‘সড়ক আইন বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা কমবে’

বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। ১৯৯৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তার স্ত্রী। ‘পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়’ স্লোগান নিয়ে গড়ে তোলেন একটি সামাজিক আন্দোলন ‘নিসচা’ (নিরাপদ সড়ক চাই)। 

দেশে সড়কের নৈরাজ্য ও দুর্ঘটনা না কমা এবং বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন সাম্প্রতিক দেশকালের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ সেলিম...

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবচেয়ে জরুরি কী বলে আপনি মনে করেন?

সবচেয়ে বেশি জরুরি সেটা হচ্ছে, চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া। তাদের প্রশিক্ষণ না দিলে তারা কীভাবে গাড়ি চালাবেন। একজন চালক কত সময় গাড়ি চালাবেন। তাদের বেতন কাঠামো কেমন হবে। এ সবকিছুই কিন্তু চিন্তার বিষয়। কারণ এটা তো সায়েন্টিফিক বিষয়। সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে চালকদের পাশাপাশি যাত্রী বা পথচারীদের সচেতন হওয়ারও কোনো বিকল্প নেই।

এ দায়িত্ব কার ওপর বেশি বর্তায়?

জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এটা সংবিধানে আছে; কিন্তু রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করছে না।

আপনার এ আন্দোলন কতটুকু সফল বলে আপনি মনে করেন?

একটি অলাভজনক সংগঠন দীর্ঘ ২২ বছর ধরে মানুষকে সচেতন করে আসছে। এটা বড় সাফল্য। তবে এ আন্দোলন পুরোপুরি সফল একদিন না একদিন হবেই।

সড়কে নৈরাজ্য থামছে না কেন?

সব নাগরিকের জন্য দেশের সড়কগুলো অনিরাপদ। ২৮ বছর ধরে আমরা যে কথাগুলো বলে আসছি এবং সড়ক নিরাপত্তার জন্য যে পরামর্শগুলো দিয়ে আসছি, সেগুলো যাদের বাস্তবায়ন করার কথা তা হচ্ছে না। এখন সরকার ও সরকারের সংস্থাগুলো যদি তা আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় এবং নতুন আইন যদি বাস্তবায়ন করে তাহলে নৈরাজ্য কমবে। আর না হলে কমবে না। পাশাপাশি সাধারণ জনগণ কোনো নিয়ম-কানুন মানে না। পুলিশ বলেছে, সাধারণ জনগণের প্রায় ৯০ শতাংশ সড়কে আইন মানে না। আমিও এর সঙ্গে একমত। সকলেই নৈরাজ্য করছে, নিয়ম কেউ মানছে না। নৈরাজ্য কমাতে সকলকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না কেন?

শহরে যারা বাস চালায় তাদের ৬০ শতাংশই মাদকাসক্ত। মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ার কারণেও দুর্ঘটনা বাড়ছে। প্রতিদিন ৭-৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটছে। এটি আগে ছিল না। এ ছাড়া ট্রাকভ্যান চালকরা একেবারেই অদক্ষ। তাদের কোনো রকমের শিক্ষা নেই। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়াদের ৪০ শতাংশই পথচারি। তারা সড়ক আইন না মানার কারণে দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। 

বিশৃঙ্খলা দূর করতে সরকারের যে ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন; তা কী নিচ্ছে?

পরিবহন মালিকদের কাছে সরকার জিম্মি। সরকারে যারা থাকেন তারা পরিবহন খাতের ধর্মঘটকে ভয় পান। কারণ পরিবহন ধর্মঘটের ফলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এবং জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। ফলে সরকারের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় সমস্যা হয়। আর সরকার চায় না সেই সমস্যা তৈরি হোক। এই জিম্মি দশা থেকে বের হওয়ার জন্য যেসব পরিকল্পনা বা কৌশল নেওয়া দরকার কোনো সরকার তা করেনি। প্রতিবারই পরিবহন নেতাদের কাছে হেরে যাওয়ার একটা প্রবণতা ছিল। ফলে তাদের সাহস বেড়ে গেছে।

মালিক-শ্রমিকদের ক্ষমতার উৎস কী?

পরিবহন মালিক কারা? সরকারের মন্ত্রী, এমপি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। তাহলে কারা তাদের থামাবে? তাছাড়া পরিবহনের নেতারা সরকারের সঙ্গে থাকায় তারা অনেক ক্ষমতাবান। তাই নিরাপদ সড়কের দাবিগুলো পূরণ হচ্ছে না এবং আইনটিও কার্যকর হচ্ছে না।

সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের দেওয়া ১১১টি সুপারিশ কী বাস্তবায়ন হচ্ছে?

সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২০১৯ সালে দেওয়া ১১১টি সুপারিশের মধ্যেই সড়ক নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা রয়েছে। এই সুপারিশগুলো পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মতামতের ভিত্তিতেই প্রণীত হয়েছে। নিরাপদ সড়কের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে ৬টি এবং পরে ১৭টি নির্দেশনা দিয়েছিলেন; কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও বাস্তবায়িত হয়নি। আমি মনে করি, এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকেও কঠোর হতে হবে। তাছাড়া হাইকোর্টেরও কিছু নির্দেশনা ছিল, তাও মানা হয়নি। অথচ হাইকোর্ট পরবর্তী সময়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তারা একটু কঠোর হলেই পরিবহনের লোকজন আইন মানতে বাধ্য হতো।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো আপনাকে টার্গেট করেছে। এ বিষয়ে কি বলবেন?

সাধারণ শ্রমিকরা কিন্তু আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন না। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, যারা সড়ক আইন চায় না। পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা যে আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, সেই আইনটি তো আমি করিনি। করেছে জাতীয় সংসদ। প্রধানমন্ত্রী নিজে আইনটি বাস্তবায়নের পক্ষে সংসদে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন। ২০১২ সালে আমরা যখন সড়ক পরিবহন আইনের দাবিতে আন্দোলন করি, তখনই মহলটি নানা অপতৎপরতা চালায়। তখন সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে এতটা সাহস পেত না। আমি দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। চলচ্চিত্র অঙ্গনে সময় না দিয়ে নিরাপদ সড়কে সময় দিয়েছি। যখন দেখি, এ বিষয় নিয়ে কেউ বাজে মন্তব্য করছেন, আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছেন, তখন খারাপ লাগে, কষ্ট লাগে।

নিসচা গাড়ি চালকদের প্রশিক্ষণে কী উদ্যোগ নিয়েছে?

নিসচার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইতিমধ্যে ড্রাইভিং ট্রেনিং ও মেকানিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ইনস্টিটিউট দক্ষ চালক তৈরির লক্ষ্যে ড্রাইভিং পেশায় আগ্রহী এসএসসি পাস বেকার তরুণ-তরুণীদের বিনামূল্যে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। এ পর্যন্ত ১০টি ব্যাচে প্রায় ২২০ জন চালক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এ ছাড়া নিসচা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মোট ১৮টি স্থানে চালকদের দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে আসছে। 

আপনি একটি অনলাইন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করেছেন (নিরাপদ নিউজ২৪ ডটকম)। এর উদ্দেশ্য কী?

সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিলের সংখ্যা কমাতে অনলাইনটি কাজ করে যাচ্ছে। অন্যান্য বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি নিসচার মুখপত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখছে এটি।

নিসচার দাবির ভিত্তিতে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে কি-না? 

সরকার কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। যেমন চালকদের ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে সরকার দেখল ইনস্টিটিউট নেই, প্রশিক্ষকও নেই। এখন সরকার ১৪১০ জন প্রশিক্ষক তৈরি করছে। আবার এ ক্ষেত্রে ভালো প্রশিক্ষকেরও সংকট ছিল। অনেক কষ্টে ৪-৫শ’ প্রশিক্ষক তৈরি করা হয়েছে।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //