শিক্ষা জাতীয়করণই একমাত্র সমাধান

সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ শাহাদাত হোসাইন। ফাইল ছবি

সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ শাহাদাত হোসাইন। ফাইল ছবি

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। দেশ ও জাতিকে উন্নত করতে হলে শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড ছাড়া যেমন কোন মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না ঠিক তেমনি শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। শিক্ষক সমাজের একজন আদর্শবান ব্যক্তি। স্বাভাবিকভাবে তাকে সমাজের মানুষ অনুসরণ করে থাকেন। কিন্তু শিক্ষার কাজে নিযোজিত মানুষ গড়ার কারিগরদের অবস্থা অনেকটাই ‘নুন আনতে পানতা ফুরানো’র মতো।

একবার এক মাস্টার মশাই ক্লাসে ছাত্রদের জ্ঞান দিচ্ছিলেন এভাবে- ‌‘পড়ালেখা করে যে গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে’। ক্লাসের পর ছাত্রছাত্রীরা সেই শিক্ষকের পিছু নিলেন তার বাড়ি পর্যন্ত। যা দেখলো তাতে ছাত্রদের চোখে হতাশা ছাড়া আর কিছু নেই। শিক্ষক দেড় মাইল দূরে তার বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে আসা যাওয়া করেন। বাড়ি-ঘর ছনের ছানি কোন মতে। খাবার দাবার খুবই নিম্নমানের। শিক্ষক বাচ্চাদের যে আদর্শে বড় করে তোলার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বাচ্চারা সেই মাস্টার মশাইয়ের জীবনের বাস্তবতা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে গেলেন।

বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষকদের অবস্থা খুবই নাজুক। বর্তমান বাজার মূল্যে এতো কম বেতনে চাকরি করে সংসার চালানো সত্যি কষ্টসাধ্য।শিক্ষা জাতীয়করণ করলে শিক্ষকদের জীবন মান উন্নত হবে শুধু তা নয়, সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় হবে বৈকি। প্রতিষ্ঠান যদি ছাত্রদের কাছ হতে দশ টাকা বেতন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় তাহলে সরকারেরই লাভ হবে।

এমপিওভুক্তি একটি জটিল কঠিন নিয়ম। এই পদ্ধতি হতে মুক্তি দিতে শিক্ষা জাতীয়করণ সময়ের বাস্তব দাবি। আমার মতে- এমপিওভুক্তি একটি ক্ষত শরীরের মতো যাতে শত ডাক্তারি চিকিৎসায় রোগ ভালো হবে তো দূরের কথা বরং বেড়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।ধরুন, এনটিআরসিএ গঠিত হলো বিগত কয়েক বছর আগে। শিক্ষক হবার আশায় নিবন্ধিত হাজার হাজার বেকার রয়েছে। অথচ ডিগ্রি মাস্টার্স পাস করে একটি প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষক নিবন্ধন পাস করেও তাদের বযস পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ চাকরি পাবার কোন সম্ভাবনা নাই। এমপিওভুক্তির নিয়ম বাতিল করে সব নিবন্ধিতদের যদি বিসিএসের আদলে এনে চাকরি নিশ্চিত করা যেত তাহলে শিক্ষিত বেকারদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ হতো এবং দেশ মেধাবী শিক্ষকও পেতো।

একটি মহৎ উদ্যেশ্য নিযে এনটিআরসিএ গঠিত হলেও এখন হতাশা আরো বেড়েই চলছে। এমপিওভুক্তির জটিল নিয়ম বহাল রেখে যত নিয়ম করুক না কেন সব নিয়মই ব্যর্থ হবে এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। শিক্ষকতা পেশায় সুযোগ সুবিধা না থাকলে কোন মেধাবী এই পেশায় আসবে না। মেধাশূন্য ব্যক্তি যদি শিক্ষক হন তাহলে শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কি হবে আপনারাই বলুন। যিনি আদর্শের বুলি সমাজে ছড়ান তিনি নিজেকে আদর্শবান হতে হয়, যিনি জ্ঞান বিতরণ করেন তাকে অবশ্যই জ্ঞানী হতে হবে। একটি বাগানের মালি ঠিক থাকলে সে বাগানের সুবাসিত ফুল ফুটবে, আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মান সম্পন্ন শিক্ষক থাকলে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নত হবে আলোকিত মানুষ সমাজে উপহার দিবে। সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি বাজেটে ঈদের শতভাগ বোনাস প্রাপ্তির কথাও যদি না থাকে তাহলে মনে করতে হবে- আমরা আসলে শিক্ষার উন্নয়নে কতোটা আন্তিরক সেই প্রশ্নটি আপনাদের কাছে রেখে গেলাম।

বাড়ি ভাড়া নেই, মেডিক্যাল ভাতা নেই, শিক্ষা ভাতা নেই, পদোন্নতি-বদলি নেই। তবে আমি জোর দিয়ে বলছি না- শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হলে সব সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে তবে এসব হলে শিক্ষা জাতীয়করণ পথে আর কোন বাধা থাকবে না। শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে শিক্ষা জাতীয়করণের কোন বিকল্প নেই। মানসম্পন্ন বেতন হলে মানসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যাবে আর মানসম্পন্ন শিক্ষক পেলে উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নত জাতি গঠন করা সম্ভব।

বেসরকারি শিক্ষকদের সব দাবি লুকিয়ে আছে শিক্ষা জাতীয়করণের মধ্যে। মুজিববর্ষে বেসরকারি শিক্ষকগণ বড় আশা নিয়ে বসে আছে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে জাতীয়করণের ঘোষণা আসবে। আমরা এখনও বিশ্বাস করি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অতি শিগগিরই জাতীয়করণ ঘোষণা দিয়ে দেশ ও জাতিকে শিক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়ে নিবেন।

-সহকারী অধ্যাপক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh