অনলবর্ষী বক্তা কমরেড জসিম মণ্ডল

কমরেড জসিম মণ্ডল।

কমরেড জসিম মণ্ডল।

পরনে সাদা লুঙ্গি, গায়ে গরদের পাঞ্জাবি, পায়ে হাওয়াই চটি- বেশবাসে জসিম উদ্দিন মণ্ডল আর দশজন সাধারণ রাজনীতিক থেকে বেশ আলাদা। কিন্তু আপাত সাধারণ এই ভাবমূর্তির আড়ালে আসল জসিম উদ্দিন মণ্ডল এক কঠিন এবং দৃঢ়প্রত্যয়ী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সাধারণত অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তৃতায় আসল কথা বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় কথাকে কেন্দ্র করেই বাকবিস্তার চলে; কিন্তু অল্প কথায় যে অধিক ভাব প্রকাশ করা সম্ভব, সে বিদ্যাটি যথাযথভাবে আয়ত্ত করেছিলেন কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল। ফলে কোথাও তাঁর বক্তৃতা থাকলে, তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো শ্রোতারা।

মাত্র ১১ বছর বয়সে মানুষের কথা বলতে রাস্তায় নেমেছিলেন তিনি ট্রাক শ্রমিকদের আন্দোলনের সারথি হয়ে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনে, লড়াই-সংগ্রামে আওয়াজ তুলেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন সৈনিক হিসেবে। মুম্বাই, মাদ্রাজসহ  বিভিন্ন বন্দর থেকে যেসব কামান, বারুদের গাড়ি আসত, সেগুলো ট্রেনে করে আসামে পৌঁছে দিতেন। ট্রেনের ইঞ্জিনের বয়লারে কয়লা ভরতেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত যুদ্ধে সব রকমের সাহায্য করেছেন। এরপর করেছেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। ছিলেন কমরেড জ্যোতি বসুর ঘনিষ্ঠ। ১৯৪০-৪১ সালে কলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে জ্যোতি বসু ঈশ্বরদী এসে দু’তিন দিন থেকে একে একে সান্তাহার, পার্বতীপুর, লালমনিরহাট প্রভৃতি এলাকায় রেল শ্রমিকদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। সে সময় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে তাকে এমএলএ প্রার্থী করা হলে জ্যোতি বসুর কাছে মুসলিম লীগের প্রার্থী হুমায়ুন কবির বিপুল ভোটে পরাজিত হন। জ্যোতি বসুর লাল ঝাণ্ডার পক্ষে মুসলিম লীগের কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে সে সময় জসিম ম-লের মাথাও ফেটে যায়।

কোনোদিন ঢাকামুখী রাজনীতি করেননি তিনি। বলতেন- ‘যে কথা আমরা ঢাকায় বলি, সেটি যদি আমতলা, বাঁশতলা, কাঁঠালগাছের নিচে, হাটে, ঘাটে, মাঠে, গ্রামের মানুষের কাছে না নিয়ে যাই, তাহলে কীভাবে হবে? সে জন্য ঢাকায় আসতে চাইনি। আমার কথা হলো, পার্টিকে গ্রামে নিতে হবে।’

তাঁর স্বপ্ন ছিল একটাই- সমাজতন্ত্র। বিশ্বাস করতেন সমাজতন্ত্র হবেই, তবে মনে করতেন তিনি হয়তো তা আর দেখতে পাবেন না। হয়েছেও তাই।  ১৯২০ সালে কুষ্টিয়া জেলা কালীদাশপুর গ্রামে কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হাউস উদ্দীন মণ্ডল, তিনি রেলওয়েতে চাকরি করতেন। মায়ের নাম জহুরা খাতুন। বাবার চাকরির সুবাদে সিরাজগঞ্জ, রানাঘাট, পার্বতীপুর, ঈশ্বরদী, কলকাতা নানা স্থানে তিনি বসবাস করেছেন। বাবার সঙ্গে কলকাতায় নারকেলডাঙা রেল কলোনিতে বসবাসকালে মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে মিছিলে যোগ দিয়ে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। 

১৯৪০ সালের মাঝামাঝিতে শিয়ালদহে জসিম মণ্ডল মাসিক ১৫ টাকা বেতনে রেলের চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৪১-৪২ সালে প্রমোশন পেয়ে তিনি সেকেন্ড ফায়ারম্যান হন। কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল ১৯৪২ সালে জাহানারা খাতুন মরিয়মের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কমরেড মরিয়ম তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ জুগিয়েছেন সারাজীবন। জসিম-জাহানারা দম্পতি পাঁচ কন্যা ও এক পুত্রের জনক-জননী ছিলেন। চাকরির পাশাপাশি ক্রমে লাল ঝাণ্ডার একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৪০ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সদস্য পদ লাভ করেন। 

রেল শ্রমিক আন্দোলনে তিনি জ্যোতি বসুর সহকর্মী ছিলেন। ১৯৪৬ এর নির্বাচনে রেল আসনে জ্যোতি বসুর নির্বাচনী প্রচারনায় সক্রিয় অংশ নেন। এরপর ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর জসিম মণ্ডল পার্বতীপুর এবং তার বাবা ঈশ্বরদীতে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৪৯ সালে রেলের রেশনে চাউলের পরিবর্তে খুদ সরবরাহ করলে রেল শ্রমিক ইউনিয়নের ‘খুদ স্ট্রাইকের’ অপরাধে জসিম উদ্দিন মণ্ডলসহ ছয় নেতার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং রেল কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরিচ্যুত করে। ১৯৫৪ সালে তিনি মুক্তি পান। 

মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর আবার তাকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। এ সময় রাজশাহী জেলে কিছুদিন থাকার পর তাকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বদলি করা হয়। ১৯৫৬ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬২ সালের দিকে আবার গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৪ সালে মুক্তি পান। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতা চলে যান। মহান মুক্তিযুদ্ধে ৫১ বছর বয়সের জসিম মণ্ডল সংগঠক এবং উদ্দীপক হিসেবে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। তবে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের সার্বিক মুক্তির লড়াই-সংগ্রামের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশেও তাকে জেল বরণ করতে হয়েছে। মোট ১৭ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন। ১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১২ সালে সিপিবির উপদেষ্টা মনোনীত হন। আমৃত্যু এ দায়িত্ব তিনি পালন করেন।

কমরেড জসিম মণ্ডল বাংলাদেশ রেল শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহসভাপতি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উপদেষ্টা ছিলেন। অনলবর্ষী বক্তা কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল ২ অক্টোবর, ২০১৭ সালে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

লেখক: ফয়সাল মাহমুদ পল্লব
সাংবাদিক।


মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh