Logo
×

Follow Us

ফিচার

৪৮ বছর পর ধরা পড়ল খুনি

Icon

বখতিয়ার আবিদ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৫, ১২:৫৫

৪৮ বছর পর ধরা পড়ল খুনি

খুনের শিকার গ্রেচেন (বাঁয়ে), খুনি জ্যান্ডস্ট্রা (ডানে)

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার মার্পল শহর, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। স্থানীয় চার্চের পাদরি হ্যারিংটনের চার কন্যার মধ্যে তৃতীয় কন্যা আট বছরের গ্রেচেন হ্যারিংটন সকাল ৯টায় স্কুলের উদ্দেশে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বাড়ির কাছে ট্রিনিটি চ্যাপেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত গ্রেচেন। বাসা থেকে হেঁটে সর্বোচ্চ পাঁচ-সাত মিনিটের দূরত্বে ট্রিনিটি চ্যাপেল স্কুল। স্বাভাবিকভাবে ১০টার মধ্যে তার ফিরে আসার কথা। কিন্তু সেদিন ১১টা বেজে গেলেও গ্রেচেন ফিরল না। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন মিস্টার হ্যারিংটন। ছুটেগেলেন স্কুলে, কিন্তু কোনো খোঁজ পেলেন না গ্রেচেনের। হ্যারিংটনের বন্ধু ও স্কুলের পরিচালক ডেভিড জ্যান্ডস্ট্রা খোঁজ নিয়ে জানালেন, গ্রেচেন সেদিন স্কুলেই আসেনি! এরপর আর দেরি না করে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। গ্রেচেনের খোঁজে বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছেন দমকলকর্মী, পুলিশ আর স্বেচ্ছাসেবীরা, সংখ্যায় দুইশর কম হবে না। 

পুলিশ প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলল। একজন প্রতিবেশী ডিটেকটিভ ফ্রেড ব্ল্যাঙ্ককে জানালেন, তিনি গ্রেচেনকে সকালে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছেন। এটুকুই শেষ, আর কোনো তথ্য বা সূত্র পাওয়া গেল না। পুলিশ চিফ ড্যানিয়েল হেনেসি সর্বশক্তি নিয়ে  মাঠে নামলেন। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী, দমকলকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হলো সাধারণ মানুষ। রাজ্য পুলিশের একটি হেলিকপ্টারও ক্ষণে ক্ষণে এসে চক্কর দিতে লাগল মার্পল শহরের চারদিকে। এভাবে কয়েক সপ্তাহ ধরে হন্যে হয়ে খোঁজার পর ১৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে সাত-আট মাইল দূরে রিডলি ক্রিক স্টেট পার্কে এক পথচারী গ্রেচেনের লাশ দেখতে পান। গ্রেচেনের মাথার খুলিতে গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল। সেখান থেকে নানা আলামত সংগ্রহ করে। কিন্তু ৪৮ বছরেও গ্রেচেন হত্যার রহস্যের জট খোলেনি। জানা যায়নি খুনির নাম, কী তার পরিচয়।  

আটচল্লিশ বছর পর ২০২৩ সালের ২৪ জুলাই ডেলওয়ার কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি জ্যাক স্টলস্টেইমার ঘোষণা দেন গ্রেচেনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন তারই বাবার বন্ধু ও ট্রিনিটি চ্যাপেল স্কুলের সাবেক পরিচালক ডেভিড জ্যান্ডস্ট্রা! তাকে আটক করেছে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের পুলিশ। খুনের স্বীকারোক্তি দেওয়ার পরই গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।

প্রশ্ন জাগতেই পারে, ৪৮ বছর পর জ্যান্ডস্ট্রা কী ভেবে স্বীকারোক্তি দিলেন? পুলিশই বা কোন সূত্রধরে তার কাছে পৌঁছে গেল! প্রশ্নের উত্তর জানতে একটু পেছনে ফিরতে হবে।

মার্পলেরই বাসিন্দা সাংবাদিক মাইক ম্যাথিস আর জোয়ানা ফ্যালকন গ্রেচেনকে নিয়ে একটি বই লেখার উদ্দেশ্যে স্থানীয় অনেকের সঙ্গেই কথা বলেন। সেই তালিকায় জ্যান্ডস্ট্রা ছিলেন। তারা একজন লোককে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহ করছিলেন। পুলিশকে বিষয়টি জানালে ২০১৭ সালে তারা নতুন করে তদন্ত শুরু করে। সন্দেহভাজন নির্দোষ প্রমাণিত হন। তবে এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান পুলিশকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। সেই প্রত্যক্ষদর্শী গ্রেচেনকে একটি গাড়িতে উঠতে দেখেছিল এবং সেই গাড়ির বিবরণ মিলে যায় জ্যান্ডস্ট্রার সেই সময়ের গাড়ির সঙ্গে।

গ্রেচেনের এক সহপাঠী ছিলেন জ্যান্ডস্ট্রার মেয়ের বান্ধবী। ছোটবেলায় বান্ধবীর বাড়িতে কয়েকবার থেকেছেন তিনি। সেই সময় অন্তত দুইবার জ্যান্ডস্ট্রা তার শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দিয়েছেন। এই ঘটনার প্রমাণ হিসেবে ছোটবেলায় লেখা নিজের ডায়েরি পুলিশের কাছে তুলে দেন।

গ্রেচেনের হত্যার বছরখানেকের মাথায় মার্পল শহর ছেড়ে জ্যান্ডস্ট্রা টেক্সাসে চলে যান। ২০০৫ সালের দিকে জর্জিয়ার ম্যারিয়েটায় স্থায়ী হন।

২০২৩ সালে জুলাইয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা জর্জিয়ার পুলিশের সাহায্য নিয়ে জ্যান্ডস্ট্রাকে জেরা করেন। জেরার একপর্যায়ে গ্রেচেনকে হত্যার কথা স্বীকার করেন জ্যান্ডস্ট্রা। গ্রেচেনের খুনের ব্যাপারে জ্যান্ডস্ট্রা জানান, গ্রেচেনের ওপর তার নজর ছিল আগে থেকেই। সেদিন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে তাকে একা হাঁটতে দেখে নির্জন এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে গ্রেচেনকে ক্লাসে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে উঠিয়ে নেন তিনি। বাবার বন্ধু আর নিজের শিক্ষককে বিশ্বাস করে গ্রেচেন গাড়িতে ওঠে। তাকে শহরের বাইরে নিয়ে যান জ্যান্ডস্ট্রা। এরপর নিজের বিকৃত কামনা চরিতার্থ করার চেষ্টা করেন। তবে গ্রেচেন সহজে হার মানেনি, প্রাণপণে বাধা দেয় তাকে। জ্যান্ডস্ট্রা রেগে গিয়ে গ্রেচেনের মাথায় আঘাত করলে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় গ্রেচেন। রিডলি ক্রিকে মৃতদেহ ফেলে দিয়ে শহরে ফিরে আসেন জ্যান্ডস্ট্রা। গ্রেচেনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরিচালকও ছিলেন তিনি! 

জ্যান্ডস্ট্রার আটকের মধ্য দিয়ে হ্যারিংটন পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। গ্রেচেনের বাবা মারা গেছেন। তবে তার পরিবারের অন্য সদস্যরা একটি বিবৃতি দিয়ে পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ফেয়ার দিয়া ১১/৮/ই, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট (লেভেল-৮), বক্স কালভার্ট রোড, পান্থপথ, ঢাকা ১২০৫