সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও মওলানা ভাসানীর মূল্যায়ন

হক কথা সম্পাদক সৈয়দ ইরফানুল বারী লেখক, গবেষক এবং রাজনৈতিক সংগঠক। জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ মার্চ, কিশোরগঞ্জে। ‘৬০-এর দশকের তোলপাড় করা দ্বন্দ্বমুখর রাজনৈতিক সময় তাকে টেনে এনেছিল রাজনীতির স্রোতে।’ ৬৭-তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর এবং সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা অর্জন করার কোনো মূল্য থাকল না তার কাছে- যখন মওলানা ভাসানী তাকে বললেন- শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে কাজ করতে কোনো ডিগ্রির দরকার হয় না, দরকার ত্যাগের। ইরফানুল বারী মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর প্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৬৯ থেকে নতুন জীবন শুরু হয়েছিল কঠোর অনুশীলন, ত্যাগ এবং অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন পালন করেছেন জননেতা ভাসানীর ব্যক্তিগত সচিবের দায়িত্ব। তিনি কিশোরগঞ্জের মানুষ তবুও মওলানা ভাসানীর সন্তোষ-আশ্রম কোনোদিন ছাড়েননি। দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন। তথাকথিত ‘উন্নত জীবনের হাতছানি পেয়েছেন; তবু ফিরে এসেছেন সন্তোষে যেখানে স্মৃতিঘেরা মওলানার অমূল্য সময় কেটেছে। বর্তমানে তিনি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স শিক্ষক। ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ান ‘মওলানা ভাসানী স্টাডিজ’। আক্ষরিক অর্থেই শয়নে-স্বপনে তার ধ্যান-জ্ঞান মওলানা ভাসানী। ২০২০ সালের আগস্ট মাসে নেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি মওলানা ভাসানীর ১৪২তম জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশ করা হলো। 

জীবনে কোন বিষয়ে আপনি মওলানা ভাসানীকে ধারণ করেছেন, কীভাবে প্রভাবিত হলেন?

ষাটের দশকের শেষের দিকে আমি বিভিন্ন প্রোগ্রামে ও কর্মস্থলে মওলানা ভাসানীর সান্নিধ্য পাই। আমি তখন ঢাকায় নবীন সাংবাদিক, তিনি জবরদস্ত রাজনীতিবিদ। এই সময়ে মওলানার সান্নিধ্যটি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়ায় যে, তিনি একদিন আমাকে সন্তোষে ডেকে পাঠালেন। আসলাম তাঁর নিকট। বিকেলবেলায় সন্তোষে এসে পৌঁছলাম। হুজুর বাড়িতে ছিলেন না। আমি বিঘ্নিত চোখে তাকিয়ে আছি তাঁর বাড়ির দিকে অপেক্ষাকৃত নিচু জায়গায়। বর্ষায় নিশ্চয়ই জায়গাটা খানা-খন্দের মতো ডুবে থাকে তারই প্রান্ত একটা দু’চালা আর একটি চার চালা ঘর। বেড়ার একদিকে পাটকাঠি আর একদিকে মলিবাঁশ। ঘরের পূর্ব দিকটায় বারান্দা গোছের একটু জায়গা সেখানে বেঞ্চ পাতা। হুজুর বাড়িতে না থাকলেও সেখানে বসে অপেক্ষা করা যায়; কিন্তু আমি অপেক্ষা না করে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার জন্য মনস্থির করি। ৪ হাত ও ২ হাত মাপের এক টুকরো লাল কাপড়ে সাদা হরফে লেখা একটি ব্যানারে আমার চোখ আটকে যায়। ওই ব্যানারটিই একমাত্র চিহ্ন। এ ছাড়া এ বাড়িটি যে মওলানা ভাসানীর তা বুঝবার কোনো উপায় নেই। প্রকৃত পক্ষে ওই ব্যানারটিই আমাকে সন্তোষে আটকে ফেলে। ব্যানারে লেখা থেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে থাকব, দেখব এবং বুঝব। সেখানে দুটি বাক্য লেখা ছিল। প্রথমটিতে অপেক্ষাকৃত বড় লেখা- ‘হুকুমতে রব্বানিয়া’ দ্বিতীয় বাক্যটি ‘কৃষক শ্রমিক মজুর রাজ কায়েম হোক।’ কৃষক শ্রমিক মজুর রাজ মওলানা ভাসানীর কথা। তিনি এর ওপরে ভিত্তি করেই রাজনীতি করছেন; কিন্তু হুকুমতে রব্বানিয়া মওলানা ভাসানীর কথা হতে পারে না। হুজুরকে তো কেউ কেউ নাস্তিকই মনে করেন। যারা আস্তিক মনে করেন তাদের অনেকে তাঁকে আসলেই মুসলমান মনে করেন না। তাঁর পরিচয় ধর্ম নিরপেক্ষ তাই নয়, ধর্মহীনতার তত্ত্ব সমাজতন্ত্রের বলয়ে। আমরা ষাটের দশকে যতবার তাঁর নামে রিপোর্ট লিখেছি ততবারই লিখেছি- পিকিংপন্থী ন্যাপের সভাপতি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। মূলত আমাকে আকৃষ্ট করে তাঁর উদারপন্থী প্রগতিশীল চিন্তা- চেতনা। ধর্মীয় সংকীর্ণতা গোঁড়ামি বা কুসংস্কার বিরোধী মওলানা ভাসানী এখনো মানুষের মনোযোগ কাড়েন।

এক জীবনে মওলানা ভাসানী যা করে গেছেন, তা বাঙালির পক্ষে অপরিমেয়। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য অনুসারী রেখে গেছেন- তাদের ভেতর থেকে একজনও সেই মাত্রার বা কাছাকাছি কাউকে পেলাম না আমরা, এ ব্যর্থতা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

প্রথমত, এর জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই দায়ী। মওলানা ভাসানী একটি পূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন।

১৯৭০-এর ১২ নভেম্বরের সাইক্লোন-পরবর্তী মওলানা ভাসানীর রাজনীতি স্বায়ত্তশাসনে সীমাবদ্ধ না থেকে স্পষ্ট উচ্চারণ স্বাধীনতায় উন্নীত হয়। টালমাটাল অবস্থায় ১৯৭১ সালটি শুরু হলেও ৯ জানুয়ারি সন্তোষের দরবার হলে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাজনীতিবিদ ও কর্মীদের সম্মেলনে মওলানা ভাসানী ঘোষণা দেন- “স্বাধীন দেশে গোলামীর শিক্ষা মুক্ত দেশপ্রেমিক ঈমানদার নাগরিক গড়ে না তুললে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। এ জন্য চাই যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা। যে জন্যই প্রস্তাবনা প্রণয়ন করতে ১৯৭১-২৭ ফেব্রুয়ারি এই দরবার হলে দিবারাত্রি শিক্ষা ও কৃষ্টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে জীবন অভিজ্ঞতার কথা মওলানা ভাসানী লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে সে লেখায় তিনি উল্লেখ করেছেন- “পুজিবাদের ধারক বাহক ঔপনিবেশিকতাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীরা দেশে শাসন শোষণ অব্যাহত রাখা ও কেরানিকুল সৃষ্টি করার জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করিয়াছিল আমরা অন্ধভাবে সেই শিক্ষা নীতিই অনুসরণ করিয়া চলিয়াছি। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্ম ও নৈতিকতার কোনো স্থান নেই। ধর্মীয় শিক্ষার নামে জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক রহিত তথাকথিত মাদ্রাসা শিক্ষা প্রবর্তন করিয়া সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় সুকৌশলে আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মাইয়াছে। শিক্ষা ও রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষা ক্ষেত্রে যাঁরা ভেবেছেন ও কাজ করেছেন, তারা কেউ, পাকিস্তানি জামানায় হোক আর বাংলাদেশ আমলেই হোক শিক্ষা সম্বন্ধীয় মওলানা ভাসানীর চিন্তাধারা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছেন এমনটি আমার জানা নেই। বরং আমি জানি শিক্ষা ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানীর নিজস্ব চিন্তাধারা থাকতে পারে। এমনটা তারা ভাবেননি। যে চিন্তা ধারায় কারও অপেক্ষা না করে তিনি যে কিছু কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছেন এর খোঁজ খবরও তেমন কেউ নেননি। সে জন্য বলতে হয় স্বয়ং মওলানা ভাসানীই দায়ী।

তিনি সর্বতোভাবে একজন রাজনীতিবিদ, এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর বিদ্রোহাত্মক বৈশিষ্ট্য এতই সুষ্পষ্ট যে সংগ্রাম সমৃদ্ধ জীবনের পাশাপাশি তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে শিক্ষা-ব্যবস্থা ও শিক্ষা-নীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, এ দিকটা গবেষক ব্যতীত আর কারও দৃষ্টিতে গুরুত্ব পায়নি। তিনি নিজে যেহেতু প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত হননি তাই ঢালাওভাবে ভাবা হয়েছে, যুগের দাবি পূরণ করা দূরের কথা- মওলানা ভাসানীর কোনো শিক্ষা-দর্শন থাকতে পারে, এটাই যেন আশা করা যায় না। বাস্তবচিত্র কিন্তু ভিন্ন।

‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ এই স্লোগানেই বিপ্লবী মওলানা ভাসানীকে খুঁজে পাই। শেষ পর্যন্ত তিনি তাই ছিলেন; কিন্তু সমসাময়িক রাজনীতি তাঁকে বৈরী করে তুলেছিল এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন কী?

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী খাপ না খাওয়া মানুষ, যিনি ১৯০৭ হতে ১৯১২ প্রায় পাঁচ বছর দারুল উলুম দেওবন্দে কাটালেন, পড়লেন শাহ ওয়ালিউল্লার গ্রন্থাবলি, তাঁরই ওস্তাদদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পরিচালিত জমিয়তে উলমায়ে হিন্দু পার্টিতে যোগদান না করে ব্যস্ত হলেন মওলানা মোহাম্মদ আলী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখদের রাজনীতি নিয়ে। এতেই শুধু আটকে পড়ে থাকলেন তা নয়। লক্ষ্য স্থির করলেন জমিদারদের, সুদখোর মহাজনদের দিকে। রাজনীতিতে পার্টির কর্মী সম্মেলন, কাউন্সিল অধিবেশন প্রথাগত ব্যাপার। মওলানা ভাসানী সংযোজন করলেন প্রজা সম্মেলন, কৃষক সম্মেলন, ঘাতক সম্মেলন। এসব সম্মেলন যেন গণ-আদালত। দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ সম্মেলন হতে পথের দিশা পান, আর টাউট বাটপার রাজনীতিবিদ সম্মেলনের জোশে ও তোড়ে ভেসে যান। সম্মেলনগুলো হতো শিক্ষা সংস্কৃতির গণমিলন।

আসামে বাঙালি স্বার্থ রক্ষায় যে সংগ্রাম মওলানা ভাসানী করেছিলেন, একই শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন পূর্ব বাংলার জাতিসত্তার বিকাশে। এতেই তিনি থেমে থাকেননি। আফ্রো-এশিয়া ল্যাটিন আমেরিকার মুক্তিকামী মানুষের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন, তাদের হয়ে বিশ্ব ফোরামে কথা বলেছেন। পঞ্চাশের দশকে ইউরোপে আখ্যায়িত হলেন রেড মওলানা, ফায়ার-ইটার মওলানা। স্টকজোম, লন্ডন, পিকিং, হাভানা, টোকিও, কায়রো সর্বত্র তাঁর উপস্থিতি বিশ্বের তাবৎ মুক্তিকামী মানুষের নেতা হিসেবে। সে জন্যই ষাটের দশকে সেদিনের পশ্চিম পাকিস্তানে যতটা-না ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা তার চেয়ে তিনি বড় নেতা সামন্ত শোষণের বিরুদ্ধে, পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে, সোচ্চার অধিকার আদায়ের পথিকৃৎ হিসেবে। স্বার্থান্বেষী রাজনীতিকরা এসব মেনে নিতে পারেনি, তারা কথায় ও অন্তরে এক হতে পারেনি, মওলানা ভাসানীর সঙ্গে একাত্ম হতে পারেনি, এমনকি তাকে বোঝার চেষ্টাও করেনি- এটাই মূল কারণ। মওলানা ভাসানী অনেক বড়, তাকে বোঝার মতো মানুষ কম।

মওলানা ভাসানী শোষণহীন ন্যায়বিচারভিত্তিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। নির্যাতিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁর যে অবদান তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে বলতে গেলে অজানাই। তাঁকে জানতে মওলানা ভাসানী স্টাডিজ কোর্স সেই ভূমিকা কতটুকু পালন করছে? আপনার শিক্ষক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি ব্যাখ্যা করতেন-

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মওলানা ভাসানীর স্বপ্নপূরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মওলানা ভাসানীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যাবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বর্জিত শিক্ষা তিনি চাননি, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা- তো ইসলাম যুক্ত হলো না, যা তিনি চেয়েছিলেন এবং এই চাওয়ার পিছনে তাঁর একটা লক্ষ্য ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে মওলানা ভাসানীর অবস্থান নিয়ে তর্ক করার কিছু নেই। ঘটনা প্রবাহে তা প্রমাণিত ও স্বীকৃত।

মওলানা ভাসানীকে জানতে মওলানা ভাসানী স্টাডি কোর্স কতটুকু ভূমিকা পালন করছে, এ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় প্রায়ই। সর্বত্যাগী নেতা ‘মওলানা ভাসানী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ নামকরণে ও বৈশিষ্ট্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় সন্তোষে করতে চেয়েছিলেন। সেই ক্যাম্পাস শেষ পর্যন্ত একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলো বটে; কিন্তু মওলানা ভাসানীর তাত্ত্বিক চিন্তা ধারা এবং দার্শনিক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন ঘটে এমন বিশ্ব বিদ্যালয়তো হলো না! দুঃখের বিষয় এই যে মওলানার তথাকথিত পদাঙ্ক অনুসরণ করা কোনো মন্ত্রী বাহাদুর গরজ করে কোনো দিন জানতেও চাননি, মওলানা ভাসানী কী চেয়েছিলেন।

১৯৪৬ সাল থেকেই তিনি সন্তোষে নানা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে আধুনিক পরিপ্রেক্ষিতে ও পরিভাষায় ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নামকরণ ও কাঠামোর অধীনে স্থায়িত্ব দেবার চিন্তা ভাসানীর মনে দানা বাঁধতে থাকে। এই সম্পর্কে তিনি ১৯৫৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে পরিষ্কার ঘোষণা দেন; কিন্তু এরপর পরই সরকারের সঙ্গে তাঁর ঘোরতর বিরোধ এবং দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের কারা বাস সকল প্রয়াসকে পিছিয়ে দেয়। ১৯৭০ সালের ১৯ জানুয়ারি ঐতিহাসিক সন্তোষ সম্মেলনে আবার তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এবং এ বছরেই ৮ সেপ্টেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দরবার হল উদ্বোধন করেন। দেশবরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদদের সহায়তায় তাঁর স্বপ্নের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ রূপরেখা প্রণয়ন করে ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রকৃত কাজে হাত দেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে তাঁর মনোনীত ৬০টি বিভাগের মধ্যে ৩০টিই প্রত্যক্ষভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক। তাছাড়া প্রচলিত অর্থে নয়, মওলানা ভাসানীর অর্থে, ইসলামী বিষয় বলতে তিনি অনুমোদন করেছেন মাত্র ৩টি বিভাগ। সেই আশা, বল ভরসা ও এখন নাই যে ওই ৩টি বিভাগের পড়াশুনা মওলানা ভাসানীর দৃষ্টিভঙ্গিতে হবে। পুঁজিবাদের ধারক উপনিবেশিকতাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীরা দেশে শাসন শোষণ অব্যাহত রাখা ও কেরানিকুল সৃষ্টি করার জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থা করেছিল আমরা অন্ধভাবে সেই শিক্ষানীতিই অনুসরণ করে চলেছি। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্ম ও নৈতিকতার কোনো স্থান নেই। ধর্মীয় শিক্ষার নামে জীবনের সঙ্গে সম্পর্করহিত তথাকথিত মাদ্রাসা শিক্ষা প্রবর্তন করের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় সুকৌশলে আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মানো হয়েছে। এই অবস্থা থেকে মওলানা ভাসানীকে খুঁজে নেওয়া এখন যুগের দাবি।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে মওলানার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সাপ্তাহিক ‘হক কথা’। আমার যতদূর জানা স্বাধীন বাংলাদেশে সেই প্রথম একটি জনপ্রিয় পত্রিকা নিষিদ্ধ হয়েছিল। কতদিন চলেছিল প্রত্রিকাটি, নিষিদ্ধ হওয়ার কারণই বা কী ছিল?

‘হক কথা’ প্রকাশিত হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে। প্রকাশক ও পৃষ্ঠপোষক মওলানা ভাসানী প্রত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পণ করেন আমার ওপর। প্রথম সংখ্যায় সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘হক কথা বলবার নিশ্চিত সম্ভাবনা নিয়ে হক কথা বের হলো। সমাজের সকল স্তরের রাজনীতি, ধর্মনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গতিশীল রূপরেখা তুলে ধরে প্রয়োজনের পরিচ্ছেদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে চায়।... সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত জাতি হিসেবে আমরা যে হিম্মত পেয়েছি তার পরশ নিশ্চয়ই এতে লাগবে। আবার নবীন দেশে প্রাচীন সমস্যা যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। তার ছোঁয়াও আমাদের লাগবে। সব মিলিয়ে আমরা বাস্তবানুগ হক কথা বলবার প্রয়াসী, সৌখিন কলবাজিতে নেই। তাই লেখক ও পাঠক মহল হক কথা একটি স্থান করে নেওয়ার আশা রেখে অবশ্য কার মুখপত্র হিসেবে আজকের দুনিয়ায় তা একটি বড় প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।... আজ মানুষের মুক্তির যুগ। বিপ্লবের হাওয়া বইছে। কে জানে, মুখপত্রটির সকল সমঝদার কেবল ন্যায় ও সাধুতাকেই ভালোবাসে কিনা, শুধু বিপ্লবের পথকেই মুক্তির নিশানা মনে করে কিনা।’

প্রত্রিকাটি প্রকাশের পর থেকেই অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

১৯৭২, ২০ জুন মঙ্গলবার বিনা গ্রেফতারি পরোয়ানায় টাঙ্গাইলে কল্লোল প্রেসে কর্মরত অবস্থায় পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। এরপর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এই প্রথম বারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশে সত্য প্রকাশের দায়ে একজন সম্পাদককে গ্রেফতার করে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো মিথ্যা মামলায়। মূলত ঘুষখোর, চোরাকারবারি, লুট-পাট, দখল রাজনীতিবিদ, স্বৈরাচারী আমলা, মন্ত্রী ও সরকার এবং সকল চেহারার শোষকদের কবল থেকে জনতাকে রক্ষার উদ্দেশ্যেই ‘হক কথা’ প্রকাশিত হয় এবং তার বলিষ্ঠ ভূমিকা। সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে গড়েছে প্রতিরোধের দৃঢ় প্রাচীর। তাই হক কথা এদেশের নির্যাতিত প্রতিটি জনতার বলিষ্ঠ সমর্থন পেয়েছে।

২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭২-৩০তম সংখ্যা প্রকাশিত হবার পর প্রেসের ওপর নেমে আসে সরকারি খড়গ। সঙ্গে সঙ্গে সরকার বাতিল করে দেয় ‘হক কথা’র ডিক্লারেশন। ৩০তম সংখ্যাই ছিল ‘হক কথা’র শেষ সংখ্যা। ‘হক কথা’ বে-আইনিভাবে বন্ধ করে দিয়ে যে জঘন্য মনোবৃত্তির পরিচয় দিয়েছে সরকার তার নজীর ইতিহাসে নেই। ১৯৭২-২৮ সেপ্টেম্বর পল্টনে আয়োজিত ঐতিহাসিক প্রতিবাদ সমাবেশে মওলানা বলেন- ‘হক কথা’ শাসক গোষ্ঠীর দুর্নীতির কথা প্রকাশ করত বলেই তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ‘হক কথা’ বন্ধ করে সত্য বন্ধ করা যাবে না। আমার কণ্ঠকে স্তব্ধ করা যাবে না।

ফারাক্কা লং মার্চ ১৯৭৬, ১৬ মে ‘এ মরণ ফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ’ ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে বাংলার সর্বস্তরের মানুষের বজ্রকণ্ঠ স্লোগান ভারতের শাসক মহলেও কাঁপন ধরিয়ে দেয়। যার রেশ উপমহাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পৌঁছে যায়, তখন বিষয়াদি বাংলাদেশ সরকার কীভাবে নিয়েছিল?

সত্তরের দশকে প্রথম প্রবহমান পানির স্বাভাবিক প্রাপ্তির ওপর যে আঘাত ভারত থেকে আসল- মওলানা ভাসানীই রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রথম কথা বলেন। সে বাংলাদেশ স্বাধীন হবারও আগে যতদূর জানি সেটি ঊনসত্তর সালের ১২ মার্চ তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানের তোবাতেক সিং-এর কৃষক সম্মেলনে তিনি প্রথম ফারাক্কা বাঁধের বিষয়ে সতর্ক করেন। মওলানা বলেছিলেন ইন্ডিয়া যে বাঁধ তৈরি করছে ফারাক্কায় উত্তরবঙ্গ মরুকরণ শুরু হবে। বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফারাক্কা বিষয়ে তিনি আবার সোচ্চার হলেন ১৯৭৬-এ এবং ঘোষণা দিলেন ১৬ মার্চ শুরু হবে লং মার্চ। মওলানার বয়স তখন ৯৬ বছর গুরুতর অসুস্থ তিনি। সরকারের সমর্থন ছিল। বেতারে দু’দিন ধরে ধারাবিবরণী দেওয়া হয়েছিল। ধারা বর্ণনায়- বলা হচ্ছিল- ‘মওলানা ভাসানী লং মার্চে যাচ্ছেন, তিনি এখন রাজশাহী পৌঁছেছেন।’ সেখানকার প্রশাসন ইতিবাচক ছিল। এটা সরকারের সমর্থন ছাড়া সম্ভব ছিল না। ফারাক্কা লংমার্চ মওলানা ভাসানীর জীবন দর্শনেরই প্রতিফলন ঘটেছে।

১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের আসসালামু আলাইকুম বলে সর্ব প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়ে ছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিনয় আর নম্রতা আমার মনে দাগ কেটে আছে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫-এর মধ্যে বিশ্বব্যাপী নেতায় পরিণত হন বঙ্গবন্ধু। তবে এ সময়কালে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পরিমাপের বিস্তৃতি ঘটলেও মওলানা ভাসানী হুজুরের সামনে সেই বড়ত্ব দেখাননি তিনি। আমার ধারণা, দৈহিকভাবে যেমন বড় ছিলেন বঙ্গবন্ধু তেমননি ছিলেন মনের দিক থেকেও বড়। ১৯৭১ থেকে ৭৫ পর্যন্ত একক ক্ষমতার অধিকারী হলেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন ভাসানী হুজুরের জন্য উদার আর নিবেদিত। বঙ্গবন্ধু পিতার মতো শ্রদ্ধা করতেন ভাসানীকে। সে সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের মতোই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাগারে আটক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সে সময় ভাসানী তাকে মুক্ত করতে ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু করেন। পাকিস্তান সরকার আন্দোলনে আতঙ্কিত হয়ে ১৯৭০-এর ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর এক সময়ের রাজনৈতিক সহকর্মী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তদানীন্তন পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং সি আইএর মদদে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী, হয়েছিলেন। ‘পূর্ববঙ্গের সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করে’ ভারত- আমেরিকার দোসররূপে সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া আওয়ামী লীগের বিরাট অংশ যেমন মানতে পারেনি তেমনি মওলানা ভাসানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও তা মেনে নেননি।

উপরোক্ত অবস্থায় সোহরাওয়ার্দী এবং তার দোসরদের দেশবিরোধী চক্রান্তের প্রতিবাদ জানাতেই ১৯৫৭ সালের ৮ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে এক সম্মেলন আহ্বান করা হয় এই সম্মেলনেই তিনি বলেন, ‘পূর্ববাংলা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের দ্বারা শাসিত হতে থাকলে পূর্ববঙ্গবাসী তাদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানাতে বাধ্য হবে। ভাসানীর এই বক্তব্যকেই আমাদের মহান স্বাধীনতার মূলমন্ত্র আখ্যায়িত করা হয়। তিনি কাগমারী সম্মেলনে আমেরিকার সঙ্গে কৃত সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী এবং তার দোসররা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে ভাসানী ৫৭ সালের ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। তাদের দু’জনের বিরোধ ছিল রাজনীতির অঙ্গনে অন্তরে নয়।

নতুন প্রজন্মকে মওলানা ভাসানী ও তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে উদ্বুদ্ধ করতে আরও কী প্রয়োজন বলে মনে করেন?

শিক্ষা ও সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক মওলানা ভাসানীর শিক্ষা দর্শন ও সংস্কৃতি-ভাবনাকে ছড়িয়ে দেওয়া খুব প্রয়োজন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। মওলানা ভাসানীর সংস্কৃতি ভাবনার সার সংক্ষেপ হচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির লালন ও বিকাশ সাধনের মধ্য দিয়ে নগর সংস্কৃতিকে প্রভাবান্বিতকরণ। তিনি সব সময় আশা করতেন নগর সংস্কৃতিতে গ্রামীণ জীবন, জীবন বোধ শ্রদ্ধার আসন লাভ করুক। রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে তিনি সাংস্কৃতিক শক্তি সৃষ্টি করেছেন এবং যথাযথ কাজে লাগিয়েছেন।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //