করোনায় মানসিক উৎকন্ঠা থেকে মুক্তি পেতে...

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত কয়েক মাসে আমাদের জীবনে যেসব নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, তাতে আমাদের মানসিক দুশ্চিন্তা যেন অনেক বেড়ে গেছে। 

এক নতুন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, অভিভাবকরা বিশেষ করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাদের সন্তানদের নিয়ে।

কোনটাকে আমরা মানসিক দুশ্চিন্তা বলবো? আর এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির উপায় কী? যখন বলা হয়, কেউ মানসিক উৎকন্ঠা বা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন, তার মানে এটা মানসিক চাপ বা কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত হওয়ার চাইতে বেশি কিছু। আমরা সবাই কমবেশি কোনো না কোনো বিষয়ে চিন্তায় থাকি বা মানসিক চাপে ভুগি। এগুলো মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এরকম প্রতিক্রিয়া দেখানো ভালো।

কিন্তু কেউ যখন সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন, যেটা রীতিমত ভীতিকর হয়ে উঠে এবং যা থেকে আর মুক্তি পাওয়া যায় না, তখন সেটাই আসলে মানসিক উৎকন্ঠা বা দুশ্চিন্তা। এই সমস্যা এতটাই তীব্র হয়ে উঠতে পারে যে এটি আপনার পুরো জীবন বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, আপনার নিত্যদিনের স্বাভাবিক কাজকর্মে বিঘ্ন তৈরি করতে পারে।

এর ফলে আপনাকে সারাক্ষণই খুব চিন্তিত মনে হবে, ক্লান্তিতে ভুগবেন ও কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারবেন না। ঘুমাতে অসুবিধা হবে ও বিষন্ন বোধ করবেন।

প্রায়শই এমন কিছু লক্ষণ চোখে পড়বে, যার প্রভাব শরীরেও পড়বে। যেমন হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘন ঘন নিশ্বাস নেয়া, শরীর কাঁপা, ঘাম হওয়া, মাথা ঘোরা, ডায়ারিয়া ও অসুস্থ বোধ করা।

মানসিক উৎকন্ঠার অনেক রকমফের আছে। কারও ক্ষেত্রে এটা হয়তো খুবই মৃদু, কারও ক্ষেত্রে এটি খুবই তীব্র হয়ে উঠতে পারে। প্রতি ১০ জনের একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় বা কোনো ধরণের ফোবিয়া বা ভীতিতে আক্রান্ত হবেন। কিন্তু অনেকেই এরজন্য চিকিৎসকের কাছে যান না।

মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগা মানুষদের প্রথমেই উচিৎ নিজেই নিজেকে দুশ্চিন্তামুক্ত করার চেষ্টা করা। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব সাইক্রিয়াট্রিস্টসের পরামর্শ হচ্ছে, নিজেকে নিজে সাহায্য করার কিছু কৌশল আছে, প্রথমে সেটাই চেষ্টা করা উচিৎ। যেমন:

১. কোনো বন্ধু বা আত্মীয়ের সাথে কথা বলা

২. কোনো সেলফ হেলপ গ্রুপ বা অনলাইন সাপোর্ট গ্রুপে যোগ দেয়া

৩. রিল্যাক্সেশন বা শারীরিক-মানসিক শিথিলকরণের কৌশল শেখা

৪. যোগ ব্যায়াম, শরীরচর্চা, বই পড়া ও গান শোনা। এগুলো খুব সহায়ক হতে পারে

৫. বিশেষজ্ঞরা বলেন, মদ পান এবং ধূমপান বন্ধ করলেও মানসিক উৎকন্ঠা অনেক কমে যায়।

এরপরও যদি দুশ্চিন্তা দূর না হয়, তখন অনেক ধরণের আত্মোন্নয়নমূলক (সেলফ হেল্প) বই আছে, সেগুলোর সাহায্য নেয়া যেতে পারে। এসব বইতে নানা ধরণের থেরাপির বর্ণনা আছে। যেমন- কগনিটিভ বিহ্যাভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি)। 

সিবিটি থেরাপি মূলত দুশ্চিন্তায় ভোগা মানুষকে কথা বলে প্রশান্তি দেয়ার চেষ্টা । যখন কেউ খুব বড় ধরণের সমস্যার কারণে দুশ্চিন্তায় ভুগতে থাকেন, তখন তার সাথে কথা বলে এই সমস্যাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে সেগুলো মোকাবেলার পরামর্শ দেয়া হয়। যেসব শিশু মারাত্মক মানসিক দুশ্চিন্তা ভোগে, তাদের জন্যও এটা বেশ কার্যকরী। মা-বাবাকে এই থেরাপি শেখানো যায়, যাতে তারা তাদের সন্তানদের এটি দিতে পারেন।

যুক্তরাজ্যে মানসিক দুশ্চিন্তা বিষয়ক একটি সংস্থা অ্যাংজাইটি-ইউকের নিকি লিডবেটার বলেন, কেউ যেন মানসিক দুশ্চিন্তা চেপে রেখে একা একা না ভোগেন, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যে ডাক্তারের সাথে দেখা করে লক্ষণগুলো তাকে বলা। তবে সবার জন্য এটাই যে একমাত্র নিরাময়ের পথ, তা নয়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্টাল ক্লিনিকাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ক্যাথি ক্রেসওয়েল বলেন, স্কুলের চাপ যেহেতু এখন নেই, তাই কেউ কেউ তাদের জীবন নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে, কেউ কেউ আবার বেশ ভালোই করছে।

প্রফেসর ক্রেসওয়েল করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর যে লকডাউন জারি করা হয়, তার প্রথম মাসে শিশুদের ও তাদের মা-বাবার ওপর একটি সমীক্ষা চালান। এতে তিনি দেখেছেন, প্রাথমিক স্কুলের শিশুদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, নিরানন্দ ও মন খারাপ থাকার ব্যাপারগুলো বেড়ে গেছে। তবে মাধ্যমিক স্কুলের ছেলে-মেয়েদের বেলায় এরকম আবেগজাত সমস্যা কম দেখা গেছে। এরা বলেছে, তাদের মনে বা ব্যবহারে সেরকম কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

১৩ ও ১৪ বছর বয়সীদের ওপর চালানো আরেকটি জরিপে এটার প্রতিফলন দেখা গেছে। এই জরিপে দেখা যায়, গত অক্টোবরে ছেলে-মেয়েরা যতটা দুশ্চিন্তায় ভুগতো, লকডাউনের মধ্যে তাদের মধ্যে ততটা দুশ্চিন্তা ছিল না। এর মানে হচ্ছে, বয়সভেদে শিশুদের মধ্যে দুশ্চিন্তায় ভোগার ব্যাপক তারতম্য ঘটে।

দুশ্চিন্তায় ভোগা শিশুদের ও তরুণ ছেলে-মেয়েদের সাহায্য করতে এনএইচএস পাঁচটি পরামর্শ দিচ্ছে অভিভাবকদের। এগুলো হলো:

১. ওদের কথা শুনুন: ওরা কেমন আছে জিজ্ঞেস করুন নিয়মিত, যাতে তারা তাদের অনুভূতি সম্পর্কে কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।

২. তাদের জীবনের সাথে যুক্ত থাকুন: তাদের ব্যাপারে ও যেসব বিষয় তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে আগ্রহ দেখান।

৩. একটি ইতিবাচক রুটিন মানায় উৎসাহ দিন: তাদের জন্য ইতিবাচক রোল মডেল হয়ে উঠুন। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া ও শরীরচর্চা, খেলাধূলায় অংশ নেয়ায় উৎসাহ দিন।

৪. তাদের আগ্রহে উৎসাহ দিন: তারা যাতে সক্রিয় থাকে, সৃষ্টিশীল থাকে ও নতুন নতুন জিনিস শেখে এবং একটি টিমের সাথে মিলে এসবে অংশ নিতে পারে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য।

৫. ওদের কথাকে গুরুত্ব দিন: ওরা যা বলে, সেটাকে মূল্য দিন। কঠিন আবেগজড়িত বিষয় যাতে তারা মোকাবেলা করতে পারে, সেজন্য তাদের সাহায্য করুন। -বিবিসি

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh