গণমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ নয়, বন্ধু: রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ

রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ দেশের সাংবাদিকতার অন্যতম কিংবদন্তি। পেশাদার সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের যে অর্জন, তার পেছনে জোরালো ভূমিকা রয়েছে তার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অবজারভারের চাকরি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে সহযোগিতা করেন। তিনি বিদেশের বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ ১৯৭০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যকরী পরিষদের সদস্য ছিলেন, ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক এ সভাপতি ১৯৯৩ সালে একুশে পদক পান।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অর্জন এবং বিভিন্ন সংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশ বরেণ্য এই সাংবাদিকের সঙ্গে সাম্প্রতিক দেশকালের কথা হয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মাহমুদ সালেহীন খান।

দেশ, সমাজ ও জনগণের প্রয়োজনে গণমাধ্যমের ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখেন?

গণমাধ্যম হয়েছে দেশ, সমাজ ও জনগণের জন্য। দেশ, সমাজ ও জণগণকে বিভিন্ন বিষয়ে ওয়াকিবহাল করার জন্য, বিভিন্ন তথ্য দেওয়ার জন্য গণমাধ্যমের জন্ম। প্রথমেই একটি খবর গণমাধ্যমকর্মীরা জানবে, সবার চেয়ে বেশি জানবে এবং তারা এই বিষয়টি জনগণকে জানাবে। এখানেই গণমাধ্যমের শুরু। এই গণমাধ্যম শুরু করতে গিয়ে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এটি কুসুমাস্তীর্ণ পথ না। গণমাধ্যমের কাজ হলো সত্যকে তুলে ধরা, মিথ্যার আবরণ খুলে ফেলা। এগুলো করতে গিয়ে যারা সত্য হত্যা করে, যারা মিথ্যার বেসাতি করে, তারা গণমাধ্যমের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীরা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। যত বাধাই আসুক, সংবাদকর্মীরা সত্য সংবাদ উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের আজকের এই ইতিবাচক অবস্থান একদিনে অর্জিত হয়নি। এ অর্জন কীভাবে সম্ভবপর হলো?

গণমাধ্যম আজকে যে অবস্থান অর্জন করেছে, তা অনেক কষ্ট করে হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও নানা সময়ে আইনি বাধা, রাজনৈতিক বাধা, প্রশাসনিক বাধা পেরিয়ে সংবাদপত্র এবং গণমাধ্যমকে এগিয়ে যেতে হয়। আমাদের দেশেও একই অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৫৮ সালে যখন আইয়ুব খানের সামরিক শাসন থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য নানান আইন হয়েছে, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এসেছে। নানানভাবে সাংবাদিকদের হয়রানি করা হয়েছে। সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তারপরও সাংবাদিকরা বসে থাকেনি। তারা এগিয়ে গেছে। সংগ্রাম করেছে। আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের লেখনীর স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে অর্জন করেছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সংবাদপত্রের কোনো আইন ছিল না। আমরা শূন্য থেকে শুরু করেছিলাম। বড় বড় সাংবাদিকদের অনেকেই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আবার অনেককে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়ে গণমাধ্যমে শূন্যতা তৈরি করা হয়েছে। সেই শূন্যতা কাটিয়ে, নানান বাধা পেরিয়ে আজ গণমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট আইন হয়েছে, ওয়েজ বোর্ড হয়েছে, প্রেস কাউন্সিল হয়েছে- মোট কথা গণমাধ্যম একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। 

গণমাধ্যম কি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে? অন্তরায়গুলো এবং প্রতিকারের কী উপায় বলে আপনি মনে করেন?

গণমাধ্যমের কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা। তাদের প্রত্যাশা হলো গণমাধ্যম এমন কিছু কথা বলবে, সত্যকে তুলে ধরবে, যাতে রাষ্ট্র ও সমাজ সঠিক পথে হাঁটবে। এই প্রত্যাশা পূরণে গণমাধ্যম সবসময় একই রকম ভূমিকায় থাকতে পারে না। কারণ নানাভাবে তার হাত বেঁধে ফেলার চেষ্টা করা হয়। কখনো গণমাধ্যমের মালিকরা, কখনো সম্পাদকরা আবার কখনো সরকারের পক্ষ থেকেও বাধাগ্রস্ত করা হয়। আবার অনেক প্রেশার গ্রুপও বাধা তৈরি করে।  বিভিন্ন সময়ে অনেক গণমাধ্যম সত্য প্রকাশে প্রশাসনিক বাধায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক সাংবাদিককে অদৃশ্য কালো হাত হত্যা করেছে। তারপরও সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহে পিছিয়ে থাকেননি। সাহসিকতার সঙ্গে তারা সংবাদের জন্য ছুটছেন জনগণকে সত্য তথ্য জানানোর জন্যই। আমাদের দেশে দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকার গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে। কিন্তু গণমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহায়ক শক্তি বা বন্ধু। সরকার যদি গণমাধ্যমকে বন্ধু মনে করে; তাহলে এখানকার তথ্যগুলো ব্যবহার করে সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে, রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে সমাজ ও রাষ্ট্র।

বিশ্লেষণধর্মী পত্রিকার ভবিষ্যৎ কেমন বলে আপনি মনে করেন?

বিশ্লেষণধর্মী পত্রিকা সবসময় একটা বড় রোল পালন করতে পারে। খবরের ভেতরের খবর এবং আরও অন্তরালের খবর প্রকাশ করার একটি বড় সুযোগ থাকে। এটি যদি পাঠকদের দেওয়া যেতে পারে, তাহলে তার কদর অবশ্যই থাকবে।

সাংবাদিকদের একটি ঐক্যবদ্ধ পেশাগত সংগঠন কাম্য। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন বিভক্ত। একত্রীকরণের ক্ষেত্রে সংকট ও সমস্যাগুলো কী?

সাংবাদিকরা তাদের অধিকার আদায়ে, সত্য সংবাদ সংগ্রহে যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে আসছে তার একটি বড় শক্তি হচ্ছে সাংবাদিকদের সংগঠন, এসব ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের কারণেই সংবাদপত্র আজকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ৯ম ওয়েজ বোর্ড হয়েছে। এটাও ইউনিয়নের মাধ্যমেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সাংবাদিকদের আস্থার এই জায়গাটা রাজনৈতিকভাবে এক থাকতে পারেনি। কখনো কখনো সাংবাদিকরা নিজেকে গণমাধ্যমকর্মী পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো, বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপ। আসলে এখন দু’গ্রুপের একত্রীকরণটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা আমরা জাতি হিসেবেই এখন বড় দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। গণমাধ্যমকর্মীরা যদি শুধু তাদের পেশাগত দিকটাকেই প্রাধান্য দেন। দল নিরপেক্ষ হয়ে ওঠতে পারেন, তাহলেই কেবল এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।

সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে সাংবাদিক সংগঠন বিশেষ করে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভূমিকা কেমন ছিল? এখন কেমন আছে?

আগে আমরা রাজনৈতিক আবরণে যুক্ত ছিলাম না। গণমাধ্যমের আজকের যা অর্জন তা সবই এই বৃহৎ দুটি সংগঠনের কল্যাণে। কিন্তু এখন রাজনৈতিক দলের ছায়ায় থাকতে বেশি পছন্দ করেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দরা। সেই সুযোগটিই নিয়ে থাকেন রাজনৈতিক দল আর গণমাধ্যমের মালিকরা। এখন যে কয়টি গণমাধ্যম আছে, তার মধ্যে অনেকগুলোর মালিকই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর ফলে স্বাধীনভাবে কিছু করা বা বলাটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাংবাদিক নেতারা দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন, এ বিষয়ে আপনার মতামত ও পর্যবেক্ষণ কী?

আগেই বলেছি, গণমাধ্যমকর্মীরা এখন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। যদি গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে রাজনৈতিক কর্মীর পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশে হাত-পা বাঁধা থাকবে।

বিভিন্ন সরকারের সময়ে গণমাধ্যমের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ এসেছে। আপনার কি মনে হয় সাংবাদিক সমাজের বিভক্তি এই হস্তক্ষেপের পথকে প্রশস্ত করেছে?

অবশ্য, ঐক্যবদ্ধ শক্তির কোনো বিকল্প নেই। অনৈক্যের ফলে সুবিধাবাদীরা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। এর বাইরে সাংবাদিক সমাজও নয়।

বর্তমানে বিভিন্ন মিডিয়া হাউসে চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে, অনেক হাউসে বেতন নিয়মিত নেই, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও সংগঠন এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এর কারণ কী?

দেশের গণমাধ্যমগুলো কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল, কর্মী ও পৃষ্ঠপোষকের অর্থে চলে। আপনি যতক্ষণ বিভক্তির মধ্যে থাকবেন, কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে অধিকার আদায় করতে পারবেন না। কারণ আপনি যখনই এসব ঘটনার বিপক্ষে রাস্তায় নামবেন, তখনই কোনো না কোনো ফোন এসে আপনাকে বিভ্রান্ত করবে। কারণ আপনার সাংবাদিক পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়টাই তখন মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা আগের মতো নেই। এই অবস্থা উত্তরণে কী করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

সাংবাদিকরা সবসময় সত্য সংবাদ প্রকাশ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন নানাবিধ কারণে, তা আগেই বলেছি। এ জন্য মানুষ কিছুটা সংকটে পড়ে গেছে। তারপরও এখনো রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে গণমাধ্যমকেই বলা হয়ে থাকে। দলমত নিরপেক্ষ হয়ে ওঠতে হবে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে। দলের সমর্থক হয়ে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।


২০২০ সালে সাম্প্রতিক দেশকালের ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //