উপনিবেশবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ আর বাংলাদেশের ব্যদুর্নিবেশবাদ!

উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাকে বোঝার জন্য ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত হয়েছে কলোনিয়ালিজম, যা বাংলা ভাষায় উপনিবেশবাদ হিসেবে অনূদিত হয়েছে। উপনিবেশবাদ বলতে মোটা দাগে এক অঞ্চলের জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অন্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে অধীনস্ত বা নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে আধিপত্য চর্চার শাসন প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়। এই আধিপত্যের চর্চার মাধ্যমে উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী অধিকৃত উপনিবেশের সম্পদ, অর্থ নিজ অঞ্চলে পাচার এবং উপনিবেশের অধিবাসীকে হত্যা করে বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত করে নিজেরাই বসতি স্থাপন করে। এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগালের মতো উপনিবেশিক শক্তিগুলো তাই করেছিল।

আগে উপনিবেশিক ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে বিদেশিরা সম্পদ বা অর্থ পাচার করত তাদের নিজ দেশে। আর এই কালে দেশীয় ক্ষমতাসীন ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গ এবং আমলাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে একই কাজ করে আসছে। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পদ পাচার করছে সাবেক উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোতে।


তবে ভারতবর্ষে একটা ক্ষেত্রে উপনিবেশিক ব্রিটিশের শাসন-শোষণ ব্যতিক্রম ছিল। তারা এই অঞ্চলে কোনো স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেনি। তবে সম্পদ পাচার করেছে, উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইরত মুক্তিকামীদের হত্যা করাসহ সব অন্যায়-অবিচার করেছে প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ায়! সেজন্য ভাইসরয় ও লর্ডমন্ডিত ব্যক্তিনির্ভর রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় জবাবদিহিবিহীন প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের একদম উপরের তলায় ছিল ৩০ হাজার শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ আমলা। একই রকম অবস্থা বিরাজ করত পুলিশ, সামরিক বাহিনী আর বিচারালয়েও। এ ধারাবাহিকতায় আইনি ব্যবস্থার বিকাশ ঘটানো হয়েছিল ভাইসরয় ও লর্ড এবং তাদের এই সব সাঙ্গ-পাঙ্গদের রক্ষা এবং তাদের সর্বোচ্চ সামাজিক, অর্থনৈতিক সুবিধাদি নিশ্চিত করার জন্য। ভারতবর্ষের অধিবাসী তো আর তাদের নিজেদের নাগরিক নয়! তাই আমলাতন্ত্র, পুলিশ বাহিনী, সামরিক বাহিনী, বিচারালয়ের নিচের পদগুলোতে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাপনায় কাজ করত এই অঞ্চলের অধিবাসীদের একটা অংশ। 

১৯৪৭ সালের পরে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে তৈরি হলো উপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক বৈষম্যমূলক কাঠামো, যার ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আর ভারত নামের দুটি রাষ্ট্র গঠিত হলো। উপনিবেশোত্তরকালে পূর্ব পাকিস্তান হয়ে উঠল পশ্চিম পাকিস্তানের আইনগত এবং ধর্মপরিচয়ে বৈধ উপনিবেশ, অন্তত বৈষম্যনির্ভর আইনি-ব্যবস্থা এবং আমলাতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর বিবেচনায়! এতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ পাচার শুরু হলো ব্রিটিশের মতো করে। নতুন শাসকদের অনাচার, নিপীড়নের ধারাবাহিকতায়ও কোনো ছেদ পড়লো না! সবকিছুই আগের মতোই রইল। শুধু পরিবর্তন হলো শাসকগোষ্ঠীর ধর্ম-পরিচয়, গায়ের বর্ণ এবং ভাষার ক্ষেত্রে ইংরেজির জায়গায় উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বদৌলতে আগের উপনিবেশ আমল বিবেচনা করে। তবে মুসলমানদের পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তান জনমানুষের রাষ্ট্র হয়ে উঠল না আর! 

যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ সদ্য স্বাধীন হওয়া উপনিবেশগুলোর বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা, উপনিবেশিক শক্তিগুলোর সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ, বৈষম্যমূলক বিশ্বায়ন বিশ্লেষণ করে এই বিশ্বব্যবস্থাকে নয়া-উপনিবেশবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জঁ পল সার্ত্রে সম্ভবত প্রথম এই শব্দটির প্রচলন করেন ১৯৫৬ সালে তার প্রকাশিত একটা লেখায়। এরপর আফ্রিকার নেতা কোয়ামে নকরুমা এটা ব্যবহার করেন। এটা দাবি করলে খুব অত্যুক্তি হবে না যে, এই সময়কালে বৈষম্যমূলক বিশ্বব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করার জন্য নয়া-উপনিবেশবাদের ধারণাকে বেশি জনপ্রিয় করেছেন নোয়াম চমস্কি। 

বৈষম্য, বঞ্চনা থেকে মুক্তি নিশ্চিত করার প্রতিজ্ঞায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান নামের উপনিবেশ বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে গিয়ে বাংলাদেশ নামে আবির্ভূত হলো। এখন নয়া-উপনিবেশবাদী বিশ্বব্যবস্থার আলোচনায় না গিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থার আলোকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আমরা আসলে কি জনমানুষের মালিকানাধীন স্বাধীন রাষ্ট্র বর্তমানে গঠন করতে পেরেছি? আমরা কি ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে এসে, নতুন ধরনের শাসন ব্যবস্থার বিকাশ ঘটাতে পেরেছি জনমানুষের কল্যাণে? 

আসলে কাঠামোগত বা শাসনগত অন্য কোনো মৌলিক পার্থক্য না দেখা গেলেও, এখন একটা পার্থক্য খুব স্পষ্ট আমাদের সবার কাছে। বিদেশি শাসকদের পরিবর্তে দেশীয় নাগরিককেই আমরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখছি। 

তাই আগে উপনিবেশিক ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে বিদেশিরা সম্পদ বা অর্থ পাচার করত তাদের নিজ দেশে। আর এই কালে দেশীয় ক্ষমতাসীন ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গ এবং আমলাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে একই কাজ করে আসছে। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পদ পাচার করছে সাবেক উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোতে। মোটা দাগে তাদের ছেলে-মেয়ে, পরিবার সেই পাচার করা সম্পদে ভর করে বসবাস করছে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা অন্য কোনো পশ্চিমা দেশে। তারা তাদের নিজেদের শাসিত রাষ্ট্রকে বসবাস-উপযোগী ‘দেশ’ মনে করে না। আগে অন্যায়-অনাচার করে পার পেতো বিদেশিরা এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা আর এখন ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা পাড় পেয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী এগুলো জায়েজ করত তাদের রানীর নামে আর এখন আমরা করি নিজেদের অবিসংবাদিত নেতাদের নামকে বাজারজাত করার মাধ্যমে! নেতাদের নামকে যত নগ্নভাবে বাজারজাত করা যায়, দুর্নীতি তত নির্বিঘ্নে করা যায় এবং এতে নিজেদের সুরক্ষাও ততটাই নিশ্চিত হয়! উপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজা বা রানীর মতো এই নেতা-নেত্রীরা অলঙ্ঘনীয় এবং তারা সব প্রশ্ন এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে ওঠা এক অবতার। 

তাই জবাবদিহিবিহীন একক নেতৃত্ব নির্ভর প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এখন আরও বেশি জনবিচ্ছিন্ন এবং শক্তিশালী। দলীয় পরিচয়ের কারণে এই শাসন ও শোষণ ব্যবস্থাকে বিভিন্ন নামে সমর্থন বা বৈধতা দিতে সদা তৎপর থাকে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা পাওয়া একদল পেশাজীবী আর বুদ্ধিজীবী এবং তাদের তৃণমূল পর্যায়ের অন্ধ সমর্থকগোষ্ঠী। এতে ধারাবাহিকভাবে বিরাজমান উপনিবেশিক আইনি-কাঠামোভিত্তিক এই শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন নেতাদের যেমন রক্ষা করে আমলা, সেনা বা পুলিশসহ বিভিন্ন রকম বাহিনী, ঠিক তেমনি এই আইনিকাঠামো আমলা, সেনা বা পুলিশসহ বিভিন্ন রকম বাহিনীর জন্য একইভাবে রক্ষাকবচ! 

২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এই রকমই এক আইনি কাঠামোর সর্বশেষ সংযোজন! শাসকগোষ্ঠী ও তাদের আমলাতন্ত্র নিয়ে যতো বেশি সমালোচনা হবে, বিতর্ক হবে, জনমানুষ ততই অনিরাপদ হবে। হয় গ্রেফতার, নয় গুম, হত্যা, ক্রসফায়ার, জেল-জুলুম। 

সরকারি দলের কেউ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজস্ব পেশিনির্ভর, অগণতান্ত্রিক এবং অসুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে ওপরের মহলের রোষানলে না পড়বে, ততক্ষণ পর্যন্ত সবকিছুতেই তার জন্য মুশকিল আসান- সেই খুন হোক বা অন্যের সম্পদ হরণ বা অন্যায় যে কোনো কিছু। জুলুমবাজ, অপরাধীদের জন্য সরকারি দল যেন আলাদিনের চেরাগ সব আমলে!

তাহলে সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দেশের বিরাজমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় বর্তমান বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাকে কোন ধারণা দিয়ে এলে ব্যাখ্যা করা যাবে- উপনিবেশবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ নাকি অন্য কিছু? 

ওপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট- প্রথম ধারণাটি প্রাসঙ্গিক নয়। কেননা উপনিবেশের অন্য বৈশিষ্ট্যগুলো বিরাজ করলেও, রাষ্ট্র ও সরকার এখন দৃশ্যত স্বাধীন। দ্বিতীয় ধারণাটিও প্রযোজ্য নয়। কেননা আমরা আমাদের শাসন ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক, অর্থনীতির প্রেক্ষাপটেও দেখছি না। তাহলে কী হতে পারে? 

আসলে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায়, আমাদের শাসন ব্যবস্থা বোঝার জন্য নতুন ধারণার প্রচলন জরুরি। সেই ধারণাকে আমি নাম দিতে চাই- ব্যদুর্নিবেশ। এই ধারণাটিকে এভাবে প্রকাশ করা যায় যে, এটা হলো উপনিবেশোত্তরকালে ব্যক্তিস্বার্থে সব ধরনের দুর্নীতি আর অনাচারের জবাবদিহিবিহীন উপনিবেশিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক অর্থনীতির চর্চা। অন্য কথায় ব্যাখ্যা করলে, এটা একটা জনমানুষবিমুখ, জবাবদিহিবিহীন, ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক একক নেতৃত্বনির্ভর দুর্নীতিগ্রস্ত শাসন ব্যবস্থার রাজনৈতিক অর্থনীতির অনুশীলন। এই ব্যবস্থায় নিজ দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার চাইতে শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের প্রভাবশালী সমর্থকগোষ্ঠীর ব্যক্তি-স্বার্থে সম্পদ হরণ, পাচার এবং সবরকমের অন্যায়-অবিচার করাটাকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। উপনিবেশিক রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী অন্যায় আর অপকাজগুলো করত মোটাদাগে তাদের নিজেদের মাতৃভূমির স্বার্থের হিসাব-নিকাশে আর একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী এগুলো করে এখন একেবারে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের হিসাব-নিকাশ থেকে। সে জন্যই ব্যদুর্নিবেশের গাণিতিক সমীকরণ কথায় প্রকাশ করলে এ রকম দাঁড়ায় : 

ব্যদুর্নিবেশবাদ = ব্যক্তিস্বার্থ + ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ + একক ব্যক্তির নেতৃত্ব এবং আধিপত্যে বিকশিত দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে উপনিবেশিক রাজনৈতিক অর্থনীতির চর্চা। আর ব্যদুর্নিবেশের প্রভাব রাষ্ট্রের অন্তর্গত সব ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠানেই পড়ে- আদালত বা বিচারালয়, মন্ত্রণালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- তা যাই হোক না কেন।


লেখক
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh