গার্মেন্টস শ্রমিকদের টিকা পাওয়া থেকে যেন বঞ্চিত করা না হয়

ফরিদা আখতার।

ফরিদা আখতার।

গার্মেন্টস শিল্প এবং তাতে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কোভিডের কারণে যে লকডাউন বা বিধিনিষেধ এই পর্যন্ত ঘোষণা হয়েছে তা ২০২০ সালে সাধারণ ছুটির প্রথম অংশ ছাড়া আর কার্যকর হয়নি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, এই শিল্প বিদেশের ‘বায়ার’ নির্ভর, তারা পোশাকের অর্ডার দিলে তা যে কোনো মূল্যে সময় মতো সরবরাহ করতে হবে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের বাজার সংকুচিত হয়েছে তবুও ব্র্যান্ডের ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে। কোভিড-১৯ সব ধরনের পেশার মানুষকে সংক্রমিত করে, কিন্তু গার্মেন্টস শ্রমিকদের করে না, এমন একটি ধারণা বিজিএমইএ থেকে দেয়া হয়। তাদের যুক্তি, গার্মেন্টস শ্রমিকরা বয়সে তরুণ এবং তারা গরিব। বয়সে তরুণদের কোভিড-১৯ সংক্রমণ কম হয়, এবং গরিবদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি ইত্যাদি। তবে এমন যুক্তি প্রমাণের জন্য কোনো প্রকার টেস্ট করানো হয়নি। চল্লিশ লাখ শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৫০০০ জনকে পরীক্ষা করানো হয়েছে, এবং এর মাত্র ২৯৯ জনের পজিটিভ এসেছে। তাদের ধারণা পোক্ত করার জন্য এই তথ্য যথেষ্ট। বিজিএমইএ নিজেই টেস্ট করে, এখানে সরকার কোনো দায়িত্ব কেন নেয় না সেটা বোধগম্য নয়। জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে রেখে দেয়ায়, ৪০ লক্ষ শ্রমিকদের সবার টেস্ট আর করানো হয়নি। লকডাউন ঘোষণা এলে তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ফ্যাক্টরি চালান বলে দাবি করা হয়। তারা বলেন, ফ্যাক্টরিতে প্রবেশের আগে তাদের তাপমাত্রা মাপা হয়, মাস্ক পরে কাজ করে, দূরত্ব বজায় রাখে, তাহলে কোভিড সংক্রমণের কোনো জায়গাই নেই; কিন্তু তারা জানে না, এই শ্রমিকরা তাদের বাড়ি থেকে দলে দলে এক সঙ্গে হেঁটে কারখানায় আসে, বাজারে যেতে হয় শাক-সবজি কেনার জন্য। পরের দিন আবার কারখানায় আসেন। কারখানার স্বাস্থ্যবিধি দিয়ে তাদের কতখানি সুরক্ষা দেয়া সম্ভব? কারখানার বাইরে থেকে সংক্রমণের বিষয়টি দেখা হচ্ছে না। 

এবার আসি টিকা দেওয়ার প্রশ্নে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিকরা। এই দাবি তাদের ন্যায্য মজুরির দাবির মতোই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে তাদের জীবন-মরণের প্রশ্ন। গত ১৭ জুন তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে এই দাবি তুলেছেন। তারা দাবি করেছেন যে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে, কারণ যতই বিধিনিষেধ থাকুক তারা কাজ চালিয়ে নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচ্ছল রাখেন। বলা যায় তাদের বাধ্য করা হয়, নইলে চাকরি হারাবার ভয় থাকে, বেতন না পাওয়ার বিষয় থাকে। তাদের সাধ্য কি এই আদেশ অমান্য করার! 

অন্যদিকে জানুয়ারি মাসেই গার্মেন্টস মালিক সমিতির নেতারা সরকারের কাছে দাবি করেছেন ১০ হাজার টিকা গার্মেন্টস মালিক এবং তাদের পরিবারের জন্য বরাদ্দ করার। তাদের এই দাবি তারা পেশ করেছিলেন বেক্সিমকোর কাছে, কারণ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আমদানির চুক্তি বেক্সিমকো করেছে। তাদের ধারণা টিকা কাকে দেওয়া হবে না হবে তা ঠিক করে দেবে বেক্সিমকো। অথচ এটা কোন প্রাইভেট টিকাদান কর্মসূচি নয়, এটা সরকারি কর্মসূচি, সেটা বিজিএমইএর ব্যবসায়ীরা ভুলে গেছেন। তারা দাবি করেন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গার্মেন্টস কারখানা চালান, তাদের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন এবং কেউ কেউ মারাও গেছেন। কাজেই তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া উচিত। 

জুন মাসের শুরুতে সরকার ২০২১-২২ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা করেছে; কিন্তু ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ হাজার কোটি টাকার এত বিশাল বাজেটে শ্রমিকদের জন্য ১২০ নম্বর প্যারায় মাত্র গোটা ১২ লাইনে অল্প কিছু দায়সারা কথা আছে। এবং আরও হতাশার বিষয় হচ্ছে শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থার কোনো প্রতিফলন নেই বাজেটে। দুঃখজনক হচ্ছে বাজেটে বলা হয়েছে যে ‘শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশের অধিকাংশ কল কারখানা চালু রেখে শ্রমিকদের বেতন ভাতা সময়মতো পরিশোধ করা হয়েছে এবং শ্রমিক ছাটাই ও শ্রমিকের কর্মহীনতা রোধে একাধিক প্রণোদনা প্যাকেজ গ্রহণ করা হয়েছে।’ এই কথাগুলো কি ঠিক? শ্রমিকদের এখনো ন্যায্য বেতন-ভাতার জন্য রাস্তায় নামতে হয়। তাদের ওপর রাবার বুলেট চালানো হয়। সম্প্রতি জেসমিন নামের এক শ্রমিকের মৃত্যুর কথা আমাদের ভুললে চলবে না। গার্মেন্টস মালিকরা যত প্রণোদনা পেয়েছেন, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের কথা বলা হলেও শ্রমিকরা ঠিক মতো বেতন কখনই পায়নি। ঈদের আগে বেতন পেতেও তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। করোনা মহামারিতেও বেতন না পাওয়ার কারণে শ্রমিকরা যখন বিক্ষোভ সমাবেশ করে সেখানে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা তো দূরে থাক, কেউ মাস্ক পড়ে স্লোগান দেবেন এমন কল্পনা করা যায় না। কাজেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খোলা রেখে করোনা সংক্রমণ থেকে দূরে রাখার যে দাবি সরকার করে, সেটা বেতন ভাতা ঠিকমতো না দেওয়ার কারণে গার্মেন্ট শ্রমিকদের সংক্রমণের দিকে ঠেলে দেয়া হয় নাকি? সেটা জেনেও মালিকদের এই আচরণ সরকার কীভাবে গ্রহণ করেন সেটাই একটা বড় প্রশ্ন। 

বাজেট ঘোষণার পর শ্রমিকরা হতাশ হয়ে ওয়েবিনার করেছে ‘বাজেট তেলেসমাতি শুধু মালিকের জন্য হয়, শ্রমিকের জন্য নয়’ শিরোনামে। এতে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ তাদের হতাশা ব্যক্ত করেন তাদের মতো করে। ওয়েবিনারের শিরোনামটাই যথেষ্ট শ্রমিকরা বাজেট সম্পর্কে কী মূল্যায়ন করেছেন। 

টেস্টের বেলায় গার্মেন্ট শ্রমিকদের পেছনে রাখা হয়েছে, ভ্যাকসিন বা টিকার ক্ষেত্রেও তাই হবে এমন আশঙ্কা শ্রমিকরা সংগত কারণেই করছেন। এবং সেকারণে টিকার দাবি নিয়েও তারা রাস্তায় নেমেছেন। মহামারী নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে টিকা দেওয়ার ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কমপক্ষে ৭০% মানুষ টিকার আওতায় আনতে হবে, তাহলে জনগোষ্টীর একটি বড় অংশ এই রোগের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি অর্জন করতে পারবে। এ বছর জানুয়ারি মাসে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৭০ লাখ ডোজ টিকা দেয়া শুরু হয়েছে। একই টিকা উপহার হিসেবে পেয়েছে ৩৩ লাখ ডোজ। সেই টিকা দুই ডোজ করে ৪৩ লাখ মানুষকে দেওয়া হয়েছে। 

ভারতে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে নিজ দেশে ব্যাপকসংখ্যক টিকা দিতে গিয়ে ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েও টিকা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক দেন দরবার করে চীনের সিনোফার্মের টিকা বাংলাদেশ ১১ লাখ ডোজ পেয়েছে। এই টিকা দুই ডোজ করে সাড়ে ৫ লাখ মানুষকে দেওয়া যাবে। তাছাড়া করোনার টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স থেকে বাংলাদেশ ফাইজারের টিকা পেয়েছে ১ লাখ ডোজ। অর্থাৎ মাত্র ৫০ হাজার মানুষকে এই টিকার দুই ডোজ করে দেওয়া সম্ভব হবে। সিনোফার্ম ও ফাইজারের টিকা দুই ডোজ করে ৬ লাখ মানুষকে দেওয়া যাবে।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, সিনোফার্ম ও ফাইজারের টিকার দুই ডোজ করে মোট ৪৯ লাখ মানুষ টিকা পাচ্ছেন, যা দেশের জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশ। হার্ড ইম্যুনিটি অর্জন করতে হলে আরও ৬৭% মানুষকে টিকা দিতে হবে যা এখনো অনিশ্চিত হয়ে আছে। সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে সন্দেহ নেই। তবে এখন দেখার বিষয় এই স্বল্প সংখ্যক টিকা ব্যবস্থাপনায় কারা অগ্রাধিকার পায়। 

এবং সেখানেই ভয়। একদিকে যেমন স্বাস্থ্য কর্মীদের দেওয়া দরকার তেমনি গার্মেন্টস শ্রমিকরাও দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকা উচিত নয়। আশা করি, সেটা থাকবে না। গার্মেন্টস শ্রমিকরা অগ্রাধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন, সেই আশা করছি।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, উবিনীগ।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //