
প্রতীকী ছাবি
ঢাকা একসময় ছিল সবুজে ভরা, বলা হতো ‘বাগানের শহর’। মোগলরা এই অঞ্চলে বাগান তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তোলে। কিন্তু আধুনিকতার নামে এই শহর তার সবুজের জৌলুস হারিয়েছে। ইট-পাথরের জঙ্গল, কংক্রিটের ছায়া আর গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়ার নিচে চাপা পড়ে গেছে ঢাকার সেই শ্যামল রূপ।
সবুজ থেকে ধূসর
ঢাকার এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস। মোগল থেকে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত ঢাকা সবুজের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর, বিশেষত গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শহরটি দ্রুত তার চরিত্র বদলেছে। একসময় যে ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানীর মতো এলাকাগুলো সবুজে ঢাকা ছিল, সেখানে এখন কেবলই উঁচু উঁচু ভবন আর সরু রাস্তা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ শহরের জন্য জনসংখ্যার তিন গুণ গাছ থাকা জরুরি। কিন্তু প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই বিশাল শহরে গাছের সংখ্যা অতি সামান্যই। দুঃখজনকভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার মোট ৩০৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যে ঠিক কতটুকু অংশে সবুজের আধিক্য রয়েছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান বন বিভাগ বা সিটি করপোরেশনের কাছে নেই।
১৯৮১ সালের নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের (ইউডিডি) এক জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ১৯ শতাংশ ভূমি সবুজে আচ্ছাদিত ছিল। বর্তমানে তা ৬ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। আশির দশকে ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকায় প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার থেকে দুই লাখ পূর্ণ বয়স্ক গাছ ছিল বলে ধারণা করা হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং ধানমন্ডি, মিরপুর ও উত্তরার মতো আবাসিক এলাকাগুলোতেও প্রচুর গাছ ছিল। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিবেশ বিভাগ জানিয়েছে, তাদের হিসাবে ২০২৫ সালে ঢাকা শহরের রাস্তার পাশে থাকা পূর্ণ বয়স্ক গাছের সংখ্যা ৫০ হাজারেরও কম।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সবুজ জায়গা মাত্র শূন্য দশমিক ৪২ বর্গমিটার, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী যেটি হওয়া উচিত ৯ বর্গমিটার। এতে শহরের তাপমাত্রায় লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। ১৯৮১ সালের পর থেকে গ্রীষ্মের গড় তাপমাত্রা ২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ধুলাবালি কণার (পিএম ২.৫) মাত্রায় বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে দূষিত পাঁচটি শহরের তালিকায় ঢাকার নাম নিয়মিতই উঠে আসছে।
সবুজ হারানোর কারণ
ঢাকার সবুজ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের আবাসন চাহিদা মেটাতে নতুন নতুন ভবন ও অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এতে করে গাছপালা, জলাশয় ও খোলা জায়গা ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
জমির উচ্চমূল্যও এর একটি বড় কারণ। মালিকরা সামান্য জায়গা ফেলে না রেখে বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবন তৈরিকে লাভজনক মনে করছেন।
এ ছাড়া পরিবেশ রক্ষাসংক্রান্ত আইন থাকলেও সেগুলোর দুর্বল প্রয়োগ দেখা যায়। অবৈধভাবে জলাশয় ভরাট, গাছ কাটা বা খেলার মাঠ দখল করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
রাস্তার ধারে লাগানো গাছের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করাও আরেকটি বড় কারণ সবুজ হারানোর। ডিসিসি, রাজউক ও সড়ক বিভাগ বিভিন্ন ডিভাইডারে গাছ লাগালেও তাদের পরিচর্যার অভাব রয়েছে। ফলে অনেক গাছই মরে যায়।
এমনকি ফুটপাতে থাকা গাছের গোড়ায় ইট-সিমেন্ট দিয়ে এমনভাবে ঢেকে দেওয়া হয়, যার ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
উচ্চ তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
সবুজ কমে যাওয়ায় শহরে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। পর্যাপ্ত গাছপালা না থাকায় শহরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমে। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে শীর্ষে থাকা শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম।
গাছপালা না থাকায় বায়ুদূষণও বাড়ছে ঢাকায়। কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাস শোষণ করে গাছ পরিবেশকে বিশুদ্ধ রাখে। কিন্তু গাছের অভাবে ঢাকার বাতাসে এসব ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে গেছে, যা এখানকার মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দূষিত বাতাস ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে ফুসফুসের রোগ, অ্যালার্জি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে।
এর আরেকটি ভয়াবহ পরিণতি হলো মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা বৃদ্ধি। সবুজের মধ্যে থাকলে মানুষের মন শান্ত ও সতেজ থাকে। কিন্তু কংক্রিটের এই পরিবেশে মানুষের সামাজিক মেলামেশা কমে যাচ্ছে, শিশুদের খেলার মাঠ নেই, বয়স্কদের বসার জায়গা নেই। এতে করে মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ ও অস্থিরতা বাড়ছে।
এসির ওপর নির্ভরশীলতা
তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এসি) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। একসময় যা বিলাসের বস্তু ছিল, এখন তা প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ টেকসই জ্বালানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ২০১০ সালে দেড় লাখ ইউনিট থেকে ২০২৪ সালে এসির সংখ্যা বেড়ে সাড়ে সাত লাখে পৌঁছেছে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ বাড়ছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসির এই ব্যবহার তাপমাত্রা আরো বাড়াচ্ছে এবং সামাজিক বৈষম্যও সৃষ্টি করছে। যেখানে ধনীরা এসি চালিয়ে স্বস্তিতে থাকছেন, সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষ লোডশেডিং আর অসহনীয় গরমে কষ্ট করছেন। পুরোনো মডেলের এসিগুলো হাইড্রোফ্লোরোকার্বন গ্যাস ছাড়ে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সবুজ ফেরানোর লড়াই
এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। নগরের পরিবেশকে বাঁচাতে হলে বনায়নের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বনায়ন শুধু একটি পরিবেশগত চাহিদা নয়, এটি টিকে থাকার কৌশল। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে :
পরিকল্পিত নগরায়ণ : একটি সুনির্দিষ্ট মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা। নতুন ভবন, রাস্তা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের সময় পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
আইনের কঠোর প্রয়োগ : পরিবেশসংক্রান্ত আইনগুলোকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অবৈধভাবে জলাশয় বা সবুজ জায়গা ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
গাছ লাগানোর উদ্যোগ : সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ছাদ বাগান, উলম্ব বাগান (াবৎঃরপধষ মধৎফবহ) এবং রাস্তার পাশে গাছ লাগানোর প্রচারাভিযান শুরু করা উচিত। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন উদ্যোগে প্রায় এক লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে, কিন্তু এর অন্তত ৩০ শতাংশ প্রথম বছরেই মারা গেছে। এর কারণ হলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, ভাঙচুর ও অনুপযুক্ত গাছের চারা ব্যবহার। এই বিষয়গুলো নজরদারিতে আনা প্রয়োজন।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি : বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সবুজায়নের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা। তরুণদের এই কাজে যুক্ত করা।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে
ঢাকার ভবিষ্যৎ আজ এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। আধুনিকতার নামে আমরা যা হারাচ্ছি, তার মূল্য অনেক বেশি। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এর মূল্য দিতে হচ্ছে এখানকার মানুষকে। এখনই উদ্যোগ না নিলে সবুজ পরিসর ধ্বংসের আরো চড়া মূল্য দিতে হবে।
যেকোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে হাতিরঝিল প্রকল্পের মতো পরিবেশবান্ধব মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। জলাধার ও পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখেও যে উন্নয়ন করা যায়, এটি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ঢাকা নগরীকে বাঁচাতে হলে কেবল গাছ লাগালেই হবে না, গাছটি পরিবেশবান্ধব কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি আন্তরিক হয় এবং জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেয়, তাহলে রাজধানী ঢাকাকে আবারও বাসযোগ্য করে তোলা কঠিন কিছু নয়। ঢাকা যদি তার গাছ, পার্ক ও প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের পথ সংরক্ষণ করতে পারে, তাহলে এত বেশি কৃত্রিম শীতলীকরণের প্রয়োজন হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ আমরা যে গাছ লাগাচ্ছি, তা আগামী দিনের জন্য একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য ঢাকার প্রতিশ্রুতি।