প্রবাসী ফুটবলার নিয়ে আশা বাড়ছে

বিশ্বের সবেচেয় জনপ্রিয় খেলা ফুটবলে এখন বিবর্তন চলছে। বিশেষ করে দেশের বাইরে জন্ম নেওয়া ফুটবলারদের নিয়েই স্বপ্নটা বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্স তো প্রবাসী এসব ফুটবলার নিয়ে বিশ্বকাপই জিতে নেয়। যদিও বাংলাদেশ এ পথে আরো আগেই হাঁটা শুরু করেছে।

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের তৎকালীন কোচ লোডউইক ডি ক্রুইফ ২০১৩ সালে নতুন এক পথের দিশা দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। জামাল ভূঁইয়াকে দিয়ে যে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল এবারের ফুটবল মৌসুমে সেটি পেতে যাচ্ছে ভিন্ন মাত্রা। প্রবাসে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা এখন সংখ্যাটা দিনে দিনে বড় হচ্ছে।

আট বছর পর ২০২১ সালে কাজী তারিক রায়হানের কল্যাণে এখন বৃদ্ধি পেয়েছে। নিজের প্রতিভাগুণে জামাল তো দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। ডিফেন্সিভ এই মিডফিল্ডারের এখন দেশের ফুটবলের পোস্টারবয় হিসেবে পরিচিত। ডেনমার্কে জন্ম নেওয়া জামালের অবশ্য শুরুতে বাংলাদেশের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে খানিকটা সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। যেমন করে ফিনল্যান্ডে জন্ম ও বেড়ে ওঠা তারিক কাজীকেও পার হতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতা।

জামাল-তারিকের পর সংখ্যাটা এখন বেড়ে ১০-১১ জনে দাঁড়িয়েছে। ওবায়দুর রহমান নবাব-মাহাদী খানরা লাল-সবুজের জার্সি গায়ে চাপানোর বড় স্বপ্ন নিয়েই এদেশে এসেছেন। দেশের ফুটবলে প্রবাসীদের গুরুত্ব এতটাই বেড়েছে যে, মধ্যবর্তী দলবদলে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেড, সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেড ও বাংলাদেশ পুলিশ ফুটবল ক্লাব চারজনকে দলভুক্ত করেছে। মোহামেডান ইংল্যান্ড প্রবাসী নাবিল আরিফ ইবনে রহিম ও আব্দুল মুহাইমিন হক, পুলিশ ক্লাবে ইংল্যান্ডেরই সাকলাইন আহমেদ চৌধুরী এবং সাইফ এসসি একই দেশের স্যামুয়েল হাডসনকে দলে নিয়েছে।

জাতীয় দলে সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষ গোল স্কোরারের অভাবটা চরমভাবে ভোগাচ্ছে। প্রবাসী ফুটবলারদের সুযোগ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই সংকট কাটানো; কিন্তু জামাল মিডফিল্ডার আর তারিক ডিফেন্ডার। তাই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা চাইছেন, দেশের বাইরে থেকে যেন স্ট্রাইকাররা বেশি করে আসেন।

আলোচিত এই দু’জনের আগে ওবায়দুর রহমান নবাব জাতীয় দলের ক্যাম্পে সুযোগ পেয়েছিলেন। এছাড়া রাহবার ওহায়েদ খান, ফ্রান্স প্রবাসী তাহমিদ ইসলামও লাল-সবুজ জাতীয় দলের প্রাথমিক দলে ডাক পেয়েছিলেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে চার জাতি টুর্নামেন্টে রাহবার সুযোগ পেয়েছিলেন। অনূর্ধ্ব-২৩ দলে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ইউসুফ জুলকারনাইন হককে। যাদের মধ্যে জামাল ও তারিক টিকলেও রাহবার, ইউসুফ টেকেননি। বাকিরা কোচদের সেভাবে মন জয় করাতে পারেননি বলে ফিরে গেছেন জন্মভিটায়। এখন নাবর-রাহবাররা যদি নিজেদের প্রমাণ করতে পারেন তাহলে যে সুযোগ মিলবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। প্রবাসে জন্ম নেওয়া ফুটবলারদের মধ্যে এখন বিভিন্ন ক্লাবে খেলছেন ১২ জন। 

এর বাইরে নতুন চার ফুটবলার ছাড়া বসুন্ধরা কিংসের হয়ে তারিক কাজী এবং নরওয়েতে জন্ম নেওয়া মাহাদী খান খেলছেন। শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে রাহবার খান, বসুন্ধরা থেকে ধারে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে নবাব বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ফুটবলের দ্বিতীয় পর্বে খেলছেন। এছাড়া সুইডেনে জন্ম নেওয়া জোসেফ নুর রহমান বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে (বিসিএল) ফর্টিস স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলছেন। আলোচিতদের মধ্যে কেবল ইংল্যান্ড প্রবাসী ইউসুফ জুলকারনাইন এবং ফ্রান্স প্রবাসী তাহমিদ ইসলামই ঘরোয়া লিগে খেলেননি। 

পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিনিয়ত প্রবাসী ফুটবলারের সংখ্যাটা বাড়ছে। এই যেমন ২০২১ সালের মে মাসে বিপিএল ফুটবলে এক ম্যাচে তিন প্রবাসী খেলোয়াড় খেলেছেন। বসুন্ধরা-ব্রাদার্স ইউনিয়ন ম্যাচে তারিক কাজী, মাহাদী খান ও জোসেফ নুর খেলেন। তারা এখনো খেলছেন, তবে ইউসুফ, তাহমিদের মতো কেউ কেউ রয়েছেন দোটানায়। তবে বিপিএল ফুটবলের মধ্যবর্তী দলবদলে বড় সমাবেশ ঘটেছে প্রবাসী ফুটবলারের। 

বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ বলেছেন, ‘বিদেশ থেকে কেউ আসলেই তাকে জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। নিজেকে প্রমাণ করে তবেই লাল-সবুজের দলে সুযোগ পাচ্ছেন তারা। বিষয়টিকে ফেডারেশন দেখছে ইতিবাচক হিসেবে। আমাদের মূল লক্ষ্য ভালো মানের স্ট্রাইকার খুঁজে বের করা।’

এদের মধ্যে আবার আলাদা একজন আবিদ হোসেন। মোহামেডানের সাবেক ফুটবলার আবুল হোসেনের ছেলে আবিদের জন্ম অবশ্য মার্কিন মুল্লুকে। বাবার প্রিয় ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন বড় স্বপ্ন নিয়ে। এছাড়া ইতালি প্রবাসী বিশাল দাস খেলছেন বিসিএল থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিমিয়ারে আসা স্বাধীনতা ক্রীড়া সংঘে। সাবেক ফুটবলার খোকন দাসের ভাতিজা বিশাল দাস এর আগে ব্রাদার্স ইউনিয়নে খেলেছেন। শেখ জামালের জার্সিতে ফেডারেশন কাপ ও স্বাধীনতা কাপে খেললেও ইনজুরির কারণে কানাডা ফিরে যেতে হয়েছে রাহবারকে।

প্রবাসীদের অনেকেই মূলত একটি ধারণা নিয়ে আসেন, বাংলাদেশে এলেই মনে হয় জাতীয় দলে খেলার সুযোগ মিলবে; কিন্তু এখানেও যে প্রতিযোগিতা করে সুযোগ করে নিয়ে হবে এটা তাদের ভাবনার মধ্যেই থাকে না। সে কারণে পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণে দ্রুতই অনেকে চলে যান।

ফেডারেশনের মতোই বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন চট্টগ্রাম আবাহনীর কোচ একেএম মারুফুল হক, ‘জামাল ভূঁইয়া ও তারিক কাজী যে পদটা দেখিয়ে দিয়েছেন সেখানে যারা আসছেন তাদের খুব একটা মানসম্মত মনে হয়নি। পাশাপাশি প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হবে এই মানসিকতা নিয়ে তারা আসেননি। আমি মনে করি যে, স্রোতটা শুরু হয়েছে এটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তখনই এটা ফলপ্রসূ হবে, যখন দেখা যাবে জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে’।

জামাল আসার পর ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে যেমন দারুণ একজন খেলোয়াড় পেয়েছে বাংলাদেশ ঠিক তেমনি তারিক কাজীও পূরণ করেছেন রক্ষণভাগের অভাব। সে কারণেই ফুটবল বিশ্লেষকদের বড় একটা অংশ মনে করেন, প্রবাসী ফুটবলারদের মধ্যে যারা কেবল মেধাবী তাদেরই সুযোগ মিলতে পারে। অপরিচিত পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শুরুতে অনেক কষ্ট করতে হবে। সেই মানসকিতা যাদের নেই তারা আর যাই হোক জাতীয় দলে সুযোগ করে নিতে পারবেন না। ভালোমানের স্ট্রাইকার পাওয়া গেলে লাভবান হবে জাতীয় দলের পাশাপাশি দেশের ফুটবল। অপেক্ষাটা সেই সময়ের।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //