ICT Division

বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে চান না আমলারা

বর্তমানে দেশে সরকারি চাকরিজীবন ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরের ভীতি কাজ করছে। সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মকবুল হোসেন ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনার পর এ ভীতি কাজ করছে কর্মকর্তাদের মনে। এই অবসর প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যেখানে আমলারা বাধ্যতামূলক অবসর প্রত্যাশাই করেন না সেখানে যেকোনো এই খড়গ নেমে আসতে পারে বলে তারা বেশ বিচলিত বর্তমানে।

আইনের ৪৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারির চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যেকোনো সময় জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে সরকার কোনো ধরনের কারণ দর্শানো ছাড়াই তাকে চাকরি থেকে অবসরে পাঠাতে পারে। প্রশাসনের বর্তমান ও সাবেক একাধিক সচিবসহ বিশিষ্টজনরা মনে করেন, আইনের এ ধারাটি গণবিরোধী। সব সরকারের আমলেই এ ধারার রাজনৈতিক অপব্যবহার করা হয়েছে। তাই আইনে বাধ্যতামূলক অবসরের ধারাটি বাতিল হওয়া উচিত। কাউকে বাধ্যতামূলক চাকরি থেকে বিদায় করা উচিত নয়। দীর্ঘ জীবন চাকরি করে এমন বিদায় চান না আমলারা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সব সরকারের আমলেই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে। এইচএম এরশাদের সামরিক সরকারের আমলে প্রায় ৮০ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সময়ে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকার আমলে প্রায় ৫৬ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা তুলনামূলক অনেক কম। এ সরকারের আমলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তার সংখ্যা সব মিলিয়ে ২০ জনের বেশি হবে না। কয়েক দিন আগে তথ্য সচিবসহ পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর আগে গত বছর পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। 

এছাড়া ২০১৪ সালে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার কারণে পাঁচ সচিবকে একসাথে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এর আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হেয় করে কবিতা লেখার অভিযোগে ২০০৯ সালে তৎকালীন তথ্য সচিব আ ত ম ফজলুল করিমকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। তিনি লেখকমহলে আবু করিম নামে পরিচিত ছিলেন। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদে ছয়জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে। তবে বিএনপি আমলে ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ৫০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।’ 

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৩ (১) ধারায় বলা হয়েছে, একজন সরকারি কর্মচারি তার বয়স ৫৯ বছর পূর্তিতে এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মচারী তার বয়স ৬০ (ষাট) বছর পূর্তিতে, অবসর নেবেন। ৪৪ (১) ধারায় বলা হয়েছে, চাকরির মেয়াদ ২৫ (পঁচিশ) বছর পূর্ণ হওয়ার পর যেকোনো সময় একজন সরকারি কর্মচারি অবসর গ্রহণের অভিপ্রেত তারিখের অন্যূন ৩০ (ত্রিশ) দিন আগে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের অভিপ্রায় লিখিতভাবে ব্যক্ত করে অবসর নিতে পারবেন। 

তবে সরকারের পক্ষ থেকে অবসর দেওয়াসংক্রান্ত আইনের ৪৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারির চাকরির মেয়াদ ২৫ (পঁচিশ) বছর পূর্ণ হওয়ার পর যেকোনো সময় সরকার, জনস্বার্থে, প্রয়োজনীয় মনে করলে কোনোরূপ কারণ না দর্শিয়ে তাকে চাকরি থেকে অবসর দিতে পারবে।

সরকারের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাধ্যতামূলক অবসরের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে শুধু জনস্বার্থে চাকরি থেকে অবসর দেওয়ার কথা বলা হলেও তার কোনো কর্মকাণ্ড জনস্বার্থবিরোধী হয়েছে, সে সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া অনেক কর্মকর্তাই কখনো জানতে পারেননি তাকে কেন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। সরকারি চাকরি থেকে গত রবিবার (১৬ অক্টোবর) ‘বাধ্যতামূলক’ অবসরে পাঠানো তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মো. মকবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি জানি না আমাকে কেন অবসরে পাঠানো হলো। মানুষকে ফাঁসি দিলেও তো একটা ট্রায়াল হয়। কিন্তু আমি জানি না কোন কারণে সরকারের এ সিদ্ধান্ত।’

সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর এ বিধান ব্রিটিশ আমলে ছিল, পাকিস্তান আমলে ছিল এবং বাংলাদেশেও আছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ আমলে করা আইনগুলোকে সমন্বয় করে ২০১৮ সালে নতুন সরকারি চাকরি আইন করা হয়েছে। এ আইনের ধারা সবসময়ই প্রায় একই রকম। আইন অনুযায়ী চাকরির বয়স ২৫ বছর হলে আপনি স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে পারেন আবার সরকার চাইলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারে। পাকিস্তান আমলে এ আইনের নাম ছিল পিও-৯। এই পিও-৯-এর অধীনে পাকিস্তান আমলেও অনেক সিএসপি কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।’

সরকারি চাকরি আইনের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোসংক্রান্ত ৪৫ নম্বর ধারাটি সব সরকারের আমলেই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এ ধারাটি গণবিরোধী ধারা। কারণ কেউ যদি অপরাধ করে, তাকে প্রচলিত আইনে বিচার করতে হবে। কিন্তু তা না করে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই হাতে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে অবসরে পাঠানো কোনো ন্যায়বিচার থেকে পারে না। এটা অগণতান্ত্রিক ধারা। অবশ্যই এ ধারা বাতিল করা উচিত।’

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //