ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

অনেক বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে লিখতে ইচ্ছা করে না। কিছু বিষয় আছে, যা নিয়ে লিখতে যে গভীরতার প্রয়োজন, তা না থাকায় লিখতে উৎসাহ পাই না। আবার কিছু বিষয় আছে, যা নিয়ে লিখতে সাহস থাকা প্রয়োজন। স্বাধীন সার্বভৌম স্বজাতির শাসনের মধ্যে পরাধীনতার গন্ধে সাহসে টান পড়ে। পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশও সাহসের জন্য সহায়ক নয়। 

পেশাজীবীদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্তি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার পরিবেশ রক্ষায় ব্যর্থতার পরিচয় রাখছে। বৃষ্টি আসার আগেই এরা ছাতা ধরে বসে পড়ে। পেশাজীবীরা এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখার ফলে শাসক শ্রেণির চোখে মুখে এক রকম আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। এখন যা করা হয়, যা বলা হয়, যা ভাবা হয় সবকিছু জনকল্যাণে বলে মনে হয়। গণ্ডির বাইরে কিছু আছে বলে বিশ্বাস হয় না। কোনো আলোচনা-পর্যালোচনা এক কান দিয়ে শুনে অন্যটা দিয়ে বের করে দেওয়া হয় আর সমালোচনা সহ্য করার মতো কোনো মানসিক অবস্থাই থাকে না। 

ফলে আজকের পরিবেশে আমার বিবেচনায় যা সত্য ও সুন্দর তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্যের জন্য শাপে বর হিসেবে দেখা যায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণেতারা আজ আপ্লুত হলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাতিলের আন্দোলনে রাজপথ কাঁপাবে-ইতিহাস তার সাক্ষী। তাই বলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে এমন বোকা কি শাসক শ্রেণি? ভবিষ্যৎ চিন্তায় বর্তমানের সুখ নষ্ট কেন করতে হবে?

ব্রিটিশরাজ ঔপনিবেশিক শাসন পাকা করতে, সরকারবিরোধী গণআন্দোলন প্রতিহত করতে ১৮৯৬ সালে সিআরপিসি নামে অ্যাক্ট নং ৫ ফৌজদারি আইন পাস করে। এই আইনের ৫৪ ধারায় পুলিশকে ঢালাওভাবে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া বা কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত সন্দেহের বশে যে কাউকে আদালতগ্রাহ্য অপরাধের জন্য গ্রেফতার করতে পারার ক্ষমতা দেওয়া হয়। সোয়াশত বছর ধরে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিককে নির্বিচারে গ্রেফতারের যে ক্ষমতা পুলিশের ওপর অর্পণ করে রাখা হয়েছে, তা আজ স্বাধীন দেশের মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত এটা শাসক শ্রেণির বিবেচনার মধ্যেই নেই। দেশের সংবিধানে মানুষের যেসব মৌলিক অধিকার আছে তারও পরিপন্থী এই আইন। 

আজ জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করলেও ব্রিটিশদের প্রণীত আইনকে ভুলতে পারেনি। অনেকেই বলে থাকেন আমরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভালো কিছু শিখতে না পারলে কি হবে অনেক খারাপ গুণের অধিকারী হয়েছি। শাসক শ্রেণির কাছে এ আইন যতটা জনপ্রিয় বিরোধীদের কাছে ঠিক ততটাই অজনপ্রিয়। মসনদের বাইরে থাকলে আইনটা বাতিলের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে আর শাসক শ্রেণি আইনটি ব্যবহার করে নিজেদের নিরাপদ রাখে। 

বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে ডিটেনশন আইন করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে জবাবদিহিহীন ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। শাসক শ্রেণির কাছে আইনটি মুক্তির পথ হিসেবে বিবেচিত হলেও তা বিরোধী দলের সবার কাছে কালা- কানুন হিসেবে বলবৎ হয়। এই আইনটি বাতিলের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম হলেও তাতে শাসক শ্রেণি কর্ণপাত করেনি। ক্ষমতা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত না হওয়ায় ক্ষমতা পরিবর্তনের পর দীর্ঘসময় ধরে প্রণেতাদের বিরুদ্ধে এ আইন প্রয়োগ হয়। প্রণেতারাও একসময় বাধ্য হয়ে আইনটির বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করতে বাধ্য হয়। তখনো শাসক শ্রেণি কর্ণপাত করেনি। সৌভাগ্য নির্ধারিত সময়ে আইনটি বাতিল হয়ে গিয়েছে। তাই আইন প্রণয়নে আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। না হলে আজ যাকে মুক্তির পথ বিবেচনা করা হচ্ছে আগামীতে তা নিজেদের গলার ফাঁস হয়ে ফেরৎ আসতে পারে। 

’৭৪ এর কালা কানুনের কথা ভুলে গেলে চলবে কেন? যদি মনে করা হয় বর্তমান শাসক শ্রেণি আইনটি ব্যবহারের পর তা বাতিল হয়ে যাবে, তবে মনে রাখা প্রয়োজন পথ যখন একবার তৈরি হয়ে গিয়েছে তখন হাঁটার লোকের অভাব হবে না। এ নশ্বর পৃথিবীতে কারো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। সে কারণে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করেই চলা জরুরি। নিজেদের ফাঁদে নিজেরা পড়ার কার্যক্রম থেকে সরে আসার মানসিকতায় বিষয়টা ভাবতে হবে। সমালোচনার একটা কার্টুন, একটা ভাষ্য, একটা প্রবন্ধ আগামীতেও থাকবে। তখন কী হবে?

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যার মধ্যে যেতে চাই না। এ নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন চলমান। আইনের অপব্যবহার হলে তা বেশি গতি পায়। ক্ষমতার বলয় থেকে আশ্বাসের বাণী উচ্চারিত হয়। এতে কাজের কাজ কিছু হয় না। নিজেকে বিখ্যাত করতে পথে-পথে, গাছে-গাছে শুভেচ্ছার বাণী প্রচার করে থেমে যাওয়া যায় না। ব্যক্তির অপমানকে নিজের অপমান বিবেচনার ক্ষেত্রে এসব কালাকানুন সহায়ক হয়। কোনোক্রমে একটা সুযোগ হাতে এলেই ৪৬০টা উপজেলায় আইনের আশ্রয় নেওয়া শুরু হয়। কে, কীভাবে, কেন সংক্ষুব্ধ তা দেখার প্রয়োজন পড়ে না। সত্যিকার অর্থে, ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকলে সংক্ষুব্ধ হতে কোনো কারণের প্রয়োজন পড়ে না। অন্যদেরও যে সাংবিধানিক অধিকার আছে তা তারা বিশ্বাস করতে পারে না। সব অধিকারের কেন্দ্রবিন্দুই ক্ষমতা। আজকে কাজল-রুহুল-কিশোর-মুস্তাকদের মিছিলে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা আরো ব্যাপকভাবে প্রতিভাত হবে- ইতিহাস তার সাক্ষী। আমাদের বিদ্বেষপূর্ণ চলমান রাজনীতির কারণে পরিবেশ পরিস্থিতি সুখকর থাকবে না তা জোর দিয়েই বলা যায়। তাই ক্ষমতার মোহে আজ যা মুক্তি আগামীতে তা গলার ফাঁস। 

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসেকৃত কোনো কার্যের ফলে কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হইলে বা ক্ষতিগ্রস্থ হইবার সম্ভাবনা থাকিলে তজ্জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না (নবম অধ্যায়ের ৫৭ নং ধারা)।’ দেশের সাধারণ মানুষ খুব সরল। কোনো জটিলতা তাদের স্পর্শ করে না। এই সরল মানুষগুলোর সরল বিশ্বাসকে সরলভাবে ব্যবহার করছে ক্ষমতার বলয়ে থাকা মানুষরা। সরল বিশ্বাসে হলমার্ক চার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক জালিয়াতি করে উল্লসিত, পি কে হালদার সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা নিয়ে কানাডায় বসে ঠ্যাং নাচাচ্ছে, মুস্তাককে হত্যা করে নির্বিকার থাকা যাচ্ছে, সরল বিশ্বাসে একটা বালিশ নয় হাজার টাকায়, একটা পর্দা সাইত্রিশ হাজার টাকায়, একটা কাঠের চেয়ার এক লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকায়, একটা কলাগাছ ছয় লক্ষ টাকায়, একটা নারিকেল গাছ বাষট্টি লাখ টাকায় কেনা যাচ্ছে। সরল বিশ্বাসে পুকুর কাটা, খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশে চলে যাওয়া যাচ্ছে। 

সরল বিশ্বাসে মেগা প্রকল্প দশ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু ত্রিশ হাজার কোটি টাকায়, এগারশ’ কোটি টাকার পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর তেত্রিশশ’ কোটি টাকায়, একুশশ’ কোটি টাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম চারলেন প্রকল্প আটত্রিশ শত কোটি টাকায় নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি আমরা। সরল বিশ্বাসের ফিরিস্তি দিনে দিনে লম্বাই হচ্ছে। জনগণের সম্পদ জেনেও ব্যক্তিকে হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে ব্যাংক, একজনের কারাভোগ অন্যজনকে দিয়ে দিচ্ছে, খুনের সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে বিদেশ থেকে ডেকে এনে ক্ষমা করে বিদেশে দলের দায়িত্ব দিচ্ছে-এসবই সরল বিশ্বাসে চলছে। সরল বিশ্বাসে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনেরা কাজ করে চলেছে। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সরল বিশ্বাসে চলমান আছে এবং আগামীতে এমনভাবেই চলমান থাকবে তা আশা করাই যায়। 

প্রজাতন্ত্রের মালিকদের কল্যাণের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সরল বিশ্বাসের মধ্যে অতীতে ছিল না, বর্তমানেও নেই। আগামীতে থাকবে কি না তা হয়ত সময়ই বলবে। নির্বাহী প্রধান হিসেবে সব দায়-দায়িত্ব একক কাঁধে এসে পড়বে। মহল্লায় যে ‘ক’ বললে কলিমুল্লাহ বুঝে ফেলে বলে ধমক দিয়ে বেড়াচ্ছে সেও রেহাই পাবে না। তাই ইতিহাস সবকিছুর সাক্ষী - একথা মনে রেখে আইন পাস করা প্রয়োজন। সময় যত গড়াবে বিবেচনার দরজা ততটাই শক্ত হয়ে যাবে। তাই শুধু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নয়, সব কালা-কানুন পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

লেখক : সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh