অতিরিক্ত-অতিরঞ্জন

জিয়াউদ্দীন আহমেদ।

জিয়াউদ্দীন আহমেদ।

প্রাত্যহিক বিষয়গুলোকে অতিরঞ্জিত করে প্রদর্শন করার প্রবণতা বাঙালি সমাজে অহরহ দেখা যায়। রাজনীতিতে অতিরিক্ত ও অতিরঞ্জনের নাটক প্রতিনিয়ত মঞ্চায়ন হয়ে থাকে এবং এতে জনসাধারণ অনেক ভুল ম্যাসেজ পেয়ে থাকে। অবশ্য এটাও ঠিক যে, একটু অতিরিক্ত কখনো কখনো সৌন্দর্য বাড়ায়, কখনো কখনো আবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। 

শার্টের কলারটি অতিরিক্ত বিবেচিত হলেও শীতপ্রধান দেশে টাই পরার জন্য দরকার, পায়ের পাতার মাপের প্রশস্ত জায়গা হাঁটার ক্ষেত্রে সবার জন্য উপযোগী নয়। গতিকে হঠাৎ থামালে দুর্ঘটনা হয়, তাই দৌড়ের প্রতিযোগীকে ধরতে হয় গন্তব্য থেকে একটু পেছনে গিয়ে, এই অতিরিক্ত দূরত্বটি অপরিহার্য। তাই বলে সব কিছুতেই অতিরিক্ত-অতিরঞ্জন ভালো নয়। গানের কণ্ঠ ছাপিয়ে যখন আনুষঙ্গিক যন্ত্রের আওয়াজ শ্রোতার কানে বাজে তখন তা অতিরিক্ত-অতিরঞ্জন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথির পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় কী পরিমাণ বিশেষণ ব্যবহার করা হয় তা আমরা সবাই জানি, বিশেষ করে ওয়াজি হুজুরদের পরিচয়ে এমন সব শব্দ বা উপাধি ব্যবহৃত হয় যেগুলোর কিছু অর্থ বোঝা যায়, আর কিছু বোঝা যায় না। 

বেশিরভাগ সময়ে আবেগের কোনো মাত্রা থাকে না; কিন্তু বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা থাকে। অনেক সময় আকস্মিক ভালো লাগা, মন্দ লাগায় মানুষ তাড়িত হয়। আবেগের স্থায়িত্ব কম সময়ের হলেও অনেকে মাত্রা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে; অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে। জ্ঞানের স্বল্পতা, পরিমিতি বোধের অভাবই অতিরিক্ত বিষয়ের অবতারণার কারণ- একে বলা হয় অতিনাটকীয়তা। সাহিত্যের শিল্পগুণও নষ্ট হয় অতিরিক্ত আবেগে বিন্যস্ত সংলাপ, ঘটনার সংযোজনে। বিয়োগান্তক কাহিনির সমাপ্তিতে মৃত্যুর ঘনঘটায় অতি নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। একটি কক্ষে একটির পরিবর্তে দশটি ক্যালেন্ডার টাঙানো হলে তার গুরুত্ব আর থাকে না; কিন্তু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে কক্ষে বই ছড়িয়ে এলোমেলো অবস্থায় থাকলেও তা অতিরিক্ত মনে হয় না। বিষয়ের বিন্যাস অবশ্য ব্যক্তি রুচি ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে রুচির ভিন্নতা থাকলেও কিছু অতিরিক্ত সব সময় সকলের কাছে দৃষ্টিকটু বা শ্রুতিকটু মনে হয়। 

প্রয়াত রাজনৈতিক নেতাদের মাজারে ফুলের তোড়া দেয়ার সময় নেতা-কর্মীদের ধাক্কাধাক্কি কুরুচির পরিচায়ক। সাধারণ কর্মীরা মিডিয়ায় চেহারা দেখানোর জন্য আগ্রহান্বিত হতেই পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত নেতারা এত হেংলা হয় কী করে। কোন একজন দলীয় নেতা বক্তব্য দেয়ার সময় তার পেছনে অন্য নেতারা দাঁড়ানোর জন্য ঠেলাঠেলি করতে থাকেন। এটা না হয় রাজনৈতিক বিশ্বস্ততার পরিচায়ক, কিন্তু মন্ত্রীর করোনা টিকা নেয়ার সময় এত লোকের ভীড় জনতা কেন সহ্য করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন টিকা দেন তখন সেই দৃশ্যে শুধু জো বাইডেন আর টিকা প্রদানকারী নার্সকে দেখতে পাই। অন্যদিকে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর টিকা দেয়ার সময় এক ঝাঁক লোক গিজগিজ করে। শুধু মন্ত্রী কেন, যে কোনো স্থানীয় নেতা টিকা নেয়ার সময়ও তাদের তোষামোদকারীকে ঠেলাঠেলি করতে দেখা যায়। পুকুরে মাছ ছাড়ার সময়, গাছ রোপণের সময়, রোপণের পর পানি দেয়ার সময় অনেককে সহায়তা করতে দেখা যায়; কিন্তু রিলিফ দেয়ার সময় নেতাকর্মীদের কর্মকান্ড দেখলে হাসি চাপিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। একটি ছোট পুঁটলিতে হাত লাগায় কমপক্ষে দশজন নেতাকর্মী। দর্শকদের লজ্জাটা বেড়ে যায় তখন যখন ছবি বা ভিডিও করার জন্য প্রদেয় পুঁটলিটি গ্রহীতার হাতে সহজে ছাড়ে না- টান দিয়ে ধরে রাখে। 

বাঙালির স্বভাব অদ্ভুত; নর্দমা পরিষ্কার বা মশার ওষুধ ছেটানোর সময়, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের প্রাক্কালে বা রাস্তা সংস্কারে গর্ত করার দৃশ্য দেখার জন্য বাঙালিদের ভিড় জমে যায়। এই বাঙালিই আবার ডাস্টবিনের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় নাকে হাত দিয়ে দুর্গন্ধ রোধ করে। করোনার সময় অযথা ঘোরাঘুরি করা লোকদের পুলিশ কীভাবে বিতাড়ন করে তা দেখার জন্য জনতা রাস্তায় নামে, শহরের এই মানুষগুলোকে ঘরে ঢোকাতে রাস্তায় রাস্তায় পুলিশের টহল বাড়াতে হয়। কোথাও আগুন লাগলে জনতার অযাচিত ভিড়ের জন্য আগুন নির্বাপক গাড়ি অকুস্থলে ভিড়তে পারে না। বন্যায় শুকনো জায়গায় আশ্রয় নেয়া নিরীহ পশুগুলোকে পেটানোর সময় নিষ্ঠুর লোকগুলোর সঙ্গে শিশুরাও উৎসবে মেতে উঠে। চোর বা ছিনতাইকারী সন্দেহে কারও দিকে কেউ অঙ্গুলি নির্দেশ করার সঙ্গে সঙ্গে শত শত লোকের কিল-ঘুষি পড়ে যায়, বাছবিচার করার কারো কোন আগ্রহ থাকে না। কয়েক বছর আগে মতিঝিল বিমান অফিসের সামনে ছিনতাইকারী সন্দেহে কয়েকজনকে তাদের মোটরসাইকেলসহ পুড়িয়ে দেয়া হয়; ধর্ম অবমাননার মিথ্যা দায়ে একজনকে পিটিয়ে মারার পর রাস্তার ওপর নিয়ে উৎসব করে পোড়ানো হয়। 

ঔচিত্যবোধ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে অতিরিক্ত-অতিরঞ্জন থাকবেই। কোন অনুষ্ঠানে একটি চেয়ার বড় ও উঁচু থাকে; ওই চেয়ার প্রধান অতিথির জন্য। সেই চেয়ারে আবার বিরাট টাওয়াল দিয়ে ঢাকা থাকে। এমন সজ্জা না থাকলে প্রধান অতিথি মনক্ষুণ্ন হন। একই মঞ্চে এমন বিসদৃশ দৃশ্য অন্যদের জন্য অপমানজনক। তবে বাঙালির অপমান বোধ কম। অফিসেও কর্মকর্তারা তাদের বসার চেয়ারে তোয়ালে রাখেন, যিনি যত বড় অফিসার তার তত বড় তোয়ালে। এই অশ্লীল রীতির প্রচলন কবে শুরু হয়েছে তা স্পষ্ট করে বলা যাবে না। এমন তোয়ালে আবার মাথার তেলের দাগ দেখা যায়, হাত মোছার চর্বির দাগও থাকে। কোনো কোনো নেতা বা আমলার বসার চেয়ার দেখলে মনে হয়, তারা সকলে বড় ও বিদঘুটে চেয়ার দিয়ে তাদের পদের বড়ত্বের প্রমাণ করতে চান। 

অতিরিক্ত স্নেহ, ভালোবাসাও বিরক্তি উৎপাদন করে। বহুকাল আগের একটি ঘটনা- সকাল, দুপুর, বিকেলে রুমের দরজা নক করে অতিথির খোঁজ নেয়ার কারণে সুন্দরবন হোটেল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মেহমানরা অন্য হোটেলে চলে যান। অতিরিক্ত নজরদারি করলে, চব্বিশ ঘন্টা খোঁজ-খবর রাখলে প্রেমেরও ইতি ঘটে। অতিরিক্ত দাঁত মাজার কারণে দাঁত নষ্ট হয়ে যেতে পারে, অতিরিক্ত খাবার খেলে শরীরে মেদ জমে, অতিরিক্ত ভিটামিন সি খেলে হতে পারে নানাবিধ সমস্যা। তেমনি অতিরিক্ত প্রশংসা রাজনীতিকে কলুষিত করে তোলে। জাতীয় সংসদে সাংসদদের বক্তৃতায় যাকে লক্ষ্য করে স্তুতি তারও লজ্জা লাগার কথা, স্পিকার বারবার মূল কথায় আসার তাগিদ দিলেও অনেক সাংসদ তা করেন না। বাস্তবতা হচ্ছে, মনোযোগ আকর্ষণের বাড়াবাড়ি প্রশংসা বিরক্তি উৎপাদন করতে পারে। অতিরঞ্জিত প্রশংসা তোষামোদ বা চাটুকারিতায় পর্যবসিত হয়। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অক্ষম এই সকল ব্যক্তিদের তোষামোদ করার কৌশলটি জানা না থাকায় এরা পরিশেষে পরিহাসের পাত্র হয়ে যান, জ্ঞান-গরিমা এবং আত্মসম্মানবোধ না থাকায় পরিহাসটুকুও বুঝতে পারেন না। অতিরিক্ত মানেই কৃত্রিম, ভেজাল কিংবা অনান্তরিক। অতিরিক্ত ভীতি, অতিরিক্ত সাহস, অতিরিক্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অতিরিক্ত তোষামোদ করার মানসিকতা বাঙালি জাতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্রশংসাকারী এবং প্রশংসিত ব্যক্তি উভয়েরই সত্য-মিথ্যা, উচিত-অনুচিত যাচাই করার মত মেধা ও সাহস থাকা জরুরি। আমাদের সকলের প্রত্যাশা শিক্ষিত বাঙালির অতিরিক্ত সবকিছু পরিত্যাগ করার দক্ষতা বাড়ুক, তোষামোদের সংস্কৃতি বন্ধ হয়ে প্রশংসার সংস্কৃতি চালু হোক।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh