Logo
×

Follow Us

ফিচার

টাংগুয়ার হাওরের যত দুঃখ

Icon

জাহাঙ্গীর আলম ভূইয়া

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৫, ১৪:৪৫

টাংগুয়ার হাওরের যত দুঃখ

প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর থাকা মাদার ফিসারিজ খ্যাত টাংগুয়ার হাওর। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, হাওরের সৌন্দর্য ও প্রাণ-প্রকৃতি ততই যেন সংকট বাড়ছে। যেসব পর্যটক হাওরের সুনাম শুনে এখানে ভ্রমণে আসছে, প্রকৃত অবস্থা দেখে তারাও হতাশ হয়ে যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে দুঃখ হাওর পারে বসবাস করা মানুষের। সীমান্তঘেঁষে শহীদ সিরাজ লেক (কয়লা কোয়ারী), যাদুকাটা নদী, শিমুলবাগানসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলো দাপিয়ে বেড়ানো অত্যাধুনিক হাউস বোটগুলোর কারণে তাদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে হাউস বোটগুলো সংরক্ষিত এলাকায় চলাচল করে। এতে হাওরের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও হাওরের পারের বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। 

মেঘালয় পাহাড় ঘেঁষে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বেশির ভাগ ও মধ্যনগর উপজেলার আংশিক অংশ নিয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি টাংগুয়ার হাওরের অবস্থান। স্থানীয় লোকজনের কাছে এ হাওর নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ১৮টি মৌজায় ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে ৯ হাজার ৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে হাওরটি জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি। পানি বহুল মূল হাওর ২৮ বর্গকিলোমিটার, বাকি অংশ কৃষিজমি ও ৬৮টি গ্রামের মানুষের বসবাস। 

১৯৯৯ সালে সরকার এই এলাকাকে বিপন্ন প্রতিবেশ এলাকা ও ২০০০ সালে ২০ জানুয়ারি ইউনেসকো বিশ্বের এক হাজার ৩১টি রামসার সাইটের মধ্যে বাংলাদেশের টাংগুয়ার হাওরকে দ্বিতীয় রামসার সাইট ঘোষণা করে। পরে ২০০১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে হাওরকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ২০০৩ সালের ৯ নভেম্বর জেলা প্রশাসন হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হাওরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)। কিন্তু হাওর সুরক্ষার বদলে বরং পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংস, পাখি-মাছ শূন্য এবং গাছপালা উজাড় হয়েছে।

হাওর পারের বাসিন্দা সফিউল আলম দুঃখ করে বলেন, হাওর উন্নয়নে যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তা দিয়ে এখানে এক আনাও উন্নয়ন হয় না। বরং সব ধ্বংস হতে চলেছে। আগে মাছ ধরতে পারতাম, এখন মাছের দেখা নেই। মিঠাপানির মাছের বদলে পাঙ্গাশ মাছ খেতে হয়। মাছের নিরাপদ আশ্রয় স্থলগুলোতে অবাধে পর্যটকের নৌকা ঘোরাফেরা করছে। 

হাউজ বোটগুলো থেকে বছরের পর বছর ধরে হাওরে শব্দদূষণ, পানিতে প্লাস্টিকের বোতল, চিপস, ডিজেলসহ বিভিন্ন ময়লা ফেলায় দূষিত হচ্ছে পানি। নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না পর্যটক পরিবহনকারী হাউস বোট ও নৌযান চালকরা, ফলে আরো ধ্বংস হচ্ছে হাওর। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকা থেকে পর্যটন ব্যবসায়ীরা অর্থলগ্নি করে তৈরি করেছে পাঁচ শতাধিক অত্যাধুনিক নামিদামি হোটেলের মতোই বিলাসবহুল হাউস বোট। তারা অনলাইনে পেইজ খুলে পর্যটন স্পটে যাওয়ার জন্য প্যাকেজ দিচ্ছে। ট্যুর পরিচালনাকারী দলগুলো নিজেদের লাভের জন্য প্রশাসনের দেওয়া কোনো নিয়মনীতি মানছে না। তারা হাউস বোটে সব ধরনের সুবিধা দিয়ে আকর্ষণ বাড়িয়ে পর্যটকদের হাওরে আনছে। এতে তাদের লাভ হলেও হাওর ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আর প্রশাসন নির্বিকার, কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করছে না তারা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাওরের ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় গিয়ে নৌকাগুলো করচগাছে বেঁধে রাখা হয়। ফলে এই এলাকায় থাকা শতাধিক হিজল করচগাছের ডালপালাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাওরের সংরক্ষিত এলাকার বিভিন্ন অংশে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে থাকা হাউস বোটগুলো থেকে উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্সে গান বাজছে। ওয়াচ টাওয়ার এলাকা সেই শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছে।

ঢাকা থেকে আগত পর্যটক মোহাম্মদ রেজাউল আহমেদ জানান, টাংগুয়ার হাওর দেখে ভালো লাগলেও পর্যটকদের নেই নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা। উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্সে গান বাজানো হচ্ছে, যা বিরক্তিকর। রিফ্রেশমেন্টের জন্য এসে অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে আছি। আগের হাওর কিছুই নেই। সব মিলিয়ে হাওর ও পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে পর্যটকদের আগমন কমে আসবে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ফেয়ার দিয়া ১১/৮/ই, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট (লেভেল-৮), বক্স কালভার্ট রোড, পান্থপথ, ঢাকা ১২০৫