কৃষিশ্রমিকদের নিয়ে দুটি কথা

মাঠে-ঘাটে নিত্যদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে মানুষগুলো পৃথিবীর সাড়ে সাত শত কোটি মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্রসহ যাবতীয় মৌলিক চাহিদা পূরণে উৎপাদন করেন- তারাই শ্রমিক, তারাই শ্রমজীবী মানুষ। পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষরা উৎপাদন উপকরণের মালিকের অধীনে কাজ করেন। শ্রম দেন। শ্রমের বিনিময়ে যা মজুরি পেয়ে থাকেন তা দিয়ে চলে তাদের জীবন-সংসার। 

দার্শনিক কার্ল মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্বের হিসাবে উৎপাদন উপকরণের মালিকরা মজুর বা শ্রমিককে ঠকিয়ে প্রাচুর্যের উচ্চ শিখরে উঠে যান। সম্পদের পাহাড় গড়েন। আর শ্রমিক-মজুর শোষণ-বঞ্চনার বেড়াজালে ঘুরপাক খান জীবনভর। 

কথাগুলো কিছুটা তাত্ত্বিক হলেও শ্রমজীবী মানুষের জীবনের গল্পগুলো এমনই। তবুও প্রতি বছর শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশ্বব্যাপী একটা দিন আছে ১ মে। দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষ কম-বেশি এ দিনটার সঙ্গে পরিচিত। ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস নামে পরিচিত। বিশ্বের প্রায় ৮০ টা দেশে পহেলা মে জাতীয় ছুটির দিন। দক্ষিণ এশিয়ার সবকটি দেশের কল-কারখানা বন্ধ থাকে এ দিনে। অনেক দেশে এ দিনটি বেসরকারিভাবেও উদযাপিত হয়। 

কিন্তু কৃষিশ্রমিক বা কৃষি মজুর- যারা তাবৎ পৃথিবীর খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী, তাদের ছুটি নেই এ দিনটিতে। দিনটার কোনো তাৎপর্যও নেই তাদের জীবনে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কৃষিপ্রধান। আরও স্পষ্ট করে বললে ধান, পাট, গম-ভুট্টা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কৃষিতে ব্যাপক স্থানজুড়ে আছে। কোটি কোটি কৃষিশ্রমিক দক্ষিণ এশিয়ার- ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা এবং নেপালে শ্রম দিচ্ছে কৃষি ক্ষেত্রে। দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্যনিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি এই কৃষিশ্রমিক বা কৃষি মজুর শ্রেণি। তথাপি কৃষিশ্রমিক একটি নিপীড়িত সামাজিক শ্রেণি এসব দেশে। 

বাংলাদেশের কৃষিশ্রমিকদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার আগে দক্ষিণ এশিয়ার, অন্তত ভারতের কৃষিশ্রমিকরা কেমন আছেন, তা নিয়ে কিছু বলা যাক। ভারতের কৃষিশ্রমিকদের সংখ্যাগত তথ্যটা হাতে নেই, তবে নিপীড়িত, বঞ্চিত কৃষিশ্রমিকরা প্রতি বছর আত্মহত্যা করছে ভারতে- এ তথ্যটা আছে। বাংলা ট্রিবিউন (৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০) এনসিআরবির তথ্যের বরাত দিয়ে লিখেছে- ‘২০১৯ সালে ভারতে মোট ১০ হাজার ২৮১ জন প্রান্তিক কৃষক ও ৩২ হাজার ৫৬৩ দিনমজুর আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যাকারী কৃষি শ্রমিকের মধ্যে নারীরাও আছেন’। এই সংবাদটা থেকে অনুমেয় কৃষি মজুর বা কৃষিশ্রমিকরা কেমন আছেন। আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হচ্ছে কৃষিশ্রমিকদের। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়- এটাই যেন কৃষিশ্রমিকদের জীবনে চরম সত্য। 

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসা যাক। ২০১৭ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশের শ্রমিকের সংখ্যা ৬ কোটি ৩৫ লাখ। ১৭ কোটি মানুষের দেশে শ্রমিক সংখ্যাটাও বিশাল। ড. আবুল বারাকাত হিসেব করে বলেছেন, প্রতিবছর এই সংখ্যাটা বাড়ছে। বর্তমানে কারখানা শ্রমিক ও কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। 

যাই হোক, ২০১৭ সালের লেবার ফোর্স সার্ভের হিসাব মতে, বাংলাদেশে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা ২ কোটি ৯০ লাখ। অর্থাৎ বাংলাদেশের কৃষি এবং শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে কৃষিশ্রমিক ৪৭ শতাংশ। এই কৃষিশ্রমিকরা ক্ষেতে খামারে কাজ করেন। ক্ষেতে খামারে ১২ মাস কাজ থাকে না। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অকৃষি কাজের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে থাকেন তারা। নারী কৃষি শ্রমিকের সংখ্যাটাও দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন তথ্য সূত্র পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। পরিসংখ্যানের হিসাবে যাই থাক, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে কৃষি পরিবারগুলোর শতভাগ নারী কৃষির সঙ্গে যুক্ত। একথা স্পষ্ট করেই বলা যায়। 

এখন কৃষিশ্রমিক হিসেবে কতসংখ্যক নারী যুক্ত- এটাই দেখার ব্যাপার। সরকারি-বেসরকারি পরিসংখ্যান প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলো কৃষি ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের মজুরি সম্পৃক্ততা সম্পর্কে ভালো তথ্য দিতে পারেনি। কৃষি মজুরি যুক্ত কাজে নারীর সংখ্যাটা অস্পষ্টও। অর্থাৎ কৃষি মজুরিযুক্ত কাজে নারীর অংশগ্রহণ এর সঠিক চিত্র নেই কোথাও। তবে নির্ভর করা যায় এমন কিছু গবেষণা এবং তথ্যসূত্র পর্যালোচনা করে বলা যায় বাংলাদেশ প্রায় ১৫ শতাংশ নারী কৃষিশ্রমিক। 

এই যে ১৫ শতাংশ নারী কৃষিশ্রমিক কৃষি কাজে জড়িত- তারা কি পুরুষের সমান মজুরি পেয়ে থাকেন? এ প্রশ্নের উত্তরটা এক কথায়- না। পুরুষের সমান মজুরি পাচ্ছেন না। একই কাজে এবং সমান শ্রমঘণ্টা ব্যয় করে একজন পুরুষ কৃষিমজুর যে মজুরি পেয়ে থাকেন, তার চেয়েও একশ থেকে দুইশত টাকা মজুরি কম পেয়ে থাকেন নারী কৃষি মজুররা। নারী পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছেন। শিল্প শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও নারী-পুরুষ মজুরি সমতা নেই। নারী-পুরুষের মজুরি সমতা একটা বিরাট প্রশ্ন। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নারী-পুরুষ মজুরি সমতার প্রসঙ্গটি আলোচনায় থাকলেও, এ পর্যন্ত উল্লেখ করার মতো কোনো অর্জন নেই ও ফল শূন্যও।

কৃষিশ্রমিক বিষয়ে আরও কিছু তথ্য আছে। মাঠ থেকে সদ্য তূলে আনা তথ্য। ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার দুটি গ্রামে কৃষিশ্রমিকদের ওপর ছোট্ট একটি জরিপ চালানো হয়, এ বছরের এপ্রিল মাসে। জরিপের ফলগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক : ভবানীপুর ও ফারাবাড়ী গ্রামে খানার (পরিবার) সংখ্যা- ৭ শত ও এখানে ৭০ শতাংশ খানা মুসলিম এবং ৩০ শতাংশ হিন্দু (ক্ষত্রিয়) সম্প্রদায়ের। গ্রাম দুটিতে দিনমজুর বা কৃষিশ্রমিক মোট খানার ৫৫ শতাংশ। কৃষিশ্রমিকরা ধান লাগানো এবং ধান কাটা কাজ ছাড়াও অনেক ধরনের কাজ করেন। ধানের মৌসুমে ভালো মজুরি পেয়ে থাকেন কৃষিশ্রমিকরাও। ধান কাটা এবং লাগানোর সময় একজন পুরুষ ৫শ’ থেকে ৭শ’ টাকা মজুরি পান দৈনিক। আর একজন নারী শ্রমিক পেয়ে থাকেন চারশ’ টাকা। ধানের মৌসুম শেষ হলে লোকজনের ঘর-বাড়ি মেরামতের কাজ, ইট ভাটায় কাজ, রিকশা-ভ্যান চালানো ইত্যাদি কাজ করেন গ্রামীণ কৃষিশ্রমিকরাও এ সব কাজে দৈনিক মজুরি পুরুষদের ক্ষেত্রে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। আর নারীরা পেয়ে থাকেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। 

শ্রমের মজুরি দিয়ে পরিবারের খাওয়া-দাওয়া চলে ভালোই তাদের; কিন্তু আরও কত দরকারি খরচ আছে সংসারে। থাকার জন্য ঘর লাগে, আসবাবপত্র লাগে। সন্তানদের লেখাপড়া, বিয়ে দেওয়া ইত্যাদি আছে। দিন মজুরির আয় দিয়ে কুলাতে পারেন না। এসবের জন্য অর্থের উৎস কোথায়? এনজিও থেকে ঋণ একমাত্র ভরসা। জরিপে উঠে এসেছে ঋণের বিস্তৃত তথ্য। কৃষিশ্রমিকদের প্রতিটি পরিবার এনজিও ঋণ নিয়ে নিয়েছেন। হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে, মজুরির টাকার একটা অংশ দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন প্রতি সপ্তাহে। ঋণ ছাড়া কোনো কৃষিশ্রমিক পরিবার নেই গ্রাম দুটিতে। অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ কৃষি শ্রমিকের পরিবারগুলোর সবাই ঋণের জালে আবদ্ধ। 

গুরুদাস চন্দ্র রায় (৪০) দিন মজুর। তিনি ঘর তৈরির জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন ‘আশা’ সংস্থা থেকে এবং প্রতি সপ্তাহে পরিশোধ করছেন কিস্তি। জরিনা বেগম (৪৫) বিধবা এবং এক মেয়ে আছে। স্কুলে যায় ও দিন মজুরেরও কাজ করেন। তিনি ২ শতক জমির মালিক। অর্থাৎ ভিটে বাডিটিই তার শেষ সম্ভল। ঘর মেরামতের জন্য ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন আরডিআরএস থেকে। এ রকম প্রতিটি কৃষিশ্রমিক পরিবার ঋণগ্রস্ত। বস্তুত বাংলাদেশে কৃষি শ্রমিকের চিত্রটা একই রকম। 

কৃষিশ্রমিকরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন ও মজুরির টাকা দিয়ে কোনো রকমে দিনযাপন করেন; কিন্তু ঘর-বাড়ি মেরামত, ছেলে-মেয়ের ভরন-পোষণ, লেখাপড়া ও বিয়ে দেওয়া এবং পরিবারের লোকজনের চিকিৎসা বাবদ খরচ ঋণের টাকা থেকেই করতে হয়। বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলো কাজ করছে। ২৭ থেকে ৩৫ শতাংশ লাভে ঋণদাতা সংস্থাগুলো ঋণ দেন এ সব মেহনতি মানুষদেরকে। কৃষিশ্রমিকদের যারা ৫০-৬০ বছর বয়সি তারা কাজ করতে পারেন না ভালোভাবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে কৃষিশ্রমিকদের অসহায়ত্ব সবার চোখে পড়ে। কৃষিশ্রমিকরা অসহায় হয়ে যায় বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। 

রমজান আলি একজন কৃষিশ্রমিক। ৬১ বছর বয়স তবু মাসের অর্ধেক দিন কাজ করেন অন্যের বাড়িতে। বয়সের ভারে অসুস্থতা বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘চাকরিজীবীরা চাকরি শেষে পেনশন পান এবং পেনশনের টাকা দিয়ে চাকরি শেষে সুন্দর দিন চলে যায় উনাদের; কিন্তু আমার মতো যারা বয়স্ক কৃষিশ্রমিক ও কাজ করতে অক্ষম তাদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করা যায় না?’ 

রমজানের প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? কৃষিশ্রমিকদের জন্য পেনশন স্কিম থাকাটা জরুরি বলে মনে করি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh