লকডাউন ও মজলুমের ভাবনা

আজাদ খান ভাসানী

আজাদ খান ভাসানী

‘বাবারে কামলা না দিলে খামু কি?’ দিন কয়েক আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত কামলা বেঁচতে আসা শ্রমজীবী এক ভাইয়ের কন্ঠস্বর ছিল এমন। 

গত কদিন ধরে রাস্তায়ও বের হতে না পারা শ্রমজীবী মানুষের দিনাতিপাত না জানি কত কষ্টে চলছে! আবার চলছেও কি? 

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একজন রিকশাচালক ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো। কিছুক্ষণ আগে পুলিশের পিটুনি খেয়ে এসেছে সে। পাছায় বাড়ি মেরে ওরা জিজ্ঞেস করেছে কেন বের হয়েছিস? উত্তর না শুনেই রিক্সার হাতল ঘুরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু পেটের হাতল তো ঘুরে নাই। বাড়িতে খাবার নাই। তার ওপর অসুস্থ মায়ের জন্য ঔষধ কিনতে হবে যে।

শহরে কিছু ছোট যানবাহন ও গাড়ি ঘোড়া চলতে দেখে তার মুখে খেদ ঝরে ওরা তাহলে কারা? আরেকজন বলছে, আরে বোকা! ওদের কাছে ‘মুভমেন্ট পাস’ আছে। স্বাভাবিকভাবেই এবার প্রশ্ন জাগে মুভমেন্ট পাস, সুরক্ষা অ্যাপ, ভ্যাকসিনেশন, বিশেষ সুবিধা, প্রণোদনা এগুলো তাহলে কাদের জন্য? আজ পর্যন্ত কতজন কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ করোনা ভ্যাকসিন নিতে পেরেছেন? কতজন মুভমেন্ট পাস নিয়েছেন? বিশেষ সুবিধা, প্রণোদনা পেয়েছেন কতজন? প্রশ্ন জাগতেই পারে সরকার তবে কেবল কাদের সুরক্ষা নিয়ে ভাবছে? হ্যাঁ সবার সুরক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে। বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের। ধনী ও মধ্যবিত্তের সুরক্ষার জন্য যদি এত্তো এত্তো ব্যবস্থা নিতে হয়‌ তবে তার আগে সরকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের জন্য ভাত, চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শত প্রতিকূলতার মাঝেও আমাদের দেশের কৃষক সবার অন্ন যোগান দিয়ে যাচ্ছেন; শ্রমিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। তাদের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রের নীতি স্পষ্ট থাকতে হবে। 

এদেশে আবার বিপরীত চিত্রও আছে। অনেকেই আছেন যারা লকডাউনকে বিনোদন আর অবকাশ অবসরের উপলক্ষ মনে করে থাকেন। কেউ কেউ সুযোগ পেলেই করোনাকালীন সুরক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিলাসসামগ্রী, জামা, কাপড়, জুতা, ঈদের আগাম কেনাকাটা করতে ভিড় জমান। এদের বেশিরভাগই স্বচ্ছল চাকুরীজীবী অথবা স্বচ্ছল ব্যবসায়ী। পেটে টান না থাকায় তাদের যেমন দ্রব্যমূল্য নিয়ে ভাবনা নেই; তেমনি থোরাই কেয়ার তাদের করোনা নিয়েও। এই শ্রেণীটির বেশিরভাগই তাই সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি নিয়েও নেই গভীর কোন ভাবনা। মিছিলে নেই, প্রতিবাদে নেই, সমাজ সেবায় নেই। উটপাখির মতো যাপিত জীবন তাদের। 

‘আমি বেঁচে থাকলেই হলো’ ধরনের বিচ্ছিন্ন জীবন ভাবনা। কিন্তু নির্মম হলেও এটাই সত্য যে করোনা কাউকেই ছাড়ছে না। বলতে পারেন তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। যখন যার পরিবার আক্রান্ত হয়, সেই বোঝেন কতটা যাতনা। তবুও সামষ্টিক ভাবনা তাদের তাড়িত করে না। 

ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলেও এখানে একটা সুবিধাবাদী শ্রেণী ছিল। বাংলাদেশ আমলেও হয়েছে। বড় পরিতাপের বিষয় সবসময় তারা শাসকগোষ্ঠীর আনুকূল্য পেয়ে আসছে। সুদ, ঘুষ, রাজনীতি-ব্যবসা কিংবা ব্যবসার ফাঁদ পেতে তারা গরীব ঠকাচ্ছে। বিদেশে টাকা পাচার করছে, বেগমপাড়ায় স্থায়ী নিবাস গড়ছে। বাংলাদেশের মাটি এবং মানুষকে তাদের লোভের জ্বালানি বানিয়ে কেবল পুড়ছে। আফসোস তাদের সুরক্ষা দিতেই রাষ্ট্রযন্ত্রের যত শক্তি সম্পদ ব্যয়িত হচ্ছে। এই শ্রেণীটি কোনো কিছু উৎপাদন না করেই কেবল ভোগ করছে।

এখন প্রশ্ন হলো স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসেও রাষ্ট্র কোন শ্রেণীটির প্রতিনিধিত্ব করছে; আমলা, মোসাহেব, ধনিক শ্রেণীর? তাই যদি না হবে তবে করোনাকালীন লকডাউন ঘোষণার আগে খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্নে সরকারের দিকনির্দেশনা গুরুত্ব পেল না কেন? উন্নয়নশীল দেশের তকমায় আমরা কি ভুলতে বসেছি আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনো দিন আনে দিন খায় গোছের? অথচ যারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা খেটে খাওয়া মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন প্রায়। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে প্রখর রোদের এই খরতাপে পুড়তে থাকা শ্রমজীবী মানুষের জন্য তারা কতোটা ভাবেন? কৃষক শ্রমিকের আহাজারি আর ক্ষোভ দিনকে দিন পুঞ্জিভূত হচ্ছে- কান পেতে কি শুনতে পান?

করোনায় শিল্প কারখানা খোলা রাখা হয়েছে কিন্তু শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য যে নির্দেশনাগুলো দেয়া হয়েছে সেসব সুরক্ষা ঠিকঠাকমতো মানা হচ্ছে কিনা তার নজরদারি হচ্ছে কি? নাকি আসলে সোনার ডিম পাড়া হাঁসের ডিমটার জন্যই এসব খোলা রাখছেন? আর হাঁসটার জন্য রাখা হয়েছে বলির ব্যবস্থা! চাকরি হারানোর ভয় আর পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার সংশয়ের মাঝে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কি কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একাত্তর আমাদের পূর্বপুরুষদের শোষণ, বঞ্চণা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছিল। কৃষক শ্রমিকরাও সেদিন অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নেমেছিল। তাদের ভাগ্যের আজ কতটা পরিবর্তন এসেছে? কতটা মান মর্যাদা নিয়ে তারা সমাজে বসবাস করতে পারছে? চাটার দল আর লুটেরা শ্রেণীর কাছে প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জিম্মি হয়ে আছে। আমাদের শাসন ব্যবস্থার ফাঁকফোকর গলিয়ে একশ্রেণির অসাধু মহল এই গণবিরোধী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখছে। নিজেদের স্বার্থে তারা রাষ্ট্রব্যবস্থা গণমুখী হতে দিচ্ছে না। কিন্তু পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। নইলে জনরোষের বারুদ একদিন বিস্ফোরিত হয়ে ধনিক শ্রেণির ‘সাধের প্রাসাদ’ ধুলায় মিশে যেতে সময় লাগবে না। 

আমাদের মতো স্বল্পোন্নত জনবসতিপূর্ণ দেশে ‘ক্রাউড কন্টেইন’ করোনাকালীন দীর্ঘ মেয়াদে সমাধান আনতে পারে। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, বিয়ের অনুষ্ঠান, ওয়াজ-মাহফিল, মেলা ও জনসমাগমপূর্ণ অনুষ্ঠানাদির ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ বেশি লোকের জনসমাবেশে কঠোরতা আরোপ করা যেতে পারে। অনলাইন অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলে কেনাবেচা অব্যাহত রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে তরুণ উদ্যোক্তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশ শ্লোগানেরও মান বাঁচে, মানুষও বাঁচে। 

জানি সরকারের কাছে আরও ভালো বিকল্প আছে, থাকাটাই স্বাভাবিক। আমরা শুধু সুবিধাবাদী শ্রেণীর প্রভাবমুক্ত হয়ে আন্তরিকভাবে তা বাস্তবায়নের দাবি রাখি।

লেখক : সদস্য সচিব, ভাসানী পরিষদ।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh