আজও প্রাসঙ্গিক ভাসানীর লাইনপ্রথা বিরোধী আন্দোলন

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

উপমহাদেশের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা বিরোধী শীর্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন যতটা দীর্ঘ, ততটাই সংগ্রামবহুল। তিনি প্রায় ৬৫ বছর সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে দেশে আপামর গণমানুষের স্বার্থ রক্ষায় অবদান রেখেছেন। 

ঔপনিবেশিক আমলে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। সেসব সংগঠনের মধ্যে ছিল- বিপ্লবী অনুশীলন দল, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, স্বরাজ্য দল ও মুসলিম লীগ। তিনি বরাবর অসাম্প্রদায়িক সংগঠনেই থাকতে চেয়েছেন; কিন্তু এক সময় বাধ্য হয়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৪০-এর দশকে তিনি আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। ওই সময়ে আসাম বিধানসভারও সদস্য ছিলেন তিনি। 

তবে মুসলিম লীগের অধিকাংশ নীতি আদর্শের সাথে তার বিরোধ ছিল। সামন্তবাদী ও রক্ষণশীল নেতাদের সাথে তার বনিবনা হতো না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে গঠন করেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পরে আওয়ামী লীগ। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের যে ভরাডুবি হয়েছিল, সেই যুক্তফ্রন্টে মওলানা ভাসানী ছিলেন অন্যতম শীর্ষ নেতা। তার দল আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছিল। 

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রশ্নে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে মতপার্থক্য হলে তিনি স্বেচ্ছায় দল থেকে বেরিয়ে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। আমৃত্যু তিনি ন্যাপের সভাপতি ছিলেন।

তার বর্ণাঢ্য সংগ্রামী জীবনে তিনি জমিদার, জোতদার, মহাজনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, আসাম লাইনপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই, অবিভক্ত ভারতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম, পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগ বা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মতো রাজনৈতিক দল গঠন। কৃষক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠন গড়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনে। লড়াই জারি রেখেছেন সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, উপনিবেশিকতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করেছেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছেন। করেছেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে এনআরসি সংকট যখন নতুন রূপ পেয়েছে, তখন আসামে মওলানা ভাসানীর লাইনপ্রথা বিরোধী আন্দোলন আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। 

১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জের কাওখোলা মাঠে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের পর মওলানা ভাসানীর নাম বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এত বিশাল কৃষক সম্মেলন শুধু বাংলায় নয়, গোটা উপমহাদেশেই তার আগে কখনো হয়নি। বাংলার মহাজনি ঋণে জর্জরিত কৃষকরা যে সংগঠিত হতে পারে, ওই সম্মেলনে তিনি তা প্রমাণ করেছিলেন। ‘খাজনা বন্ধ’ আন্দোলনে তিনি সফলতা অর্জন করলে বাংলার জোতদার, জমিদারদের উৎপাতে তাকে বাংলা ছেড়ে আসামে পাড়ি জমাতে হয়। ৪০-এর দশকে আসামের লাইনপ্রথা বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন মওলানা ভাসানী। 

১৯ শতকের প্রথম দশক থেকে অবিভক্ত ভারতে বাংলার ময়মনসিংহ, রংপুর, কোচবিহার, ত্রিপুরা ও সিলেট থেকে লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন কৃষক আসামের জঙ্গলে বসবাস করতে আরম্ভ করেন। তারা প্রধানত আসামের গোয়ালপাড়া ও নওগাঁ জেলা, দরং জেলার মঙ্গলদই সাব-ডিভিশন ও কামরূপ জেলার বরপেটা সাব-ডিভিশনে জঙ্গল আবাদ করে ফসল ফলায়। এর আগে কালাজ্বর রোগে আসামের বহু লোক মারা যাচ্ছিল। এই বহিরাগত কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনির ফলে আসামের হিংস্রর শ্বাপদের বিচরণ ক্ষেত্র মানুষ্যবাসের উপযোগী হয়। ফলে প্রথম প্রথম আসাম সরকার নবাগতদের সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। ক্রমেই আগতদের সংখ্যা বেড়ে গেলে অসমীয়রা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। তারা আসাম সরকারকে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। অনেক জায়গায় বহিরাগতদের সাথে জমি নিয়ে তাদের বিরোধ বাধে। এই সংঘর্ষ নিবারণ করার উদ্দেশ্যে আসাম সরকার ‘লাইনপ্রথা’ প্রবর্তন করে। এই প্রথামতে, নবাগতদের অধিকারযোগ্য ভূমির সীমারেখা লাইন টেনে দেয়া হয়। ফলে বিভিন্ন জেলার নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে নবাগতরা যেতে পারত না। এই কুখ্যাত লাইনপ্রথার বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। শুরুতে তিনি বহিরাগতদের সমস্যা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনায় বসার চেষ্টা করেন; কিন্তু তাতে কোনো সুফল পাওয়া না গেলে, শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নেন সংগ্রাম করার। 

তার মতে, ‘সংগ্রামই জালেমের জুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র পথ।’ তিনি সরকারের দমননীতির প্রতিবাদ করার জন্য বহিরাগত বাঙালি কৃষককে সংঘবদ্ধ করতে থাকেন। তিনি ‘আসাম চাষি-মজুর সমিতি’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন- সভাপতি ছিলেন ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নূরুল হক। এই সমিতি ১৯৩০ এর শেষ দিকে বছর তিনেক লাইনপ্রথার বিরুদ্ধে নানা জায়গায় সভা-সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানায়।

পূর্ববঙ্গের মানুষ অন্য কোনো স্থানে না গিয়ে আসামে যাওয়ার কারণ শুধু অর্থনৈতিক ছিল না। ছিল জাতিগত ও সাংস্কৃতিকও। আসামের দক্ষিণ অংশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শত শত বছর ধরে ছিল বাঙালিদের আবাস। সেখানে অসমীয়া আদীবাসীদের তুলনায় বাঙালিই সবসময় বেশি ছিল। ১৯০১ সালের আদমশুমারির হিসাবে আসামের মোট জনসংখ্যা ছিল ৬১ লাখ ২৬ হাজার ৩০০। এর মধ্যে বাঙালি ছিল ২৯ লাখ ৪৮ হাজার ২০০, অসমীয় ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ এবং অন্যান্য ভাষাভাষী ১৮ লাখ ২৮ হাজার ৩০০ জন। 

৩০-এর দশকে আসামে অনেক ছোট ছোট আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, তবে জাতীয় কংগ্রেসই ছিল সেখানে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী। এদিকে আব্দুল মতিন চৌধুরী সেখানে মুসলিম লীগ সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন; কিন্তু তিনি বেশিদূর এগোতে পারেননি। ভাসানী কৃষকদের মধ্যেই তখনো কাজ করছিলেন। তিনি এক সময় মতিন সাহেবের সাথে মুসলিম লীগ সংগঠনের কাজে নেমে পড়েন এবং রাজনৈতিক দল গঠন করেন। 

১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে অনেক দল আসাম প্রদেশে অংশগ্রহণ করে। মওলানা ভাসানী দক্ষিণ ধুবড়ী থেকে মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। নবনির্বাচিত আইন সভার প্রথম অধিবেশন মাত্র তিনদিন চলেছিল। কাজেই সে অধিবেশনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপিত হতে পারেনি। দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছিল ১৯৩৭ সালের ৩ আগস্ট। এ অধিবেশনে লাইনপ্রথাই প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। ১৯৩৭-৩৮ সালের মধ্যে আসামের লাইনপ্রথা নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। এ আন্দোলন চলেছিল দীর্ঘ ১০ বছর, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। 

১৯৪০ সালের ২ এপ্রিল প্রাদেশিক মুসলিম লীগের এক সভা করিমগঞ্জ টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়। আসামের বাঙালি কৃষক নেতারা তাতে যোগ দেন। সভাপতির ভাষণে ভাসানী যথারীতি লাইনপ্রথা বিলোপের জোর দাবি জানান। অভিবাসীদের ওপর অত্যাচার বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি দেয়া হবে। আসামের শিলংয়ে তীব্র শীতের মধ্যেও ভাসানী লুঙ্গি পরে জনসভায় যেতেন। লাইনপ্রথার প্রতি গোটা ভারতের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতেন তিনি। ১৯৪০ সালের ২১ ডিসেম্বর এক সমাবেশে মওলানা বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জন না করা পর্যন্ত উপমহাদেশের মানুষের কোনো সমস্যারই সমাধান হবে না।’ 

১৯৪২ সালে এক জনসমুদ্রে দেয়া ভাষণে তিনি সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ৩১ মার্চের মধ্যে লাইনপ্রথা বিলোপ না করলে তিনি এপ্রিল থেকে ‘আইন অমান্য’ আন্দোলন শুরু করবেন। সেই সম্মেলনে ভাসানীর উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণে সরকারের ভীতির সঞ্চার হয় এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি সরকার তাকে এই মর্মে চিঠি দেয় যে, পরবর্তী এক বছর ভাসানী আর কোনো সমাবেশ করতে পারবেন না। ওই সম্মেলনের চার দিন আগে গোয়ালপাড়া জেলার বাঁশকাটায় অপর এক জনসভায় সভাপতিত্ব করার সময়ে ভাসানী জনগণকে সরকারের যুদ্ধ সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনোরকম সহযোগিতা না করার আহ্বান জানান। ৪০-এর দশকের প্রথম দিকে ‘আগস্ট আন্দোলনে’র আগে আসামে ভাসানী একাই ব্রিটিশ শাসকদের অস্থির করে রেখেছিলেন। ভাসানীর আন্দোলনের ফলে সাদ উল্লাহর মন্ত্রিসভা সংকটে পড়ে এবং বাধ্য হয়ে তখন অন্তত এক লাখ বহিরাগত কৃষককে জমি বরাদ্দের কথা ঘোষণা করে। 

মওলানা ভাসানী গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে, ‘১৯৩৭ সাল থেকে আসামে লাইনপ্রথা বিরোধী আন্দোলনে গভীরভাবে জড়িয়ে না পড়লে এবং সেখানকার সর্বহারা কৃষকদের নেতৃত্ব না দিলে ভাসানী হয়তো তখন আরো বৃহত্তম পটভূমিতে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিতে পারতেন।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh