সবখানে হিন্দুত্ববোধ উঁকি মেরে ওঠে

(পূর্ব প্রকাশের পর)

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায়। (2019 general election the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…) ভোটাররা নাকি এমন একজনকে খুঁজছিল, যে তাদেরকে ‘নিরাপদ অনুভব করাবে।’ খুবই বিপজ্জনক সাফাই সন্দেহ নেই। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ, তা বলা স্পষ্ট এড়িয়ে গেছেন। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন, নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী নাকি সত্তর বছর ধরে ‘একটা লিবারেলিজম করতে গিয়েছিলেন (The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades)। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উৎস। এটাকে এক ধরনের লিবারেল চাপাচাপি (liberal push) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, ‘The liberal push in India led to a forced restructuring of      society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ংকর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদির উত্থানের পক্ষে। তিনি দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণি এবং নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষদের নাম করেছেন। (লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি, যদিও মোদিগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো)। আর বলেছেন এদেরকে ‘বিশেষ অধিকার দেয়াতেই’ (granting special rights) নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এমন ভুয়া সাফাই কথা তো আরএসএসও দেয়নি।

দ্বিতীয় পর্ব
তিনি আরও বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকে তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদিকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদিকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি। তাই কী? এ ছাড়া ‘লিবারল পুশ’ করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকে একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ এবং এর লেখকদের ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত ‘কংগ্রেসের লিবারল পুশ’ করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়েছেন। অথবা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েছে। তবে আসল কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদির হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। 

এদিকে মোদির হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলার বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তার ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা, সেক্যুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে (শিরোনাম, বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য, ‘ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতার প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন’। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল ‘বাঙালি হওয়া’ মানে কী। বোঝা যাচ্ছে খুবই সাংঘাতিক ব্যাপার।

কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেওয়া কাজ, অনুমান করি। সেটা মোদির হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জ। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সঙ্গে। সবার আগে প্রশ্ন হলো, এখানে ‘বাঙালি হওয়া’ বলতে কী, আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?

আনন্দবাজার এই বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত ও প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, ‘তার বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন’।

লিখেছে, ‘ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে।’

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো অমর্ত্য সেন বিরাট কোন জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এসব গীত গেয়ে কি মোদির হিন্দুত্ব ও রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলতে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বুঝাবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন তারা আসলে কারা, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ একচেটিয়াভাবে এর সবকিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু হাজারো প্রশ্নের মধ্যে গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন, মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা কি সাতচল্লিশের আগের জমিদারেরা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; বরং তাদের বিচারে মুসলমানরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে। কী, মিছে বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন; এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলা অর্থাৎ ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল (racial) জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে একালেও সিদ্ধান্ত আসে যে - এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। (মুসলমানরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।)

তাহলে আমরা অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে দেখলাম যে- মুসলমানরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকে সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে যে বাঙালির ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয়েছিল তাতে মুসলমানদের এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানরা বাঙালি না, এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা। জমিদারি ক্ষমতার চোখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। 

অথচ, মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যে কোনো রেসের রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। অর্থাৎ মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দু জাতীয়তবাদী বয়ানটাই অমর্ত্য এখানে আউড়িয়েছেন। (সমাপ্ত)

লেখক: গৌতম দাশ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh