করোনা দুর্যোগ : যেসব প্রশ্নের উত্তর নেই

বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও মহামারি দুর্যোগের এক কঠিন সময় পার করছে। অধিকাংশ দেশ ও তাদের সরকার মহামারিজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলা ও তা থেকে উত্তরণে অনেক শিক্ষাগ্রহণ করেছে এবং যার সুফলও তারা পেতে শুরু করেছে, মহামারি থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে।

এই সময়কালে বাংলাদেশে আমরা, আমাদের সরকার কী অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিয়েছি? কেন আজ টিকা নিয়ে আমাদের হাহাকারের মধ্যে পড়তে হলো, কেন সুযোগ, সময় ও প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও টিকার ব্যাপারে বিকল্প উৎস অনুসন্ধান করা হলো না, কেন একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছে জনগণকে জিম্মি করা হলো? করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যাপারে কথিত ডেডিকেটেড হাসপাতালের নামে কেন শত শত কোটি টাকা অপচয় করা হলো, মহামারিকালেও কেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বেশকিছু প্রতিষ্ঠান অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া হয়ে দাঁড়াল? কেন সাজানো গেল না? এসব জরুরি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কেউ নেই, দায়দায়িত্ব নেবারও কেউ নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা করোনার দ্বিতীয়-তৃতীয় ঢেউয়ের ব্যাপারে আশঙ্কা ব্যক্ত করে সংশ্লিষ্ট সব সরকারকে বার বার সতর্ক হতে বললেও কেন তাকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো দেশ থেকে করোনা বিদায় দেওয়া হয়েছে বলে ঢেকুর তোলা হলো তার জবার কে দেবে? এ ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কোনো প্রয়োজনীয় আত্মজিজ্ঞাসা বা আত্মসমালোচনা নেই।

এটা এখন অনেকখানি স্বীকৃত যে, আরও ক’বছর করোনার সঙ্গেই আমাদের বসবাস করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের পাশাপাশি দেশের ৭০-৭৫ শতাংশ জনগণকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে; কিন্তু এত টিকা আমদানি করা অসম্ভব প্রায়। তাহলে দেশেই আমাদের জরুরিভিত্তিতে টিকা উৎপাদনের যাবতীয় কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। কেন আমরা প্রায় একটা বছর নষ্ট হতে দিলাম। টিকার ব্যাপারে আমাদের যে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সক্ষমতা এবং অবকাঠামোগত অগ্রগতি এতদিনে তা ভালোভাবেই কাজে লাগানো যেত। প্রয়োজনে করোনার টিকা প্রযুক্তি আমদানি করা যেত, যৌথ উদ্যোগও নেওয়া যেত। গত বাজেটে চিকিৎসা গবেষণা খাতে বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকার এক টাকাও খরচ হলো না, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার রাস্তাও পাওয়া গেল না। সমস্যাটা অর্থের নয়, সংকট উদ্যোগের, পরিকল্পনার তথা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পদক্ষেপের। জনস্বাস্থ্য কেন অগ্রাধিকার পাবে না, কেন আমরা উপযুক্ত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব না। আমাদের তুলনায় ছোট ও দুর্বল অর্থনীতির দেশ যদি কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলে জনগণকে নিরাপদ রাখতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না।

করোনা মোকাবেলায় অন্য অনেকের মতো ‘লকডাউন’কেই নিদান মনে করা হলো; অথচ লকডাউন কার্যকর করার বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হলো না। শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর কাছে খাদ্য ও নগদ অর্থ পৌঁছানো ছাড়া যে ‘লকডাউন’ কার্যকর হবে না এটা তো কারও না বোঝার কথা নয়। তাহলে ‘লকডাউনের’ ঘোষণা দিয়ে জনগণকে কেন নিয়তির ওপর যে যেভাবে পার বেঁচে থাক এরকম একটি অমানবিক ও অনিশ্চিত অবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হলো?

করোনার বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সরকার বিভিন্নভাবে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে প্রধানত, বড় ও মাঝারি শিল্পকে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রণোদনার তেমন কিছু পায়নি। ব্যতিক্রম ছাড়া তেলির মাথায় তেল দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে অনেকেই কোটিপতিদের ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন। প্রণোদনার নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের এই ধারা এখনো অব্যাহত আছে।

নানা জরিপ ও পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে গত এক বছরে সাড়ে তিন থেকে চার কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্রসীমার নিচে নেমে এসেছে। প্রণোদনা দরকার ছিল মূলত এদের জন্য, ক্ষুদে উদ্যোক্তাদের জন্য, আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের জন্য; কিন্তু তা হয়নি।

গত বছরের ঈদযাত্রার অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টের পর এবার কেন আবার ঈদে ঘরেফেরা কয়েক কোটি মানুষের যাওয়া-আসায় এত দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হলো! লকডাউন আর পরিবহন নিয়ে কেন এত স্বেচ্ছাচারী, অদূরদর্শী, পরস্পরবিরোধী ভুল সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত যানবাহন চলতে পারলে কেন গণপরিবহন বন্ধ রাখা হলো। জেলায় বাস চলার অনুমতি দিয়ে কেন আন্তঃজেলায় বাস চলাচল বন্ধ রাখা হলো। এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের যুক্তিগ্রাহ্য কোনো উত্তর নেই। এসব স্ববিরোধী হঠকারী সিদ্ধান্তে লাখ লাখ মানুষ কি নিদারুণ দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন ভুক্তভোগীরাই কেবল তা বলতে পারবেন। এই নৈরাজ্যিক অবস্থার দায় নেবার জন্যও কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। এসব প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘ করার অবকাশ থাকলেও এই নিবন্ধে বোধ করি তার আর প্রয়োজন নেই।

করোনা মহামারি- এই নাজুক পরিস্থিতি একটি জাতীয় ও বৈশি^ক দুর্যোগ। জাতীয় দুর্যোগ বলেই পরিস্থিতি মোকাবেলায় দরকার ছিল জাতীয় উদ্যোগ, সব বিরোধী দল, পেশাজীবী ও জনগণকে আস্থায় নিয়ে আমাদের সম্মিলিত সহায় সম্বলকে পুঁজি করে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া। সরকার এ পথে হাঁটেনি। হাঁটছে না। গত দেড় বছরের কার্যক্রম থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনাই সরকারের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এ কারণে করোনা সম্পর্কিত কমিটিগুলোর পরামর্শ, এই সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতামত উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

করোনা একসময় কমে আসবে, হয়তো বিদায়ও নেবে; কিন্তু জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা ভবিষ্যতে কবে কায়েম হবেকিংবা আদৌ কায়েম হবে কিনা এটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন। জনগণকে নিশ্চয় এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর খুঁজে নিতে হবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের বিপ্লবী, ওয়ার্কার্স পার্টি

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh