নিজ জন্ম-সাফাইয়ের খোঁজে

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ মানে ১৯৭১ সালের আগে যা পূর্ব পাকিস্তান ছিল আর তারও আগে যা ছিল পূর্ববঙ্গ- এই পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গের আমরা কী করে পড়ব ও জানব? অন্তত আমাদের নিজেদের ভাষ্যেই তা পড়তে হবে। যদিও এমনিতেই একটি দেশে ইতিহাসের মূল ন্যারেটিভ ঠিক বা একই রেখেও কিছু প্রসঙ্গে কয়েকটি ভাষ্য থাকতে পারে। এমন ভিন্নতা থাকে। তবে মোটকথা নিজের দেশের লেখা ভাষ্যে মূল বিষয়গুলোর ন্যারেটিভ মোটা দাগে একই থাকে। তবে ভিন্ন দেশের ভাষ্য হলে সেখানে মোটা দাগে ভিন্নতা হতে পারে; কিন্তু আবার ইতিহাসের ভাষ্যমাত্রই তা উপস্থাপনের মধ্যে কিছু কমন দিক মানতেই হয়। যেমন যে কারও দেশের জন্মের ইতিহাসটা নিজের কাছে ও নিজের চোখে ইতিবাচক হতেই হয়। কারণ এটি আত্ম-অস্তিত্বের প্রশ্ন, সেলফ-ইন্টারেস্টের প্রশ্ন। নিজ জন্মের পক্ষে নিজ সাফাই দিতেই হয়, এক ইতিবাচক ইতিহাস-ভাষ্য সেটি হতেই হয়। কারণ, ঠিক যেমন জীবিত মানুষ নিজেই বলতে পারে না যে, তার নিজের জন্মই হয়নি। এটি অর্থহীন। এটি অনেকটা সেরকম। ‘এই ভাষ্য’ সে নিজে গ্রহণ করতে পারে না। নিজে নিজেরই অস্তিত্ব নাই, এ কথা বলা যায় না, বললে এর মানে হয় না।

জন্মানোর পরে এ কারণে কেউ বলে না যে, আমার জন্মটা হয়নি বা জন্মানোটা ঠিক হয়নি। এটি অন্যরা পারে হয়তো যেহেতু তার দায় নাই; কিন্তু নিজে একথা বলা যায় না, সেটি অর্থহীন ও আত্মবিরোধী হবে বলে। নিজের অন্তত একটি জন্ম-সাফাই-ভাষ্য হাজির করার দায় নিজেকে নিতেই হয়। যদিও এটি বলতে পারে যে, তার জন্মের এটি বা সেটি ঘাটতি-খামতি আছে। যেমন কলকাতার ইতিহাস ভাষ্য এমন হতেও পারে যে, পূর্ব পাকিস্তান হওয়া ঠিক হয়নি; কিন্তু সাবধান, সাতচল্লিশ সম্পর্কে কলকাতার সেই ভাষ্য আবার পূর্ব পাকিস্তানের ভাষ্য বলে গৃহীত হতে পারবে না। এ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব ও আলাদা ভাষ্য থাকতে হবে। তবে আবার হতে পারে সেটি ঠিক মুসলিম লীগের ভাষ্য নয় হয়তো; কিন্তু মজার দিকটা হলো, প্রগতিবাদী চোখের তৈরি পূর্ব পাকিস্তানের জন্ম-অস্তিত্ব সম্পর্কে তার নিজস্ব ও আলাদা কোনো ভাষ্য বা সাফাই নেই। তারা তা তৈরি করেনি বা করতে দেয়নি; কিন্তু তাহলে? নিজের ইতিহাস-ভাষ্য তো প্রত্যেকেরই একটি লাগবেই। অবাক কাণ্ড হলো- কলকাতার ভাষ্য, ‘স্বদেশী ইতিহাস’ নামে যেটি কলকাতার সাফাই সেটিকেই পূর্ব পাকিস্তানেরও সাফাই ভাষ্য বলে এদেশে এটি অনেকে ব্যবহার করতে চেষ্টা করে। অন্তত একাডেমিক পাঠ্য ইতিহাসে। এ দিক থেকে ভাবলে মনে হয়, প্রগতিশীলতারও বাইরে আর কী ভাষ্য হতে পারে সেদিকেও চোখ খুলে রাখার একটি দায় আমাদের আজও থেকে গেছে। 

আমাদের রাজনৈতিক নেতা কারা? আমাদের বলতে ঠিক কবে থেকে আমাদের? যেমন ধরা যাক ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ভাগের আগে থেকে শুরু করে এরপরের যদি পূর্ব পাকিস্তানের কালপর্ব এবং বাংলাদেশ হিসেবে পার করা কাল মিলিয়ে পুরোটিও যদি ধরি? আমাদের রাষ্ট্রের জন্মযুদ্ধ বিজয়ের প্রায় অর্ধশতবার্ষিকীর প্রাক্কালে ক্ষীণভাবে হলেও আজ দেখা যাচ্ছে, শেখ মুজিব ছাড়াও এসব আমলের পুরনো আমাদের জনগোষ্ঠীগত নেতা ও ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সম্ভবত আরও কমপক্ষে তিনজন নেতার নাম বলা যায়। তারা হলেন শেরেবাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। আমাদের সমাজের সব দলের পক্ষ অর্থে সর্বসাধারণের মনে এই তিন নেতাদের সম্পর্কে কোথাও সমালোচনা নাই ব্যাপারটা এমন নয় হয়তো। তবু এদেরকে আমাদের জাতীয় নেতা বলে মানতেও সাধারণ একটি বোঝাবুঝি এখনো আছে সম্ভবত আমরা এখনো তা দেখতে পাই। এর একটি বড় কারণ, এমনিতেই পাকিস্তান জন্মের পরের, ১৯৫৪ সালের প্রথম সারা পাকিস্তানব্যাপী নির্বাচন লড়তে গিয়ে সবার আগে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গড়ে নিতে পারা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঐক্যের ঘটনা। মানে, মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে সেকালের সংগঠিত হওয়া সারা পূর্ব পাকিস্তানের একক নির্বাচনী জোট হতে পেরেছিল যুক্তফ্রন্ট, আর এই জোটগড়ার মূল কারিগরই ছিল এই তিন নেতা। সে হিসেবে তারা প্রাসঙ্গিক নেতা আজও। 

১৯৫৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে বাংলাপিডিয়া বলছে, ‘প্রাদেশিক পরিষদে মোট ৩০৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে। পক্ষান্তরে, ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগমাত্র ৯টি আসন লাভ করে’। আর, ‘যুক্তফ্রন্টের ২২৩ জন নির্বাচিত সদস্যের মধ্যে ১৩০ জন ছিলেন আওয়ামী লীগের’। কোন আওয়ামী লীগ?

এটি ছিল ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন গঠিত মওলানা ভাসানী-শামসুল হকের আওয়ামী মুসলিম লীগ। যার মধ্যে আবার আতাউর রহমান খান, খন্দকার মোশতাক আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান, একে রফিকুল হোসেনসহ অনেকেই এর অন্যতম নেতা ছিলেন। বলা হয় এদের পেছনে সোহরাওয়ার্দীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই দলে আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের সক্রিয় উপস্থিতিই এর প্রমাণ। যদিও ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তফ্রন্ট গড়ার কথাবার্তা সামনে এসে পড়ার আগ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ফেরেননি বা ঢাকার রাজনীতিতে আবির্ভূত হতে দেখা যায়নি। অবশ্য সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগ নেতাদের নোংরা খেলায় পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথাও শোনা যায়। 

তবে ফজলুল হক কখনো ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ করেননি। কেবল সবার আগে তিনি একটি ‘কৃষক শ্রমিক পার্টি’ নামে দল সংগঠন করে নিয়েছিলেন, যাতে ৮-১২ মার্চের [যুক্তফ্রন্ট- বাংলাপিডিয়া] নির্বাচনে ওই দল নিয়েই তিনি যুক্তফ্রন্ট গড়ে তাতে অংশ নিতে পারেন। এভাবেই তিনি যুক্তফ্রন্টে নেতা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাপিডিয়া ১৯৫৪ সালের নির্বাচন সম্পর্কে বলছে, যুক্তফ্রন্ট আসলে পূর্ব বাংলার পাঁচটা বিরোধী দল নিয়ে গঠিত হয়েছিল- মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ, এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক পার্টি, মওলানা আতাহার আলীর নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম, হাজী মোহাম্মদ দানেশের নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রী দল এবং খিলাফতে রব্বানী পার্টি। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হলে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, পরে ১৯৫৬ সালের দিকে সোহরাওয়ার্দীও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এরা কিন্তু কেউই ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি। 

তবে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী এ দু’জন ১৯৬২ সালের আশপাশেই (ফজলুল হক ১৯৬২ আর সোহরাওয়ার্দী ১৯৬৩ সালে) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আর তাদের তুলনায় ভাসানী প্রবল তৎপর থেকে সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করে ১৯৭৬ সালে মারা যান। 

আর সুনির্দিষ্ট করে ফজলুল হকের কথা বললে, তিনি মূলত মুসলিম লীগ ঘরানার বাইরের নেতা হয়েই থাকতে চেয়েছেন। যদিও মুসলিম লীগের জন্মের সময় ১৯০৬ সাল থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে চেষ্টা করেছেন; কিন্তু যতই লীগের ওপর জিন্নাহর প্রভাব বেড়েছে ততই তিনি দূরে নিজেকে আলাদা করেছেন। ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন ও প্রাদেশিক সরকার গড়ার সুযোগ আসার সময় তিনি মুসলিম লীগ নয়, কৃষক প্রজা পার্টির হয়ে নির্বাচন করেছেন। পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের জন্য প্রদেশে বরাদ্দ আলাদা ১১৭ আসনের মধ্যে তার দল ৩৫ আর মুসলিম লীগ ৪০ আসন পেলেও ফজলুল হক প্রথম কংগ্রেসকে এ জোটে পেতে আগ্রহী ছিলেন; কিন্তু পাননি বলে শেষে মুসলিম লীগের সঙ্গেই সরকার গড়েছিলেন; কিন্তু (১৯৩৭-৪৩) পুরো প্রথম প্রাদেশিক সরকারের কালে তিনটি সরকার (যার দুটিই আবার হকের নেতৃত্বে) গঠন হয়েছিল, আর প্রায় সব সময়ই দ্বন্দ্ব-সংঘাতের নানান ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে গেছেন। যদিও ১৯৪৭ সালের আগস্টের মধ্যে তিনবার তিনি মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছেন আবার বের হয়ে গেছেন। যতটুকু জানা যায়, জিন্নাহর সঙ্গে বা জিন্নাহকে নেতা মেনে বা তার অধীনে ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবন কখনো ভালো যায়নি। তিনি স্বস্তিবোধ করেননি জিন্নাহর সঙ্গে থাকতে। এরই প্রথম প্রকাশ হলো- ১৯৩৫ সালে তিনি নির্বাচনী রাজনীতি শুরু করেছিলেন মুসলিম লীগের বাইরে থেকে কৃষক-প্রজা পার্টি গঠন করে। আবার কৃষক স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তিনি বাকি সবার চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। আসলে অবিভক্ত ভারতের সময়কালে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এলিট-আশরাফদের বাদ দিয়ে বললে মূল দুই নেতা ছিলেন- ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী। যাদের মধ্যে ফজলুল হক মূলত কৃষক-প্রজা স্বার্থের নেতা আর সোহরাওয়ার্দী মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক প্রথম মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি- যার জন্ম হচ্ছিল, তাদের নেতা। 

অবিভক্ত ব্রিটিশ-ভারতের বাংলায় প্রাদেশিক নির্বাচন হয়েছিল মাত্র দু’বার ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে, যেখানে ‘ভারত শাসন আইন’ এর অধীনে প্রাদেশিক নির্বাচন ও সরকার গঠিত হয়েছিল, যা ছিল ‘ভারত শাসন আইন’- এর সর্বশেষ ১৯৩৫ সালের সংশোধিত সংস্করণ। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার কারণে দ্বিতীয় ও শেষ নির্বাচনটি কিছুটা দেরিতে ১৯৪৬ সালে হয়েছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ ১৯৪৬-এর নির্বাচনটিই। কারণ সেবার আর বিভক্তি নয়, সে নির্বাচনটিতে বাঙালি মুসলমানের প্রায় সব অংশকেই মুসলিম লীগ নিজের পতাকাতলে সমবেত করতে পেরেছিল। এমনকি ফজলুল হকও মুসলিম লীগের বাইরের দল-প্রক্রিয়ার লোক থাকেননি। যোগ দিয়েছিলেন। অথচ এই ফজলুল হকই আবার ১৯৩৭-৪৩ সালের সরকারের সময়কালে এক পর্যায়ে সব হারিয়ে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে হাত মিলিয়েও কোয়ালিশন সরকার গড়েছিলেন।

কমবেশি একই ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরে মুসলিম লীগের সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। যদিও তখনকার মুসলিম লীগের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের মূল নেতা কারুরই আর এক রাজনীতি থাকেনি। ফলে একই সম্পর্ক আর থাকেনি। গুরুত্বপূর্ণ অনেক সময়ই ফজলুল হক আওয়ামী মুসলিম লীগ বা আওয়ামী লীগ করেননি। তবে ১৯৫৪ সালের একমাত্র যুক্তফ্রন্ট হিসেবে তিনি আবারও নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। এককথায় বললে, সবসময়ই বাস্তবতা যা ছিল তা হলো- ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী ও (পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরে) ভাসানী এরা একত্র থাকলেই একমাত্র পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ আদায় সম্ভব ছিল। তাতে বাংলার স্বার্থের বিরোধী বলতে সেটি পশ্চিম পাকিস্তান অথবা অবিভক্ত ভারতের কংগ্রেস যেটাই হোক। অথচ এটিই তারা বিশেষত দু’জন কখনই বজায় রাখতে পারেননি। তাই সর্বশেষ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ৯০ শতাংশের বেশি আসন পেয়েও সে বিজয় ধরে রাখতে পারেনি। শেষে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির পর থেকে হক-সোহরাওয়ার্দী দু’জনই রাজনীতি থেকেই চিরবিদায় হয়ে যান। ১৯৬২-৬৩ সালের মধ্যে দু’জনেরই মৃত্যু হয়। 

অবশ্য যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৫ সাল থেকেই সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভী হয়ে ওঠেন। যুক্তফ্রন্টের মূল দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন। অথচ তিনি সেটিই আপস করে ফেলেন। জিন্নাহ-লিয়াকত উত্তরসূরিদের বাইরে পশ্চিম-পাকিস্তানে ভিন্ন ধারার সঙ্গে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। আর ততদিনে পাকিস্তানের আসরে আমেরিকার উপস্থিতি ঘটে যাওয়ায় সেই মধ্যস্থতায় এই আপসী ক্ষমতা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি; কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন; কিন্তু ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি। এককথায় বললে, পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরে সোহরাওয়ার্দী আর কখনই পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়াতে পারেননি।

হক-সোহরাওয়ার্দীর পাশাপাশি অবিভক্ত ভারতের বাঙালি মুসলমান আরও দু’জন- আবুল হাশিম ও মওলানা আকরাম খাঁ ছিলেন মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা; কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো দু’জনই স্বাধীন পাকিস্তানে আর ভূমিকা রাখতে পারেননি, হারিয়ে গেছেন। পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগকে সাংগঠনিকভাবে গণভিত্তি দেবার মূল কৃতিত্বের ভূমিকাটা ছিল মূলত আবুল হাশিমের; কিন্তু দুটি ডি-মেরিট তাকে ১৯৪৭ সালের পর আলাদা করে ফেলেছিল। প্রথমত, তিনি মূলত বর্ধমানের মানে পশ্চিমবঙ্গের, ফলে তার নির্বাচনী আসন হিসেবে তিনি ছিলেন ওপার বাংলার। দ্বিতীয়ত, শারীরিকভাবে তার দৃষ্টিশক্তি প্রকট সমস্যা হয়ে তাকে কাঁবু করে ফেলেছিল। তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে মারা যান। বাংলাদেশের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক, নেতা ও ইতিহাসের লেখক বদরুদ্দীন উমরের পিতা তিনি। পূর্ববঙ্গের মুসলমান তরুণ যারাই অবিভক্ত ভারতে কলকাতায় পড়তে গিয়ে কমিউনিস্ট হয়েছিলেন এদের প্রায় সবাই কলকাতায় আবুল হাশিমের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছেন। বিশেষত (১৯৪৩-৪৭) যখন তিনি বাংলা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

অন্যদিকে, আকরাম খাঁর বেলায় দুর্ভাগ্য হলো, মুসলিম লীগের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপরীতে থাকার কারণে মুসলিম লীগের ভূমিধস পরাজয়ে সব শেষ হয়ে যায়। ভারত বিভক্তির পরে তিনি মুসলিম লীগের প্রাদেশিক সভাপতি ছিলেন। তাই ১৯৫৪ সালের পরাজয়ের পরে তিনি রাজনীতি থেকে হারিয়ে যান। 

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরে (১৯৪৭-৬২) হক-সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরে প্রধান ধারার রাজনীতি ও ক্ষমতায় মওলানা ভাসানীই ছিলেন একমাত্র লোক, যিনি ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সক্রিয় রাজনীতিতে টিকে ছিলেন। আর তরুণদের মধ্যে থেকে উঠে আসেন শেখ মুজিব। আবার সোহরাওয়ার্দী তাঁর গুরু বলে গুরুর জীবিতকালে তিনি নিজে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন নাই। আর এই নিজে হাল ধরা আবির্ভাবটাই অর্থপূর্ণভাবে ঘটতে ঘটতে ১৯৬৬ সাল লেগে গিয়েছিল।

এখন মওলানা ভাসানীর কথায় আসা যাক। পাকিস্তান জন্ম নেওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন আসাম প্রদেশের মুসলিম লীগের সভাপতি, তাই ওদিকের রাজনীতিবিদ; কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে ১৯৪৯ সালের জুনে নতুন দল আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন তিনি। ভাসানী আসলে যতটা না নিজে নেতা তার চেয়ে বেশি অন্য এক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পছন্দের নেতা। তখন সবচেয়ে বড় এক রাজনৈতিক গোষ্ঠী ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। বলা হয়ে থাকে বহুবার জেলে যাওয়াতে সেখানেই কমিউনিস্টদের সঙ্গে ভাসানীর ব্যাপক আলাপ, পরিচিতি, যোগাযোগ এবং পরস্পরকে জানাচেনা ঘটেছিল আর সেখান থেকেই কমিউনিস্টদের পছন্দের নেতা হন ভাসানী।

কমিউনিস্টদের এক বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো ‘গণসংগঠন’ যে শব্দ অন্য অ-কমিউনিস্ট প্রায় কেউই ব্যবহার করে না বললেই চলে। মানে কমিউনিস্টদের এটি হলো, খাওয়ার দাঁত আর দেখানোর দাঁত আলাদা করে রাখার এক ব্যবস্থা। কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক দলের নাম কমিউনিস্ট পার্টি হওয়াই স্বাভাবিক; কিন্তু এরা অন্য দলে ঢুকেছিল অথবা অন্য নামে দল খুলে তার ভেতরে ঢুকে বসেছিল কমিউনিস্টরা। তেমন অন্য নামে দল খুলে বসা দলই হলো ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ অথবা পরে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ যা সংক্ষেপে (ন্যাপ)। মানে খুলে বসা দল- এটিই হলো কমিউনিস্টদের দেখানোর দল। আর এই ‘দেখানোর দলের’ সিদ্ধান্ত কী নেওয়া হবে তা ঠিক হয় আরেক গোপন ছোট দলে সেটিই কমিউনিস্ট পার্টি। স্বাধীন পাকিস্তানে মুসলিম লীগের বাইরে প্রথম রাজনৈতিক দল, সবচেয়ে সক্রিয় বিরোধী দলটিই ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’- এটিই হলো খুলে বসা এক দেখানোর দল। তবে তা আবার একটি নয়, দুটি ধারার রাজনীতির মিশ্রণে দাঁড় করানো হয়েছিল; ১. পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট ২. পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগারদের বড় প্রাক্তন একটি অংশ যারা জিন্নাহবিরোধী- এদের মিলিয়ে গড়া এক গণসংগঠন।

কেন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হলো

ব্যাপারটি আরেকটু ভেতরে থেকে বুঝতে হলে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ের পটভূমিকাটি বুঝে নিতে হবে আগে। হবু সমগ্র পাকিস্তানের মুসলিম লীগের মূল নেতা ছিলেন, জিন্নাহ-লিয়াকত (লিয়াকত আলী খান) এই পরিচিতি ও প্রভাব তারা তৈরি করতে পেরেছিলেন ও তা বজায় রেখেছিলেন। আগেই বলেছি এই নেতৃত্বের সঙ্গে ফজলুল হক ১৯৩৭ সাল থেকেই সম্পর্ক রাখতে স্বস্তি পাননি বা পারেননি। অর্থাৎ মুসলিম লীগের সঙ্গে বিরোধ কমিয়ে রেখে কাজের সম্পর্ক রেখে চলতে পারেননি। তাই বাস্তবতা হলো যে, বাংলার মুসলমানেরা নিজেদের ভোট আলাদা করে দিতে পারলেও এর সুফল কাজে লাগাতে লীগ-প্রজা দল একসঙ্গে কাজ করতে পারেনি বলে কিছুই কাজে আসেনি। বিরোধ-সংঘাতেই দিন গেছে। আবার পরের ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মোট ১১৭ আসনের ১১৩টি এবার একা মুসলিম লীগ পেলেও পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ নেতাদের সঙ্গে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছিল। জিন্নাহ-লিয়াকত চেয়েছিলেন পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র করার ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব পূর্ববঙ্গের ফলাফলকে কাজে লাগাতে; কিন্তু এর বিপরীতে হক বা সোহরাওয়ার্দী ব্যাপারটিকে দেখেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের কাছে নিজেদের স্বতন্ত্র ক্ষমতা ও প্রভাব ক্ষুণ্ণ বা কমে হেরে যাওয়া হিসাবে। ফলে তারা চেষ্টা করেছেন দেশভাগে পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র যদি হয়ে যায়, তাহলে হবু পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের ভেতরে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেয়ে কলকাতার অমুসলমান যে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে আলাদা কোয়ালিশন গড়ে সেখান থেকে ভাগ জোগাড় করতে; কিন্তু সোহরাওয়ার্দী ঘটনাবলি সেদিকে গড়িয়ে নিতে বা নিজের জন্য কোনো সুবিধা বের করতে পারেননি। সম্ভবত এর মূল কারণ সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিগত নির্বাচনী আসন কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলমানেরা হলেও তিনি যে প্রাদেশিক সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এর মূল বিরাট নির্বাচনী আসন তো মূলত পশ্চিমের বঙ্গ নয়, পূর্ববঙ্গ। আবার কলকাতায় বসে থাকা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে দেশভাগ বা পাকিস্তান আলাদা হবার পক্ষে কাজ করবেন, জিন্নাহর হাত শক্তিশালী করবেন এই ভূমিকার মধ্যে সোহরাওয়ার্দী নিজ স্বার্থ দেখেন নাই। এটি তার কাছে কষ্টকল্পিত। এর চেয়ে বরং সোহরাওয়ার্দী চেয়েছেন কলকাতার কংগ্রেসের বাইরে অমুসলমান প্রো-জমিদারি শক্তিদের সঙ্গে কোয়ালিশন গড়তে। 

আর এতেই সবমিলিয়ে চরম অখুশি হয়েছেন জিন্নাহ। আর সে কারণে তৎপর হয়েছেন হক বা সোহরাওয়ার্দী- এদের সবার বাইরে নবাব বা খাজাদের গ্রুপের মধ্যে থেকে পূর্ববঙ্গের নেতা বের করে আনতে। যারা বাড়তি সুবিধা হিসেবে জিন্নাহ ও পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের সহজেই আনুগত্য ও অধীনস্ততা মেনে নেতা হবেন। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অবিভক্ত ভারত ভেঙে আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানের স্বার্থে অবস্থান নেওয়ার দিক থেকে জিন্নাহর পতাকা সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে বেশি উজ্জ্বলই হবে। ঠিক তাই হয়েছিল। সাতচল্লিশের দেশভাগ, পাকিস্তান আলাদা জন্ম নেওয়ার ঘটনা- এটি কলকাতায় বসেই সোহরাওয়ার্দীকে দেখতে হয়েছিল। এর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনোদিকেই তিনি কোনো সক্রিয় পদক্ষেপ বা ভূমিকা নিতে পারেননি। যদিও তিনি ভেবেছিলেন কলকাতায় তিনি বন্ধু-কোয়ালিশন খুঁজে বের করে কিছু করতে পারবেন; কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি। পাকিস্তান হয়ে যাওয়ার পর কলকাতাই সোহরাওয়ার্দীকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। কারণ তখনকার কলকাতা ইতিমধ্যে ভরপুর হিন্দুত্বে ডুবে গেছে, যেখানে কোনো কোণেই সোহরাওয়ার্দীকে আর তাদের দরকার ছিল না। সোহরাওয়ার্দী না ঘরের না ঘাটের হয়ে পড়েন। আর তার অনুসারী বা গ্রুপের এমনকি আরেক নেতা আবুল হাশিমের অনুসারীদের ঢাকায় ফিরে এসে নতুন করে জিন্নাহর মুসলিম লীগবিরোধী নতুন দলের জন্ম ও যোগ দিতে হয়েছিল। এটিই ভাসানীর সভাপতিত্বের ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগ। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা হলো, প্রকৃতপক্ষে মুসলিম লীগ কোনো নীতিগতভিত্তিতে গড়ে তোলা দল হওয়ার চেয়ে ব্যক্তিত্বভিত্তিক দলই ছিল। তাই রাজনৈতিক অবস্থানের ঐক্য প্রায় ছিল না বললেই চলে। এর মধ্যে আবার হক-সোহরাওয়ার্দীর মধ্যেও ন্যূনতম অবস্থানের নীতিগত অনৈক্য- এটি হয়েছিল আরও মারাত্মকভাবে। 

তাহলে ভাসানীর নেতৃত্বে যে আওয়ামী মুসলিম লীগ সেখানে প্রাক্তন মুসলিম লীগারদের নেতা কি ভাসানী, নাকি ভাসানীর নতুন অনুসারী হয়েছিল প্রাক্তন মুসলিম লীগাররা? 

এর জবাব আর যাই হোক প্রাক্তন মুসলিম লীগাররা ভাসানীর নতুন অনুসারী হননি। তাহলে ভাসানী কে? কাদের নেতা? সঠিক ভাষ্য হবে কমিউনিস্টদের গণসংগঠন হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ যা কমিউনিস্টরা বানিয়েছিল, আর তারাই মওলানা ভাসানীকে তাদের গণসংগঠনের সভাপতি বানিয়েছিল। আর প্রাক্তন মুসলিম লীগাররা তাতে যোগ দিয়েছিল। তাহলে মূল এই কমিউনিস্ট- এরা কোথা থেকে এলো? এরা আবার কারা? আর তারা পেছনে কেন?

শেখ মুজিবের আত্মজীবনীতে তাঁর বাল্যবন্ধুর কথা আর তাঁর কিশোরকালের অনেক ঘটনার বর্ণনা আছে। যেখান থেকে আমরা ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের আগের পূর্ববঙ্গের সমাজ কিভাবে হিন্দু-জমিদারের সামাজিক-রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যে পরিচালিত হয়ে থাকত এর কিছু চিত্র দেখতে পাই। শেখ মুজিবসহ মুসলমানদের সেখানে সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে নিচু দেখানো হয়েছে- অর্থাৎ ‘প্রজা’ হিসেবে চিত্রিত। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ওই ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সাল থেকে এই হিন্দু-জমিদার-আধিপত্যের ‘হাতের’ পরিণতি কী হয়েছিল? নিজের অঙ্গুলি হেলনে সমাজপাড়া প্রতিবেশের ক্ষমতা পরিচালিত করার ‘গণ্যমান্যদের’ অর্থাৎ হিন্দুদের প্রচণ্ড হঠাৎ অভাব দেখা দেওয়াই স্বাভাবিক। বরং এতদিন সমাজে আধিপত্য চালানো গণ্যমান্য হিন্দুদের প্রথম ধাক্কায় দেশত্যাগ করে কলকাতা চলে যাওয়ার ফেনোমেনাই মুখ্য ছিল তা অনুমান করে নেয়া যায়। এভাবে একদিনেই সামাজিক ক্ষমতা-আধিপত্য হারানোর পরে সেই সমাজেই পুরাতন হয়ে থাকতে চাওয়াদের ন্যূনতম সামাজিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার পরিণতিই হলো তাদের ‘কমিউনিস্ট হয়ে যাওয়া’। কেন? 

ধর্ম পশ্চাতপদ ব্যাপার, এর তুলনায় কমিউনিজম অগ্রসর, প্রগতিশীলতা। এই হয়ে উঠেছিল সে সময়ের নতুন চাল্লু বয়ান। এই বয়ানের আড়ালে থেকে জমিদারি হারানো হিন্দু জনগোষ্ঠীর নিজেকে পুনর্গঠিত করে সমাজে টিকে থাকবার জন্য ন্যূনতম ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একমাত্র উপায় হয়ে উঠেছিল; কিন্তু একটি বিরাট অসুবিধাও আবার ছিল। পুরনো জমিদারি-উৎস থেকে পাওয়া ক্ষমতাচর্চাকারী হিন্দুরাই পাকিস্তানের জন্মের পর সব ক্ষমতা হারিয়ে নতুন করে আবার দল খুলে সামনের সারিতে থাকাটা স্বস্তিকর মনে করে নাই। স্পষ্ট করে তা সবার চোখে পড়ার ভয় ছিল। তাই খোদ কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই পেছনে আড়াল অবস্থান নিয়েছিল। পাবলিক অ্যাক্টিভিটি কম যেন হয়, গোপন সংগঠন এমনভাবে চলত। আর গণসংগঠনের বেলায়? অর্থাৎ সেটি তো পাবলিকলি হাজির থাকার প্রতিষ্ঠান, একজন মওলানার মাধ্যমে কমিউনিস্টদের হাজির থাকাই সবচেয়ে উপযুক্ত বিবেচনা করেছিলেন তারা। পূর্ব পকিস্তানে আওয়ামী মুসলিম লীগ জন্মের অন্তত একবছর আগে ৬ মার্চ ১৯৪৮ কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম। 

যদিও অনেকে মনে করতে পারেন, কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান সরকারের আমলে নিষিদ্ধ করে রাখা ছিল সেজন্যই হয়ত গণসংগঠন ধারণার আবির্ভাব। না, সেটি একটু ভুল হবে। কারণ কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান সরকারের হাতে নিষিদ্ধ হয়েছে ১৯৫৪ সালের ৯২ (ক) ধারা প্রয়োগে। [দেখুন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ১৯৫৪ সালে ৯২-ক ধারা জারি এবং প্রদেশে গভর্নরের শাসন চালু হলে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।] আর এর আগে ১৯৫১ সালের মার্চে (এর আগে নয়) পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মূলত পশ্চিম অংশ) সামরিক ক্ষমতা দখল করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে মূল নেতারা সব গ্রেফতার হয়ে যান। তাই বাকি নেতারা নিজে থেকেই প্রকাশ্য তৎপরতা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলে। যেটিকে অনেকে সরকারের দল নিষিদ্ধ করে রাখা বলে বুঝতে ভুল বা প্রপাগাণ্ডার শিকার হতে পারে। আবার যেমন যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির ৭ প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন কিন্তু দলের নামে নয়। অতএব, কমিউনিস্ট পার্টি বাধা না থাকলেও নিজেই সবার আগে গণসংগঠন হিসেবে হাজির হয়ে তৎপর থাকতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর এভাবে নিজ কমিউনিস্ট পার্টির নামে দলের তৎপরতায় পাবলিক উপস্থিতি হিসেবে হাজির থাকাটা কমিয়ে ফেলেছিল।

এদিকে পরবর্তিতে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পরের বছর ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের এক সম্মেলন হয়েছিল। যেখানে নতুন কমিটির প্রেসিডেন্ট- সেক্রেটারি হয়েছিলেন ভাসানী ও শেখ মুজিব। অর্থাৎ পাকিস্তান হবার পরে সোহরাওয়ার্দী সবসময়ই শেখ মুজিব প্রমুখদের সামনে দিয়ে নিজে পেছনে থেকেছেন। আসলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় (যা মূলত পশ্চিমের কুক্ষিগত) ক্ষমতার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের কোনো সমঝোতা বা একসঙ্গে কাজের সম্পর্ক গড়ার শেষ সুযোগটাও নষ্ট হয়ে যায় ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পরে ধীরে ধীরে। ২১ দফা দাবিতে যুক্তফ্রন্টের ওই নির্বাচনের ফলাফল থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান দাবি হয়ে উঠেছিল ‘স্বায়ত্তশাসন’।

পাকিস্তান জন্মানো ও গঠন বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়ে জানান দিয়েছিল তখন থেকেই। ওদিকে আগেই বলেছি পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান সোহরাওয়ার্দীর কাছে কখনই নিজ কনষ্টিটিউয়েন্সি বা স্বার্থ হয়ে উঠতে পারেনি। এটিই অন্যভাষায় বললে, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন তার কাছে কখনো কোনো ইস্যুই হয়নি; কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা- মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হওয়া। তাই ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি (৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন আদায় হয়ে গেছে বলে) পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে কোয়ালিশন করে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান; কিন্তু সেটিও ১৪ মাসের বেশি টিকাতে পারেননি। তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ হয় এখানেই।

জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে মারা গেলে যোগ্য সঙ্গী লিয়াকত আলী খান তার জায়গা নিয়েছিলেন। তার অনুসারীরা, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব-পাকিস্তান সামলাতে গেলে হেরে যাবার সম্ভাবনা আছে, তা জেনে দেরিতে হলেও ১৯৫৪ সালের নির্বাচন দিয়েছিল। এমনকি পরে ১৯৫৬ সালের সংবিধান রচনা করার দিকেও গিয়েছিল। তাদের আগাবার পথ-পরিকল্পনা অংশ ছিল সেটি। এটিই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে একটি রফা করার তাদের শেষ চেষ্টা। তাদের কল্পনা ও লক্ষ্য ছিল যে, সোহরাওয়ার্দী এ কাজে তাদের সাহায্যকারী সম্ভাব্য নেতা হতে পারেন। ফজলুল হককে মুখ্যমন্ত্রী আর সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী ইত্যাদি সবই তারা করেছিল কিন্তু সবই ব্যক্তি হিসাবে। অথচ পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠন ও কাঠামো বা মেকানিজমগত যত ত্রুটি তৈরি করে ফেলেছেন তা পূর্বকে চাপে ফেলে সমাধা করার পথ ধরেন তারা। ক্ষমতার কাঠামো বা এর ব্যবহার কাঠামোতে কোনো সংস্কারে মনোযোগ দেননি তারা।

ইতিমধ্যে আরও বড় কিছু সমস্যা তৈরি করে ফেলেছিলেন তারা। ততদিনে কোল্ড ওয়ার তুঙ্গে। সোভিয়েত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজোট বা লেনদেন বাণিজ্যের ব্লকে রাষ্ট্রগুলোকে ভাগ করে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিল। অথচ উপরের এই জোট ভাগাভাগির লড়াইয়ের ভেতর অভ্যন্তরীণভাবে কমিউনিস্টরা ভাসানীকে মাথার ওপরে রেখে একই গণসংগঠন আওয়ামী লীগ আর সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মঞ্চ শেয়ার করে থাকতে রাজি হলেন না। সোহরাওয়ার্দীকে প্রবল সমালোচনা ও জবাবদিহিতায় উপড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য যে সম্মেলন হয়- সেটিই কাগমারী সম্মেলন। এখানকার সার বক্তব্যটা ছিল- সোহরাওয়ার্দী দুই পাকিস্তানের সংঘাত বিরোধের কোনো সমাধান তো নয়ই, বরং সমস্যাকে বাড়ানো। কারণ এটি পাকিস্তানের ভেতরের সমস্যাকে কোল্ড ওয়ারের আন্তর্জাতিক বিরোধে ঢুকিয়ে তার অংশ করে ফেলেছে। অতএব, ভাসানী আসসালাম আলাইকুম!

তাই মার্কিনিদের পরামর্শে পাকিস্তানকে সিভিলিয়ান শাসনে আগানো এটি আর কোন অপশন মনে করার সুযোগ দেখেনি। এতে সোহরাওয়ার্দী আর তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন না। আইয়ুবের মিলিটারি শাসনই একমাত্র পথ হয়ে যায়। 

এখানে খুব সংক্ষেপে বলে রাখি, আইয়ুব দশক, বাইশ পরিবারের হাতে শিল্পায়নের ভিত্তি দেওয়া ইত্যাদি যা আমরা শুনেছি- সেটিই ছিল লিয়াকত আলী খানের স্বপ্নের শিল্পায়িত পাকিস্তান। তবে আমেরিকান ইকোনমিক মডেল অর্থে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামো, বৈষম্যের সমাধান করা অর্থে এটি বলা হচ্ছে না। 

কমিউনিস্টরা আওয়ামী লীগকে আর তাদের গণসংগঠন ভাবতে না পেরে নতুন এক গণসংগঠন খুলে নেয় যেটি একান্তই কেবল কমিউনিস্ট পার্টির, যার নাম ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ সংক্ষেপে ন্যাপ। তবে ঘটনাটি ঘটেছিল দুই ধাপে। প্রথম পর্যায় ছিল ১৯৫৭ ফেব্রুয়ারিতে কাগমারি সম্মেলনে প্রকাশ হয়ে পড়া বিরোধে। যেখানে ভাসানী ও কমিউনিস্টদের তোলা অভিযোগ হলো, সোহরাওয়ার্দী ও তার অনুসারীরা দলের ও যুক্তফ্রন্টের গৃহীত জোটনিরপেক্ষ নীতি ভেঙেছেন। তাই ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। আর ওই বছরই ১৯৫৭ সালের জুলাইয়ে আলাদা সম্মেলন ডাকেন আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় ন্যাপ। 

ইতিমধ্যে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক আইন জারি হওয়াতে রাজনৈতিক তৎপরতা স্থগিত ও আইয়ুবের ‘বেসিক ডেমোক্রেসির’ তৎপরতা আড়ালে পড়ে আগের সব ধারার রাজনীতিরই ছেদ-পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। এটি আবার খোলা শুরু করেছিল ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, সোভিয়েত মধ্যস্থতায় তাসখন্দ আপস চুক্তি, বিরোধী সবদলেরই ওই যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য আইয়ুবকে দায়ী করে সোচ্চার হয়ে ওঠা আর সর্বোপরি আইয়ুবের শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া ইত্যাদি কারণে।

ইতিমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো- এই প্রথম শেখ মুজিব আওয়ামী লীগকে নিজের নেতৃত্বে সাজিয়ে নিয়েছিলেন। শুধু তাই না, তিনি মুখ্য ইস্যু হিসাবে হাজির করেছিলেন তার ১৯৬৬ সালের ছয় দফা। তবে এখানে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগকে নিজের নেতৃত্বে সাজিয়ে নিয়েছিলেন বলতে যা বোঝানো হয়েছে তা হলো, সাতচল্লিশের আগে থেকে মুসলিম লীগ, নামে যা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও তৎপরতা শুরু হয়েছিল তার সবচেয়ে ইতিবাচক ‘কোর মুসলিম লীগার’ ধারাটাই হাজির হয়েছিল শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগে। ‘কোর মুসলিম লীগার’ বলে যদি একটি নাম ব্যবহার করি, এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা অর্থ মুসলিম লীগার। ইসলামের দিকটিকে ভারি করে পশ্চিম পাকিস্তানি মনের অর্থে যে মুসলিম লীগার ঠিক তা নয়। তাই এই কোর অর্থে এই মুসলিম লীগের মানে যারা দেশভাগের আগের রাজনীতিটিকে জমিদারি উচ্ছেদ করে জমি পাবার আন্দোলন, চাষা-প্রজা বাঙালি মুসলমানের আত্মমুক্তির আন্দোলন হিসাবে একে এক ঝলক দেখে ফেলেছিলেন। 

ভাসানীর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তাঁর সংগঠিত করার ক্ষমতা ও আন্দোলন গড়ার ক্ষমতা। জীবনে অজস্রবার তিনি তাঁর এই ক্ষমতা দেখিয়েছেন; কিন্তু এই ক্ষমতাকে কাজ লাগানো তাঁর বিপ্লবী বন্ধুরা করতে পেরেছেন এমনটা দাবি করতে পারবেন না; কিন্তু অন্য দলের লোকেরা সঠিকভাবেই তাঁকে ব্যবহার করতে পেরেছেন।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে সফল গণঅভ্যুত্থান হিসেবে হাজির করেছেন ভাসানী। ভাসানী অতুলনীয় গণআন্দোলন রচনাকারী নেতা, তাঁর সংগঠন মাস মুভমেন্টের। আওয়ামী লীগ ভাসানীর গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিয়ে নেতা শেখ মুজিবকে জেল থেকে মুক্ত করায় যা পরিশেষে মুজিবকেই স্বাধীনতার নায়ক বানিয়ে নিল।

ওদিকে আইয়ুব খান আপস করতে বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান। এতে যারা রাজনৈতিক বন্দি তাদের ছাড়া পাবার দাবি উঠবে স্বাভাবিক, নইলে আলোচনাটা হবে না; কিন্তু এক্ষেত্রে লীগের সমস্যা দ্বিগুণ। নেতা শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি, যার দায় অন্য রাজনৈতিক দল কেউ নেয়নি। আন্দোলনের ওপর আওয়ামী লীগের একক প্রভাব তেমন ছিল না; কিন্তু ন্যাপের ভাসানীর তা ছিল। তিনি গণভ্যুত্থান সফল করে দিলেন; কিন্তু কমিউনিস্টদের ভুল হলো যে, তারা আগাম সিদ্ধান্ত দিলেন ন্যাপ আলোচনার গোলটেবিলে যাবে না। অথচ এটিই পরোক্ষভাবে শেখ মুজিবকে গোলটেবিল সফলের প্রধান বিরোধীপক্ষ বানিয়ে দিল। ভাসানী যাবেন না বলে, শেষে মুজিব হয়ে গেলেন গোলটেবিলের একমাত্র নায়ক। শেখ মুজিবের এই গুরুত্ব বেড়ে যাবার কারণে একেক করে শেষে পুরো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটিই আইয়ুবকে বাতিল করে দিয়ে শেখ মুজিবকে মুক্ত করে দিতে হয়েছিল। এভাবে শেখ মুজিবই গোলটেবিল বৈঠকের প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেন। 

সারকথা

এক. ভাসানীকে কমিউনিস্ট ধারার নেতারা সবকিছু বর্জন করিয়ে থাকুক না কেন, ভাসানীর প্রথম অবদান হলো - লীগের খামতি পূরণ করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সফল করা এবং তা থেকে পরোক্ষে শেখ মুজিবের মামলা প্রত্যাহার করানো ও শেষে শেখ মুজিবকেই গোলটেবিল সফল করার প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে হাজির করা। 

দুই. সত্তরের নির্বাচন বর্জন করে ন্যাপ, আওয়ামী লীগকেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বা মুখ্য প্রতিনিধি এবং কার্যত ক্ষমতার একমাত্র প্রার্থী বানিয়ে দিয়েছিল।

তিন. সত্তরের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়। এ সময়ে ভাসানীর বিশেষ ভূমিকাটি খুবই নির্ধারক হয়েছিল। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ১০ লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু হয়েছিল। এই ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতিকে পাকিস্তানের ইয়াহিয়ারা আমাদের বিরুদ্ধে অবজ্ঞার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরে মাঠঘাট চষে বেড়িয়েছিলেন ভাসানী। আর তাতেই সারা পূর্ব পাকিস্তানের মনোভাব ঘুরে যায়। জনমত একচেটিয়াভাবে একাট্টাভাবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বাক্সমুখী হয়ে উঠেছিল যে পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬৯ আসনের ১৬৭টাই আওয়ামী লীগের পক্ষে কাস্ট হয়ে যায়। যেটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গণরায় প্রদান হয়ে উঠেছিল। কাজেই একাত্তর যেন ছিল আসলে মুজিব-ভাসানীর যৌথ উদ্যোগ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh