বিশ্ব কাপানো ‘ম্যাজিককন্যা’ মনিকা চাকমা

এ বছর এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন আয়োজিত অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ কোয়ালিফায়ার খেলা থেকেই মনিকা দেখাতে থাকেন তার তেজস্বিতা। তার বদৌলতে টুর্নামেন্টের প্রথম দুই ধাপ খুব সহজেই পার করে ফেলে বাংলাদেশ দল। 

কর্নার থেকে মন মাতানো গোল করে পহেলা মার্চে মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত হওয়া এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন আয়োজিত অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ কোয়ালিফায়ার খেলায় স্বাগতিক দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশকে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলার সুযোগ করে দেন ‘ম্যাজিক চাকমা’। 

নেপালে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৯’। সেই টুর্নামেন্টে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে চোখ ধাঁধানো গোল করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ফুটবলের এক নতুন চিত্র অঙ্কন করেন মনিকা। তার এই গোলের জাদু দেখেই ফিফা তাকে ‘ম্যাজিক চাকমা’ উপাধি দেয়। আর এই গোলটি কীভাবে ফিফার দৃষ্টিতে এলো সেই প্রশ্ন অনেকেই করেন। হরহামেশা হতে থাকা নিত্যনতুন গোলের মধ্যে খাগড়াছড়ির এই মেয়েটির জাদুকরী গোল কীভাবে ফিফার নজরে পড়ল? 

ফিফা প্রতি সপ্তাহে বিশ্বের সব ফুটবল ফ্যানদেরও বলে, তাদের পছন্দের গোলের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করতে, যেন গোলগুলো ফিফার চোখ না এড়ায়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশি এক ফুটবল ফ্যান তৌসিফ আক্কাস ফিফাকে জাদুকর মনিকার এই গোলের ভিডিওটি পাঠান। এভাবে তারা জানতে পারে মনিকা চাকমার জাদুকরী গোলের ব্যাপারে। বাংলাদেশি কন্যার এই গোল সম্বন্ধে ফিফা বলে, এই গোলটি গণনাতীত গোলগুলোর একটি।

‘বাংলাদেশ’ আর ‘ফুটবল’, অনেকের কাছেই এটা একটা বেমানান সমন্বয় মনে হলেও এ শব্দযুগল একদিন খুবই সুন্দর একটা সমন্বয় হয়ে দাঁড়াতে পারবে ভবিষ্যতে। তাদের এই বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করে ফেলেছেন মনিকা চাকমা। 

একটি গোলই পাল্টে দিয়েছে সবকিছু। অনূর্ধ্ব-১৯ বঙ্গমাতা আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপে মনিকার করা গোল ফিফার ‘ফ্যানস ফেভারিট’ ক্যাটাগরির শীর্ষ পাঁচটি গোলে জায়গা করে নিয়েছে, যা মনিকার ক্যারিয়ারের অনেক বড় অর্জন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। 

গত ৩০ এপ্রিল মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে বঙ্গমাতা আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপের সেমিফাইনাল খেলার সময় শেষ গোলটা দেন মিডফিল্ডার মনিকা এবং ৩-০ গোলে জিতে যায় বাংলাদেশ টিম। কেন মনিকার গোলটা বিশ্ব মাতালো, আসুন জানা যাক। মনিকা এক ডিফেন্ডারকে গতিতে পেছনে ফেলে বল নিয়ে এগিয়ে যান। এরপর ছয় নম্বর জার্সি পরিহিত আরেক ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে বলটা সুবিধামতো জায়গা করে নেন তিনি। এমন সময় তাকে আটকাতে এগিয়ে আসে প্রতিপক্ষ দলের আরো দু’জন খেলোয়াড়; কিন্তু মনিকা বলের নিয়ন্ত্রণ ছাড়েননি। পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকেই বাম পায়ে জোরালো কিক করেন বলে, প্রতিপক্ষ গোলকিপার গোল ঠেকানোর জন্য বেশ জোরে লাফ দেন; কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয় না, বল গোলকিপারকে উপেক্ষা করে ঢুকে যায় গোলবারের একেবারে ডানপাশ ঘেঁষে। প্রতিপক্ষের জালে তৃতীয় গোল, ফাইনালে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। 

মনিকার বাসা খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়া অঞ্চলে। বাবা বিন্দু কুমার, পেশায় একজন কৃষক; মা রভি মালা একজন গৃহিণী। পাচঁ বোনের মধ্যে মনিকা সবচেয়ে ছোট। সেই ছোট্টটি থাকার সময় একরকম দুরন্তভাবেই কেটেছে তার সময়। ছোট থেকেই এলাকার ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলতেন, যা তার বাবা মোটেও পছন্দ করতেন না। 

২০১১ সালে তিনি ময়মনসিংহের হয়ে বঙ্গমাতা প্রাইমারি স্কুল টুর্নামেন্ট নামে জীবনের প্রথম টুর্নামেন্ট খেলেন। তবুও তার বাবার সম্মতি অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ২০১২ সালে আবারো বঙ্গমাতা টুর্নামেন্ট খেলার জন্য নির্বাচিত হন তিনি, বেশ ভালো খেলেনও। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট বাংলার মেয়ে ফুটবলারদের জন্য বেশ ভালো একটা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং বরাবরের মতো এবারো মনিকা এই টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পান। তবে এবার নতুন স্কুল, রাঙামাটির মঘাছড়ি প্রাইমারি স্কুল থেকে বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেন এই দুর্ধর্ষ ফুটবলার। আর এভাবেই বাংলাদেশের ফুটবল জগতে যাত্রা শুরু হয় মনিকার। 

২০১৪ সালে রাঙামাটিতে অনূর্ধ্ব-১৪ টিমের একটা ট্রায়াল হয়। সেখানে দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্স আর অনবদ্য খেলার কৌশল দিয়ে তিনি জায়গা করে নেন বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৪ টিমে। 

এরপর ধীরে ধীরে দেশকে বিশ্ব দরবারে হাজির করার লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি নানান টুর্নামেন্ট খেলতে থাকেন তিনি। ২০১৭ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফিডারেশন (এএফসি) কর্তৃক আয়োজিত অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপ কোয়্যালিফায়ারস টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। মনিকার কল্যাণে এই খেলায় বাংলাদেশ চীনা তাইপে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, কিরগিজস্তান ও সিঙ্গাপুরকে একত্রে ২৬ গোলে হারিয়ে ফাইনালে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর সুযোগ করে নেয়।

পক্ষান্তরে পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে মাত্র দুটি গোল হয়; কিন্তু থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো নামকরা দেশগুলোকে হারিয়ে বাংলাদেশের ভালো করা একটু কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ প্রতিপক্ষ দলগুলো বিশ্ব ফুটবল র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা ২০ দলগুলোর মধ্যে ছিল আর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০০। এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ বেশ কিছু শিক্ষা নিয়ে ছিটকে যায়।

কিন্তু মনিকা সবচেয়ে এগিয়ে থাকা টিম অস্ট্রেলিয়াকে (র‌্যাঙ্কিং ৪) একটি স্মরণীয় গোল দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ টিমের যোগ্যতা, বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তার পারদর্শিতা।


মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh