বার্সেলোনা থেকে বিদায় লুইস সুয়ারেজের

লুইস সুয়ারেজ

লুইস সুয়ারেজ

কষ্টের রূপ এমনই। আজীবন চেপে রাখা যায় না। মন-অন্দরের গোপন সিন্দুকের তালা ভেঙে একদিন না একদিন বেরিয়ে আসে। কথা প্রসঙ্গে, আচরণে প্রকাশ্য ডানা মেলে ভেতরের চাপা কষ্ট। লুইস সুয়ারেজও কষ্টটা বেশি দিন মন-মন্দিরে লালন করতে পারলেন না। মাত্র তিন মাসের মাথায় উরুগুইয়ান তারকা বুকের ভেতর দলা পাকানো কষ্টটা প্রকাশ করে দিলেন। 

কথা প্রসঙ্গে তিনি প্রকাশ্যেই বলে ফেললেন, যে প্রক্রিয়ায় তাকে বার্সেলোনা ছুড়ে ফেলেছে, তাতে কষ্ট পেয়েছেন খুব। হৃদয়ে রক্ত ঝরেছে। ঝরছে এখনো।

পেশাদার ফুটবলারদের জীবনটা অনেকটা যাযাবরের মতোই। আজ এই ক্লাবে তো কালই হয়তো ঠিকানা বানাতে হবে অন্য কোনো ক্লাবে। এটাই পেশাদার ফুটবলের চরিত্র। কখনো কোনো ফুটবলার নিজের ইচ্ছাতেই খুঁজে নেন নতুন ঠিকানা। কখনো ছেড়ে দেয় ক্লাব। পেশাদার ফুটবলের এই কঠিন চরিত্রটা খুব ভালো করে চেনা সুয়ারেজের। তাই নিজের দলবদলটা সাদা মনেই মেনে নিয়েছেন তিনি। নতুন ঠিকানা অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদে সুখীও তিনি।

কিন্তু সেই সুখের ভেতরে চিনচিনে একটা কষ্ট। যার শাখায় শাখায় হাজারো প্রশ্ন- বার্সেলোনা তাকে কীভাবে আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলতে পারল? এমন অবজ্ঞা কি তার প্রাপ্য ছিল? তার বিদায়টা কি একটু সম্মানজনকভাবে হতে পারত না? তেমনটাই কি তার পাওনা ছিল না? কষ্ট নামের এই প্রশ্ন গাছগুলো সুয়ারেজের বুকের ভেতরে জন্মেছে আসলে নিখাঁদ ভালোবাসা থেকে। বার্সেলোনাকে তিনি ভালো বেসেছিলেন খুব। দীর্ঘ ৬টি মৌসুম কাটিয়েছেন ক্যাম্প-ন্যুতে।

বার্সেলোনার প্রতিটি খেলোয়াড়, সাপোর্ট স্টাফদের সাথে গড়ে তুলেছিলেন নির্মল ভালোবাসার সম্পর্ক। বার্সার সমর্থকেরাও তাকে ভালোবেসে জায়গা দিয়েছিল বুকে। ক্যাম্প-ন্যুর ড্রেসিংরুম, প্রতিটি দেয়াল, মাঠ, মাঠের ঘাসও তাকে আপন করে নিয়েছিল। সুয়ারেজ নিজেও ক্যাম্প-ন্যুকে মনে করেছিলেন ‘আপন ঘর’; কিন্তু সেই ‘আপন ঘর’ থেকে তাকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে।

 যেভাবে তাকে অ্যাতলেতিকোর কাছে বেচে দিয়েছে বার্সেলোনা, সেটা আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলাই। নির্লজ্জ অবজ্ঞা। অথচ বার্সেলোনার হয়ে সুয়ারেজের অর্জন বলছে, কোনোভাবেই এমন অবজ্ঞার বিদায় সুয়ারেজের প্রাপ্য ছিল না। বার্সেলোনার কর্তারা তাকে ও তার অর্জনকে অসম্মান করেছে। ৬ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৮৩ ম্যাচ খেলে ১৯৮টি গোল করেছেন সুয়ারেজ। যা তাকে বসিয়েছে বার্সেলোনার ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায়।

শুধু তাই নয়, ৬ মৌসুমে ক্লাবকে ১৩টি শিরোপা উপহার দিয়েছেন। ৬ মৌসুমের মধ্যে চারবারই ক্লাবকে জিতিয়েছেন লিগ। তারচেয়েও বড় কথা, অধিনায়ক লিওনেল মেসির সাথে গড়ে তুলেছিলেন দারুণ এক জুটি। মাঠে দুই বন্ধুর বোঝাপড়া, যোগাযোগটা ছিল অবিশ্বাস্য। বার্সার মেসি-সুয়ারেজ জুটিকে সমীহ করেছে বিশ্বের সব বড় ক্লাবই। প্রতিভা বিচারে নিখাঁদ ‘নম্বর ৯’। পায়ে ফর্মও ছিল। ছিল গোল করার প্রচণ্ড ক্ষুধাও।

কিন্তু এত সবের পরও স্রেফ বয়সের দিকে তাকিয়ে বার্সেলোনা ভেবে নিল, সুয়ারেজের প্রয়োজন তাদের ফুরিয়ে গেছে। বুড়ো সুয়ারেজকে আর তাদের দরকার নেই! নিজেদের এই ভাবনাটাকে বাস্তবায়ন করতে একতরফাভাবে সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলল বার্সেলোনার পরিচালন বোর্ড- বেচে দিতে হবে সুয়ারেজকে। বেচে দেয়ায় দুঃখ নেই সুয়ারেজের। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ক্লাব তাকে রাখবে না, এই সত্য-কঠিন স্বাভাবিক নিয়মটা ভালো করেই জানা সুয়ারেজের; কিন্তু বেচে দেয়ার আগে যেভাবে মুখের ওপর বলে দিল, ক্লাবের আর তাকে দরকার নেই, ক্লাবের ভবিষ্যত পরিকল্পনায় তিনি নেই, সুয়ারেজের কষ্টটা সেখানেই।

আসলে সুয়ারেজের ওপর থেকে বার্সা কর্তাদের মন উঠে যায় গত মৌসুমেই; কিন্তু সেটা কর্তাদের অন্দরমহলেই বন্দি ছিল। কর্তাদের গোপন সেই পরিকল্পনাটা বাইরে আসে বার্সার নতুন কোচ রোনাল্ড কোমানের কণ্ঠ বেয়ে। মৌসুমের শুরুতে এই ডাচ কোচ বার্সেলোনার দায়িত্ব নিয়েই সুয়ারেজকে সরাসরি বলে দেন, ‘তুমি আমার পরিকল্পনায় নেই। তুমি নতুন ক্লাব খুঁজে নাও।’ এরপর কাল-বিলম্ব না করে অ্যাতলেতিকোর কাছে তাকে বেচেও দিল দ্রুত।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh