ফেসবুক কি তথ্য ফাঁস করে?

লকডাউনে ফেসবুকের ব্যবহার বেড়েছে ৬০-৭০ শতাংশ। গণমাধ্যমে যেদিন এই সংবাদ প্রকাশিত হলো, তার কিছুদিন আগের আরেকটি খবরের শিরোনাম : ‘৩৮ লাখ বাংলাদেশি ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস’। 

খবরে বলা হয়, হ্যাকাররা সম্প্রতি সারাবিশ্বের প্রায় ৫৩ কোটি ৩০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করেছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন ৩৮ লাখ ১৬ হাজার ৩৩৯ জন বাংলাদেশি।

চুরি হওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে- ফেসবুক আইডি নম্বর, প্রোফাইলে দেওয়া নাম, ই-মেইল অ্যাড্রেস, বসবাসের ঠিকানা, ব্যবহারকারীর লৈঙ্গিক পরিচয়, পেশাসহ আরও বেশ কিছু তথ্য। অর্থাৎ একজন ব্যবহারকারী ফেসবুক প্রোফাইল তৈরির সময় যেসব তথ্য দিয়ে থাকেন, মূলত সেগুলোই হ্যাকড হয়েছে। 

ফেসবুকের তথ্য ফাঁসের খবর অবশ্য এটিই প্রথম নয়। তবে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের দাবি, বছর দেড়েক আগেই নিরাপত্তার ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করা হয়েছে।

অস্বীকার করা যাবে না, বাংলাদেশে যেভাবে ফেসবুকের ব্যবহারকারী বেড়েছে, সেটি বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় সম্ভবত অনেক বেশি। আপনার বাসার নিচে যিনি কাঁচা সবজি বিক্রি করেন কিংবা যিনি আপনার চুল কেটে দেন, তারও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এর ভালো-মন্দ নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বিশেষ করে উদ্ভট, মিথ্যা, বানোয়াট খবর ও গুজব ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হওয়ায় ফেসবুকের সমালোচনা এখন তুঙ্গে।

অপপ্রচার ও গুজব প্রতিরোধে মাঝে মধ্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে; কিন্তু তারপরও এটিই বাস্তবতা যে, মানুষ এখন এত বেশি ফেসবুকনির্ভর হয়ে গেছে যে, গণমাধ্যমের আগেই অনেক তথ্য তারা জেনে যায়। আবার ফেসবুকে তথ্য প্রকাশে যেহেতু কোনো সম্পাদকীয় নীতি নেই, অর্থাৎ ফেসবুকের যেহেতু কোনো গেটকিপার নেই। ফলে মানুষ যা খুশি লিখে দিতে পারে। সে কারণে অনেক সময় ভুয়া খবরও মানুষ বিশ্বাস করেন এবং তখন মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। কারণ গণমাধ্যমকে তখন প্রমাণ করতে হয় যে, ওই তথ্যটি সঠিক নয়।

ফেসবুক এখন একদিকে বিশাল জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগের বিরাট মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এটা যেমন ঠিক, তেমনি সমাজে নানারকম মিথ্যা, গুজব ও অস্থিরতা ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে- এই ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। এ দায় তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। মানে এখানে মেশিন হিসেবে ফেসবুককে দোষারোপ না করে বরং ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিনকেই দায়ী করা সঙ্গত।

কারণ করোনা পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মানুষ বাড়িতে বসে অফিস করা এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও এখন অনলাইননির্ভর। সেইসঙ্গে বহুগুণ বেড়েছে অনলাইন কেনাকাটা। এসবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা। 

গণমাধ্যমের খবর বলছে, সাম্প্রতিক লকডাউনে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ফেসবুক ব্রাউজের পরিমাণ বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এ হার ৬০ থেকে ৭০ ভাগের বেশি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে ভাইরাল ভিডিও দেখার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।

যখন কোনো কিছুর ব্যবহার বাড়ে, তখন সেখানে নানারকম দুষ্টুচক্র ঢুকে পড়ে। যেমন অনলাইন ব্যবসা বা অনলাইনে কেনাকাটা জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক টাউট ও ফটকা ব্যবসায়ী এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বা এখনো নিচ্ছে। সুতরাং ফেসবুকের ব্যবহারকারী যখন বাড়বে, তখন অল্পশিক্ষিত মানুষও ফেসবুকের মতো একটি টেকনিক্যাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন এবং তিনি যখন ফেসবুকের সবগুলো অপশন না জেনেই এবং এর ভালো-মন্দ বিচার না করেই কোনো কিছু লিখে দেন বা শেয়ার করে- তখন নিজের অজান্তেই তিনি নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনেন। সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হয়, সেই তথ্যটি না জানার কারণে নিজের গোপনীয় অনেক তথ্য তিনি প্রকাশ করে দিচ্ছেন বা এমনভাব তথ্যগুলো রাখছেন- যা হ্যাকাররা সহজেই জেনে যাচ্ছে। 

বাস্তবতা হলো, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এখনো তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে খুব একটা সচেতন নন। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ কোটিরও বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে- এই অভিযোগ ওঠার পর এ বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে যেসব তথ্য দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো কীভাবে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে এবং কার সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে, এসব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ফেসবুকের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ অনেকটা জ্বালানির মতো। এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপনদাতারা এই মাধ্যমটিতে আসেন তাদের পণ্য বা সেবার প্রচার চালাতে। ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর বিচার বিশ্লেষণ চালিয়ে তারা ফেসবুক ব্যবহাকারীদের টার্গেট করে বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। এর মাধ্যমে বিজ্ঞাপনদাতা ও ফেসবুক উভয়েই অর্থ আয় করে থাকে।

ফেসবুকের এসব বাণিজ্যিকীকরণ এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের কারণে এই মাধ্যমটির ওপর মানুষের আস্থা কমছে- এমন কথাও শোনা যায়। বিশেষ করে তরুণদের কাছে। যুক্তরাষ্ট্রের তরুণদের নিয়ে করা সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ফেসবুক ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এডিসন রিসার্চ এ সমীক্ষা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রে দেড় হাজার সামাজিক যোগাযোগের সাইট ব্যবহারকারীকে নিয়ে ওই সমীক্ষা চালানো হয়। ওই সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ১২ বছর বয়সের অধিক জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ ফেসবুক ব্যবহার করতে, যা ২০১৮ সালে নেমে আসে ৬২ শতাংশে। বর্তমানে তা ৬১ শতাংশে নেমে এসেছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীর হার সবচেয়ে বেশি কমেছে ১২ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে। মানুষ ফেসবুক ছেড়ে স্ন্যাপচ্যাটের মতো অ্যাপ্লিকেশনের দিকে ঝুঁকছে। ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাইভেসি নিয়ে উদ্বেগের কারণে বড় ধাক্কা খেয়েছে ফেসবুক। অবশ্য গবেষণা বলছে, তরুণদের মধ্যে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা কমলেও বয়স্ক মানুষদের কাছে এটি জনপ্রিয় হচ্ছে। 

তবে বিশ্বের অনেক দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী কমলেও বা নাগরিকরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেটের অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হলেও বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন হলো, ফেসবুক ব্যবহারকারী তার ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ রাখতে কী করতে পারেন? বিশেষজ্ঞরা যেসব পরামর্শ দেন, তা এরকম ফেসবুকে লগ ইন করুন। তারপর অ্যাপ সেটিং পেজে যান। অ্যাপসে ক্লিক করুন। তারপর অ্যাপস, ওয়েবসাইটস অ্যান্ড প্লাগিন্সের এডিট বাটনে ক্লিক করুন এবং প্ল্যাটফর্মটিকে ডিজেবল করে দিন। এটা করার অর্থ হচ্ছে, আপনি ফেসবুক থেকে তৃতীয় কোনো পক্ষের সাইট ব্যবহার করতে পারবেন না; কিন্তু আপনি যদি মনে করেন যে, এটা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে, তখন আপনি অন্য কোনো পক্ষ যাতে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য সীমিত পরিসরে ব্যবহার করতে পারে এবং আপনিও তৃতীয় পার্টির সাইট ব্যবহার করতে পারেন, তারও উপায় আছে। ফেসবুকে লগ ইন করুন। তারপর অ্যাপ সেটিং পেজে যান। অ্যাপসে ক্লিক করুন। তারপর ‘অ্যাপস আদার্স হাউসে’ গিয়ে আপনার যেসব তথ্য অন্য কোনো অ্যাপস দেখুক সেটা না চান, তাহলে সেগুলো আনক্লিক করুন। এর মধ্যে আছে জন্ম তারিখ, পরিবার, ধর্মীয় পরিচয়, আপনি অনলাইনে আছেন কি-না, আপনার টাইমলাইনের পোস্ট, আপনার আগ্রহ ইত্যাদি বিষয়। 

তবে এরই মধ্যে আপনার ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ফাঁস হয়েছে কি-না, তা কি জানেন? বিবিসি সম্প্রতি একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে যেখানে তারা একটি টুল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে লিখেছে, Have I Been Pwned নামে ওয়েবসাইটে ঢুকে নিজের ই-মেইল ও ফেসবুক আইডি দিয়ে জানতে পারবেন যে, তার ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ফাঁস হয়েছে কি-না। চাইলে আপনিও এটি যাচাই করে দেখতে পারেন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh