হেফাজত কি সরকারের পকেটে নেই?

আমীন আল রশীদ

আমীন আল রশীদ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ২৬ মার্চ পালিত হলো। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হওয়া যেকোনো জাতির জন্যই তাদের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি বা সুবর্ণজয়ন্তী একটি গৌরবের দিন। 

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এই ঐতিহাসিক দিনটি কীভাবে উদযাপন করল? একদিকে করোনা, অন্যদিকে মোদিকে ‘না’- এই দুই ‘না’ মিলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণটিতে যা হলো, তা মোটেও কাক্ষিত ছিল না। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে ঘিরে যা কিছু ঘটল, তার পেছনে কতটুকু দেশপ্রেম, রাজনীতি আর ধর্ম ও উগ্রবাদ রয়েছে- তার নির্মোহ বিশ্লেষণ হওয়া জরুরি। 

তারও চেয়ে বড় প্রশ্ন, যে হেফাজতে ইসলামের সাথে সরকারের ব্যাপক সখ্য, তারা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচিতে মোদির আগমন ঠেকানোর নামে যা করল, তার ব্যাখ্যা কী? তারা কি আর সরকারের ‘পকেটে’ নেই?

উল্লেখ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গত ২৬ মার্চ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভে অংশ নেয়া মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, নেতা-কর্মী ও মুসল্লিদের একটি অংশের সঙ্গে পুলিশ, সরকারি দলের ছাত্র-যুব-স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হন শতাধিক। 

বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষের পর চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তাণ্ডব চালায় হেফাজত কর্মীরা। হেফাজতের সদরদফতরের কাছের মাদ্রাসা থেকে মিছিল বের হয়। কর্মীরা সরকারি ডাকবাংলো, স্থানীয় সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে হামলা করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশনেও হামলা হয়। সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা ও রেল লাইনে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনায় ট্রেন চলাচল কয়েক ঘণ্টা বন্ধ হয়ে যায়। হামলা হয় পুলিশ সুপারের কার্যালয়েও। 

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো? ভারতের প্রধানন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগেও বাংলাদেশে এসেছেন। তখন কেন এরকম বিক্ষোভ হয়নি? এবার কেন তার আগমন ঠেকানোর নামে বিক্ষোভ ও সহিংসতা? তার মানে এখানে শুধুই মোদিবিরোধিতা, নাকি আরও কিছু ছিল? হরতালের সমর্থনে পিকেটিং করে থানা, বিভিন্ন স্থানে হামলা ও ভাঙচুরকারীদের যেসব ছবি দেখা গেছে, তাতে এটা বোঝা যাচ্ছে যে, সবাই হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী নন, বরং তাদের সঙ্গে অন্য আরো অনেক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছিলেন। 

গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে বিশাল শোডাউন করা হেফাজতে ইসলামের মতো একটি কট্টরপন্থি দলের সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সখ্যতা চোখে পড়ার মতো। কওমি মাদ্রাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দেয়া, সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলাসহ হেফাজতের মৌলিক অনেক দাবিই সরকার মেনে নিয়েছে। বিপরীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বড় সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেন কওমি মাদ্রাসাগুলোর হাজার হাজার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। এ সময় শেখ হাসিনার সাথে একই মঞ্চে ছিলেন হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির আহমদ শফি। শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিও দেয়া হয়। 

অস্বীকার করার উপায় নেই, হেফাজতের মতো একটি বড় ধর্মীয় শক্তিকে ‘নিউট্রাল’ করে রাখা, তারা যাতে রাজপথে সরকারের বিরুদ্ধে না নামে, সেজন্য তাদের দাবি দাওয়া মেনে নেয়া হয়েছিল; কিন্তু তারপরও নানা ইস্যুতেই সরকারের সঙ্গে হেফাজতের বিরোধ তৈরি হয়েছে। সবশেষ রাজধানীর ধোলাইপাড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ ইস্যুতেও তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং তখনো একটি বড় ধরনের সহিংসতার পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা ছিল। অনেকে মনে করেন, আল্লামা শফির মৃত্যুর পরে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব নিয়ে বিভক্তি ও বর্তমান আমির জুনায়েদ বাবুনগরীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব এর একটি বড় কারণ। অর্থাৎ হেফাজতে ইসলাম এখন আর পুরোপুরি সরকারের পকেটে নেই।  

মনে রাখা দরকার, আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক দর্শন, তার সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের পার্থক্য অনেক। বিশেষ করে নারী নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়ন নিয়ে হেফাজতের বক্তব্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শন মেলে না। তবে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সখ্যতা গড়ে তুললেও বা তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে তাদের নিষ্ক্রীয় করে রাখার চেষ্টা করলেও আদতে এই সংগঠনটি যে আওয়ামী লীগের পাশে থাকবে না- সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের অনেক বুদ্ধিজীবীও বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করেছেন। 

হেফাজতে ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল না হলেও অনেক বড় রাজনৈতিক দলের চেয়েও তাদের শক্তি ও দেশের মানুষের মধ্যে তাদের প্রভাব অনেক বেশি। বিশেষ করে ধর্ম যখন বিশ্বের আরো বহু দেশের মতো বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার পালাবদলে বড় ভূমিকা রাখে, তখন আওয়ামী সরকার হেফাজতে ইসলামকে নিজের পকেটে রাখার চেষ্টা করেছে- আরএটিই স্বাভাবিক। ক্ষমতায় থাকা কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক কোনো দল যাতে এরকম শক্তিকে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র করতে না পারে, সে চেষ্টাও সরকারের ছিল। 

এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম এতটিই প্রভাবক যে, যথেষ্ট প্রগতিশীল বলে পরিচিত দলও ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতায় থাকার অস্ত্র হিসেবে বারবারই ধর্মকে ব্যবহার করে। ভোটের আগে পীরের মাজারে যাওয়া, ধর্মীয় নেতাদের আশীর্বাদ নেয়া, ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে তাদের আস্থাভাজন থাকা বা নিষ্ক্রীয় রাখা, ধর্মবিষয়ক সম্মেলনে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের যোগদান ইত্যাদি চলতে থাকে। যে কারণে ধর্ম আর মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং সে রাষ্ট্রের রাজনীতি ও ক্ষমতার গতিপ্রকৃতিও নির্ধারণ করে।

আর ধর্ম যখন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করে, তখন সেই রাষ্ট্রে কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠবে- এটিই স্বাভাবিক। তখন তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিতেও সরকার বাধ্য হয়। এটি অব্যাহত থাকলে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো একসময় কী করা যাবে ও করা যাবে না- তাও নির্ধারণ করে দেয়া শুরু করে। তারা একটি জাতির বহু বছর ধরে লালিত সংস্কৃতি বদলে দেয়ার মতো নির্দেশনাও দিতে পারে। সে বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh