মোদির ৮৯ জনের ‘সত্য’, বাকিসব মিথ্যা!

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা সেই সূত্রে আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবতও কী ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করতে চান? বিজেপি-আরএসএস সম্পর্কে অনেকেই হয়তো বলবেন এরা ধর্মতাত্বিক, আবেগী, মানুষকে ধর্ম নিয়ে সেন্টিমেন্টাল সুরসুরি দিতে পারে ভালো, এটাই তাদের রাজনীতি ইত্যাদি। হয়তো বা এসব কথা সত্যিও কিন্তু এর চেয়েও বড় সত্য এরা আসলে সবচেয়ে বড় ম্যাটেরিয়ালিস্ট বা বস্তুবাদি। মানে বস্তুগত স্বার্থবাদী। কেন?

‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’-এর ভালো উদাহরণ। এটা একটা বাণিজ্যিক ছবির নাম। ১১ মার্চ রিলিজ হওয়া এ ছবি নিয়ে সম্প্রতি হৈচৈ তোলা হয়েছে ভারতের প্রতিটি রাজ্যে; বিশেষ করে যেখানে রাজ্য সরকারে বিজেপি আছে। কারণ ছবিটা বিনোদন করমুক্ত করেছে সেসব রাজ্য সরকার। এর চেয়ে বড় কথা, মোদি এই ছবির মধ্যে তার ‘কথিত সত্য’ খুঁজে পেয়েছেন। যে সত্য নাকি এতদিন লুকানো দাফনায়ে দেয়া সত্য ছিল। ছবি রিলিজের পরের দিনই মোদি প্রযোজক ও পরিচালকদের সঙ্গে নিজ অফিসে ডেকে সাক্ষাৎ করে এসব কথা বলেছেন। 

আসলে, এই ছবিটা সম্পর্কে বলা উচিত এটা বিজেপির প্রডাক্ট যা পরোক্ষে বাণিজ্যিক ছবি বলে হাজির করা হয়েছে; কিন্তু কোনো পার্টি বা পার্টির নির্বাচনে প্রপাগান্ডার জন্য যেমন গান লেখা হয়, তেমনি। তবে এর বাজেট বেশি তাই আস্ত একটা প্রপাগান্ডা সিনেমাই বানানো হয়েছে। এই ছবির কুশিলবেরা কে কত পারিশ্রমিক নিয়েছেন এর হিসাব নিয়ে প্রথম আলো একটা ফিচার ছেপেছে। আবার এর অভিনেতা-নেত্রীরা সরাসরি বা পরোক্ষে বিজেপি দলে যোগদান করা সিনেমা ব্যক্তিত্ব। তবু ওই ফিচার বলছে তাঁরা বাণিজ্যিক ছবির মতোই পারিশ্রমিক নিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নিয়েছেন পশ্চিমবাংলার মিঠুন চক্রবর্তী, দেড় কোটি রুপি। আবার তিনিই কমিউনিস্ট- তৃণমূল ঘুরে সাম্প্রতিককালে বিজেপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন। গত ২০২১ সালে মমতার নির্বাচনের সময় বিজেপির প্রার্থীদের পক্ষে বিভিন্ন শোতে যোগ দিয়েছিলেন। আর তখনই খবর রটেছিল নিজ ছেলেকে কোনো একটা মামলা থেকে বাঁচাতে বিজেপির আশ্রয় চান বলে তিনি অবসর বয়সে একাজ করেছেন। 

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম বিজেপি-আরএসএস অবশ্যই ভারতকে হিন্দু-রাষ্ট্র ঘোষণা করতে চান; কিন্তু তারা আসলে চরম বস্তুবাদি বলে হিন্দু-রাষ্ট্র ঘোষণার অর্থ তাদের কাছে মুসলমানের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা-বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলে ধরা। কারণ তাদের অবজারভেশন বলছে, এভাবে ঘৃণা জাগিয়ে তুললে হিন্দু ভোটারেরা সহজেই আপ্লুত হয়ে মোদি-বিজেপির বাক্স ভরিয়ে তুলে থাকে। অতএব, মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন, এমনি এমনি না। তিনি আজীবনই এমন ভাবে প্রাকটিক্যাল হিন্দুরাষ্ট্রে থাকতে এসেছেন। 

আর এরই এক অনুষঙ্গ হল ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ সিনেমা। যাতে নামমাত্র টিকিট আর এমনকি সরকারি কর্মচারীদের জন্য সিনেমা দেখার ছুটি দেয়া। এতে সবমিলিয়ে ওই রাজ্যে এমন হুজুগ তুলে সারা রাজ্যজুড়ে হিন্দুত্বের জয়জয়কারে ছেয়ে ফেলা যায় কয়েক দিন। এটাই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ও পাওনা তাদের। 

এই কর্মপরিকল্পনা তাদের কাছে কত জরুরি এর প্রমাণ পাওয়া যায় দিল্লির ঘটনায়। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আম আদমি পার্টির কেজরিওয়াল। অর্থাৎ বিজেপির বিরোধী দল দিল্লিতে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সম্ভবত এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে ওই রাজ্য সংসদে বিজেপি সদস্যরা সেখানেও ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ দেখতে ট্যাক্স ফ্রি বা ছুটির প্রস্তাব তুলেছিল। জবাবে কেজরিলাল সিনেমাটা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘একটা লোক কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জ্বালা, যন্ত্রণা, দুর্দশা দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে আর আপনারা সেই ‘মিথ্যা’ ছবির পোস্টার সাঁটছেন! দুর্ভাগ্য!’। আর তাতেই এই মন্তব্যের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে এক বিজেপি এমপির নেতৃত্বে তাঁরা হামলা করেছিল। এখানে বলে রাখা ভালো দিল্লির রাজ্য সরকার এক আজব জায়গা যেখানে রাজ্য সরকারের হাতে কোনো পুলিশ নাই। কারণ, দিল্লির পুলিশ প্রশাসন সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে। 

তবে দিল্লির অবস্থা যাই হোক, দ্য কাশ্মীর ফাইলস এর মধ্যে মোদি চাপা দিয়ে রাখা ‘সত্য’ খুঁজে পেয়েছেন। আর সিনেমা বানানেওয়ালারা এই সিনেমার মাধ্যমে নাকি কাশ্মীর পণ্ডিতদের জাস্টিস মানে ন্যায়বিচার দিতে চান। তাই এই সিনেমার প্রচারে ব্যানারে সবখানে #righttojustice বলে হ্যাশট্যাগ ঝুলিয়ে দিয়েছেন। যেন বিজেপি এক মানবাধিকার সংগঠন!!

এ সিনেমায় মোদি কোন ‘সত্য’ খুঁজে পেয়েছেন

এই সিনেমায় সুনির্দিষ্ট করে কাশ্মীরের কেবল হিন্দু পণ্ডিতদের কথা তুলে আনা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে জম্মু-কাশ্মীরে ১৯৪১ সালের হিসাবে ৭২.৪ মুসলমান ও ২৫% হিন্দু। ১৯৬১ সালে ৬৮% মুসলমান ২৮.৪৫% হিন্দু। আর এখন ২০১১ সালে এটা ৬৮.৩১% মুসলমান ও ২৮.৪৩% হিন্দু। তবে সবচেয়ে বড় কথা কাশ্মীরে যেমন জনসংখ্যার বেশির ভাগই মুসলমান, জম্মুতেও তেমনি হিন্দু জনসংখ্যা একটু বেশি। এই তথ্য ২০১৬ সালের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক রিপোর্ট থেকে নেওয়া।

এখন একটা সোজা প্রশ্ন, কাশ্মীরের সমস্যা কী হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ অথবা কে সংখ্যালঘু হিসেবে অপরের হাতে নিগৃহীত, এরকম? না এটা তা একেবারেই না। ১৯৪৭ সাল থেকে মূল সমস্যা কাশ্মীর কী মূল ভারতের অংশ হবে কী হবে না? এবং হলে কী করে হবে? অর্থাৎ এটা হিন্দু-মুসলমান বিরোধের সমস্যাই না। তবে সেই মূল সমস্যা সমাধান আজও হয় নাই। তবে ১৯৯০ সালে হিন্দু পণ্ডিতদের নিগৃহীত হওয়া ও দেশত্যাগের মানে কাশ্মীর ছেড়ে তাদের ভারতের অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। 

সেখানে কতজন কাশ্মীর পণ্ডিতের হত্যার কথা জানা যায়?

ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা গত ১ এপ্রিল ২০২২ এক ফ্যাক্ট চেক [প্রকাশিত কোনো মিডিয়া রিপোর্টের সত্যতা যাচাই করে প্রমাণসহ আরেক রিপোর্ট প্রকাশ করা- যে আগের প্রচারিত তথ্য কেন ভুল অথবা শুদ্ধ, এটাই ফ্যাক্ট চেক রিপোর্ট।] রিপোর্ট প্রকাশ করে দ্য কাশ্মীর ফাইলস সিনেমা রিলিজ হওয়াতে সামাজিক বিতর্ককে কেন্দ্র করে। সেখানে এক রাইট-টু-ইনফরমেশন সূত্র বলা হয়েছে কাশ্মীরে এমন মোট হত্যা হওয়া লোকের সংখ্যা ১৬৩৫ যার মধ্যে মাত্র ৮৯ জন হিন্দু মানে কাশ্মীরি পণ্ডিত। তাই ওই রিপোর্ট থেকে বলা যায় আসলে তা উল্টা মোদিকেই প্রশ্ন করেছে তাহলে ১৬৩৫ জনের মধ্যে বেছে বেছে এই ৮৯ জন্মের জন্য কেন কেবল এত সংহতি প্রকাশ ও কান্নাকাটি? কেন কেবল কাশ্মীর পণ্ডিতদের জন্য জাস্টিসের চিৎকার? ‘রাইট টু জাস্টিসের’ বিপ্লবীপনা ও হুঙ্কার তোলা? 

এবং এমন ধারণা দেয়া যেন কাশ্মীরে পণ্ডিতেরাই কেবল নিগৃহীত হচ্ছে আর এটাই মুখ্য ঘটনা-ফেনোমেনা? আর এটাই কী মোদির ‘সত্য’? 

তার মানে মুসলমান ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের হিন্দু ভোটারকে ক্ষেপিয়ে ভোট যোগাড়- এটারই নাম দ্য কাশ্মীর ফাইলস সিনেমা!

কাশ্মীর সমস্যাটা আসলে কী?

আমরা যেমন অনেকে ধরে নেই, কলোনিদখল আমলের ভারত মানে ব্রিটিশ-ভারত নিশ্চয় একটা দেশ ছিল কোন একটা প্রশাসনের অধীনে! সরি, এই ইমানিজেশনটা ভুল। মানে একেবারেই আন্দাজে বলা। ফ্যাক্টস হল, ব্রিটিশ আমলে একক ভারত বলতে কিছুই ছিল না। তাহলে কী ছিল?

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে হুগলীতে গঙ্গা নদীর তীরে নিজেদের একটা হেড কোয়ার্টার বা দুর্গ বানানোর অনুমতি নিয়েছিল। এটাই ১৬৯৬ সালে নির্মিত ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ বা কোম্পানির হেড কোয়ার্টার। পরবর্তীকালে এই কোম্পানিই সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে ক্রমশ সারা ভারতের দখল নিয়েছিল; কিন্তু ১৭৬৩ সালের পর থেকে যে প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, তা কোনো একক ভারত ভূখণ্ড ধরে নিয়ে এক প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলে নাই। বরং ফোর্ট উইলিয়ামের অধীনে ছিল তিনটা (বেঙ্গল, মুম্বাই, মাদ্রাজ) প্রেসিডেন্সি (কমপক্ষে তিনটি প্রদেশের চেয়ে বড় হতো প্রেসিডেন্সি), ১৭/ ১৮ টা প্রদেশ আর ৫৫০ এর বেশি ছোট-বড় মিলিয়ে করদ রাজ্য-এভাবে। তাই ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করে যায় তখনও একটা একক ভারত বলতে কিছু ছিল না। নেহেরু প্রেসিডেন্সি আর প্রদেশগুলোকে নিয়ে সহজেই একক ভারত রাষ্ট্রের কল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলেন বটে কিন্তু করদ রাজ্যগুলোকে নিয়ে বড় সমস্যায় পড়েছিলেন। প্রধান কারণ এমন এই ছোট-বড় রাজারা কোম্পানির ভারত দখলের আগে থেকেই স্বাধীন রাজা ছিল। কোম্পানির সঙ্গে তাদের চুক্তি ছিল যে তাঁরা রাজার আদায় করা রাজস্বের একটা ভাগ নিবেন। এ ছাড়া রাজারা আগের মতোই নিজের প্রশাসন দিয়ে রাজ্য চালাবেন; কিন্তু ব্রিটিশরা ছাড়া আর কোনো বিদেশির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক বা চুক্তি করতে পারবেন না। বিনিময়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা তা দেওয়ার সব দায় ব্রিটিশদের। ফলে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করলে আইনত রাজারা আগের মতোই স্বাধীন রাজা হয়ে যান। তাই ব্রিটিশদের পক্ষে তা নেহেরুকে হস্তান্তরের কিছু ছিল না। 

এতে এসব রাজার রাজ্য যেগুলোর বেশির ভাগই বিভিন্ন প্রদেশ বা প্রেসিডেন্সির সংলগ্ন তা নেহেরু ভয় দেখিয়ে বা বল প্রয়োগে করে তার কল্পিত হবু ভারতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। কখনো ওই রাজারা অন্তর্ভুক্তিতে (এক্সেশন অব ইন্সট্রুমেন্ট) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তবে কাশ্মীর ভারত-পাকিস্তান দু’দেশের সঙ্গে সীমান্ত যুক্ত ভৌগোলিক অবস্থান হওয়াতে নেহেরু তা সহজে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নিতে পারেন নাই। অন্যদিকে কাশ্মীরের জনসংখ্যার ৬৮ ভাগের বেশি সবসময়-ই মুসলমান হওয়াতে হিন্দু রাজা হরি সিং ভারতে অন্তর্ভুক্তি সহজ ছিল না। কারণ মূল সমস্যা তা মুসলমানদের মানানো। ফলে কাশ্মীরের পাকিস্তান সংলগ্ন অংশ পাকিস্তানের সাহায্য চাইলে তা ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সংঘাতের রূপ নেয় ১৯৪৮ সালে। 

জাতিসংঘ কাউকে রাজা মানে না, কেন? 

জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ম্যান্ডেট ও করণীয় লিখে কার্যকর হওয়া ১৯৪৫ সালে। তবে এর আগে এর জন্ম ঘোষণা হয় ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি। দুঃখের বিষয় ব্যতিক্রম কিছু ছাড়া প্রায় শতভাগ রাজনীতিবিদ এবং অনেক বড় একাডেমিশিয়ানও জাতিসংঘ- এটা কেমন প্রতিষ্ঠান ও এর জন্ম কীভাবে এর ইতিহাস জানেন না। না, অনেকেই একটা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস তত নাও জানতে পারে; কিন্তু যেগুলো ফান্ডামেন্টাল প্রসঙ্গ যেমন কোন ভিত্তিমূলক চিন্তা ও বক্তব্যের ওপর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তা জানতেই হবে। কারণ মডার্ন দুনিয়া তার রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, কলনিমুক্ত এক নয়া দুনিয়া এবং সর্বোপরি একটা গ্লোব্লা পলিটিক্যাল সিস্টেম দুনিয়াতে এল কেমন করে এটা না জানা প্রায় অপরাধ বা অযোগ্যতা। এমনকি তা না জানলে যে কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও পরামর্শকরা বিপদে পড়বেন, বেইজ্জতি হবেন। 

কলোনি শাসনের অবসান

ভারতের প্রায় সকল রাজনীতিবিদ আর বাংলাদেশেরও অনেকে আন্দাজ-অনুমানের ওপরে বলে ও মনে করে থাকে যে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জমিদার হিন্দুর (সূর্যসেন মার্কা সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে) ও পরবর্তিতে কংগ্রেসের আন্দোলনের কারণে। মানুষ সাধারণত নিজের ঢোল পিটায় সেটা বুঝা যায় কিন্তু, তাই বলে এমন ডাহা মিথ্যা অনুমানে বুঁদ হয়ে তা করতে হবে, হিন্দুত্বের ভ্যানিটি দেখাতে হবে? এটা আসলেই টু মাচ!! বিশেষত যখন ফরমেশন অব গ্লোবাল হিস্ট্রি এবং জাতিসংঘের জন্মই তাঁরা জানে বুঝে না। আপনি গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম যেটা তৈরি হয়ে আছে তা অপছন্দ করতেই পারেন; কিন্তু এই সিস্টেমটা কী এবং কেন সেটা তো জানতেই হবে। নইলে রাজনীতি করার যোগ্য হবেন কী করে!!!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৩৯ সালে। এতে একপক্ষে ছিল মূলত ব্রিটিশ-ফরাসি ও তাদের বন্ধু দেশ আর অন্যপক্ষে হিটলারের জর্মানি ও তার বন্ধু দেশগুলো। ব্যতিক্রম আমেরিকা যে কোন পক্ষে নয়। এমনকি আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধে যোগই দেয় নাই পরের দুই বছর। এর কারণ সম্পর্কে ইউরোপীয় যারা অকমিউনিস্ট এমন অন্যদের কথা তো জানাই যায় না। আর স্টালিনীয় কমিউনিস্টদের বয়ান শুনেছি যে তারা বলে থাকে আসলে ইউরোপের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের ফয়দা নিয়ে চায় বলে আমেরিকা শুরুর দু’বছর যুদ্ধে যায়নি বা কোনো পক্ষ নেয় নাই। বলা বাহুল্য এটা অনৈতিহাসিক ও পুরাপুরি ভিত্তিহীন গল্প মাত্র। কেন যায় নাই সেকথা থাক, তা অন্যত্র আলোচনা করেছি বিস্তারিত; বইও ছাপা হয়ে গেছে। এখানে কথা বাড়াচ্ছি না।

ফ্যাক্টস হল, ১৯৪১ সালের আমেরিকার অবস্থান পরিবর্তিত হয়ে যায়। পিছনের কারণ, হিটলার ডমিনেটিং হয়ে উঠতে থাকে এবং ১৯৪০ সালের জুনে ফ্রান্স দখল করে নেয়। ‘ব্যাটেল অব ফ্রান্স’ নামে যা পরিচিত। এরপর থেকে যত এমন দখল হতে থাকে আর ততই ইংল্যান্ড নিজেও এরপরের শিকার হতে পারে ভেবে সন্ত্রস্ত হতে থাকে। আর এটাই তাকে আমেরিকার কাছে ছুটতে সাহায্য চাইতে বাধ্য করে। আর আমেরিকা যেন এরই অপেক্ষায় ছিল। এখান থেকেই আমেরিকা শর্ত দেয় যে যুদ্ধে সে ব্রিটেনের পক্ষ-যুদ্ধে এই পক্ষে যোগ দিতে পারে; কিন্তু এর আগে এই যুদ্ধ শেষ হলে দুনিয়াটা দেখতে এমন লাগবে এর এক ইতিবাচক ছবি আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে দেখাতে হবে। আসলে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে বলতে চাইছিলেন যে যুদ্ধ শেষে দুনিয়া থেকে কলোনি দখলদারিতে সমাপ্তি টানতে হবে। ফলে দুনিয়াটা ‘কলোনি মুক্ত’ দুনিয়া দেখে লাগবে। 

আর তাতে চার্চিল বুঝেছিলেন হিটলারের হাতে ইংল্যান্ড হারানো ও দখল হয়ে যাবার চেয়ে কলোনি ব্যবসা ছেড়েছুড়ে দিয়ে ভালো হয়ে যাওয়া নিজ দেশের জন্য সম্মানের হবে। এই কথোপকথন চুক্তিতে লিপিবদ্ধ হলে সেই চুক্তির নামই আটলান্টিক চার্টার চুক্তি। এবং আজকের দুনিয়ার সব আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পর্কের ভিত্তি এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে। চার্চিল এই চুক্তি করেই আমেরিকাকে নিজ যুদ্ধ-পক্ষে এনেছিলেন। আটল্যান্টিক চার্টার এটা আট দফা এক চুক্তি। এর প্রথম তিন দফার কারনেই অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে রাজাগিরিও বন্ধ হয়ে যায়। 

আগেই বলেছি এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য দুনিয়া থেকে কলোনি দখল ব্যবসার অবসান। তাই এর প্রথম দফা বলছে, তাঁরা দুই দেশ (আমেরিকা ও ব্রিটেন) নিজ নিজ ভূখণ্ড বাড়ানোর দিকে যাবে না। দ্বিতীয় দফায় বলছে, তাঁরা নিজের কোনো টেরিটর-ই বদল ঘটাবে না যেখানে ভূখণ্ড সংশ্লিষ্ট দেশের স্বাধীন ইচ্ছায় দেয়া কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। তৃতীয় দফায় বলছে আরো স্পষ্ট করে যে তারা দুই রাষ্ট্র যে কোনো বাসিন্দা মানুষেরা কেমন ধরনের সরকারের গড়ে তার অধীনে শাসিত হতে চায় তা বেছে নিবার অধিকারের প্রতি সম্মান করে। তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা দেখতে যায়। ‘তাদের আত্ম-নিয়ন্ত্রনাধিকার তারা পুনরায় ফিরে পেয়েছে দেখতে যায় যা তাদের থেকে আগে গায়ের জোরে কেড়ে নেওয়া হয়েছে’। 

কোথাও কলোনি শব্দটা নাই কিন্তু প্রতিটা অনুচ্ছেদই কলোনিবিরোধী। সার কথায় যে কোনো ভূখণ্ড কীভাবে শাসিত হবে তা ঐ ভূখণ্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র বেছে নিবে, চূড়ান্ত কথা বলবে। বলাই বাহুল্য এতে কলোনি দখলদারদের সঙ্গে সঙ্গে রাজারাও নাকচ হয়ে যায়। কারণ কোনো রাজতন্ত্র বা রাজাই তার বাসিন্দাদের অনুমতি নিয়ে রাজাগিরি করে না। কারণ অনুমতি-সম্মতি নিলে তো সেটা আর রাজতন্ত্র থাকে না; প্রজাতন্ত্র বা রিপাবলিক হয়ে যায়। 

কাজেই কাশ্মীরের রাজা হরি সিং কাশ্মীরের ভাগ্য নির্ধারণে কেউ না। তাই তিনি নেহেরুকে একসেশন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে দিলেই কাশ্মীর ভারতের হয়ে যাবে না। কাশ্মীরের বাসিন্দা-জনগণের অনুমতি ম্যান্ডেট লাগবে। 

আর এটাই যোগাড় না করে কোথাকার এক হরি সিং এর স্বাক্ষরের বলে কাশ্মীর ভারতের হয়েছে বলে চালানোর চেষ্টা করে গেছেন নেহেরু। আবার তিনি এই আটল্যান্টা চুক্তি জানতেন না বলেই বোকার মত জাতিসংঘের কাছে পরামর্শ জানতে চিঠি দিয়েছিলেন যে, একসেশন [accession] চুক্তি থাকলে কাশ্মীর ভারতের হবে কিনা। জবাবে, জাতিসংঘ রেফারেন্ডাম মানে বাসিন্দাদের মত নিয়ে সে ভিত্তিতে সমাধান করতে বলেছিল। তিনি তবু কাশ্মীর দখলে রেখেই আবার ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা যুক্ত করেন নেহেরু। অথচ এটা- মূল কাজ না করে এক অহেতুক কাণ্ড। আর একালে (২০১৯) মোদি তো সরাসরি ওসব ধারা বাতিল করে একেবারে গায়ের জোরে কাশ্মীর ভারতে বলে দাবি করেন। যা আসলে কলোনি দখলেরই নামান্তর। আর এটাই কাশ্মীর সমস্যার আসল জায়গা। অথচ মোদি ওই সমস্যায় নিহত (৮৯ জন) কেবল কাশ্মীর পণ্ডিতের প্রতি ‘জাস্টিসের’ কথা বলে হিন্দুত্ববাদের অত্যাচারের পক্ষে সাফাই তুলে আনতে চাইছেন।

আমাদের মধ্যে কারও কারও মাথায় টেরা প্রশ্ন জাগে সহজে। তাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন যে তাহলে রাজতান্ত্রিক দেশগুলো যেমন সৌদি আরব জাতিসংঘের সদস্য হচ্ছে কেমন করে। এর জবাবের সঙ্গে আগে আরেকটু বলে নেয়া দরকার। চার্চিল-রুজভেল্ট আটলান্টিক চার্টার চুক্তি ১৯৪১ সালে স্বাক্ষর হয়েছিল ১৪ আগষ্ট। আর পরে ঐ একই ড্রাফট নিয়ে একসঙ্গে চারদেশ মিলে আবার স্বাক্ষর ঘটেছিল ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি। এবার আর চারদেশীয় চুক্তিকে আটলান্টা চার্টার চুক্তি বলা হয় নাই। বলা হয় জাতিসংঘ ঘোষণা [Declaration by United Nations]। আর এতে ঐদিন স্বাক্ষর করেছিল চার্চিল-রুজভেল্টসহ আরও দুই প্রেসিডেন্ট। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর স্টালিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট। পরে ঐ চারদেশীয় ঘোষণাতেই আরো ২৬টা দেশ অনুস্বাক্ষর দেয়। আর আমেরিকা ঐদিন থেকেই বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়া শুরু করেছিল। 

যে কথা বলছিলেন কোনো রাজতান্ত্রিক দেশ জাতিসংঘের জন্মের সময় এর সদস্য হতে চাইলে সেই সদস্যপদ দেয়া হয়েছিল। তবে ওসব দেশের জনগণ যদি রাজার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আপত্তি, আন্দোলন করতে শুরু করে তবে জাতিসংঘ আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে বলবে গণভোট মানে বাসিন্দাদের মতামত নিতে আসতে। তাই এমন ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা দেওয়ার আগে পর্যন্ত সদস্যপদ থাকবে।

তাহলে কাশ্মীর সমস্যার মূল হল, কাশ্মীরের বাসিন্দাদের ভূখণ্ড শাসন কীভাবে হবে এর মতামত প্রকাশ করতে দেয়া হয় নাই। করতে দেয়া হয় নাই যে তাঁরা কার দ্বারা শাসিত হবে। তাঁরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়, না পাকিস্তান? অথবা নিজেরা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হতে চায়? নেহেরু এই গণভোট নাকচ তো বটেই উলটা জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। আর মোদি এসে ২০১৯ সামের ৫ মে সংসদে ঘোষণা দিয়ে দেন নেহেরুর করা ৩৭০ অথব ৩৫এ অধ্যাদেশও বাতিল। আর তাতে একেবারেই গায়ের জোরে সারা কাশ্মীর-ই ভারতের বলে দাবি করে বসেন। তাহলে মোদির কাছে জাস্টিস কোনটা? জবরদস্তিতে সারা কাশ্মীরই দখল।

নির্বাচনি বা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ব্যবস্থাটাও ভেঙে দেওয়া

নেহেরুর কোন গণভোট ছাড়া গায়ের জোরে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নিয়েছিলেন। এতে বাসিন্দারা তা পছন্দ করেন নাই, অনুমোদনও দেয় নাই; কিন্তু কাশ্মীরের রাজনীতি নিয়মতান্ত্রিকতার ভিতরেই ত্থাক চেয়েছিলেন। অর্থাৎ রাজ্যে নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্যেই তাদের আকাঙ্ক্ষাকে আটকে রেখেছিলেন। কোনো সশস্ত্রতার দিকে যান নাই।

কিন্তু ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে নেমে আসে ব্যাপক কারচুপির এক উদ্যোগ অর্থাৎ এতে যে নির্বাচন ব্যবস্থাটা ছিল সেটাও ভেঙ্গে দিবার উদ্যোগ এটা। মূল কারণ, এমইউএফ বা মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট [MUF] নামে একটা ফ্রন্ট গড়ে উঠেছিল ঐ নির্বাচনের আগে; কিন্তু এটার পক্ষে বাসিন্দাদের ব্যাপক উচ্ছাস আগ্রহ দেখা দেওয়াতে এটাকে ন্যাশনাল কংগ্রেস নেতা ফারুক আব্দুল্লাহ নিজ দলের ভবিষ্যত হারানো হিশাবে দেখেন। তাই তিনি দিল্লি এসে ততকালিন প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধিকে এর তাৎপর্য ব্রিফ করেন। আর তা ঠেকাতে তাঁরা ব্যাপক কারচুপি করে হলেও তা যৌথভাবে ঠেকাবার সিদ্ধান্ত নেন। রত মূল কারণ, এতে ঐ এমইউএফ দল ছিল আসলে মুসলিম জাতিবাদি রাজনীতির একটা দল। 

এখন প্রশ্ন হলো, মুসলিম জাতিবাদী রাজনীতির হলেই তা চক্ষুশূল হয়ে ভেঙে দিতে হবে কেন? 

এক নম্বর কারণ, ভারতের নেহেরু-গান্ধির জাতীয় কংগ্রেস দল ১৯৪৭ সালে ঠিক এটাই করেছিলেন। কেবল মুসলিম জাতিবাদের জায়গায় তাঁরা ১৯৪৭ সালে করেছিলেন হিন্দু জাতিবাদি ভারত। এরকম কোন একটা ধর্মীয় জাতিবাদী রাজনীতির মূলবৈশিষ্ট্য হলো, তা আসলে একপক্ষীয় কোন এক ধর্মের ভিত্তিতে জাতিবাদ। ফলে রাষ্ট্রের নাগরিক্দের মধ্যেবৈষম্য সৃষ্টির প্রধান উৎস হবেই এই জাতিবাদ। অন্যভাবে বললে কংগ্রেস হিন্দু জাতিবাদ করাতে যেমন হিন্দু নাগরিকের আধিপত্যের এক ভারততৈরি হয়েছিল ফলে সেই থেকে এখনও পর্যন্ত সারা ভারতে অশান্তি, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা চলছেই। ঠিক তেমনি ভারতীয় কাশ্মীরে এমইউএফ এই জোট মুসলিম জাতিবাদের ভিত্তিতে কাশ্মীর সাজাতে গেছিল। আসলে অনেকের এমন ধারণা করে থাকেন যে যারা সমাজে সংখ্যাগরিষ্ট তারাই সমাজ-রাজনীতিতে আধিপত্য করে বেড়াবেন। বৈষম্যমূলক অধিকার ও অসাম্য চর্চা করবেন। এতে তাঁরা কোনো অসুবিধা দেখেন না। একারণে এটাকে ঐ শাসক ধর্মের লোকের দিক থেকে জায়েজ বা ন্যায্য মনে করে থাকেন। ফলে হিন্দু জাতিবাদ নিজেকে ভারতে সহি-কাজ বলে সাফাই দিয়েছিল এবং এখনও আছে। এটাই এখন মোদির আমলে এসে আরো উগ্র হয়ে হিন্দুত্ববাদ হয়ে হাজির। যারা প্রকশ্যে মুসলমান হত্যার আহবান জানাচ্ছে। অথচ এমন সব ঘটনা পরিস্থিতি না দেখতে চাইলে একটাই সমাধান ছিল যে কারও আধিপত্যের জাতিবাদ ভিত্তিতে রাষ্ট্র না করা। এর বদলে ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিক সাম্যের ভিত্তিতে সমান নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়াই এর সমাধান। তাহলে দাড়ালো, মোদি সারা ভারতে যা করতেছেন তা হল, উগ্র হিন্দুত্ববাদ অথচ কাশ্মীরে মুসলিক জাতিবাদো এটাই করতে গেলে মোদি ও কংগ্রেস এর বিরোধিতা করেন।

আর সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি এটা কখনও কারও রাজনৈতিক অবস্তান ও করণীয় হয় কি করে? এতা হতেই পারে না। অথচ এটা করাতেই ১৯৮৭ সালের পরের বছর থেকে কাশ্মীর নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ফেলে সশস্ত্র রাজনীতিতে চলে যায়। আর তা থেকেই এক পর্যায়ে ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে কাশ্মীরি হিন্দুদের উপর আক্রমণ ও ফলে তাদের কাশ্মীর ত্যাগের ঘটনা, ৮৯ জনের মৃত্যু বা হত্যা ইত্যাদি। য়ার তা থেকে মোদির রাজনীতি হল, কেবল কাশ্মীর পণ্ডিতদের এই হত্যা ও দেশত্যাগের অংশটুকু বেছে তুলে এনে তা দেখিয়ে সারা ভারতে হিন্দুদের মুসলমানের ওপর চরমভাবে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং তাদের ভোট নিজ বাক্সে নেয়া। এটাই হল মোদির সত্য।

কোন দেশে কোন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি মানে মূলত তা ভোটাভুটির ব্যবস্থা, কিন্তু এটাকে কারচুপি বা অন্য কোন উপায়ে অকেজো করে দিলে কেন সশস্ত্র রাজনীতি জেগে উঠবেই এনিয়ে যতগুলো মাস্টার্স বা পিএইচডি থিসিস হয়েছে এর হদিস পাওয়া যায় JSTOR এই অনলাইন ডিজিটাল লাইব্রেরিতে। এখানে কাশ্মীরের ঐ কারচুপির ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তাই কাশ্মীরের রিগিং সারা পশ্চিমের একাদেমিক গবেষণার জগতে এক সর্বোচ্চ আলোচিত ইস্যু।

আরেকটা সবচেয়ে বড় দায়ের দিক আছে। যখন কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দেশত্যাগ ঘটে তখন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় ছিলেন ভিপি সিং এর কোয়ালিশন সরকার। যার বড় পার্টনার ছিল বাজপেয়ির বিজেপি। এরাই উস্কানি দিয়ে সেই দেশত্যাগের আয়োজন করে দিয়ে দিয়েছিল। একাজ করিয়েছিল কাশ্মীরে তাদের নিয়োজিত গভর্ণরের শাসনের গভর্ণরের মাধ্যমে। অর্থাৎ এটা ছিল কংগ্রেস-বিজেপি সব জাতিবাদি রাজনীতির এক কালেকটিভ উদ্যোগ। অথচ মোদি এখন নিজের দলের দায়ও নিতে চাচ্ছেন না!

তাহলে যে বিজেপি ও এর নেতা মোদি উগ্র হিন্দুত্ববাদি রাজনীতি করছেন সমাজে হিন্দু আধিপত্যে সাজাচ্ছেন তিনি কাকে জাস্টিস দিবেন? জাস্টিস কোথায় পাবেন? কারণ মোদি তো বসেই আছেন অন্যায় ও জুলুমের উপরে তিনি কাকে জাস্টিস দিবেন!!! এই হলো দ্য কাশ্মীর ফাইলস এর স্বরূপ!!

যারা এনিয়ে আরো পড়াশুনা করতে চান তাঁরা ১৯৮৭ সালের নির্বাচন ও পরবর্তি ঘটনাবলী নিয়ে পুরান লেখা বা তথ্য সংগ্রহ করে পড়াশুনা করতে পারেন। 

প্রগতিবাদের চোখের সমস্যা

কোন রাজনীতি বা কাজটা প্রগতিবাদী কাজ বলে গণ্য করতে হবে এনিয়ে আমাদের দেশে এক অদ্ভুত বিবেচনাবোধ আছে। যেমন একটা ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি হল, যদি যে নিগৃহিত সে যদি হিন্দু ধর্মের লোক হয় তবে ওদের রাজনীতির পক্ষ নেওয়ার মধ্যেই ‘প্রগতি’ আছে বুঝতে হবে। এই বিচারে মোদির দ্য কাশ্মীর ফাইলস এর পক্ষে নেতা ও থাকা আর মোদির মতোই এতে সত্য দেখতে পাওয়া অবশ্যই এক আদর্শ প্রগতিবাদি কাজ – তাই হয়ে দাড়িয়েছে। বাংলাদেশে অনেকের কাছে দ্য কাশ্মীর ফাইলস তাই আদরণীয় ও প্রগতির সিনেমা। 

আবার ভারতেই আরেক দল আছেন। যারা মনে করেন কাশ্মীরে মুসলিম সশস্ত্রতা থেকেই সব সমস্যার শুরু। অর্থাৎ যেনবা ১৯৪৭ থেকেই কাশ্মীরে মুসলিম সশস্ত্র রাজনীতির চলছে। এরা তাই একটু পালিশ করে বলে কেবল হিন্দুরা নয় অনেক মুসলমানও এতে মারা গিয়েছে। এই হল তাদের সেকুলার ব্যালেন্স। আর শেষে বলেন এসব কিছুর জন্য দায়ী পাকিস্তান। তেমনই এক বক্তব্য পাবেন এক সাবেক কর্ণেলের লেখায় এখানে। 

প্রথমত এরা ফ্যাক্টস জানতেই চায় না মনগড়ার ধারণার উপর দাড়াতে চায়। মোদির মন্ত্রীসভার এক মন্ত্রীর নাম ডঃ জীতেন্দ্র সিং। যিনি মোদির আপন বিভাগ মানে জনপ্রশাসনের পারসোন্যাল সেকশন দেখাশুনা করেন। তিনি এই বছর কাশ্মীরের গ্রেটার কাশ্মীর নামের স্থাণীয় পত্রিকায় বলেছেন সব সমস্যার শুরু ও কাশ্মীর রাজনীতিতে টার্নিং পয়েন্ট হল ১৯৮৭ সালের ভোটে ব্যাপক কারচুপি। কারণ এখান থেকে কাশ্মীর সশস্ত্র রাজনীতিতে চলে গেছে। তবে তিনি সেজন্য সব দায় কাশ্মীরের আবদুল্লাহ গোষ্ঠি আর কংগ্রেসকেই দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ বিজেপি ভাল, সব দায় অন্যদের। 

আর সবকিছুর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করা যেন নির্বাচনি কারচুপির ঘটনার আগে থেকে কাশ্মীরে পাকিস্তানের সশস্ত্র সমর্থন ছিল। এই বয়ানটা ভারতে নিয়ে আসেন বা চালু করেন বিজেপি নেতা বাজপেয়ী। আসলে ভোটে ব্যাপক কারচুপি, তা থেকে পরে কাশ্মীরের রাজনীতি সরকার প্রশাসন এর ভেঙ্গে পড়া, কাশ্মীর তরুনদের সশস্ত্র হয়ে যাওয়া ও কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হত্যা ও কাশ্মীর ত্যাগ এসব কিছুতে দায়ী হয়ে যাওয়ায় বিজেপি ও কাশ্মীরে তাদের অনুগামি স্থানীয় দল সকলেই এক বিশালনৈতিকতার সমস্যার মধ্যে পড়ে যায়। মরালি সকলেই দুর্বল হয়ে যায়। আর এঅবস্থায় নতুন ও মিথ্যা বয়ানতৈরি করে এদের সবাইকে বের করে এনেছিলেন এই বাজপেয়ী। তাই তার ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ বয়ান’। অর্থাৎ সীমান্তের ওপার মানে পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ তাদের সব সমাস্যর উৎস। অর্থাৎ ভারত ও তার মত রাজনীতিবিদেরা সবাই সাধু। আর তখন থেকে হিন্দুত্ববাদি রাজনীতির সকলে পালাবার পথ খুজে পায় আর এই বয়ানের ভক্ত হয়ে যায়।

আবার এক প্রভাবশালী সম্পাদক শেখর গুপ্তা। আগে দীর্ঘদিন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সম্পাদক ছিলেন। এখন নিজে ও বন্ধুদের এক কর্পরেট মিডিয়া ‘দ্য প্রিন্টের’ সম্পাদকম-লীর সভাপতি। যারা ওপেন শেয়ার ছেড়ে বাজার থেকে অর্থ তুলেছেন। সেই শেখর একদিকে মনে করেন সিনেমাটা প্রশংসাযোগ্য কারণ এসেন্সের দিক থেকে এ সিনেমার কথা সঠিক। অর্থাৎ তিনিও ৮৯ জন কাশ্মীরি পণ্ডিতের মৃত্যুকে আলাদা ও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে আগ্রহি আর এতে শোকগ্রস্থ হয়ে একে গণহত্যাই বলতে চান; কিন্তু ১৬৩৫ জনের বাকি মুসলমানদের ব্যাপারে মনে কোন প্রতিক্রিয়া হতে দেন না। এমনই পরিকল্পিত অজান্তে হিন্দুত্ববাদি তিনি। তবে তার আসল সমস্যা তিনি জাতিবাদের কড়া ভক্ত। যেমন তার লেখা কলামের নামই ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট।

এই সব বিচারে দ্য কাশ্মীর ফাইলস আসনে বহু পুরান ক্ষতের নতুন উপস্থাপন। হিন্দুত্ববাদের জয়গান!!! 


লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //