স্বাস্থ্যের সুপারিশ বাস্তবায়নে চিঠি দিলেও কাজ হয়নি:
লিয়াকত আলী

মাহফুজ উল্লাহ হিমু
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৫, ১৫:২৫

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করে দেওয়া স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে মনে করেন কমিশনের সদস্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী অধ্যাপক লিয়াকত আলী।
তার মতে কেবল সরকার নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও এটি যথেষ্ট পায়নি। ফলে ৩২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সুপারিশগুলো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। আবার তারা যেসব সুপারিশ করেছেন, সেটি আমলাতন্ত্র থেকে শুরু কবে বেসরকারি খাত- সবার কাছে ভালো লাগতে নাও পারে।
সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারকে চিঠিও দিয়েছে কমিশন, কিন্তু জবাব আসেনি, আর সরকারের এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ না দেখে পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি।
সাম্প্রতিক দেশকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এও বলেছেন, জনগণের চাপ ও সামাজিক দাবি ছাড়া স্বাস্থ্য সংস্কার এগোবে না।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশের অগ্রগতি কী। এখন পর্যন্ত কী কী সুপারিশ চূড়ান্ত হয়েছে এবং তা কতটা বাস্তবায়নের পথে আছে?
আমাদের সুপারিশের তালিকা বিশাল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ সেবা, সুশাসন, জনবল, সাপ্লাই, অর্থায়ন ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে আলাদা আলাদা অধ্যায় করেছি।
আমরা সুপারিশ তৈরির দায়িত্বে ছিলাম, বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের কাছে ছিল না। আমরা যখন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছি তখন আমরা দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ করেছি। তিনি এর গুরুত্ব স্বীকার করে দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। যদিও আমরা তার প্রতিফলন দেখিনি।
আমরা সম্প্রতি তাঁকে খোলা চিঠি দিয়েছি। একটি অনুষ্ঠানে আমরা বলেছি যে, সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি আমরা দেখিনি। এ বিষয়ে আমাদের কোনো কিছু জানানোও হয়নি।
আমরা সুপারিশ জমা দেওয়ার সময়েই বলে দিয়েছিলাম, এটি বাস্তবায়নে আমাদের সহযোগিতা লাগলে আমরা সানন্দে সহায়তা করতে রাজি থাকব। আমরা কমিশনের রিপোর্টেও তা বলেছি।
কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কোন প্রতিবন্ধকতা দেখছেন কী?
একদম সুনির্দিষ্ট বলা কঠিন। কিন্তু আমরা মনে করি, বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকবেই। এটি শুধুমাত্র রঙ দিয়ে চকচকে বা ছোটখাটো মেরামতের জিনিস না, আমরা আমূল সংস্কারের কথা বলেছি। আমরা যে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের কথা বলেছি তা অনেকে পছন্দ নাও করতে পারে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে আমরা বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলেছি। বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেছি। বাজেটের ক্ষেত্রে সব মন্ত্রণালয় তাদের বাজেট বেশি চায়। আমরা ধারাবাহিকভাবে স্বাস্থ্যে বাজেট বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশ করার কথা বলেছি, সেটাও অনেকের অপছন্দ হতে পারে।
আমরা স্থায়ী স্বাস্থ্য কমিশনের কথা বলেছি, যা স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবে। এই কমিশন নির্বাহী বিভাগের প্রধানের কাছে জবাবদিহি করবে। এটা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। আমলাতন্ত্রের বদলে জনগণের সম্পৃক্ততাসহ বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেছি, যা হয়তো সবার পছন্দ নাও হতে পারে।
আমরা বেসরকারি খাতকে একটি নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসার কথা বলেছি। তাদের দাম ও মান নিশ্চিতের জন্য বলেছি। সেটি শুধু সেবা খাতে না, শিক্ষাখাতের জন্যও প্রযোজ্য।
সুপারিশ প্রণয়নে বেসরকারি অংশীজনদের অংশগ্রহণ কতটুকু ছিল? তাদের বেশ কিছু বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে, আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
আমরা ফার্মেসি কাউন্সিলের সাথে কথা বলেছি, সেখানে কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে কোম্পানির মালিকরাও হয়ত ছিলেন। বিভিন্ন ফোরামের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে, আমাদের সময় অল্প ছিল, ফলে সব খাতের সঙ্গে আলাদা আলাদা বসার মতো সুযোগ ছিল না।
আমরা ওয়েবসাইটে বিস্তারিত প্রস্তাব তুলে ধরেছিলাম, সেখানে সবার মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল। আমরা ৮ হাজার লোকের একটি জনমত জরিপও করেছি। সবার মতামত বিবেচনা করেছি।
একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নীতি-নিয়ম প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনা করা হয় না। রাষ্ট্রের দর্শনটা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের দর্শন হচ্ছে, আমি একটা বাজার অর্থনীতি সমাজে সবকিছুকে পণ্য হিসেবে করে ফেলব কি না। একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো বিষয়গুলো সম্পূর্ণভাবে বিপণনযোগ্য নয়।
রাষ্ট্র যখন দায়িত্ব নেয় তখন সরকারি খাতকে শক্তিশালী করতে হয়। এটাই আমাদের ৭২ সালের সংবিধানে ছিল। কিন্তু গত ৫০ বছরে দেখা গেছে সরকারি খাত ক্রমশ নিম্নমুখী এবং বেসরকারি খাতের ক্রমশ উত্থান হয়েছে।
শতকরা ৭০ শতাংশ সেবা বেসরকারি খাতে চলে গেছে। এই বিষয়টি থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য অবশ্যই সরকারি খাতের গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাগুলোকে কতগুলো অর্থনৈতিক বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে।
জনগণ বিনামূল্যে প্রাথমিক সেবা পাবে, উচ্চতর সেবার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থাকবে। বেসরকারি খাতকে জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলার মধ্যে আসতে হবে। এ জন্য কতগুলো নীতিমালার কথা বলা হয়েছে।
আমাদের সুপারিশে কাউকে দোষারোপের কথা বলা হয়নি। তারা কতগুলো নিয়মের মধ্যে কাজ পরিচালনা করবে। তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ করার বিষয়টিও আমরা বলেছি। কিন্তু দাম নির্ধারণ ও মানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া সুযোগ নেই।
ওষুধের প্রচারকে একটি নিয়মে মধ্যে আনতে হবে। একটি হাসপাতাল থেকে বের হলে যদি তাদের প্রতিনিধিরা রোগীকে ঘিরে ধরে ও প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে থাকে, তাহলে তা তো প্রচারণা হলো না। এইগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করলে তারা এখন যেভাবে চলছে, তাতে অবশ্যই তারা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি মেডিকেল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে গেছে। তাদের শিক্ষক নেই, মান নেই। এই যে ছাত্রগুলো বের হচ্ছে, আপনি তাদের হাতে জীবন দিচ্ছেন। এখন যদি তাদের মান ও জবাবদিহিতার কথা বলা হয়, সেটা তো তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হলো না।
আমরা সরকারি-বেসরকারি সবার ক্ষেত্রেই এটা নিশ্চিত করার কথা বলেছি। কিন্তু যেভাবে এই দেশ অভ্যস্ত হয়েছে, তাতে সব ব্যবসা হয়ে গেছে, আমরা সেটা বন্ধ করার কথা বলেছি। আমরা যেমন ওষুধের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছি সেই সঙ্গে তাদের প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলেছি।
এখানেও প্রশ্ন রয়েছে, কোনগুলোকে দিতে হবে? শুধুমাত্র কাঁচামাল আনলাম, ওষুধ বানালাম এবং প্যাকেজিং করে বিদেশে রপ্তানি করলাম, তার থেকে যে আয় হবে সেটা থেকে আমি যদি এপিআইকে প্রাধান্য দিতে পারি সেটা বেশি উপকারী। আমরা এই পিছিয়ে থাকা জায়গাগুলোকে গুরুত্ব দিতে বলেছি। তাদের উদ্বেগের ক্ষেত্রে এখন যেভাবে চলছে, সেটা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথার্থ। তারা কেউ পরিবর্তন চান না। কিন্তু দেশ তো এভাবে চলতে পারে না।
স্বাস্থ্য বাংলাদেশের একটি অবহেলিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। এই খাতের সংস্কারের বিষয়ে জুলাই সনদে পরিস্কারভাবে কোনো উল্লেখ নেই। তাহলে কী এটি অবহেলিতই থেকে গেল?
হ্যাঁ, এটা অবশ্যই অবহেলা। এক জায়গায় সব আলো ফেলা হয়েছে। হয়তো সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সমান্তরালভাবে আশেপাশেও কিছু আলো ফেলার দরকার ছিল।
রাষ্ট্রের জন্য সংবিধান ও নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোকে কোনোভাবেই গৌণভাবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু সমান্তরালভাবে স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব নিতে হবে।
স্বাস্থ্যের পাশাপাশি নারী ও শ্রম সংস্কার কমিশনের যে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল তা একদম দেওয়া হয়নি। এইগুলো একদম অবহেলিত হয়ে গেছে। এ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে ৫টি সংস্কার কমিশনের প্রধানরা একটি চিঠি দিয়েছেন।
তার মানে রাষ্ট্রের যে অগ্রাধিকার সেখানে ছিল না। জনগণেরও এই বিষয়ে তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। কমিশনের প্রধানদের কেন দাবি করতে হবে, এই বিষয়গুলো নিয়ে চাপ তো জনগণের দিক থেকে আসবে। তারা সরকারকে প্রশ্ন করবে, এই বিষয়গুলোতে কেন সরকারের মনোযোগ নেই।
কিন্তু কোনো মহল থেকে দাবিগুলো আসেনি। আপনি যদি বলেন প্রতিবন্ধকতা, তাহলে যাদের চাওয়া দরকার তাদের পক্ষ থেকে না চাওয়াটাই প্রথম দুর্বলতা।
সংস্কারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কতটা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে?
মন্ত্রণালয় একটি নির্বাহী পর্ষদ। রাষ্ট্রের নীতি মন্ত্রণালয় পালন করে। মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণ যেভাবে হয়ে আসছে, আমরা সে বিষয়েও প্রশ্ন করেছি।
একই প্রতিষ্ঠান যখন নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকে তখন কোনটা ঠিকমতো চলে না। মন্ত্রণালয় আসলে বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা উচিত। আর নীতিটা উপরের স্তর থেকে আসবে।
মন্ত্রণালয় যতক্ষণ না নির্দেশনা পাবে ততক্ষণ তো কিছু করছে না। তাই আমি সরাসরি মন্ত্রণালয়কে দায়ী করতে চাই না। কিন্তু তাদের কোনো উদ্যোগ ছিল সেটাও আমরা বলতে পারছি না।
আমি শুনেছি একটি ছোট কমিটি হয়েছে। সেটা দিয়ে সামনে আগানোর প্রস্তাব হয়েছে। এটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু কীভাবে কী হচ্ছে সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।
এই পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান কিছু চোখে পরেনি। আর এজন্য আমি মন্ত্রণালয় না, বরং প্রধান উপদেষ্টাকে দায়ী মনে করি। প্রধান উপদেষ্টা এই কমিশন গঠন করেছিলেন। তাই উদ্যোগটা সেখান থেকে আসা উচিত। মন্ত্রণালয়কে আমি এই বিষয়ে দায়-দায়িত্বের প্রতিষ্ঠান মনে করি না।
সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের কাছ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ বা প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশা করেন?
অন্যান্য সংস্কার কমিশনের মতো স্বাস্থ্য যে একটি কেন্দ্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং স্বাস্থ্য যে সংবিধান-নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বুঝতে হবে। স্বাস্থ্য ও অধিকার অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
স্বাস্থ্য না থাকলে মানুষ অধিকার বঞ্চিত হবে। এজন্য সবাইকে আওয়াজ তুলতে হবে। সেবার পাশাপাশি জনশক্তি তৈরি করতে হবে। অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে নিয়ে সব নীতিতে স্বাস্থ্যকে যুক্ত করতে হবে। এর জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু কাজ করতে হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সংবিধানে যুক্ত করে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করা এবং সংশ্লিষ্ট কাজগুলোর জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ ও তহবিল তৈরি করতে হবে।
কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোও এই বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল যে, তারা বলবে, আমরা নির্বাচন ও অন্যান্য বিষয়ে যেভাবে সংস্কার চাই, আমরা এই বিষয়গুলিতেও চাই। কিন্তু রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কোনো পক্ষের পক্ষ থেকে এই দাবিগুলো উত্থিত হয়নি। এর মানে আমাদের চাওয়াই হয়নি।
গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়া মানুষের চাওয়া, এটি ঠিক। আমরাও মনে করি এটি সর্বোত্তম চাওয়া এবং এটি নিয়ে ঐক্যমত কমিশনে আলোচনা চলছে, কিন্তু এই দাবিগুলো এত গৌণ হয়ে যাবে তা আমরা ভাবিনি। আমরা তিন-চার মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। সেটার সঠিক প্রতিফলন হয়নি। আমরা কিছুটা তো হতাশ বটেই।
‘স্বাস্থ্য সংস্কার টাস্কফোর্স’ গঠনের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে এসেছে। কমিশনের কাজকে ত্বরান্বিত করতে এর প্রয়োজনীয়তা কতটা?
এটা অবশ্যই লাগবেই। আমাদেরটা সাধারণ পরামর্শ। এটাকে কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিছু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। কোনটা এই সরকার করবে আর কোনটা আগামী সরকার করবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দাবি হিসেবে যদি বলি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সার্বজনীন অধিকার করতে হবে। সংবিধানে এটা কী ভাষায় অন্তর্ভূক্ত হবে তা উল্লেখ করতে হবে। যদি বলি, একটি অধ্যাদেশ জারি করতে হবে, তাহলে তার একটি খসড়া তৈরি করতে হবে।
স্থায়ী স্বাস্থ্য কমিশন, অধিদপ্তরের পুনর্গঠনের জন্যও খসড়া তৈরি করতে হবে। এই কাজগুলো টাস্কফোর্স সকল মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে করে কমিশনের মাধ্যমে দায়িত্বগুলো পালন করবে। সেখানে সদস্য বা পরামর্শক হিসেবে সংস্কার কমিশনের সদস্যদের যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। তারা এই পরামর্শগুলো কোন চিন্তা থেকে করেছেন তার ব্যাখ্যারও প্রয়োজন আছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বা নীতিগত সমস্যা কী দেখছেন? এসব সমস্যার শেকড় কতটা গভীরে প্রোথিত?
সংবিধানে যদিও স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে ফাঁক রয়ে গেছে। বলা হয়েছে, এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আওতাভুক্ত নয়।
অর্থাৎ আপনি স্বাস্থ্যসেবা না পেলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবেন না এবং চিকিৎসার অবহেলাকে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। সুতরাং বড় সমস্যা হলো, রাষ্ট্রকে তার দর্শন পরিবর্তন করতে হবে।
স্বাস্থ্যখাতকে জনমুখী করতে হলে কোন খাতগুলোতে জরুরি উদ্যোগ নেওয়া দরকার? বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও গরিব মানুষের জন্য সেবার কাঠামো কতটা কার্যকর?
কল্যাণ রাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এর কিছু অংশ সরকার ও বাকিটা বেসরকারি খাত নেবে। রাষ্ট্র যে দায়িত্ব নেবে তার মধ্যে কে কতটা করবে সেটা ঠিক করতে হবে। সব দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়।
যেমন: মশা মারার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, এর জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগসূত্র লাগবে। ধোঁয়া বন্ধ করতে হলে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করতে হবে। এইগুলো করার জন্য একটি ছাতার নিচে আনার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই।
স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির ১ শতাংশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ জিডিপির ৫ শতাংশ না গেলেও স্বাস্থ্য বাজেট অন্তত আড়াই শতাংশ হওয়া উচিত। জনবল সংকট রয়েছে, যা আছে তাদেরও কাজের অবস্থা সূচনীয়।
ব্যবস্থাপনাজনিত ত্রুটির কারণে যে অপ্রতুল বাজেট পাচ্ছে তাও খরচ করতে পারছে না। অর্থাৎ সার্বিক সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা কম তা ঠিক করা মুশকিল।
এটা একটি জটিল সমস্যা। এর থেকে উত্তরণে আমরা যে পরামর্শ দিয়েছি, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেগুলো করতে বলেছি, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে সমস্যা সমাধান অনেকটাই এগিয়ে যেত।
প্রজনন স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে কীভাবে বিবেচনায় বাস্তবায়ন করা যায় বলে মনে করেন?
সারা দুনিয়ায় সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার মানে হচ্ছে, কোনো মানুষ যেন সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।এটি ২০৩০ সালের মধ্যে নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০২১ সালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এর জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য একটি কাঠামোও তৈরি করা হয়েছে।
আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। এরপর রেফারেল হয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে যাবে। এতে নগরে হাসপাতালে জনগণ ভিড় করবে না। প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য জনগণের শুধু সতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ নয়, মালিকানাও প্রয়োজন। এর জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসা কেন্দ্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করতে হবে।
রাজনৈতিকভাবে কমিউনিটি ক্লিনিককে শক্তিশালী করতে গিয়ে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একদম দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। কমিশনের সুপারিশে আমরা প্রাথমিক চিকিৎসাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছি। এর মধ্যে মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কথা বলেছি, যেখানে সব একসাথে থাকবে। আমাদের চেইনটি তৈরি করতে হবে।