শোষণহীন সমাজের স্বপ্নদ্রষ্টা শহীদ আসাদ

যে কোনো জাতির জীবনে বা জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং গৌরবময় অধ্যায় হলো সে জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম। বাংলাদেশের বাঙালি জাতির সবচেয়ে মহান অর্জন তার স্বাধীনতা। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয় এবং আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি, প্রতিষ্ঠা পায় প্রিয় মাতৃভূমি-বাংলাদেশ।

মুক্তিযুদ্ধ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিলো না। এর ছিলো এক সুদীর্ঘ প্রস্তুতিকাল। এর পটভূমি ছিলো দ্বান্দ্বিক, রক্তাক্ত ও সংঘর্ষময়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং চুয়ান্নর নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ষাটের দশকের শুরুতে এক শক্তিশালী ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত হয় এবং পুরো দশকজুড়েই এ আন্দোলন বেগবান হয়ে তীব্র আকার ধারণ করে। এ আন্দোলনের প্রভাব  সেই সময় বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পরিব্যাপ্ত হয়। এটা তখনকার সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করে। পাকিস্তানি শাসন, শোষণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে তৎকালীন ছাত্র আন্দোলন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ষাটের দশকের এই ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্যে একটা গৌরবোজ্জ্বল দৃশ্যপট রচনা করেছিলো ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান। আর আইয়ুব শাহীর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংঘটিত জনতার অভ্যুত্থানকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ও বামপন্থী ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদের শহীদী আত্মদান। 

১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি আসাদ আইয়ুব সরকারের পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন। এ ঘটনা দাবানলের সৃষ্টি করেছিলো, যার পরিণতিতে ঘটেছিলো ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান। এরেই প্রেক্ষিতে ঘটেছিলো- আইয়ুব খানের পতন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ অন্য আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তিলাভ। এই অভ্যুত্থান শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যেও বিপুলভাবে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলো। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতাতেই এসেছিলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তাই আসাদের শাহাদতবরণ ইতিহাসের কালপঞ্জিতে এক বিশেষ ঘটনা। তাই রক্তাক্ষরে লেখা এক বিশেষ দিন ২০ জানুয়ারি।

১৯৬৮ সালের শেষ দিক থেকেই অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি পর্ব চলছিলো। ১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পল্টনে জনসভা শেষে মওলানা ভাসানী গভর্নর ভবন ঘেরাও করেন। বর্তমানে যেটা বঙ্গভবন, তখন সেটাই ছিলো গভর্নর মোনায়েম খানের সরকারি বাসভবন। ঘেরাও শেষে তিনি পরদিন হরতালের ডাক দেন। অভূতপূর্বভাবে হরতাল সফল হয়েছিলো। জনতা-পুলিশ সংঘর্ষ চলেছিলো। তার পরদিন ৮ ডিসেম্বর আবারো হরতাল পালিত হয়। মওলানা ভাসানী এবার হুমকি দিলেন ‘শেখ মুজিবকে মুক্তি না দিলে বাস্তিল দুর্গের মতো ক্যান্টনমেন্ট ভেঙে মুজিবকে মুক্ত করবো।’ একই সঙ্গে তিনি গ্রামাঞ্চলে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হাট-বাজারে হরতালের ডাক দিয়েছিলেন। ২৯ ডিসেম্বর বিভিন্ন জায়গায় হাট-বাজারে হরতাল সফল হয়েছিলো। নড়াইলে এবং নরসিংদীর মনোহরদী থানার হাতিরদিয়া বাজারে পুলিশ গুলি করে মানুষ হত্যা করেছিলো।

ছাত্রনেতা আসাদ একই সঙ্গে কৃষক সংগঠন ও আন্দোলনেরও সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হাতিরদিয়া বাজারে হাটে হরতাল পালন করতে গিয়ে তিনি পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয়েছিলেন। মাথা ফেটে গিয়েছিলো। হাতিরদিয়ায় পুলিশের গুলি এবং কয়েকজনের শহীদ হওয়ার খবরটি দ্রুত ঢাকায় পৌঁছানো দরকার বলে তিনি প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। আসাদ আহতাবস্থায় মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধেই কিছুটা সাইকেলে করে, পরে ট্রেনে করে ঢাকায় পৌঁছান হাতিরদিয়ার গুলির খবর দিতে। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় নিজে গিয়ে খবর দিয়ে এসেছিলেন। তার মাত্র কয়েক দিন পর যখন আসাদ নিজেই ঢাকার রাস্তায় শহীদ হলেন, তখন দৈনিক পাকিস্তান-এ কর্মরত সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ নির্মল সেন লিখেছিলেন- ‘সেদিন আসাদ এসেছিলো খবর দিতে, আজ এলো খবর হয়ে।’

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে দুই ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগ ও এনএসএফের একাংশ নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৪ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা ছিলো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। সেই ১১ দফা সারাদেশে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিলো। এই কর্মসূচীকে ব্যাপক প্রচারে নেওয়ার জন্য ১৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশ এবং ১৮, ১৯ ও ২০ তারিখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করা হয়েছিলো। ১৮ তারিখ পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছিলো। ১৯ তারিখ গুলি করেছিলো পুলিশ। সেদিন আসাদুল হক নামে একজন (তিনি শহীদ আসাদ নন) গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ২০ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যে মিছিলটি বের হয়েছিলো, তার প্রথম সারিতে ছিলেন আসাদুজ্জামান আসাদ। চানখাঁরপুল মোড় থেকে পুলিশের জিপ থেকে মিছিলকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি ছোড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আসাদের রক্তমাখা প্রাণহীন দেহ রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। কবি শামসুর রাহমান আসাদের রক্তমাখা শার্টকে মুক্তির প্রতীক ঘোষণা করে লিখলেন- ‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা/সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;/আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’

আসাদের মৃত্যুতে সারাদেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। আসাদ সাধারণ পথচারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সচেতন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) অন্যতম নেতা ছিলেন। একই সঙ্গে কৃষক আন্দোলনের সংগঠক (প্রধানত শিবপুর এলাকায়) এবং গোপন কমিউনিস্ট পার্টির একাংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

স্বদেশ মুক্তির লড়াইয়ে আসাদ এক সাহসী পথপ্রদর্শক। অন্যদিকে আসাদ আন্দোলন ও সংগ্রামের প্রেরণার উৎস। আসাদ শহীদ না হলে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান হতো না। আসাদের আত্মদানেই তখন স্বৈরশাসক আইয়ুবের ক্ষমতার মসনদ উল্টে যায়। বর্তমান প্রজন্মকে স্বদেশ মুক্তির আন্দোলন-সংগ্রামের কথা জানতে হলে আসাদ চর্চা করতে হবে। শহীদ আসাদ স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববঙ্গের স্বপ্ন দেখতেন। সমাজতন্ত্রের কথা আসাদ ভাবতেন এবং আসাদের যে স্বপ্ন জনগণের সে স্বপ্ন বুকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো, তার সবকিছুর মধ্যেই গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক পূর্ববঙ্গের স্বপ্ন ছিলো।

এত বছর পর যখন আসাদকে আমরা স্মরণ করছি তখন একটি প্রশ্ন আসাদের সামনে এসে যায়। আসাদের স্বপ্ন কি সফল হয়েছে! আমরা জানি, আসাদের স্বপ্ন সফল হয়নি। আসাদের আত্মত্যাগ ছিলো শোষণ-মুক্তির প্রেরণা। আর যতোদিন শোষণ থাকবে, বঞ্চনা থাকবে, নিপীড়ন থাকবে, ততোদিন মৃত্যুঞ্জয়ী আসাদ থাকবে মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে এক সাহসী পথপ্রদর্শক হয়ে। 

আসাদ বিশ্বাস করতেন, পূর্ব বাংলার জনগণের মুক্তির জন্য প্রয়োজন পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা। তিনি সে লক্ষ্যেই আজীবন সংগ্রামে শামিল ছিলেন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh