মেসির অশ্রুসিক্ত বিদায়

লিওনেল মেসি। ফাইল ছবি

লিওনেল মেসি। ফাইল ছবি

যে লিওনেল মেসির সঙ্গে বার্সেলোনার বন্ধন অবিচ্ছেদ্য বলে মনে হতো, সেই বন্ধন ছিঁড়েছে। বার্সেলোনাই আনুষ্ঠানিকভাবে অবিশ্বাস্য ঘোষণাটা দিয়েছে দিন দু-এক হলো। বার্সেলোনার পর মেসিও সেই নীরবতা ভেঙেছেন। এমন দিন এত দ্রুত চলে আসবে, বার্সেলোনা সমর্থকরা ভাবেননি। ভাবেননি লিওনেল মেসিও।

বার্সা আর মেসি যে একে অন্যের সমার্থক হয়ে গিয়েছিলেন, হয়তো পরিপূরকও। অথচ সেই মেসি ক্লাবে থাকতে চাইছেন, কিন্তু আর্থিক জটিলতায় বার্সা তাকে রাখতে পারছে না... এমন দিন কে কবে কল্পনা করেছিল! অকল্পনীয় ব্যাপারটাই এখন সত্যি। বার্সা আর মেসির পথ এখন আর এক নয়। ১৭ বছর বার্সেলোনার জার্সি গায়ে ঈর্ষণীয় সাফল্যের গল্প রচনা করা মেসি বিদায় জানিয়েছেন কাতালান ক্লাবকে। অথচ এক মেসির অনবদ্য সব নৈপুণ্যে কতই না সাফল্যের গল্প বার্সেলোনার। ১৭ বছর বার্সেলোনায় প্রাণ ভোমরা হয়েছিলেন আর্জেন্টাইন খুদে জাদুকর। কত শত অর্জনের গল্পের জন্ম দিয়েছেন স্প্যানের ক্লাবটির হয়ে।

বার্সার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় আর্জেন্টাইন অধিনায়ক মেসি এখন কোন ক্লাবে যাবেন- তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। ফ্রান্সের ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মে ও ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে অনেক দিন ধরেই মেসির আলোচনা চলছিল। এর আগে আমেরিকার মেজর লিগ সকারে খেলার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন মেসি। কাজেই ওই লিগের কোনো ক্লাবেও তার যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যে ক্লাবের কাছে নতুন জীবন পেয়েছিলেন, সেই ক্লাবকে কতশত সাফল্য এনে দিয়েছেন তা গুনতে গেলে হাঁপিয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। যখন মূল দলে নাম লেখান, তখন কাতালান ক্লাবের দখলে একটি ইউরোপিয়ান কাপ, ১৬ লা লিগা ও ২৪ কোপা দেল রে ট্রফি। মেসি যুগ শেষ, সব মিলিয়ে বার্সার ট্রফি কেসে শোভা পাচ্ছে পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ২৬টি লা লিগা ও ৩০টি কোপা দেল রে! এই সংখ্যাগুলো ক্লাবে মেসির গুরুত্ব স্পষ্ট করে দেয়। তাকে নিয়ে বার্সা সেরা সময়গুলো কাটিয়েছে। এটা সত্যি যে, অনেক মৌসুমে তার চারপাশে ছিলেন বড় বড় খেলোয়াড়রা; কিন্তু রোজারিওতে জন্ম নেওয়া ১০ নম্বর জার্সিধারী ছিলেন সবসময় প্রাণকেন্দ্রে। ক্লাবের হয়ে সর্বকালের শীর্ষ গোলদাতা, সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড মেসির পায়ে লুটিয়ে পড়েছে। জিতেছেন ছয়টি ব্যালন ডি-অর। রেকর্ড ছয়টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন সু। সমানসংখ্যক বার লা লিগার সেরা খেলোয়াড়। কিছুই পাওয়ার বাকি ছিল না তার, এমনকি দেওয়ারও।

৭৭৮ ম্যাচ, ৬৭২ গোল, ৩০৫ অ্যাসিস্টে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। তবে গত মৌসুম শুরু না হতেই আকস্মিকভাবে ব্যুরোফ্যাক্সে বার্সা ছাড়ার ঘোষণা দেন অভিমানী মেসি। পারেননি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর কুটবুদ্ধির কারণে। রিলিজ ক্লস জটিলতায় সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হয়; কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সেই অভিমান থেকে সরে আসেন মেসি। সব মিলিয়ে গত মৌসুমে ৪৭ ম্যাচে ৩৮ গোল করে বুঝিয়ে দেন, এখনো অন্তরে রয়েছে বার্সার প্রতি ভালোবাসা। একইসঙ্গে শেষ হতে বসেছিল তার চুক্তির মেয়াদ। তাকে রেখে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন জিতে হোয়ান লাপোর্তার প্রেসিডেন্সি শুরু হয়। সব চেষ্টাই তিনি করে গেছেন প্রতিশ্রুতি রক্ষায়। এমনকি মেসি যখন কাগজে কলমে আর বার্সার নয়, তখনও। কিন্তু আর্থিক সংকট আর লা লিগার কঠোর নীতিতে হার মানতে বাধ্য হলেন। ঘোষণা দিলেন মেসিকে তারা আর রাখতে পারছেন না। কারণ তাকে চুক্তি করলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বার্সা। 

তারপরও এমন ঘোষণার অপেক্ষায় কোনোকালে ছিলেন না বার্সা কিংবা মেসি ভক্তরা। তাকে শেষ বিদায়টাও জানানো হলো না। হতভম্ব করা এই ঘোষণার পর সকাল থেকে ন্যু ক্যাম্পের গেটে শতশত ভক্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন। ‘ওয়ান ক্লাব ম্যান’ জাভি হার্নান্দেজ ও কার্লোস পুয়োলের মতো একটা বিদায় সংবর্ধনা পাওয়ার দাবি তো রাখেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। লাপোর্তা করলেন দুঃখ প্রকাশ, করোনাভাইরাস বিধিনিষেধের কারণে তা সম্ভব নয়। ন্যাপকিন পেপারে লেখা বার্সায় মেসি ইতিহাসের এমন সমাপ্তি কে-ই বা দেখতে চেয়েছিল!

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //