ট্রিপল নাইনও কি নিরাপদ নয়?

জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে অপরাধ বিষয়ে তথ্য জানিয়ে উল্টো বিপদে পড়েছেন আসাদুল হক নামে এক যুবক। ঘটনাস্থল কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা। 

গণমাধ্যমের খবর মতে, পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছিলেন তিনি। সাহায্যের বদলে পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) সন্ত্রাসীদের কাছে তথ্য জানিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে ক্ষিপ্ত হয়ে সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাহায্য চাওয়া যুবককে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন। এ ব্যাপারে ওই এসআইসহ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী যুবক।

একইদিনে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ফেসবুকে আরেকজন আইনজীবীর ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।’ তার অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের জনৈক আইনজীবীকে র‌্যাব তুলে নিয়ে নির্যাতন করে বুড়িগঙ্গা সেতুর ওপর সারারাত ঝুলিয়ে রাখে, এবং এর পরে মামলা দিয়ে কোর্টে চালান করে। 

জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার এই স্ট্যাটাসের নিচে নানারকম মন্তব্য দেখা গেছে। একজন লিখেছেন, ‘ভদ্রলোক যে প্রাণে বেঁচে আছেন আর তাকে যে ইয়াবা বা অস্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়নি- তার জন্যে শুকরিয়া।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘আইনের শাসনের নমুনা দেখে বারবার শিহরিত হই।’ একজনের মন্তব্য এ রকম- ‘দলবাজি রাজনীতি থেকে আইনজীবীরা বেরোতে না পারলে, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আর থাকবে না।’ রসিকতা করে আরেকজন লিখেছেন, ‘আইনজীবী আবার কার কার্টুন আঁকলো?’ 

সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের এই যে প্রতিক্রিয়া, তা মূলত ক্ষোভ থেকে। সেই ক্ষোভ কার বিরুদ্ধে? কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের বিরুদ্ধে নাকি পদ্ধতির বিরুদ্ধে?

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে এ জাতীয় সংবাদ নতুন নয়। জনগণের করের পয়সায় পরিচালিত এসব বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধ বেড়েছে নাকি গণমাধ্যমের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় খবরের সংখ্যা বেড়েছে- তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু যখনই এরকম ঘটনা ঘটে, তখনই সংশ্লিষ্টদের তরফে এগুলোকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ আখ্যা দিয়ে যে আত্মপক্ষ সমর্থন করা হয়, তাতে অনেক সময় এ রকম প্রশ্নও ওঠে যে, তাহলে কি অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে? 

সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনার পরে এ রকম প্রশ্নও সামনে এসেছে যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল কাজ কী? জনগণের নিরাপত্তা দেওয়া নাকি রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষমতাবানদের নিজস্ব বাহিনী হিসেবে কাজ করা? বিশেষায়িত কোনো বাহিনী কি কারো ঘরে ঢুকে নাগরিককে গ্রেপ্তার করতে পারে? সাদা পোশাকে কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে না, আপিল বিভাগ ২০১৫ সালে এই নির্দেশনা দেওয়ার পরও কেন এটি বন্ধ হচ্ছে না? 

এসব প্রশ্নের সুরাহা করা যেমন জরুরি, তেমনি এ প্রশ্নও আছে যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সদস্যই কি খারাপ? নিশ্চয়ই নয়; কিন্তু এই ভালো-মন্দের অনুপাতটি কত? 

২০১৯ সালের ২৪ মে রাতে টাঙ্গাইলের গোপালপুরে পুলিশের নির্যাতনে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনায় ৮ পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করা হয়। এর পরদিনই রংপুরে পুলিশ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কৃষকের ধান কেটে দিয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়। এর অব্যবহিত আগে রাজধানীর এক পুলিশ কর্মকর্তার মানবিকতার খবর গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচিত হয়, যিনি একটি সুপারশপ থেকে সন্তানের দুধ চুরি করে পালানোর সময় জনতার হাত থেকে এক বেকার বাবাকে বাঁচিয়ে ছিলেন এবং যার উদ্যোগে ওই সুপারশপেই তার চাকরির ব্যবস্থা হয়।

আবার এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসির কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় দেশব্যাপী। পরবর্তীতে ওসি মোয়াজ্জেমের শাস্তিও হয়েছে। 

স্মরণ করা যেতে পারে, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশের আগুন দেয়ার ভিডিও যখন টেলিভিশনে প্রচার হয়, ওই একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত একটি শিশুকে কোলে করে হাসপাতালে দৌড়ে নিয়ে যাওয়া একজন পুলিশ কনস্টেবলের হৃদয়স্পর্শী ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। 

তবে এটা ঠিক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে ভালো সংবাদের চেয়ে খারাপ সংবাদের পরিমাণ বেশি। ভালো কাজ বা ইতিবাচক ঘটনা বেশি ঘটলেও তার খবর কম প্রকাশিত হয় কি না- সে প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, ভালো কাজ করার জন্যই তাদের বেতন দেয়া হয়। সুতরাং সেই কাজটি যখন তারা করেন না বা করতে ব্যর্থ হন, সেই খবরগুলোই বেশি প্রকাশিত হয়। 

অস্বীকার করার উপায় নেই, রাষ্ট্রে আইনের শাসন নিশ্চিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রথম কাজটি পুলিশের। কারণ ঘটনাস্থল থেকে অপরাধের আলামত সংগ্রহ ও ঘটনার সঠিক ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত হলেই কেবল ন্যায়বিচার সম্ভব। অন্যথায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাবেন এবং অনেক সময় নিরপরাধ লোক ভিকটিম হবেন।

নামের মিল থাকায় ভুল লোককে গ্রেফতার করে তাকে কোর্টে চালান দেয়া ও বছরের পর বছর জেল খাটার ঘটনাও দেশে একাধিক ঘটেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে হয়তো কিছু ভুক্তভোগী জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন; কিন্তু মাঝখান দিয়ে তাদের জীবন থেকে যে মূল্যবান সময় এবং তাদের পরিবারের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গিয়েছে- তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেসব সদস্যের গাফিলতি, অযোগ্যতা বা দুর্নীতির কারণে নিরপরাধ মানুষেরা জেল খাটলেন, নির্যাতিত হলেন, সেসব সদস্যের কি বিচার হয়েছে? 

যখনই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তাকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। খুব ব্যতিক্রম ছাড়া অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে বহাল তবিয়তে চাকরি করেন। ফলে অপরাধের পর পুলিশকে ক্লোজ করা হয়েছে বলে যে সংবাদ আসে, তাতে সাধারণ মানুষ আস্থা পায় না। কেননা রাষ্ট্রের আইনগুলোই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সুরক্ষিত করে। ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধের’ নামে তাদের অনেক বড় বড় অপরাধের শাস্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। প্রকাশ্যে কোনো নাগরিককে পিটিয়ে হত্যা বা গুলি করে মেরে ফেললেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এটি প্রমাণ করে দিতে পারে, নিহত ব্যক্তি বা তার দোসরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়েই তারা পাল্টা গুলি চালায়। প্রতিটি ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের পরে এই একই স্ক্রিপ্ট মানুষের এখন মুখস্থ। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যত অপরাধই করুক, খুব ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের শাস্তির মুখোমুখি করা কঠিন।

পুলিশকে যতদিন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকবে, ততদিন পুলিশ বাহিনীর পক্ষে জনবান্ধব হওয়া সম্ভব নয়। তাদের সুযোগ-সুবিধা যতই বাড়ানো হোক না কেন, রাষ্ট্রযন্ত্র যদি পুলিশের কাঁধে বন্দুক রেখে ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় থাকার পদ্ধতি বদল না করে, তাহলে যে কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই সুযোগ নেবে।

সুতরাং একজন আইনজীবীকে সারা রাত সেতুতে ঝুলিয়ে রাখার পরে কোর্টে চালান করে দেয়া কিংবা ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করায় উল্টো সেই নাগরিককে সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেয়ার মতো ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে- এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তসাপেক্ষে দোষীদের বিচার করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ জাতীয় ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মনে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা দূর করা যাবে না। 

তাছাড়া বিচ্ছিন্ন ঘটনার সংজ্ঞা কী ও একইরকম ঘটনা যদি নিয়মিত ও বিরতিতে ঘটতে থাকে, তাহলে সেগুলোকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় কি না- সে প্রশ্নও আছে। খুব বড় ঘটনা গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচিত না হলে, সরকারি কর্মচারীরা আদৌ শাস্তির মুখোমুখি হন কি-না- তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এসব প্রশ্নের পরিমাণ যত কমিয়ে আনা যায়, ততই মঙ্গল।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh