সামাজিক অস্থিরতা কমাতে হবে

মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার।

মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার।

পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি শিরোনাম দিয়ে শুরু করছি। (ক) ‘বাবা মা বোনকে হত্যার পর থানায় ফোন মুনের’, (খ) ‘গাইবান্ধায় হরিজন কিশোরীকে গণধর্ষণ, প্রতিবাদ’, (গ) ‘বান্দরবানে মসজিদের ইমামকে গুলি করে হত্যা, বিক্ষোভ’, (ঘ) ‘পরশুরামে ডোবা থেকে নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার, স্কুলশিক্ষক গ্রেফতার’, (ঙ) ‘মাদ্রাসাছাত্রী ধর্ষণ প্রেমিক গ্রেফতার’, (চ) ‘রাজধানীতে সাবেক ছাত্রলীগ নেতার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার’- এমন অজ্র শিরোনাম উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ১৩টি পত্রিকার তথ্য ব্যবহার করে জুন মাসে ৩২৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের খবর প্রকাশ করেছে। এভাবে প্রতিদিনের পত্রিকা খুললেই খুন, ধর্ষণ, গুম, সন্ত্রাস আর দুর্নীতির খবর যেভাবে চোখে পড়ে, তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশে এই প্রাণঘাতী করোনার মধ্যেও সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি ঘটেছে। 

করোনার আগেও যে দেশে শান্তিময় পরিবেশ ছিল এমন নয়। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত খুন, ধর্ষণ আর অপরাধের খবর অধিকতর বৃদ্ধি পেয়েছে। এ এক অদ্ভুত মানব মনস্তত্ব। ভয়াবহ মহামারির মধ্যে তো মানুষের মন নরম হয়ে যাওয়ার কথা। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা; কিন্তু ঘটনা ঘটছে তার বিপরীত। করোনাকে পুঁজি করে হচ্ছে যুগপৎ দুর্নীতি ও রাজনীতি। করোনা-পূর্ববর্তী র‌্যাবের সেভেন মার্ডার ও মাজারের টাকা লুটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাগর-রুনি, তনু, মিতু, ত্বকীসহ খুন গুমের বিভিন্ন খবর। তবে এখন আর এসব খবর আলোচিত হয় না। নতুন করে চায়ের আসর গরম করে এখন মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড, ডা. সাবরিনা, পাপিয়া, পাপুল, গোল্ডেন মনির, মুনিয়া, আনভির, পরীমনিসহ আরও অনেকে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, করোনা যত ভয়াবহ মহামারিই হোক না কেন, রোগটি মানব মনস্তত্বে পরিবর্তন এনে ভীতি সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। 

করোনার আবির্ভাবের পর বর্ধিত মাত্রায় যুক্ত হয়েছে কিশোর অপরাধী গ্রুপের সংখ্যা ও তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এখন আর এদের কর্মতৎপরতা কেবলমাত্র রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই। বিভাগ, জেলা উপজেলাতেও এ অপতৎপরতা ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অলস কিশোর শিক্ষার্থীদের অনেকে নতুন করে কিশোর অপরাধী গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে। অদ্ভুত সব নাম নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন নতুন কিশোর অপরাধী গ্রুপের ইভ টিজিং, ভো ভো মোটরসাইকেলের শব্দ এবং ছিনতাই আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নাগরিক সমাজের স্বাভাবিক চলাফেরা বিঘ্নিত হচ্ছে। সৃষ্টি হয়েছে এক সামাজিক নৈরাজ্য ও অস্থিরতার। অনেক শিক্ষার্থী হতাশায় ভুগছেন। অনেকে মানসিক চাপ নিতে না পেরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। অনেকক্ষেত্রে ঘটেছে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও; কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব তরুণ ও যুবক শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ব্যস্ত রাখতে পারলে এরা অস্বাভাবিক পথে যেতে পারতেন না। 

সরকারি ব্যর্থতার জায়গাগুলো ঢাকতে কেউ কেউ করোনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন। আসলে করোনার জন্যই কি কেবল অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে? প্রথম দিকে করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতাও করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি করেছে। করোনার এন নাইন্টিফাইভ মাস্ক নিয়ে, পিপিই, টিকা ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়েও সরকার সুবিধাজনক পলিসি গ্রহণ করতে পারেনি। প্রথম থেকে দেশের সুযোগ্য ফার্মাসিস্টদের ব্যবহার করে টিকা উৎপাদনের উদ্যোগ নিলে আজ হয়তো নিজ প্রয়োজন মিটিয়ে বাংলাদেশ টিকা রফতানি করতে পারত; কিন্তু তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। টিকা দিতে চাইলেও টিকা সংগ্রহ করতে না পারায় নাগরিক সমাজ মানসিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছেন। তবে করোনা তো কোনো অজেয় ব্যধি নয়। এমনিতেই আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের শারীরিক রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা শক্তিশালী। এমন জনগোষ্ঠীকে যদি সচেতন করে তোলা যায়, স্বাস্থ্যবিধিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা বৃদ্ধি করা যায়, তাহলে করোনা যে দেশের বিরাট ক্ষতি করে ফেলবে এমনটা না ভাবাই ভালো। ভবিষ্যতে করোনা একটি অসুখ হিসেবে থাকলে থাকবে; কিন্তু এ নিয়ে দুর্নীতি ও রাজনীতি হবে কেন? আর তারই উপসর্গ হিসেবে সমাজে অস্থিরতাই বা ছড়িয়ে পড়বে কেন? 

 রাজনীতিবিদরা আসল সমস্যার জায়গাগুলোতে কাজ না করে কেবল করোনার ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের দায়িত্বশীলতা এড়িয়ে যেতে চাইছেন। গণতন্ত্রের ব্যাকরণ অনুযায়ী কোনো দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে সে দেশে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে। এ কথা কেউ বলেন না কেন যে, বর্তমান সরকার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর গণতন্ত্র চর্চায় জোর না দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনের যে উদ্যোগ নিয়েছিল তা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এর ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার মধ্য দিয়ে সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে। গণতন্ত্রের সুস্থ চর্চা সুনিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনৈতিক উন্নতি যে টেকসই হয় না সে বিষয়টি সরকারের অনুধাবন করা উচিত ছিল। বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া জোরদার করে গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হিসেবে বিবেচিত নির্বাচনকে ধ্বংসের কার্নিশে ঠেলে দিয়ে যে প্রকৃত উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয় এ বিষয়টি রাজনীতিবিদদের অনুধাবন করা উচিত। এ ছাড়া গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য পরমতসহিষ্ণুতা ও সহনশীলতার সংস্কৃতি বাংলাদেশি রাজনীতিতে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব কারণে বর্ধিত সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অপহরণ, চোরাচালান, ধর্ষণ, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, মাদকাসক্ত, করোনার নেগেটিভ সনদপত্র বিক্রি ও বিভিন্ন রকম অপরাধপ্রবণতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনকে নষ্ট করে দিচ্ছে। স্বীকার করতে হয়, অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে পোশাকধারী বাহিনীর ভূমিকা আছে। আবার এ সত্যও স্বীকার্য, নাগরিকদের নৈতিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগ্রত না করে কেবলমাত্র আইন-কানুন ও পুলিশ-র‌্যাব দিয়ে সামাজিক শান্তি সুনিশ্চিত করা যায় না।

বড় বড় দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংকের টাকা লুটকারী এবং দ্রব্যমূল্যের সিন্ডিকেটবাজদের শাস্তি না হওয়ায় তারা অব্যাহতভাবে দুর্নীতি করতে সাহস পায়। ১৯৯০-পরবর্তী সামরিক শাসনোত্তর সিভিলিয়ান সরকারগুলোর আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুর্নীতিকারীরা কি কোনো রকম সাজা পেয়েছে? বিশেষ করে শেষ দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা দুর্নীতিতে জড়িত ছিল তাদের কোনো সাজা হতে দেখা যায়নি। সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আজ নিয়ম শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে নৈরাজ্য ও সামাজিক অস্থিরতা। আগামী নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয় তাহলে সামাজিক অস্থিরতা আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। কাজেই সরকার যদি সত্যই সামাজিক অস্থিরতা দূর করে সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে তাকে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হতে হবে। আর এ জন্য প্রথমেই সরকারকে ইনক্লুসিভ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রকৃত রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসতে হবে।

সামাজিক অস্থিরতা দূর করার ইচ্ছে থাকলে সরকারকে এখনই নির্বাচনে কাগজের ব্যবহারবিহীন বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহার পরিহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আর সে সঙ্গে দলীয় ব্যবস্থাধীনে নির্বাচন না করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা না হলেও ভিন্ন কোনো নাম দিয়ে সবার মতামত নিয়ে একটি অস্থায়ী নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা উদ্ভাবনে সরকারের মনোযোগী হতে হবে। এমন নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করলে এমনিতেই সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে সামাজিক অস্থিরতা হ্রাস পাবে।


লেখক: অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh