ইউএনওকাণ্ড এবং অতিরিক্ত সচিবের ‘ভাবমূর্তি’

আমীন আল রশীদ।

আমীন আল রশীদ।

সম্প্রতি দু’জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলোচনায় এসেছেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ শিরোনাম- ত্রাণ চেয়ে ৩৩৩ নম্বরে ফোন বাড়ির মালিকের, জরিমানা করলো প্রশাসন এবং ২. ছাগলকে জরিমানা করলেন ইউএনও। 

এর বাইরে সম্প্রতি আরও দুটি খবরের দিকে নজর দেওয়া যাক; ১. এলজিইডির প্রকল্প, ৯টি গভীর নলকূপেই ১২০ কোটি টাকা এবং ২. অতিরিক্ত সচিব জেবুন্নেছার বিষয়ে খবর প্রকাশ না করতে তথ্য মন্ত্রণালয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চিঠি। 

প্রথম খবরের ঘটনাস্থল নারায়ণগঞ্জ। খবরে বলা বলা হয়, ফরিদ আহমেদ নামে এক ব্যক্তি ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চান। পরে তার বাসায় ত্রাণ নিয়ে যান উপজেলা প্রশাসনের লোকজন; কিন্তু তারা দেখতে পান সহযোগিতা চাওয়া ওই ব্যক্তি চার তলা বাড়ির মালিক। পেশায় হোসিয়ারি কারখানারও মালিক। তাই সরকারি লোকজনকে হয়রানি করার অভিযোগে তাকে শাস্তি হিসেবে ১০০ জনকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেন ইউএনও।

সংবাদটি এ পর্যন্ত হলে এটিকে দুই কারণে ইতিবাচক হিসেবে দেখার অবকাশ ছিল। ১. খাদ্য সহায়তা চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বাসায় খাদ্য নিয়ে হাজির হয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে প্রশাসন; এবং ২. যেহেতু গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ খাদ্য সহায়তা চেয়ে একজন বাড়ি ও কারখানার মালিক উপজেলা প্রশাসনের লোকজনকে হয়রানি করেছেন। তাই তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, যাতে আর কেউ এরকম হয়রানি না করেন। 

কিন্তু খবরের অন্তরালের খবর অন্য। ফরিদ আহমেদ আসলে কোনো কারখানার মালিক নন। বরং নারায়ণগঞ্জে একটি হোসিয়ারিতে কাটিং মাস্টারের কাজ করতেন। কয়েক বছরে তার তিনবার ব্রেইন স্ট্রোক করায় দৃষ্টিশক্তি ও স্মৃতি দুটিই কমে গেছে। ফলে আগের মতো কাজ করতে পারেন না। এখনো ৮ হাজার টাকা বেতনে শ্রমিকদের ওপর নজরদারি রাখার কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। এ টাকায়ই চলে সংসার। তার ওপর ওষুধের খরচ। ফরিদ আহমেদের সাত ভাই-বোনদের জন্য একটি পৈতৃক বাড়ি আছে। সেখানে সবাই মিলে চারতলা তুলে নিজেরা থাকেন। ফরিদ আহমেদকে চার তলার ওপরে টিনশেডে থাকতে দেওয়া হয়েছে। এফএম রেডিওতে তিনি শুনেছেন, ৩৩৩ নম্বরে ফোন করলে সরকারের তরফ থেকে গোপনে খাদ্য পাঠানো হয়। অনেক ভেবে-চিন্তে তিনি ৩৩৩ নম্বরে ফোন করেন; কিন্তু প্রশাসন যখন জানতে পারে যে ফরিদ আহমেদ সচ্ছল মানুষ, তখন তাকে জরিমানা করা হয়। শাস্তি হিসেবে তাকে ১০০ জনের ত্রাণ কিনে দেওয়ার নির্দেশ দেন ইউএনও। বলা হয় প্রতি প্যাকেটে ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, সঙ্গে আলু, তেল, পেঁয়াজ ও লবণ থাকবে।

কিন্তু দরিদ্র ফরিদ আহমেদ এই টাকা কোথায় পাবেন? স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখে, সুদে ও ধার করে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা জোগাড় করে ১০০ জনের খাদ্যসামগ্রী কেনেন। সেই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন ইউএনও আরিফা জহুরাসহ সরকারের কর্মকর্তারা। ত্রাণ বিতরণের সময় ফরিদ আহমেদের পরিবারের লোকজন ইউএনওর সামনে আহাজারি করে বলতে থাকেন, ‘আমরা ধনী না গরিব, নিতান্ত গরিব।’ 

শুধু তাই নয়, ফরিদ আহমেদের ভাই ও তাদের স্ত্রীরা গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার পর দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন ফরিদ আহমেদ। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে টনক নড়ে উপজেলা প্রশাসনের। ফিরিয়ে দেওয়া হয় ফরিদ আহমেদের টাকা; কিন্তু উপজেলা প্রশাসনকে হয়রানির করার অভিযোগে তাকে যে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া হলো, তার প্রতিকার কী? একজন মানুষ সত্যিই চার তলা বাড়ি এবং কারখানার মালিক হলে তিনি যে ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চাইবেন না, এই কাণ্ডজ্ঞানটুকু উপজেলা প্রশাসনের কেন ছিল না? তারা কেন সঠিকভাবে বিষয়টি তদন্ত না করেই তাকে জরিমানা করলেন?

আর্থিক অবস্থা খারাপ বলেই একজন মানুষ ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্যসহায়তা চেয়েছিলেন যাতে বিষয়টি গোপন থাকে; কিন্তু এটি আর গোপন থাকেনি। সারাদেশের মানুষ জেনে গেছে, তিনি গরিব এবং একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ক্ষোভ ও দায়িত্বশীলতার কথা। 

দ্বিতীয় খবরের ঘটনাস্থল বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা। খবরে বলা হচ্ছে, মালিকের অনুপস্থিতিতে উপজেলা চত্বরে লাগানো ফুল গাছের পাতা খেয়ে ফেলায় জনউপদ্রব আইনে ছাগলকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সীমা শারমিন। যদিও সমালোচনার মুখে মালিককে ছাগল ফিরিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, শেষমেশ ওই জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে ইউএনওকেই। তার দাবি, জরিমানার টাকা আদায়ের জন্য ছাগলের মালিককে বারবার ডাকা হলেও তিনি আসেননি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন যে, ছাগলের মালিক অসহায়। জরিমানার অর্থ শোধ দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। এখন প্রশ্ন হলো, এই খবরটা তিনি বিচার করার সময় বা আগে কেন করেননি? 

তৃতীয় খবরের বিষয় এলজিইডির একটি প্রকল্প যেখানে ৯টি গভীর নলকূপ বসানোর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ একেকটি গভীর নলকূপের পেছনে ব্যয় ১৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এর আগে বালিশ বা হাসপাতালের পর্দাকাণ্ডের কথাও দেশবাসী ভুলে যায়নি। অর্থাৎ সব ঘটনার সঙ্গেই প্রশাসনের বা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফে বলা হচ্ছে, নলকূপ স্থাপনের এই খরচটি প্রস্তাবিত। তবে এটি ‘প্রস্তাব’ হলেও প্রশ্ন হলো এরকম একটি উদ্ভট প্রস্তাব কী করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলো? 

প্রশ্ন উঠতে পারে, জনগণের করের পয়সা আসলে কোথায় কীভাবে খরচ হচ্ছে; উন্নয়ন প্রকল্পে যেসব ব্যয় দেখানো হচ্ছে এবং কোথায় কত টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে- সেই খবর কি প্রজাতন্ত্রের মালিক হিসেবে জনগণ জানে? দু’একটি ঘটনার সংবাদ গণমাধ্যমে আসছে বলে শুভঙ্করের ফাঁকিগুলো জানা যাচ্ছে; কিন্তু এরকম আরও কত শত প্রকল্পের খরচ অজানা থেকে যাচ্ছে, তা কি আমরা জানি?

সবশেষ খবরের বিষয় সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম যাকে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য সচিবের একান্ত সচিবের কক্ষে আটকে নির্যাতন ও নিগ্রহের পরে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পাঁচদিন কারাগারে থাকার পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তাকে নিগ্রহের ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছা বেগমের সম্পৃক্ততা এবং দেশে-বিদেশে তার বিপুল সম্পত্তি খবরও গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আসতে থাকে। 

এ অবস্থায় এই আমলাকে নিয়ে ‘অসত্য’ সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে তথ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেয় সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। চিঠিতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিক হিসেবে এতে তার (জেবুন্নেছা বেগম) ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবনের মর্যাদাহানি হচ্ছে। এ কারণে অনতিবিলম্বে সব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে তার সম্পর্কে অসত্য সংবাদ, ছবি বা ভিডিও ক্লিপ প্রচার করা থেকে বিরত রাখার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

এই চিঠির সারমর্ম হলো, জেবুন্নেছাকে নিয়ে কোনো খবর প্রকাশ করা যাবে না। কারণ এতে তার সম্মানহানি হচ্ছে। অথচ রোজিনা ইসলামের মতো একজন সাহসী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিককে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় সরকারি দপ্তরে আটকে রেখে নিগ্রহ করে কারাগারে পাঠানোয় ওই সাংবাদিকের মানসম্মান যায়নি! রোজিনা ইসলামকে সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্যাতন করলেও তাতে প্রশাসনের ভাবমূর্তি ও সম্মানহানি হয়নি।

পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র কীভাবে জেঁকে বসেছে এবং তারা নিজেদেরকে কতটা ক্ষমতাবান মনে করে বা আসলেই তারা কতটা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ চিঠির সর্বশেষ লাইন- যেখানে বলা হয়েছে, জেবুন্নেছার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতে ‘নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

এগুলো ব্রিটিশ শাসনামলে জনগণের ওপর সরকারের খবরদারি করার ভাষা- যা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম এবং রাজনৈতিক সরকারের আমলে বেমানান। এই ‘নির্দেশক্রমে অনুরোধ’ বলার মধ্যে যে ঔদ্ধত্য রয়েছে, তাতে সংবিধান স্বীকৃত ‘প্রজাতন্ত্রের মালিকানা জনগণের’ বোঝায় না, বরং মনে হয় প্রজাতন্ত্র বা রাষ্ট্রের মালিক ওই প্রশাসনযন্ত্র। সম্ভবত তারা নিজেরাও এটা মনে করেন। এই ‘নির্দেশক্রমে অনুরোধ’-এর মধ্যে যে আসলে কোনো অনুরোধ নেই, বরং পুরোটাই নির্দেশ, সেটি বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন নেই।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh