আরেকটি কঠিন বছরে সৌদি রাজতন্ত্র

মোহাম্মদ বিন সালমান

মোহাম্মদ বিন সালমান

২০২০ সাল সৌদি শাসন কাঠামোর জন্য খুব সুখের বার্তা বয়ে আনেনি। বছর শেষে দেশটির অঘোষিত শাসক এমবিএস খ্যাত যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের করা বেশিরভাগ প্রতিশ্রুতিই ভঙ্গ হয়েছে, অথবা দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুলে গেছে। 

এসবের কারণ শুধু কভিড-১৯ মহামারি নয়, বরং সৌদি আরবের মতো বিশ্বের সবচেয়ে গণতন্ত্রহীন জ্বালানি তেলনির্ভর ভঙ্গুর অর্থনীতির একটি দেশ ভেতর থেকে কতটা ভঙ্গুর, সেটিই এ সময়ে আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। 

তেলনির্ভর ধসেপড়া অর্থনীতি

সৌদি শাসকরা জ্বালানি তেলনির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; কিন্তু বাস্তবে তারা এমনটি করতে ব্যর্থ হয়। ফলে তেলের দর পড়ে যাওয়ার পরও তেল বিক্রি ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ নেয়া ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প নেই। উল্লেখ্য, তেল-নির্ভরতা কাটাতে সৌদি যুবরাজ ‘ভিশন ২০৩০’ নামক এক পরিকল্পনা হাতে নেন; কিন্তু এতে তেমন অগ্রগতি হয়নি। করোনাকালে ওই পরিকল্পনা আরো থমকে যায়। 

ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনায় ওয়াহাবি মতবাদকে কিছুটা শিথিল করার পরিকল্পনা ছিল। ওয়াহাবিবাদ নিয়ে বিশ্বের অনেক দেশেই, বিশেষ করে সৌদি আরবের ব্যবসায়িক মিত্র পশ্চিমা দেশগুলোর আপত্তি আছে। এ মতবাদ শিথিল করতে পারলে শুধু ব্যবসায়িকই নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরো গভীর করা সম্ভব বলে মতামত বিশেষজ্ঞদের; কিন্তু করোনাকালে কট্টর ধর্মীয় নেতাদের শরণাপন্নই হতে হচ্ছে রাজপরিবারকে। কেমন করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, সেই বয়ানও দিচ্ছিলেন তারা; এমনকি কেমন করে হাত ধুতে হবে সরকারি সংস্থাগুলো এমন ভিডিওও বানাচ্ছে তাদের নিয়ে। 

ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনা মূলত অর্থনৈতিক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানায়, আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে জ্বালানি তেলনির্ভর সৌদি অর্থনীতির ইতি ঘটবে। তাই এ সময়ের মধ্যেই তাদের বিকল্প উৎস ভাবতে হবে। 

বার্লিন সায়েন্স অ্যান্ড পলিটিক্স ফাউন্ডেশনের (এসডব্লিউপি) গবেষক স্টেফান রল বলেন, ‘করোনাভাইরাস ইতিমধ্যে এই সংকটের স্বরূপ দেখিয়ে দিয়েছে- আরামকো শেয়ারের দরপতনের কারণে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হবে, তার ওপর হজ না হলে আরেকটি বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা খাবে সৌদি আরব।’ দেশটির রাজনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে আরো দুর্বল করবে বলে ধারণা এই গবেষকের।

সমর্থনহীন এমবিএস

একচ্ছত্র ক্ষমতা নিশ্চিত করতে এমবিএস আগে থেকেই অন্য ক্ষমতাধর রাজন্যদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, অথবা গ্রেফতার করে কারাগারে ছুড়ে ফেলেছেন। গত ৭ মার্চ তার নির্দেশে মুখোশপরা পুলিশ সদস্যরা আটক করে সৌদি রাজা সালমানের একমাত্র আপন ভাই প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজকে। আটক করা হয় সৌদি সিংহাসনের আরেক দাবিদার সাবেক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফসহ আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ প্রিন্সকে। তাদের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ বা অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্য দিয়ে নিশ্চিতভাবেই রাজা হওয়ার পথ মসৃণ করছেন এমবিএস। তবে এ ঘটনায় সৌদি রাজতন্ত্রের ভঙ্গুরতাও স্পষ্ট হয়। 

২০১৮ সালের অক্টোবরে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার পর আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে আসেন মোহাম্মদ বিন সালমান। খাসোগি বরাবরই সৌদি যুবরাজ ও তার নীতির সমালোচক ছিলেন। হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তার বিচারের দাবি উঠলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে রাজতন্ত্রের বিরোধিতাকারী ধর্মীয় নেতা, অধিকারকর্মী ও ব্যবসায়ীদের ধরপাকড় করা হয়েছে।

২০২১ সালে সৌদি রাজা মারা গেলে, এমবিএস রাজা হতে পারেন; কিন্তু রাজপরিবারেও তার গ্রহণযোগ্যতা থাকবে তলানিতে। এমবিএস যখন রাজত্ব পাবেন, তখন তাকে সমর্থন দেয়ার মতো কোনো রাজন্যই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এ ভঙ্গুর রাজত্ব চালানোর কাজটা কোনোভাবেই মসৃণ হবে না। জনগণের সাথে বিচ্ছিন্নতার প্রসঙ্গে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক মাদাবি আল-রশিদ বলেন, ‘সৌদি রাজতন্ত্রে জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই। ক্ষমতা পোক্ত করতে গিয়ে রাজন্যরা জনগণকে একটি মুক্ত সমাজে বাস করার রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে- যেখানে ধর্মকে আশ্রয় করা রাজনীতির একমাত্র রূপ রাজতন্ত্র। ভঙ্গুর রাজতন্ত্রের এ নাটকে দেশটির জনগণ শুধুই দর্শক।’

সৌদি জনগণ এখনো রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তেমন কোনো বড় আন্দোলন গড়ে তোলেননি। এর একটি কারণ- এতদিন জনগণের একটি বড় অংশেরই খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবা পূরণ হয়েছে। জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতি বাধাপ্রাপ্ত হলে জনগণের সেবা খাতে কাটছাঁট শুরু হয়। চাপানো হয় অতিরিক্ত কর। লুটপাট করেছে রাজন্যরা। প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বহীন এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বলতে কিছুই নেই। রাজনৈতিক সংস্কারের সব প্রচেষ্টা ধুলোয় মিশেছে। এমনকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও এমবিএস একচ্ছত্র শাসন জারি করেছেন।  

ইসরায়েলি সংযোগ

ফিলিস্তিনিদের নাম ভাঙিয়ে একের পর এক আরব দেশ ইসরায়েলের সাথে প্রকাশ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। যদিও অনেক আগে থেকেই তাদের মধ্যে গোপন সম্পর্ক ছিল। এক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা ছিল সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সৌদি আরব নিজে প্রথমে সম্পর্ক স্থাপন না করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকে আগে ইসরায়েলের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রণোদনা দেয়। কারণ হুট করে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য সম্পর্ক স্থাপনের কথা ঘোষণা করলে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বে তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। 

উল্লেখ্য, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে আগ্রাসন চালানোর সময় এতে বিশেষ সমর্থন দিয়ে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীও হামলা চালায়। তবে এ বছর ইসরায়েলের সাথে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষোভ নিরসনে পদক্ষেপ নেয়ার মতো অর্থনৈতিক সংস্থানও এ মুহূর্তে সৌদি আরবের নেই।

বাইডেন ফ্যাক্টর

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেন জয়ী হওয়ার পর এমবিএসের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরো কিছুটা বেড়েছে। কারণ তিনি ভালো করেই জানেন, বাইডেন আগে থেকেই সৌদি আরবের ইয়েমেন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। সম্প্রতি সৌদি আরবের মানবাধিকার ভঙ্গের রেকর্ড, আঞ্চলিকভাবে আধিপত্য বিস্তারের জোর প্রচেষ্টার নজির দেখে বাইডেন প্রশাসন এখানে বিশাল বিনিয়োগ যে করবে না, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এমবিএস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার জামাতা জারেড কুশনার ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন উপদেষ্টাকে নিজের দলে টানতে পেরেছিলেন। তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন, ইরানের আপত্তি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র কিনবে সৌদি আরব। এছাড়া ইসরায়েলের নির্দেশ মেনে মার্কিন মিত্রদের চাওয়া অনুযায়ী সবকিছু করারও প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন; কিন্তু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে হয়তো এতটা সহজে ম্যানেজ করতে পারবেন না তিনি। 

অক্টোবরে নির্বাচনী প্রচারে বাইডেন বলেন, ‘বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক পুনরায় যাচাই করা হবে। ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষাবলম্বন করাও বন্ধ করবে ওয়াশিংটন। আর নিশ্চিতভাবেই অস্ত্র বিক্রি অথবা তেল ক্রয় কোনো বিনিময়েই আমেরিকা নিজেকে বিকোবে না।’

রাইস ইউনিভার্সিটির ফেলো ক্রিশ্চিয়ান উলরিশেন আলজাজিরাকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সৌদি নেতৃত্বের হোয়াইট হাউস থেকে শর্তহীন সহযোগিতা পাওয়ার প্রত্যাশায় জল ঢেলে দিতে পারে বাইডেন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি দুই দেশের স্বার্থের উপযোগী করেই পরবর্তী লক্ষ্যগুলো পুনর্নির্মাণ করা হবে। ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবকে বিচ্ছিন্ন করার উপায়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘সৌদি আরবের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইবে না বাইডেন প্রশাসন, আর এ কারণেই তাদের নতুন নীতিতে যেসব কার্যক্রম থাকবে সেখানে সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি বাড়ানোর লক্ষ্য থাকতে পারে। এছাড়া বাইডেনের উপদেষ্টারা সৌদি আরবকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে চাইবেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রিতে জোর দিলেও তারা নিশ্চিত হতে চাইবে- এটি ধ্বংসাত্মক নয়; বরং প্রতিরক্ষামূলক হবে।’

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক মাদাওয়ি আল-রশিদ মিডলইস্ট আইয়ে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেন, ধসে পড়া অর্থনীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ-নিপীড়ন, আঞ্চলিক আগ্রাসন চালানোয় ২০২০ সাল সৌদি আরব বা এমবিএসের জন্য তেমন ভালো ছিল না; কিন্তু ২০২১ সাল যে এর চেয়ে খারাপের দিকেই ধাবিত হবে, তা নিশ্চিত করেই বলে দেয়া যায়। 

মহামারি শুধু সৌদি আরবের সংকটকে প্রকাশ্যে এনেছে। তবে এমবিএসের দুশ্চিন্তার জন্য করোনাভাইরাসকে দায়ী করা যায় না; বরং তার উচ্চাভিলাষী ও অমানবিক ক্ষমতালিপসু আকাক্ষাই সৌদি রাজতন্ত্রকে ভাঙনের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh