নতুন পৃথিবীর নতুন মানুষের গল্প

দ্য হোয়াইট টাইগার

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

‘দ্য হোয়াইট টাইগার’ ছবিটি আপাত দৃষ্টিতে বেশ সহজ সরল মনে হয়। মনে হয়, ভারতের প্রত্যন্ত কোনো গ্রামের প্রান্তিক কোনো হতদরিদ্র ছেলে বলরাম হালওয়ার গরিব থেকে ধনী হয়ে ওঠার এক আত্মজীবনীমূলক থ্রিলার কাহিনী; কিন্তু ছবির গল্প যত এগিয়ে যায়, বলরামের এই ধনী হয়ে ওঠার বর্তমান এবং পেছনের ইতিহাস তত সহজ মনে হয় না। এই কারণেই ছবির নাম, ‘দ্য হোয়াইট টাইগার’, জঙ্গলে যে সাদা বাঘ এক প্রজন্মে শুধু একবার জন্মগ্রহণ করে। ছবিটি ২০০৮ সালে বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত একই নামে রচিত অরবিন্দ আদিগার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়েছে। পরিচালনা করেছেন ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নির্মাতা রামিন বাহরানি। গত ৬ জানুয়ারি, ২০২১, লাস ভেগাসে প্রথম প্রদর্শিত হয়েছে।

উত্তম পুরুষে নির্মিত ছবির প্রধান চরিত্র বলরামের ধারাবর্ণনার মধ্যে দিয়ে ছবির গতি এগিয়ে যায়। ফ্ল্যাশব্যাকের মধ্যে দিয়ে আমরা জানতে পারি কীভাবে লাক্সমান্ডার গ্রামের হতদরিদ্র বলরাম ধানবাদ শহরের অশোক শাহ নামের ধনীর দুলালের গাড়ির ড্রাইভার পদ থেকে প্রথমে দিল্লি হয়ে ব্যাঙ্গালোরের একজন সেলিব্রিটি ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠে। যে ব্যাঙ্গালোরকে ছবিতে ভারতের ‘সিলিকন ভ্যালি’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। যে সিলিকন ভ্যালি সারা পৃথিবীকে দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে পরিচালিত করছে। প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ, লৌহ যুগ এবং প্রযুক্তির যুগ পেরিয়ে এই সিলিকন ভ্যালির মধ্যে দিয়ে মানুষ এখন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। মানুষের হাতে বিভিন্ন যুগের উৎপত্তি ঘটলেও একেকটা যুগ মানুষকে একেকভাবে গড়ে তোলে। যে যত দ্রুত সেই যুগকে ধরতে পারে, কাজে লাগাতে পারে, সে-ই শুধু এগিয়ে যেতে পারে, অন্যরা পিছিয়ে থাকে। বলরাম তার দারিদ্রের কঠিন সংগ্রাম থেকে শিখেছে, হয় বাঁচার মতো বাঁচ নয়তো মরো। ওয়েন জিয়াবাওকে তাই ইমেইলে তার আত্মজীবনী লেখার সময় বলরাম লেখে, ‘ভারতের সোনালি অতীতে এক হাজারের মতো জাতি এবং নিয়তি ছিল। এখন শুধু দুটি জাতি, বড় পেট ও ছোট পেটের জাতি এবং শুধু দুটি নিয়তি, নিজে খাও অথবা নিজেকে খেতে দাও অন্যের কাছে।’ বলরাম বুঝে গেছে, অন্যের হাতে নিজেকে খেতে দিলে, সে নিজে কোনোদিনই খাওয়ার সুযোগ পাবেনা। ভারতের সাধারণ মানুষগুলো যেন মুরগির খাঁচায় বন্দি মুরগির মতো। খাঁচায় বন্দি মুরগিরা, তাদের সামনে অন্য মুরগিদের জবাই করা দেখেও খাঁচা থেকে বের হবার কোনো চেষ্টা করে না। এমনকি তাদের ভবিতব্যও যে জবাই করা মুরগির মতো হবে, এসব জেনেও তারা খাঁচা থেকে বের হয় না। সিনেমাতে মুরগির খাঁচার এই প্রতীকী ব্যবহার চমৎকার করে তুলে ধরা হয়েছে; কিন্তু ছবির বলরাম যেহেতু সাদা বাঘ তাই সে সেই খাঁচায় বন্দি থাকতে পারে না। যে কারণে ওয়েন জিয়াবাওকে চীনের উন্নতির পেছনে মুক্তি এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশংসা করার পাশাপাশি বলরাম এটাও জানায় যে, ব্রিটিশরা চীনাদের দাস করে রাখতে চাইলেও পারে নাই; কিন্তু বলরাম এক সময় দাস ছিল। যে দাসত্বের শৃঙ্খলে ব্রিটিশরা ভারতে দুইশ’ বছর শাসন এবং শোষণ করেছিল, যার অবশিষ্ট এখনো বিদ্যমান, সেই দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে চায় বলরাম। ছবির শুরুর দিকে আমরা দেখি, বলরামের বাবার মৃত্যুর আগে থেকেই গ্রামের মলিন পাঠশালা থেকে বলরামকে ছড়িয়ে এনে হোটেলের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতে পাঠিয়ে দেয় তার চতুর নানি; কিন্তু বলরাম সব সময় একটা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তাই সে ওয়েন জিয়াবাওকে প্রশ্ন করে, ‘তোমরা কমিউনিস্টরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না; কিন্তু ভাগ্যে বিশ্বাস কর তো?’ আবার এখানেও কথা থাকে। শুধু ভাগ্যপ্রসন্ন হলেই হয় না। ভাগ্যের সঙ্গে বুদ্ধির মতো বুদ্ধিদীপ্ত মসলা না থাকতে ভাগ্য কোনো কাজে আসে না। বলরামের ভাগ্যের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তাও প্রখর ছিল। বলরামের ভাগ্য সেদিনই খুলে যায়, যেদিন প্রথম সদ্য আমেরিকা ফেরত ধনীর দুলাল অশোককে তাদের লাক্সমানগড় গ্রামে আসতে দেখে। অশোক শাহকে দেখামাত্র এক মুহূর্তের মধ্যে বলরাম তার ভবিষ্যৎ ভাগ্য দেখে ফেলে। তারপর আমরা ছবির গতির সঙ্গে বলরামের ভাগ্য একটু একটু করে শুধু খুলে যেতে দেখি। বলরাম শুধু আশোকের ধানবাদের বাড়িতে গাড়ি চালকের নিয়োগ পেয়ে ক্ষান্ত হয় না, সেই সঙ্গে বিশ বছরের পুরনো গাড়িচালককে তাড়িয়ে দিয়ে তার স্থান দখল করে নেয়। স্থান দখলের এই বিষয়টা ছবির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে, বলরাম এই দখলের মধ্যে দিয়ে তার উন্নতির প্রথম ধাপ পার করে। এই দখলের মধ্যে দিয়ে বলরাম তার মালিক আশোক ও তার স্ত্রী পিংকি শাহের সান্নিধ্যে আসার এবং তাদের সঙ্গে দিল্লি যাবার সুযোগ করে নেয়। যে দিল্লি তার ভাগ্য খুলে দেওয়ার প্রধান এবং শেষ ধাপে পৌঁছে দিতে আরও সহায়তা করে।

দিল্লিতে এসে বলরামের চোখ আরও খুলতে থাকে; কিন্তু তখনো সে প্রভুভক্ত কুকুরের মতো অশোকের দাসত্বে মগ্ন। দাসত্ব হচ্ছে এমন একটা শৃঙ্খল যা দাসকে অন্ধ করে রাখে। দিল্লিতে আসার পর, হোটেলের বেসমেন্টে গাড়ি চালকদের থাকার জায়গায়, মাতবর গোছের মুখে শ্বেতীদাগের গাড়িচালকটি যখন বলরামকে জিজ্ঞেস করে, যে সে তার মালিকের (আশোক) দামি বিদেশি মদ, বড় বড় বক্ষের মেয়ে মানুষ লাগবে কিনা, উত্তরে বলরাম বলে, তার মালিক ভালো মানুষ, এসব তার লাগে না। সেই শ্বেতীদাগ তখন উত্তরে বলে, তোমার মালিক ভালো মানুষ না, ধনী মানুষ। ঠিক তখন আমাদের প্যারাসাইট সিনেমার গরিব কিম পরিবারের একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে কিম তার বউ আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে ধনী পার্ক পরিবার সম্পর্কে কথা বলে। পার্কের বউকে কিম সরল আর সুন্দর বললে কিমের বউ তখন বলে, ‘শুধু ধনী হবার কারণেই পার্কের বউ সুন্দর। আমি যদি তার মতো ধনী হতাম তাহলে আমিও ওর মতো সুন্দরী হতাম। টাকা হলো ইস্ত্রির মতো। সব দাগ মুছে মসৃণ করে দেয়।’ 

টাকা যে সব দাগ মুছে মসৃণ করে দেয় তার প্রমাণ আমরা হোয়াইট টাইগারের বেশ অনেক জায়গায় পাই। যেমন অশোক, তার ভাই মুকেশ এবং তাদের বাবা, দেশের বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদদের মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে চলে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার জন্য। বলরামের নিজের কিছু ঘটনার মধ্যেও টাকার মসৃণতার চিহ্ন পাই, যা একটু পরেই আমরা আলোচনা করব। তবে একরাতের একটি ঘটনা ছবির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পিংকির জন্মদিনের রাতে বলরামকে দিয়ে গাড়ি না চালিয়ে পিংকি নিজে গাড়ি চালায় এবং তার স্বামী আশোকসহ আনন্দের আতিশয্যে দিশাহারা হয়ে রাস্তা পার হওয়া একটা শিশুকে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলে। ঘটনাটি চাপা দেওয়ার জন্য আশোকের বাবা এবং ভাই মুকেশ, বলরামের ওপর দোষ চাপিয়ে একটি মুচলেকা পত্রে সই করিয়ে নেয়। মুচলেকা পত্রে বলরামকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়। দাসত্বের যে অন্ধ চশমাটা বলরাম এতদিন পড়েছিল সেটা আস্তে আস্তে খসে পড়তে থাকে। যদিও এই দুর্ঘটনা পিংকিকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে এবং বলরামকে সে নয় হাজার তিনশ টাকা (ঘুষ) দিয়ে একা আমেরিকা পাড়ি দেয়; কিন্তু মুচলেকা পত্রের যন্ত্রণা বলরামকে ক্রমেই কুরে কুরে খেতে থাকে। গাড়ির তেল চুরিসহ, গাড়ি ভাড়া খাটিয়ে সে অতিরিক্ত আয়ের ব্যবস্থা করতে থাকে। বলরাম বুঝে যায়, এখানে থাকতে হলে, হয় তাকে টিকে থাকতে হবে নাহলে মালিকপক্ষকে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলরাম নিজের পক্ষ বেছে নেয়। এবং কোনো এক বৃষ্টির রাতে, সে আশোককে খুন করে তার লাল ব্যাগে রাখা চল্লিশ লাখ রুপি নিয়ে পালিয়ে যায় ব্যাঙ্গালোরে। এই লাল ব্যাগ যেমন একটা প্রতীকী অর্থ বহন করে, তেমনি তার পেছনে থাকে কদর্য ইতিহাস। 

এই লাল ব্যাগে লাখ লাখ টাকা নিয়ে, আশোক এবং তার পরিবার ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন সময়ে ঘুষ দিয়ে গেছে ট্যাক্স ফাঁকির ব্যবস্থা করার জন্য। লাল ব্যাগে করে প্রথম যেদিন ন্যাশনাল পার্টি অফিসে ঘুষ দিয়ে অশোক এবং তার ভাই ও বাবা হোটেলে ফেরত যায়, ফেরার পথে গান্ধীর মূর্তির পাশ দিয়ে যাবার সময়ে, অশোক বলে ওঠে, ‘দেখো, আমরা গান্ধীর মূর্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছি, সেই সময়ে, যে সময়ে আমরা মন্ত্রীকে মাত্র ঘুষ দিয়ে ফিরছি। পৃথিবীর সব থেকে বড় গণতান্ত্রিক দেশে বসে এই কাজটা করছি। ছিঃ!’ ছবিতে বেশ কয়েকবার এই লাল ব্যাগের কাজ দেখানো হয়। এই লাল ব্যাগের কারণে অর্থাৎ ঘুষ দেওয়ার কারণেই অশোক তার ভাই ও বাবা দিল্লিতে এসেছিল। লাল ব্যাগটা শেষ পর্যন্ত একটা চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়। এই একই লাল ব্যাগে করে, সমাজতান্ত্রিক দলের বিজয়ী নেত্রীকে চল্লিশ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার জন্য যাবার পথে, গাড়ি স্টপেজে দাঁড়ালে, গাড়ি চালকের আসনে বসা বলরাম পাশে দাঁড়ানো ভ্যানচালকে কল্পনায় তার বাবাকে দেখে। মনে হয় তার বাবা তাকে বলছে, ‘তুমি যদি লাল ব্যাগের এই টাকাগুলো চুরি করতে চাও, এটা কখনই চুরি বলে গণ্য হবে না। অশোক সাহেব, রাজনীতিবিদদের ঘুষ দেয়, যাতে তাকে এবং তার পরিবারকে ট্যাক্স দিতে না হয়। এই ট্যাক্স ফাঁকির মধ্যে দিয়ে অশোক কার টাকা চুরি করছে জানো? এই দেশের সাধারণ মানুষের, আমার, তোমার টাকা।’ বলরামের দাসত্বের শেষ শৃঙ্খলটা ঠিক এই সময়ে খসে পড়ে। সেদিনই প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে পথেই বলরাম অশোককে খুন করে টাকাসহ লাল ব্যাগ নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে পালিয়ে যায়। খুনের দায় থেকে মুক্তি পাবার জন্য, এই লাল ব্যাগে করেই বলরাম ব্যাঙ্গালোরের পুলিশকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ দেয়। পুলিশের রুমে, বলরামের ‘মোস্ট ওয়ানটেড’ ছবি সম্বলিত পোস্টার আমরা দেখতে পাই। বলরাম ওয়েন জিয়াবাওকে লেখে, ‘তুমি কি জানো, কেন ওরা (পুলিশ) কখনই আমাকে খুঁজে পাবেনা? কারণ এই ভারতবর্ষে অর্ধেক জনসংখ্যার মুখ আমার মতো।’ এই লাল ব্যাগের টাকা দিয়েই বলরাম ব্যাঙ্গালোরে কম্পানি খুলে বসে, যার নাম দেয়, ‘হোয়াইট টাইগার ড্রাইভার্স’, ভাড়ায় খাটানোর জন্য তার কেনা ছাব্বিশটি গাড়ির জন্য ত্রিশজন ড্রাইভার শিফট অনুযায়ী কাজ করে এখন। বলরাম নিজের নাম বদলে রাখে অশোক শর্মা। 

এই অশোক শর্মা আগের অশোক শাহের মতো নয়। যাকে নপুংশক নামে অভিহিত করা হতো। যার কোন ব্যাকবোন ছিল না। যে আমেরিকার মতো দেশে বসবাস করেও সিলিকন উপত্যকার উচ্চতম প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে সেভাবে যুক্ত করতে পারে নাই। যদিও কম্পিউটার, ফেসবুক ইত্যাদি না জানার কারণে, বলরামকে অশোক একবার ‘হাফ বেকড’ বলে অভিহিত করেছিল। বলরাম তখনই বুঝে গিয়েছিল ভারতে তার মতো অর্ধেক বেকড, অর্ধেক গঠিত, অর্ধেক শুদ্ধ মানুষদের কীভাবে গঠিত হতে হয়। অশোকের খুনের মধ্যে দিয়ে, বলরাম শুধু অশোক নামের কোন মানুষকে খুন করে নাই। গোটা একটি সিস্টেমকে খুন করেছে। যে সিস্টেমে শুধু দাসত্বের শৃঙ্খল ছিল না, দাসত্ব টিকিয়ে রাখা এবং দাস হয়ে থাকার মতো ব্যবস্থাও ছিল। যেমন বলরাম একদিন যখন অশোকের বাবার পা টিপে দিচ্ছিল এবং কথায় কথায় আইটি (ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি) সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছিল, মুকেশ বলরামকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য তার মাথায় জোরে আঘাত করে বলে যে, বলরাম মুকেশের বাবার পা বেশি জোরে টিপছে। আসল কারণটা জোরে পা টেপার মধ্যে ছিল না, ছিল বলরামের আইটি সম্পর্কে জানার স্পর্ধা। অশোক যখন প্রতিবাদ করে ভাইকে বলে, এই মারার কারণে আমেরিকায় তার ভাই বরখাস্ত হতে পারতো। মুকেশ তখন উত্তরে বলে, এটা আমেরিকা নয়। এটা ভারত। এখানে চাকরেরা মালিককে এই কারণেই (মার দেওয়ার কারণে) পছন্দ করে। 

একটা সিস্টেমকে সরিয়ে না দিলে নতুন সিস্টেম সেখানে জায়গা করে নিতে পারে না। নতুন সিস্টেমের জন্য চাই নতুন মানুষ। বলরাম হলো সেই নতুন মানুষ। বলরাম তাই ওয়েন জিয়াবাওকে তার চিঠির শুরুতেই লিখেছিল, ‘যদিও আমেরিকা থেকেই সিলিকন ভ্যালি এসেছে, কিন্তু আমেরিকা এখন গতকালকের। ভারত এবং চায়না আগামীকালের। আগামী পৃথিবী হবে ব্রাউন এবং ইয়েলো মানুষদের। সাদা মানুষেরা এযাবতকাল শুধু পায়ুকাম, সেল ফোন এবং নেশা জাতীয় পণ্যের অপব্যবহার করেছে।’ ছবির শেষে দেখি, নতুন এই অশোক শর্মা (বলরাম) তার অধীনে নিয়োজিত গাড়ি চালকদের দাসসুলোভ দৃষ্টিতে দেখে না, কোনো ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও না। যে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ আগের অশোকের পরিবারের মধ্যে ভীষণভাবে গেড়ে বসেছিল। কোনো গাড়িচালক বা অন্য কোনো নিম্ন পদে মুসলমান নিয়োগ দেওয়ার প্রশ্নই ছিল না, বরং যেসব হিন্দু গাড়িচালক, অফিস বা ঘরের জন্য লোক নিয়োগ দেওয়া হতো, তাদের জাতপাত যাচাই করা হতো। এই অশোক শর্মা তার অধীনে নিয়োজিত লোকদের দাস বা ধর্ম নয়, শুধু কর্মী হিসাবে দেখে। এই অশোকের গাড়ির কোনো ড্রাইভার কোনো দুর্ঘটনায় কাউকে চাপা দিলে, অশোক নিজেই তার দায়ভার নিয়ে নেয়। তার গাড়ির চালকের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয় না। যেমন দিয়েছিল বলরামের আগের মালিক। এভাবেই আমরা দেখি নতুন এক অশোক শর্মার উদয় হচ্ছে। যে আগামীকালকের। লাল ব্যাগের টাকা অতীতে যেসব পাপকে মুছে দিয়ে মসৃণ করে দিতো, নতুন লাল ব্যাগের টাকার কোনো প্রয়োজনই পড়ে না মসৃণ করার। অতীতের লাল ব্যাগে যেসব ধনীরা টাকা রাখতো, সেসব ধনীদের টাকা নষ্ট করার অনেক সুযোগ থাকত; কিন্তু বর্তমান লাল ব্যাগে অর্জিত টাকার মালিক, এই নতুন অশোক শর্মা টাকা ব্যয় করার মসৃণ রাস্তাটা আপনা থেকেই খুঁজে পেয়েছে, ইস্ত্রির প্রয়োজন পড়ে নাই। তাই বলরাম যখন অশোকের মতো সহজ-সরল মানুষটাকে খুন করে, সেই মুহূর্তে বলরামকে বিশ্বাসঘাতক, বেইমান ইত্যাদি মনে হলেও, পরে আমরা বুঝতে পারি এই খুনের প্রয়োজন ছিল। এই খুনের মধ্যে দিয়েই আগামী দিনের ব্রাউন মানুষদের দেখা পাওয়া যাবে। তাই ছবির একদম শেষে, নতুন অশোক তার ড্রাইভারদের ডেকে যখন বলে, গতানুগতিক হিন্দি ছবিতে কোনো গরিব কোনো ধনীকে খুন করার পর যে অনুশোচনা দেখানো হয়, সেটা বাস্তবসম্মত না। অনুশোচনার অর্থ সেখানে দাসত্বের অবশিষ্ট থেকে গেছে। খুনের পর খুনি যখন উঠে দাঁড়ায়, প্রাণ ভরে শ্বাস নেয় তখনই সে অনুভব করে মুরগির সেই খাঁচা থেকে সে বের হতে পেরেছে এবং এটাই বাস্তব। আমরাও তখন একমত না হয়ে পারি না যে পুরনো জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলেই নতুন পাপমুক্ত নিয়মকে স্বাগত জানাতে হয়। 

অভিনয় শিল্পীদের সম্পর্কে কিছু না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ছবিতে প্রত্যেকেই দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। অশোকের চরিত্রে রাজকুমার রাও যেন সত্যিকার একজন নপুংশক চরিত্র। কারোর ওপরেই সে অধিকার খাটাতে পারেনা, না তার ভাই-বাবা অথবা বউ পিংকি। পিংকি শাহর চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার সময়কাল স্বল্পস্থায়ী হলেও, ওইটুকু সময় সে এতোটা ভরে দিয়েছে যে ছবি শেষ হলেও তাকে ভোলা যায় না। মুকেশের চরিত্রে বিজয় মৌরিয়াকে দেখে গ্রামের সেই টিপিকাল বেজি ধরনের সুদখোরদের কথা আমাদের মনে পড়ে যায়। মুখে শ্বেতীদাগের গাড়িচালকের চরিত্রে নালকেশ নীলকে দিল্লির প্রকৃত একজন ধান্দাবাজ ড্রাইভারই মনে হয়েছে। দ্যা গ্রেট সোশিয়ালিস্ট চরিত্রে স্বরূপ সম্পাতের সেই বসার ঘরের সেন্টার টেবিলের উপর পানের পিক ফেলার দৃশ্যটি ভোলার মতো নয়। নানির চরিত্রে কমলেশ গিলের অনবদ্য অভিনয় মনে রাখার মতো। এ ছাড়া ছোট ছোট অনেক চরিত্র আছে, যেমন বলরামের বাবা, বলরামের ছোট ভাতিজা, বলরামের সঙ্গে রাস্তায় খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা হওয়া অট্টহাসিতে ফেটে পড়া পাগলটা প্রভৃতি। সবশেষে বলরাম হালওয়ার চরিত্রে আদর্শ গৌরব একজন আদর্শ অভিনেতা বটে। একটা মুহূর্তের জন্যও সে তার বলরাম হালওয়ার চরিত্র থেকে বিচ্যুত হয় নাই। সিনেমাটোগ্রাফি এবং এডিটিং এর কাজও অত্যন্ত নিপুণ। তবে দিনের শেষে সব কৃতিত্ব অবশ্যই ঔপন্যাসিক অরবিন্দ আদিজ এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা রামিন বাহরানির। গল্প ভালো হলে, সিনেমাও ভালো হয়। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //