মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা

(২য় পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধের সময়েও বাংলাদেশে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বামপন্থীদের ক্ষমতা দখলের আন্দোলন চলমান ছিল। এ রকম দুটি প্রধান ধারার মধ্যে একটি ছিল মনি সিংহ ও খোকা রায়ের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি’ (সিপিবি) ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন– ন্যাপ। এ দুটি পার্টি রুশপন্থী ছিল। পার্টি দুটি আওয়ামী লীগের লাইনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। 

আর অন্য ধারাটি ছিল আব্দুল হকের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)’ বা ইপিসিপি (এম-এল)। সেই সময় এই পার্টি ভেঙে টিপু বিশ্বাস, শরদিন্দু দস্তিদার, শাহ আলম মানিক, ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন ও আলাউদ্দিন প্রমুখদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)’। এ পার্টি একাত্তর সালে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে টিপু বিশ্বাস নিজেই বাহিনীর নেতা হিসেবে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। 

পার্টির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে মূল নেতৃত্ব, অর্থাৎ আব্দুল হক-মোহাম্মাদ তোয়াহার সাথে মতবিরোধ তীব্র হলে তারা পার্টি ভেঙে বেরিয়ে আসেন এবং নিজেরাই নতুন পার্টি গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীতে তারা ‘বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ’ নামে সংগঠিত হন। 

এই পার্টির অপর একটি ধারা আব্দুল হকের ‘দুই কুকুরের তত্ত্ব’ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ভূমিকা পালন করেন। তারা মনে করতেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ আসলে ভারতের অধীনতা কায়েমের দুরভিসন্ধি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পাকিস্তানিদের পক্ষেও লড়েছেন। আব্দুল হকের নেতৃত্বাধীন অংশ বাদে উপরোক্ত সব গ্রুপই সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এর বাইরে আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া ও হায়দার আনোয়ার খান জুনোর নেতৃত্বে নরসিংদী অঞ্চলে ও যশোর অঞ্চলে নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে বামপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত লড়াই পরিচালনা করেছেন।

ভারতে চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন নকশাল আন্দোলনের গতিমুখ দেখে, সেই আন্দোলনের দ্রুত প্রসারে অনুপ্রাণিত হয়ে এদেশে নকশাল আন্দোলন জনপ্রিয় হতে থাকে। দলে দলে বিভিন্ন পার্টি এবং ধারা চারু মজুমদারপন্থী হয়ে ওঠে। এর ফলে এই ধারাসমূহ একাধারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছে। তাদের এই কর্মকাণ্ডের ফলেই ব্যাপকভাবে এটিই প্রচারে আসে যে ‘নকশালরা পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে আঁতাত করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়েছে!’ এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা হয় যে, ‘এরা পাকিস্তানের দালাল, এরা মুক্তিযুদ্ধের শত্রু, এরা দেশের শত্রু!’ এই মত প্রচার হয়ে যাওয়ার পরেই কার্যতই বামপন্থীরা গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। 

টিপু বিশ্বাস, শরদিন্দু দস্তিদার, অহিদুর রহমান এরা পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে, নুর মোহাম্মদ যশোর-মাগুরা অঞ্চলে, বিমল বিশ্বাস নড়াইলে, জীবন মুখার্জী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ খুলনা অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তেজোদীপ্ত লড়াই করেছেন। নাম না জানা অজস্র মুক্তিযোদ্ধা এই সব পার্টির ব্যানারে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, দেশের মাটিতে থেকে এই বামপন্থী দলগুলোর ব্যানারে লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশ নিলেও এই ইতিহাস আজ উপেক্ষিত। 

কোনো আর্কাইভেও তাদের আত্মত্যাগের বিবরণ নেই। ধারণা করা হয়, প্রায় আড়াই হাজার বামপন্থী কর্মী সে সময় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। দুঃখজনকভাবে সরকারি কোনো আর্কাইভে তথ্য যেমন নেই, তেমনি এই পার্টিগুলোর নিজস্ব সংগ্রহেও কোনো তথ্য নেই। আর তাই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তকমা তাদের গায়ে লাগলেও তারা তথ্য-উপাত্ত হাজির করে এর জবাব দিতে পারেন না। 

তাই এত বছর পরও প্রমাণ হাজির করে বলা যায় না– ‘বামপন্থীরাও একইভাবে যুদ্ধ করেছে। মরেছে। মেরেছে। দেশ স্বাধীন করবার জন্য তাদের অবদান কারও চেয়ে কম নয়।’ তাতে করে কী তাদের অবদানকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া যায়?

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh