রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের ভূমিকা

ভারতে হিন্দুত্ববাদ আর গো-রক্ষার রাজনীতি

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

মধ্যযুগে আর প্রাচীন যুগে রাজনীতিতে ধর্মের যে প্রভাব ছিল, সেটা এখন আর নেই। ভারতে প্রাচীন যুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের যেরকম ভয়াবহ দাঙ্গা দেখা গেছে বা মধ্যযুগে ইউরোপ-এশিয়ায় যে ধর্মযুদ্ধ চলেছে আর যেভাবে রক্তপাত ঘটেছে, তা এখন কমে গেছে। ধর্মের দ্বারা এখন মানুষকে খুব কম উদ্বুদ্ধ করা যাচ্ছে। বরং ধর্মের জায়গাটা দখল করেছে পুঁজিবাদের ছত্রছায়ায় বাজার সংস্কৃতি। ধর্মের প্রভাব সেখানে খুবই ক্ষীণ। মানুষের চিন্তাচেতনা, মানুষের পোশাক-আশাক, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন সবই প্রভাবিত হচ্ছে বাজার সংস্কৃতির বিজ্ঞাপন দ্বারা। বাজার সংস্কৃতি প্রভাব ফেলছে এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ওপর। মানুষের জীবনে ধর্মের যতটা প্রভাব তার চেয়ে বহুগুণ প্রভাব বাজার সংস্কৃতির, সবচেয়ে ধার্মিক ব্যক্তিটিও বাজার সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলতে পারে না। বাজার সংস্কৃতির পাশাপাশি ধর্মের চেয়ে জাতীয়তাবাদী ধারণা এখন বেশি প্রভাবশালী। জাতীয়তাবাদের কারণে গত ২শ’- ৩শ’ বছরে রক্তপাত বেশি ঘটেছে। 

বিগত ১১০ বছরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ধর্মীয় কারণে রক্তপাত ঘটেছে কম। সবচেয়ে বেশি রক্তপাত ঘটিয়েছে জাতীয়তাবাদের ধারণা। জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদ প্রায় সবক্ষেত্রেই হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে। প্রথম মহাযুদ্ধ আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ধর্মীয় কোনো কারণে ঘটেনি। দুটি মহাযুদ্ধে যত ক্ষতি আর রক্তপাত ঘটেছে, গত দেড়শ’ বছরে এত রক্তপাত আর কোনো ঘটনায় ঘটেনি। ধর্মের প্রভাব রাজনীতিতে এখন খুব কম, সেটাই তার প্রমাণ। পুঁজিবাদ তার স্বার্থে সারাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত ঘটাচ্ছে আর তার দায় চাপাতে চাইছে ধর্মের ওপরে। বিশেষ করে মুসলিম জঙ্গিবাদকে সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তারা। পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীরা নিজেরাই আসলে সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটাচ্ছে আর তারাই বড় হত্যাকারী। গত দেড়শ’ বছরের বিশ্বের ইতিহাস আর পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে এসব সত্য প্রকাশ করে; কিন্তু এই পুঁজিবাদীরাই মুসলিম জঙ্গিবাদকে বিরাট করে তুলেছে নিজেদের প্রচার মাধ্যম দ্বারা। 

রাজনীতিতে ধর্র্মের প্রভাব নেই তা বলা হচ্ছে না, প্রভাবটা ক্ষীণ। সারাবিশ্বেই তা একইভাবে প্রমাণ করা যাবে। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে সাম্রাজ্যবাদের অত্যাচার যেখানে সবচেয়ে বেশি, সেখানেই জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিতে বাধ্য হয় নিজের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য। ফলে সাম্রাজ্যবাদীদের বানানো গল্পে বা শাসকশ্রেণির চালবাজিতে আস্থা রাখা চলবে না। বাংলাদেশে যতই জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় উন্মাদনার কথা শোনা যাক, এটা একটা ভয়াবহ প্রচার। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বলতে বুঝানো হয় কট্টর-মুসলমানদের কথা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব কতটুকু? বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায়, আমলাতন্ত্রে, সামরিক বাহিনীতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে তাদের কি পাত্তা আছে? এ সব স্থানে জায়গা পায় ভদ্রলোকরা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ারা। সুতরাং রাষ্ট্রের দুর্নীতি, লুটপাট বা খারাপ কাজের দায় তাদের ওপর বর্তায় না। 

বিশ্ব চলে পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণে। রাজনীতিতে ধর্মের যতটুকু প্রভাব সেটাও ঘটে পুঁজিবাদের হাত ধরেই। ধর্ম কমবেশি ব্যবহৃত হয় পুঁজিবাদের স্বার্থেই এবং অনেকটা তাদের দ্বারাই। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে ধর্ম এখন একটা আনুষ্ঠনিকতা আর এক-চতুর্থাংশ মানুষ কোনো ধর্মেই আস্থা রাখে না। যারা ধর্মে বিশ্বাসী তাদের আবার প্রায় চল্লিশ শতাংশ ধর্মীয় রীতিনীতি বা আনুষ্ঠানিকতা পালন করে না। করোনাকালে দেখা গেছে, যাদেরকে বলা হয় কট্টর মুসলমান, সেই সৌদি আরবই ধর্মীয় উন্মাদনাকে স্থান না দিয়ে বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় দিয়েছে। বরং ভারত রাষ্ট্রই তা পারেনি, করোনা মোকাবেলায় তার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নানারকম কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। ভারত বিশ্বের একটি দেশ, যেখানে বর্তমানেও রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। জন্মান্তরবাদ, জাতপাত আর গো-রক্ষার নামে ভারতের রাজনীতিতে মানুষের ওপর চলে নির্যাতন। গরু হত্যা নিয়েই ভারতে সবচেয়ে বেশি দাঙ্গা হয়েছে। গরুর মাংস রাখা আছে ঘরে এই মিথ্যা সন্দেহে আখলাককে হত্যা করা হয় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। সেই সময়ে হরিয়ানার মুখমন্ত্রী ঘোষণা করলেন যে, মুসলমানদের ভারতে থাকতে হলে গো-মাংস খাওয়া ছাড়তে হবে। এতে উৎসাহিত হয়ে স্ব-ঘোষিত গো-রক্ষকরা ‘গরু ব্যবসার’ ওপর আক্রমণ চালাল। পরিবহনে করে গরু এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কারণে বহুজনকে পেটানো ও হত্যা করা হয়। দু’জন মুসলমান মহিলা ট্রেনে মোষের মাংস নিয়ে যাচ্ছিলেন, তাদের নিগৃীহ করে থানায় পোরা হলো।(১) এ আক্রমণ শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকল না। 

ভারতে শুধু মুসলমানরা নয়, গো-হত্যা বা গরুর সঙ্গে যুক্ত নানা কারণে দলিতরা প্রায় নির্যাতনের শিকার হয়। ২০১৬ সালে কর্নাটকের চিলমাগালুর জেলায় পাঁচ জন দলিতকে বাড়িতে গো-মাংস রাখার অভিযোগে পুলিশের সামনেই পেটানো হয়। পরে পুলিশ তাদের ‘কর্নাটক গো-হত্যা নিরোধক ও গো-রক্ষা আইন, ১৯৬৪’-র ধারা প্রয়োগ করে গ্রেফতার করে। ২০১৬ সালে ১১ জুলাই গুজরাটের উনা গ্রামে গো-রক্ষকরা চারজন দলিত যুবককে নগ্ন করে লোহার চেন দিয়ে পেটায়। তাদের ‘অপরাধ’, তারা মরা গরুর চামড়া ছাড়িয়েছিল। ইতিপূর্বে ২০১৪ সালে পাঞ্জাবে গো-রক্ষকরা কিছু দলিতকে গরু পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের মুখে প্রস্রাব করেছিল।(২) ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের দলিত-বিরোধী আক্রমণের ঘটনা নানাভাবেই ঘটে থাকে। ভারতের সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে জাতপাতের প্রশ্নে কীভাবে মানুষের ওপর অত্যাচার চলে তার চিত্র পাওয়া যায়। গুজরাটে উনার ঘটনার পর দলিতরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে তারা আর গরু ভাগারে ফেলার কাজ করবেন না। সামনে নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে সরকার তখন একটা আপোষ-সূত্র খুঁজে বের করেছিল। ভারতে গরু নিয়ে এই রকম ঘটনার শুরু অনেক দিন থেকে। বিশেষ করে ইংরেজ শাসনের পর থেকে গো-রক্ষা ভারতের রাজনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে কয়েকটি ঘটনার দ্বারা সেটাই এ প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে। 

প্রাচীন ভারতের বৈদিক ধর্ম থেকে আরম্ভ হওয়া জাতপাত বা বর্ণপ্রথা সম্পর্কে অনেকে বলে থাকেন, পাশ্চাত্যের গ্রীস রোম বা আফ্রিকার মিসরে ক্রীতদাস প্রথা ছিল- বর্ণপ্রথা ঠিক তাই। কথাটার মধ্যে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। দাসপ্রথা আর বর্ণাশ্রম এক নয়। বহুজন বলেন, প্লাটো তো দাস সমাজের পক্ষে কথা বলেছিলেন। বেদ বা মনুর বর্ণপ্রথা সেই দাসপ্রথার আর এক রূপ। প্লাটো যে দাস সমাজের কথা বলেছিলেন, তা ছিল রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রে কথিত; দাসসমাজ ছিল রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা প্রবর্তিত। ভারতের বর্ণপ্রথা হলো ধর্মীয় বিধান দ্বারা গঠিত। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে তাই বিদ্রোহ করা সহজ ছিল, রাষ্ট্রের বিধানকে বিদ্রোহ করে উড়িয়ে দেওয়া যায়। ধর্মের বিধানকে অগ্রাহ্য করা কঠিন। সারাবিশ্বে দাসপ্রথা আজ আর নেই কিন্তু ভারতে বর্ণপ্রথা ধর্মীয় বিধান দ্বারা আজও স্বীকৃতভাবে টিকে আছে। ভারতের রাজনীতিতে বর্তমানেও যার প্রভাব ভয়াবহ। ব্রিটিশ শাসনে ‘ভারত শাসন আইন’ সংশোধনের জন্য ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন ভারতে আসে। কংগ্রেস এই কমিশনের বিরোধিতা করলেও দলিত সমাজ একে স্বাগত জানায়। দলিতদের ১৮টি সংগঠন সাইমন কমিশনে সাক্ষ্য দেয় ও দাবিপত্র পেশ করে, এর মধ্যে ১৬টি সংগঠন অন্ত্যজদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা দাবি করে।(৩) কারণ অন্ত্যজরা হিন্দুসমাজে নির্যাতিত হতে হতে নিজেদের হিন্দু বলে মনে করত না। যাদের কুয়ো আলাদা, পথ আলাদা, শশ্মান পর্যন্ত আলাদা, তারা কি হিন্দুদের থেকে আলাদা নয়? সেই প্রশ্নটি আম্বেদকরের মতো বহু অন্ত্যজরা সেদিন তুলেছিলেন।

দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকের (১৯৩১) পর ব্রিটিশ সরকার মুসলমান, খ্রিস্টান, শিখ, ইউরোপিয়ান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি নির্যাতিত অন্ত্যজদের জন্য আইনসভায় পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা স্বীকার করে নেয়; কিন্তু গান্ধী বাদ সাধলেন। তিনি অনশন করে আম্বেদকরের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেন। বিভিন্ন শক্তিমানদের চাপে তখন অন্ত্যজ আম্বেদকর পৃথক নির্বাচনের দাবি তুলে নিতে বাধ্য হন। ভারতের জাতপাতের প্রশ্ন তুলে ভীমরাও আম্বেদকর ভদ্রসমাজকে বলেছিলেন, ‘জাতপাতের ওপর দাঁড়িয়ে আপনারা কোনো কিছুই গঠন করতে পারবেন না। আপনারা একটি জাতি গঠন করতে পারবেন না; আপনারা একটি নৈতিকতারও জন্ম দিতে পারবেন না। জাতপাতের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আপনারা যা গঠন করবেন তা হবে ভঙ্গুর।’ (৪) হিন্দুমহাসভার সাভারকর জিন্নাহর বহু আগে প্রথম ১৯৩৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্ব প্রচারে করে বলেছিলেন, ‘ভারতে হিন্দু মুসলমান দুটি জাতি’। কথাটা কিন্তু সত্যি ছিল না। ভারতে হিন্দু-মুসলমানের বাইরে তখন কম করে আর একটি জাতি ছিল, সেটা হলো বর্ণপ্রথার অধীন ‘অন্ত্যজ বা দলিতরা’। ভীমরাও আম্বেদকর দাবি করেছিলেন, তাঁরা হিন্দু নন-ভিন্ন একটি জাতি। শিখরাও তাই দাবি করেছিলেন। বর্ণহিন্দুদের শোষণে ভারতের তিনটি জাতি তখন পৃথক নির্বাচন দাবি করেছিল-মুসলিম, শিখ আর অন্ত্যজরা। স্বাধীন ভারতে কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে পরে ভয়াবহ বিচ্ছিন্নতাবাদী লড়াই চলেছিল শিখদের।

ভীমরাও বলেছিলেন, জাতপাতের বেড়াজাল ছিন্ন করার সংগ্রাম খুব কঠিন। কারণ অন্ত্যজদের প্রতি ব্রাহ্মণদের বিদ্বেষ, ঘৃণা আর অবহেলা। তিনি বলেন, পুরোহিত ব্রাহ্মণ যেমন আছেন, তেমনি ধর্মহীন ব্রাহ্মণ আছেন। ধর্মহীন বা প্রগতিশীল ব্রাহ্মণদের সহানুভূতি স্বীকার করে নিয়েও তিনি বলেছিলেন, যিনি পোপ হবেন তিনি বিপ্লবী হতে পারেন না। কারণ তার কোনো ইচ্ছেই নেই বিপ্লবী হওয়ার। ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রায় সমানভাবে প্রযোজ্য, যিনি ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মেছেন তার যতসামান্য ইচ্ছা আছে বিপ্লবী হওয়ার।(৫) তিনি বলেন, ভারতবর্ষের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি হলো ব্রাহ্মণ জাতের স্রেফ অন্য আরেকটি নাম। এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ব্রাহ্মণ জাতেরই স্বার্থ এবং আকাক্সক্ষা পোষণ করবে, দেশের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে তারা নিজেদেরকে স্বজাতির স্বার্থরক্ষাকারী বলে মনে করবে। বাস্তব ঘটনা এটাই যে, ব্রাহ্মণদের নিয়েই হিন্দুদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি গঠিত।(৬) তিনি লিখে রেখে গেছেন, একজন হিন্দুকে শাস্ত্রের নির্দেশ মেনে চলতেই হবে। জাতপাত বর্ণ হলো তাদের শাস্ত্রের কথা। জাত ও বর্ণের বিষয়য়টি একজন হিন্দু কখনো যুক্তি দিয়ে বিচার করতে যাবে না। জাত ও বর্ণের প্রতি হিন্দুদের বিশ্বাসের ভিত্তিকে যুক্তি দিয়ে টলানো যাবে না।(৭) তিনি মনে করেন, ভারতের রাজনীতিতে শাস্ত্রের এই বিধানগুলো যুগের পর যুগ, শতকের পর শতক ধরে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে আছে। ভীমরাও তাই বলেছিলেন, হিন্দুর জন্য ধর্ম মানে হলো শুধুই নির্দেশ আর নিষেধাজ্ঞা। বেদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধর্ম শব্দটিকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তাতে তার মানে হলো, ধর্মীয় ক্ষমতা বলে জারি করা কিছু বিধান বা অনুষ্ঠানবিধি।(৮) 

স্বভাবতই মনে করা হয়েছিল, প্রাচীন এসব বিধান আধুনিক যুগে বাতিল হয়ে যাবে; কিন্তু ঘটেছিল ঠিক উল্টো। ব্রিটিশদের আগমনের পর মধ্যযুগে ঝিমিয়েপড়া বৈদিকধর্ম নতুন করে ‘হিন্দু’ নাম ধারণ করে হিন্দুত্ববাদ যেন প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদের দেখা মেলে উনিশ শতকেই আর তার ভয়াবহ রূপ ফুটে ওঠে বিশ শতকে। ব্রিটিশ শাসনে ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদের’ ধারণা প্রবল হয়ে ওঠে নানাভাবে। বর্ণহিন্দুরা ভারতে বসবাসরত বাকি সকল সম্প্রদায়কে অস্বীকার করে ‘হিন্দু’ আর হিন্দুত্ববাদকেই প্রতিষ্ঠা করতে চায়, রাষ্ট্র কাঠামোকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় প্রাচীন বৈদিক যুগে। নতুন করে এই হিন্দু জাতীয়তাবাদ স্বীকৃতি দেয় জাতপাত বর্ণপ্রথাকে, হিন্দি ভাষাকে আর গো-রক্ষার ধারণাকে। ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক শাসনভার গ্রহণ করার পর কংগ্রেস তার দু বছরের শাসনে প্রতিটি প্রদেশে হিন্দী ভাষা জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিল। হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে দক্ষিণ ভারতে তখন আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। পাশাপাশি উনিশশো চল্লিশ সালে কংগ্রেস গো-হত্যা বন্ধ করার বিষয়ে বিশেষ একটি পর্ষদ গঠন করে।(৯) ভারতে এই সময়কালে গো-রক্ষা একটি বিশেষ ধারণা হিসেবে প্রবল হতে থাকে। 

ভারতের রাজনীতিতে গো-রক্ষার নামে গত ২শ’ বছরে নানারকম দাঙ্গা আর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ভারত ভাগের পিছনেও আছে এই গো-রক্ষা আর তার সঙ্গে যুক্ত হিন্দুত্ববাদ। বিশেষ করে বিশ শতকের কংগ্রেসের কয়েকজন বিশিষ্ট নেতা গো-রক্ষা আন্দোলনকে সবচেয়ে প্রাধান্য দেন। করমচাঁদ গান্ধী, বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়, মদন মোহন মালব্য, রাজেন্দ্র প্রসাদ, পুরুষোত্তমদাস ট্যান্ডন প্রমুখ বড় বড় নেতারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শয়ে শয়ে সভা করে মূলত সাধারণ হিন্দুদের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। হিন্দু জনসাধারণের কাছে তখন প্রতিশ্রুতি দেন যে স্বরাজ এলে গো-হত্যা বন্ধ করাই হবে স্বদেশী সরকারের কাজ। গান্ধী বলেছিলেন, গো-হত্যা বন্ধ করা স্বরাজের চাইতেও তার কাছে বেশি দামি। তাঁর মতে, ‘গো-রক্ষা করাই হিন্দুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। হিন্দুরা যতদিন গো-রক্ষা করবে, ততদিনই হিন্দুত্ববাদ টিকে থাকবে।’ (১০) গান্ধী ভারতে গো-হত্যা করার পক্ষে প্রচুর লেখালেখি করেছেন আর নানারকম উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি ভারতে তাঁর রাজনীতি শুরু করার প্রথমদিন থেকেই গো-রক্ষা বা গো-হত্যা বন্ধের পক্ষে সরব ছিলেন। গান্ধীর বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, গো-রক্ষা আর হিন্দুত্ব সমার্থক।

স্বভাবতই প্রশ্ন দাঁড়ায় তাহলে ‘হিন্দুত্ব’ কী? হিন্দুত্ব আসলে একটা নতুন ধরনের ধর্মীয় রাজনীতি। ভারতবর্ষে হিন্দু বলে কোন ধর্মীয় সম্প্রদায় ছিল না। হিন্দু কথাটা হলো সিন্ধুর বিকৃত রূপ-সিন্ধু উপত্যকা বা সিন্ধু নদী। পারস্য আর গ্রিকরা ‘স’ কে ‘হ’ উচ্চারণ করত, ফলে সিন্ধু হয়ে গেল হিন্দু আর ভারতবর্ষের মানুষরা হয়ে গেল তাদের চোখে হিন্দু। কথাটার মানে দাঁড়াল, সিন্ধুর ওপর পারে যারা বসবাস করে সকলেই হিন্দু-সে যে ধর্মের লোকই হোক। মুঘলরা ভারতকে বলতো হিন্দুস্থান। কারণ হিন্দু মানে ধর্ম নয়, একটি অঞ্চল বা একটি বিরাট অঞ্চলের সমগ্র জনগোষ্ঠী। ব্রিটিশরা আসার আগে ভারতবর্ষ কখনো সেভাবে ভারত নামে পরিচিত ছিল না, এমনকি ইন্ডিয়া নামেও নয়। প্রাচীনকালে জম্মুদ্বীপ, আর্য্যাবর্ত ইত্যাদি নামেই ভারতবর্ষের পরিচয় ছিল। ভারতবর্ষে আর্যরা এসে যে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিল তা বৈদিক ধর্ম। ব্রাহ্মণরা সে ধর্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ ছিল বলে, সে ধর্মকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মও বলা হতো। সেই বৈদিক ধর্মই ব্রিটিশ শাসনে পুরোপুরি হিন্দু নামের একটি ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে গেল। ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়রা বা বর্ণহিন্দুরা ভারতরাষ্ট্রে প্রাচীন যুগে খুব প্রভাবশালী ছিল, আজও সবচেয়ে প্রভাবশালী। প্রাচীন আর মধ্যযুগের বৈদিক ধর্মই কিছুটা রূপ পরিবর্তন করে এখন হিন্দুধর্ম নাম নিয়েছে। ইংরেজদের রাজনীতি আর কূটনীতির ফলেই এটা ঘটেছে। পূর্বে হিন্দু বলতে ভারতের সকল জনগোষ্ঠীকে বোঝাতো, এখন একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বোঝায়। 

প্রাচীন যুগেই বৈদিক ধর্মের অনেক পরিবর্তন ঘটেছিল মনুর বিধান দ্বারা ঋগ্‌বেদের যুগে ভারতের বৈদিক ধর্ম যতটা উদার ছিল, মনুর বিধানের পর আর তাও থাকা সম্ভব হয়নি। মনুর বিধানের আগে পর্যন্ত নারীরা যথেষ্ট স্বাধীনতা আর আত্মমর্যাদা নিয়ে চলতে পারতো, মনুর বিধানের পর তা বাতিল হয়ে যায়। মনু শূদ্র আর নারীকে এক কাতারে নিয়ে আসেন। নারীর প্রধান দায়িত্ব সেখানে সন্তান উৎপাদন আর স্বামীর সেবা করা। শূদ্রদের প্রধান কাজ হলো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় আর বৈশ্য নামক এই তিন বর্ণকে বিনাপ্রশ্নে সেবা করে যাওয়া। প্রথম থেকেই বৈদিক ধর্মের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটা ছিল বর্ণপ্রথা। মনুর বিধানে সেটা আরও কঠোর হলো। মনুর বিধান মানেই ধর্ম দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান। বর্তমান হিন্দুধর্ম হচ্ছে সেই বৈদিক ধর্মের নতুন নাম, নতুন এক রাজনৈতিক মোড়কে। নতুন হিন্দুধর্ম অবশ্য ভদ্রঘরের নারীদের মর্যাদা অনেকটা ফিরিয়ে এনেছে কিন্তু বর্ণপ্রথাকে রেখে দিয়েছে। নতুনভাবে যুক্ত করেছে গো-রক্ষা। প্রাচীন বৈদিক ধর্মে গো-রক্ষার কোনো বিধানই ছিল না। বরং গো-হত্যা ছাড়া বৈদিক ধর্মের পূজা-পার্বন অনুষ্ঠিত হতেই পারতো না। প্রাচীন বৈদিক ধর্মে ভয়াবহরকম গো-হত্যা হতো বলেই, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে নতুন মতবাদ প্রচার করে মহাবীর আর গৌতম বুদ্ধ সহজেই বিজয় লাভ করেছিলেন। মহাবীর আর গৌতম বুদ্ধ কঠিন এক রাজনৈতিক চাল চেলেছিলেন জীব হত্যা নিষিদ্ধ করে। দু’জনেই তাঁদের ধর্মকে ব্যবহার করেছিলেন রাজনীতি হিসেবে।

প্রাচীন ভারতে যে বৈদিকদের ভিতরে গো-হত্যা চালু ছিল সেটা প্রমাণিত সত্য। প্রাচীন ভারতে গো-মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল না। ইতিহাসের আলোকে বিচার করলে দেখা যাবে, প্রথমত গো-হত্যা বন্ধের পেছনে কাজ করেছে জৈন আর বৌদ্ধধর্মের তথাকথিত অহিংস বাণী-পরে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম তা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে সেটাই বৈদিক ধর্মেরও অংশ হয়ে দাঁড়ায়। ভারতে বৈদিক পূজা অর্চনার সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত ছিল পশু হত্যা। বিশেষ করে গরু বলি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিসর্জন’ নাটকের মূল বক্তব্য লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে ভারতের মন্দিরগুলোতে বিরাটসংখ্যক পশু বলি হতো। রবীন্দ্রনাথের নাটকে সেখানে দেখা যায়, ছাগল আর মহিষ বলি দিতে। মন্দিরে বলি প্রায় নিত্যদিনই হতো। বিসর্জন নাটকে এটাও দেখা যায়, বলি দেয়ার জন্য মন্দিরের লোকরা সাধারণ মানুষের পোষা প্রাণীও জোর করে এনে বধ করত। মন্দিরের এ অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নালিশ করা চলতো না। কারণ যে জীব হত্যা করা হয়েছে ভগবানের নামে, তার বিরুদ্ধে নালিশ করা চলে না। রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘বিসর্জন’ নাটকে রাজা গোবিন্দ্যমানিক্য একা এই অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিলেন।(১১)

বিসর্জন নাটকে ছাগল বা মহিষ বলির কথা বলা হলেও, গরু বলির কথা বলা হয়নি। কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বিসর্জন নাটক লিখছেন তখন পশু হিসেবে ‘গরু’ ব্রাহ্মণ্য ধর্মে দেবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সেযুগে মন্দিরে গরু জবাই হতো না, রবীন্দ্রনাথ সঙ্গতভাবেই সে প্রসঙ্গ টানার দুঃসাহস দেখাননি। রবীন্দ্রনাথের শিশু বয়সে ১৮৭২ সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্র কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে ‘প্রাচীন ভারতে গো-মাংস’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সভাপতি। তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেছিলেন ইংরেজি ভাষায় যার শিরোনাম ছিল, ‘বীফ্ ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’। রাজেন্দ্রলাল মিত্র আজ থেকে একশো উনচল্লিশ বছর আগে যে প্রবন্ধটি পাঠ করেন ‘প্রাচীন ভারতে গো-মাংস’ নামে, তাতে তিনি শুরুর দিকেই লিখেছেন, ‘হিন্দুরা গরুকে দেবী ভগবতীর পার্থিব রূপ বলে গণ্য করেন। সুতরাং সেই গরুর মাংস ভক্ষণ করাটা হিন্দুদের কাছে এতই বীভৎস যে তাঁরা এই শব্দটা পর্যন্ত উচ্চারণ করতে চান না। তা ছাড়া গরুর রক্ত ঝরানোর প্রশ্নে এ দেশে বহু সংঘর্ষ ঘটে গেছে। এতদ্সত্ত্বেও এটা সত্য যে, এমন একটা সময় ছিল যখন গো-মাংস ভক্ষণ নিয়ে এ দেশের মানুষের মনে কোনো ঘৃণা বা বিরাগ তো ছিলই না বরং কখনো কখনো অতিথিকে গো-মাংস খাওয়ানো আতিথেয়তার উৎকর্ষ বলে গণ্য হত।’ (১২) তিনি সামান্য পরেই লেখেন, ‘যাঁরা শিক্ষিত তাঁরা জানেন যে, বেদে গোমেদ নামক এক যজ্ঞের উল্লেখ আছে, যার অর্থ গরু বলি।’ (১৩) 

প্রাচীন ভারতে রাজসূয়, বাজপেয় এবং অশ্বমেধের মতো বৃহৎ অনুষ্ঠানে গরু কাটা অপরিহার্য ছিল। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে অশ্বমেধের যে বর্ণনা আছে তাতে একশো আশিটি গৃহপালিত পশু বলি দেবার কথা বলা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে ঘোড়া, ষাঁড়, গাই, ছাগল, হরিণ ও নীল গাই ইত্যাদি। যজ্ঞে কতগুলো গুরু কাটা হতো তার হিসেবে সেখানে দেয়া হয়নি। ব্রাহ্মণ-এ আর একটি অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে যার নাম ‘পঞ্চ সারদ্যা সভা’ মানে পঞ্চবার্ষিকী শারদকালীন উৎসব। সেখানে পাঁচ দিনের আনুষ্ঠানিকতার জন্য দরকার হতো সতেরোটি পাঁচ বছর বয়সের চূড়াবিহীন বামনাকৃতি ষাঁড় এবং তিন বছরের কম বয়সের সতেরোটি বামনাকৃতি বাছুর। ষাঁড়গুলোকে শুদ্ধিকরণের পর ছেড়ে দেওয়া হতো এবং বাছুরগুলোকে যথারীতি শুদ্ধ করার পর প্রতিদিন তিনটি করে বলি দেওয়া হতো। বাকি দুটিকে শেষ দিনের সমাপ্তি উপলক্ষে বলি দেওয়া হতো। সামবেদের তাণ্ড্য ব্রাহ্মণে এই অনুষ্ঠানের উল্লেখ আছে।(১৪) 

শাক্য সিংহ বা গৌতম বুদ্ধ পশু হত্যা নিষেধ করলেও জানা যায় নিজে গরু ও শূকরের মাংস খেতেন।(১৫) ঋগ্‌বেদে গো-হত্যার জন্য নির্দিষ্ট স্থানের কথা বলা হয়েছে। সেকালে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় সব অনুষ্ঠানেই গো-বলি ছিল একটা আবশ্যিক রীতি। ঋগ্‌বেদে ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে বলদ বা ষাঁড় উৎসর্গ করার কথা পাওয়া যায়। ইন্দ্র ষাঁড় খেতে খুব পছন্দ করত। অথর্ব বেদেও গো-মাংস উৎসর্গ করার কথা বলা হয়েছে। শ্রাদ্ধেও গো-মাংস খাওয়ার উল্লেখ বিভিন্ন শাস্ত্রে পাওয়া যায়। মনু গো-মাংস খাওয়াকে নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত করেননি। রামায়ণে মাংস খাওয়া এবং যজ্ঞের প্রয়োজনে গরু হত্যার প্রসঙ্গ আছে। রামচন্দ্র ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে গেলে তিনি একটি বাছুর মেরে রামচন্দ্রকে অভ্যর্থনা জানান। মহা কবি কালিদাসের মেঘদূত এবং ভবভুতির কাব্যেও অতিথিকে আপ্যায়ণের জন্য নধর বাছুর হত্যার উল্লেখ রয়েছে।(১৬) 

প্রাচীন ভারতের বৈদিকদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যে গরু বলি দেওয়া হতো তার নানা উদাহরণে বিভিন্ন সূত্রে পরিপূর্ণ। আশ্বলায়ন সূত্রে অনেক যজ্ঞের উল্লেখ আছে যেখানে গরু কাটা হতো। গৃহসূত্রে ‘সুলভাগ’ বা সেঁকা গো-মাংসের কথা বলা হয়েছে। সম্ভবত সে সময় লোকেরা গরুর ক্ষুর ও লোমের ব্যবহার জানতো না তাই সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা হতো; কিন্তু চামড়ার মতো প্রয়োজনীয় বস্তু পুড়িয়ে ফেলা নিয়ে অনেকে আপত্তি করেছিলেন। যেমন শ্বাম্বত্য ঋষি বলেছিলেন যে, এগুলো থেকে জুতো ইত্যাদি তৈরি করে মানুষের কাজে লাগানো উচিত।(১৭) যাঁরা বর্তমান সময়ে গরুকে দেবতা বা মাতা মনে করেন, গরু জবাই করলে তাতে তাঁদের খুবই আপত্তি; গো-মাতার চামড়ায় তৈরি জুতো পায়ে দিতে তাঁদের আবার সামান্য আপত্তি নেই; কিন্তু গরু প্রাচীনকালে বা মধ্যযুগে কখনো দেবতা হিসেবে স্থান পায়নি। অন্যান্য অনেক প্রাণী দেবতার বাহন হিসেবে বা আলাদাভাবে পূজা পেলেও গরুর সম্বন্ধে এমন তথ্য নেই। হঠাৎ সেই গরু বিজ্ঞানের যুগে এসে কংগ্রেস নেতাদের কাছে দেবতা বা গো-মাতার মর্যাদা পেয়ে গেল। কংগ্রেস দলের ভিতটা এখান থেকে ধারণা করা যাবে। 

রাজেন্দ্রলাল মিত্র তার প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন, ঋষি বাল্মীকি তাঁর ভাই ঋষি বশিষ্ঠকে অভ্যর্থনা করার জন্য অনেকগুলো বাছুর কেটেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র লিখেছেন, ‘বশিষ্ঠের জন্য বাল্মীকির খাদ্য প্রস্তুতের বর্ণনা উত্তর রামচরিত-এ পাওয়া যায়। এটি এমনই জাজ্বল্যমান নিদর্র্শন যে এর গোটা অংশটাই উদ্ধৃত করার জন্য পাঠক আমাকে ক্ষমা করবেন।’ রাজেন্দ্রলাল প্রাচীন যুগের গো-হত্যা সম্পর্কে সত্যিকথা বলার জন্য সেদিন হিন্দুসমাজের সামনে শঙ্কিত হয়ে ক্ষমা আগেই চেয়ে নিয়েছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্রের প্রবন্ধের পুরো বর্ণনা বক্ষ্যমান রচনায় দেয়া দরকার পড়বে না। মূল বর্ণনার কিছু অংশ বিশেষ হলো, ‘না হলে সবচেয়ে নধর বাছুরগুলোকে খোঁজা হচ্ছে কেন? তুমি কি জানো না আমাদের পবিত্র সংহিতা বেদের কথা। জ্ঞানী লোকেরা যখন গৃহস্থের বাড়ি আসে তিনি তাঁদের সুমধুর খাদ্য পরিবেশন করেন। তার সঙ্গে থাকে বলদের বা বাছুরের বা ছাগলের মাংস। আবার গৃহস্থ যখন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের বাড়ি যান, তিনিও একই ভাবে অভ্যর্থনা পান।’ (১৮) দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন, ‘বিরাট আর্য সমাজে যৌনসম্পর্ক ও আহারাদি সম্বন্ধে অসম্ভব রকমের শিথিলতা বিদ্যমান ছিল। যুগে যুগে আর্যসমাজ পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে বর্তমান আকার নিয়েছে। সেই এক সময়ে আর্যগণ এতবেশি গরু খাইতেন যে, গৃহে অতিথি আসলেই একটি গরু মারিতে হতো। ঠিক সে কারণেই অতিথির এক নাম “গোঘ্ন”।’ (১৯) 

প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র চরক সংহিতার খাদ্য সংক্রান্ত পরিচ্ছেদে বলা আছে, ‘গরু, মোষ ও শুয়োরের মাংস প্রতি দিন খাওয়া উচিত নয়।’ গরুর মাংস খাওয়া না হলে পঞ্চম বা ষষ্ঠ খ্রিষ্টপূর্বকালে রচিত চিকিৎসা শাস্ত্রে এমন বিধান কেন দেওয়া হবে? শাস্ত্রকার সেখানে আবার সন্তানসম্ভবা নারীদের গো-মাংস খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ তাতে ভ্রুণ শক্তিশালী হয়। প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রে গো-মাংস খাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছে কিন্তু পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। রাজেন্দ্রলাল মিত্র জানাচ্ছেন, মধ্যযুগের কিছু রচনাতেও মৃগী রোগীর ক্ষেত্রে গো-মাংসের ঝোল খেতে বলা হয়েছে। কল্পসূত্র, গৃহসূত্র এমনকী খোদ বেদেও গো-মাংস সম্পর্কে কোনো বাধা নিষেধ নেই। বরং সেখানে সুস্পষ্ট গো-মাংস খাওয়ার বিধান রয়েছে আর কোন্ কোন্ পূজায় বা উপলক্ষে গো-মাংস খেতে হবে বা গোবধ করতেই হবে তাও বলা আছে। কী ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য কী ধরনের গরু দরকার তারও সবিশেষ উল্লেখ রয়েছে।(২০) 

ফলে এ কথা প্রমাণিত যে ভারতে প্রাচীন যুগে গো-হত্যা নিষিদ্ধ ছিল না। বরং গো-হত্যা ছাড়া যাগযজ্ঞ চলতো না। যজ্ঞে হত্যা মানেই, খাওয়ার জন্যই হত্যা। প্রশ্ন দাঁড়ায় তাহলে ভারতে গো-হত্যা বন্ধের কারণ কী? ভারতে গো-হত্যা আসলে কখনোই পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। মহাবীর আর গৌতম বুদ্ধের প্রচারিত অহিংসানীতির কারণেই ভারতে প্রাণীবধ কমার সঙ্গে সঙ্গে গো-হত্যা কমে যায়। মহাবীর আর গৌতমবুদ্ধ প্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে যে কথা বলেছিলেন তার পেছনেও ছিল একটা রাজনীতি। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে একটি খণ্ডিত বিদ্রোহ। ব্রাহ্মণ্য বা বৈদিক ধর্মের বর্ণপ্রথায় ক্ষত্রিয় বা রাজাদের স্থান ছিল দ্বিতীয় আর পুরোহিত বা ব্রাহ্মণদের স্থান ছিল সবার আগে বা প্রথম স্থানে। স্মরণ রাখতে হবে, মহাবীর আর গৌতম বুদ্ধ দু’জনেই ছিলেন ক্ষত্রিয় আর রাজার সন্তান। মাথার ওপরে তাঁদের বসে ছিল পুরোহিতরা। মহাবীর আর গৌতম বুদ্ধ ক্ষত্রিয়দের অবস্থান ব্রাহ্মণদের নিচে রাখতে চাননি। নিজেদেরকে তাঁরা ব্রাহ্মণদের সমান বা উচ্চে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। সেটা করতে হলে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে চলে যেতে হয়। কারণ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিধান দ্বারাই রাষ্ট্র কাঠামোর ভিতরেই ‘বর্ণপ্রথা’ টিকে ছিল। ক্ষত্রিয় মহাবীর আর ক্ষত্রিয় বুদ্ধ কিছুতেই রাজার ওপর পুরোহিতদের কর্তৃত্ব মেনে নিতে রাজি ছিলেন না; কিন্তু বৈদিক ধর্ম বা বেদ মেনে নিলে ব্রাহ্মণদের দেয়া বিধান মেনে নিতে হয়। ফলে দু’জনেই নিজেদের বিদ্রোহকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য বৈদিক ধর্মের বাইরে গিয়ে নতুন ধর্মমত প্রচার করতে শুরু করেন। 

ক্ষত্রিয় মহাবীর আর ক্ষত্রিয় গৌতম বুদ্ধ বেদ-এর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন প্রায় একই সময়কালে। লড়াইটা প্রথমত ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক। দু’জনেই হঠাৎ জীবহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন কেন? কারণ ব্রাহ্মণদের পূজার সঙ্গে জীবহত্যা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ফলে জীবহত্যা নিষেধ করা মানেই ব্রাহ্মণদের পূজার বিরুদ্ধে কথা বলা। পূজার বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই বেদ-এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। তখন পূজায় প্রচুর গরু বলি দেয়া হতো। ব্রাহ্মণরা প্রায় সময় নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে কৃষকদের গরু জোর করে নিয়ে এসে পূজার অনুষ্ঠানে বলি দিতেন। ব্রাহ্মণদের এই জোরজুলুমের বিরুদ্ধে কে কথা বলবে! কৃষকরা ব্রাহ্মণদের সকল অত্যাচার মেনে নিতেন। ফলে তাদের চাষাবাদে গরুর অভাব দেখা দিতো। ফলে নিজেদের বৃহত্তর স্বার্থে কৃষকরা গৌতম বুদ্ধের এই জীবহত্যাকে সমর্থন জোগালো ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে। রাজনীতির আর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, নতুন দুটি ধর্মকেই বৈশ্যদের সমর্থন দান। ভারতের বৈশ্য বা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের নীরব লড়াই চলছিল একটা। ব্যবসায়ীরা বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করছিল। ব্রাহ্মণরা বুঝতে পারলো, যদি বিদেশের সঙ্গে এভাবে বাণিজ্য করে বৈশ্যরা প্রচুরা টাকা-পয়সার মালিক হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে টাকার জোরে আর ব্রাহ্মণদের মানবে না। ব্যবসায়ীরা তখন কিছুতেই বর্ণপ্রথার তৃতীয় স্থানে আর থাকতে চাইবে না। ফলে চতুরতার সঙ্গে তাদের বিদেশ বাণিজ্যের বাধা হয়ে দাঁড়ালো বৈদিক ধর্ম। 

বিদেশে বাণিজ্য করতে হতো সমুদ্রপথে। ব্রাহ্মণরা ঘোষণা করলো কালাপানি বা সমুদ্র পার হওয়া পাপ। কারণ ব্যবসায়ীরা বিদেশে গিয়ে খেয়ে, কীসব অনাচার করে জাত খুইয়ে আসতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই ব্রাহ্মণদের নববিধানে বৈশ্যদের বিদেশে বাণিজ্য করার পথ বন্ধ হয়ে গেল। ফলে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের দেয়া বিধানের ওপরে বণিক বা বৈশ্যরা ক্ষেপা ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে তাই তাঁরা মহাবীর আর গৌতম বুদ্ধকে সমর্থন দিয়ে বসল। সে কারণেই দেখা যায় বুদ্ধের প্রথম পাঁচজন শিষ্যই ছিলেন বণিক। মহাবীরের জৈন ধর্মে তো বর্তমানেও ব্যবসায়ীদের রমরমা। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে প্রথম বড় বড় মন্দির ছিল না। ব্যবসায়ারাই তাদের টাকা ঢেলে জৈনধর্ম আর বৌদ্ধ ধর্মের জন্য বড় বড় মন্দির তৈরি করে দেন। ভারতবর্ষে এভাবেই বড় বড় মন্দির নির্মাণের সংস্কৃতি চালু হয়। ব্রাহ্মণরা বুঝতে পারলো, বৌদ্ধধর্ম বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করতে যাচ্ছে ভারতবর্ষে। বুঝতে বাকি রইলো না বৌদ্ধধর্মের পিছনে শুধু ব্যবসায়ীরা নয়, কৃষকরা পর্যন্ত জমায়েত হচ্ছে। বৌদ্ধ প্রভাব এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে মৌর্য রাজা অশোক বৌদ্ধ ধর্মকে সরকারি ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রচারে নামলেন। সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর জীবহত্যা নিষেধ করার জন্য খুব ব্যাপক ভূমিকা নেন। 

বিভিন্ন জায়গায় প্রাপ্ত অশোকের প্রায় সমস্ত শিলালিপিতে পশু-হত্যা নিবারণের প্রচেষ্টা দৃষ্ট হয়। নিশ্চয় অশোকের এসব শিলালিপি প্রমাণ করে সেকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মে কী বিপুল পরিমাণে পশুহত্যার প্রচলন ছিল।(২১) সে সময়ের একটি শিলালিপিতে আছে, ‘পূর্বে রাজ রন্ধনশালায় ব্যঞ্জনের জন্য শতসহস্র প্রাণিহত্যা করা হতো। সেখানে এখন তিনটি মাত্র প্রাণী হত্যা করা হয়। পশ্চাৎ আর তিনটি প্রাণীও হত্যা করতে দেওয়া হবে না।’ (২২) অষ্টম শিলালিপিতে মৃগয়া-নিবারণের ইঙ্গিত আছে। স্ত্রীলোকের আচার ও মঙ্গলানুষ্ঠানের যে যে অংশে পশুহত্যার প্রথা ছিল, তিনি তা নিবারণ করেছিলেন। বৈদিক ধর্ম এই পর্বে জৈনধর্ম আর বৌদ্ধধর্মের কাছে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বাংলায় জৈনধর্মের রমরমার দিন তখন। পশু হননের বিরুদ্ধবাদীরা সাধারণ জনসমাজের মধ্যে বিরাট এক আন্দোলন সৃষ্টি করে যে বৈদিকধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তার প্রমাণ রামায়ণে পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়। ফলে বৌদ্ধ মতবাদের উত্থানের সময়ে হিন্দুরা নিজেদের মতবাদকে যুগোপযোগী করে নিয়েছিল এবং পশুবলির বদলে কিছুটা জীবে প্রেম দেখাতে বাধ্য হয়েছিল।(২৩) 

মহাবীর আর গৌতম বুদ্ধের ধর্মের প্রভাবে ভারতে জীব হত্যা কমে যায় আর বহু মানুষ নিরামিষাশী হয়ে পড়ে, এ কথা সত্য; কিন্তু দ্বাদশ শতক পর্যন্ত ভারতীয়দের খাবারের পাতে গরুর মাংসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতে মুসলমানরা আসার পর গো-মাংস খাবার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে কথাটা মিথ্যা। আরব অঞ্চলে সহজে গরু পাওয়া যেতো না। সেখানে মানুষ উট বা ছাগল কোরবানী দিতো। গরুর মাংস খেতে আরবরা তখন অভ্যস্ত ছিল না। বরং ভারতে এসেই তারা গো-মাংস খেতে শিখেছে বা অভ্যাস করেছে বলে অনেকে মনে করেন। সব মুসলমানরা যে গরু খায় এমন কথাও ঠিক না। পাকিস্তানের শিন মুসলমানরা গরুকে ‘শুয়োরের মতোই’ খাদ্যযোগ্য নয় বলে মনে করেন। আবার ভারতে বহু হিন্দু গরু খায়। বিশেষ করে কেরালায় বাহাত্তর শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ গরুর মাংস খায়। ভারতের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা অনেকেই গরুর মাংস খান শুধু দাম কম বলে। ফলে ভারতে এখনো বিরাটসংখ্যক হিন্দুরা গরুর মাংস খেয়ে থাকে।

মুঘলরা যে গরু জবাইকে খুব প্রশ্রয় দিয়েছে তেমন প্রমাণ নেই। বাবর তার পুত্রকে স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘ধর্মীয় পক্ষপাত যেন তোমার মনকে প্রভাবিত না করে এবং বিচার যেন নিরপেক্ষ হয়। বিচারের সময় সব ধর্মের দেশাচার-সংস্কার ও সংবেদনশীল দিকগুলো উপেক্ষা করলে চলবে না। বিশেষ করে গো-হত্যা থেকে বিরত থাকবে। এর ফলে ভারতীয়দের হৃদয় জয় করতে পারবে। কখনো কোনো ধর্মের উপাসনালয় ধ্বংস করবে না।’ সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর প্রভৃতি মুঘল শাসকেরা আংশিকভাবে গো-হত্যা বন্ধ করার ফরমান জারি করেছিলেন। শুধুমাত্র ঔরঙ্গজেবের আমলে গো-হত্যা নিষিদ্ধ ছিল না। তিনি গরু রক্ষার জন্য কিছুটা পশুবধ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ মহাবিদ্রোহের সময় গো-হত্যা নিষিদ্ধ করেন। সত্যিকার অর্থে ইংরেজ ভারতে উপনিবেশ গড়ে তোলার পরই গো-হত্যা বেড়ে যায়। কারণ গো-মাংস ব্রিটিশদের খুব প্রিয় ছিল। 

গান্ধী স্বয়ং গো-হত্যা নিয়ে কী লিখেছেন? তিনি ‘হিন্দু মুসলিম ঐক্য’ রচনায় লিখছেন, হিন্দু মুসলমান বিরোধের দুটি স্থায়ী কারণ সম্বন্ধে এখন আলোচনা করা যাক। প্রথমটি হচ্ছে গো-হত্যা।(২৪) খুব স্পষ্টই গান্ধী জানতেন, হিন্দু মুসলমান বিরোধের প্রধান কারণটি গো-হত্যা। তিনি লিখছেন, ‘গো-রক্ষাকে আমি হিন্দুত্বের মূলসূত্র বলে মানলেও এর জন্য মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষের কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই না। ইংরেজরা প্রতিদিন যে গো-হত্যা করছে তার জন্য আমরা কিছু বলি না। একজন মুসলমান একটি গো-হত্যা করা মাত্র আমরা রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে যাই।’ (২৫) গান্ধীর লেখাতে এটা স্পষ্ট যে, মুসলমান গো-হত্যা করলে সেটা অপরাধ, ইংরেজ করলে নয়। গো-হত্যা প্রশ্নে মুসলমানদের ওপর ভারতে যে নিপীড়ন চলে এটা গান্ধী নিজেই তাঁর লেখায় প্রমাণ করেছেন। ভারতে গো-রক্ষার রাজনীতিটা এখানে স্পষ্ট। সেই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট, গো-রক্ষা মানে মুসলমানদের ওপর রক্তপাত ঘটবে। সবাই সেটা জেনেও গো-হত্যা বন্ধ করতে চাইছে কেন? সবাই যখন জানে গো-হত্যাই হচ্ছে হিন্দু মুসলমান বিরোধের প্রধান কারণ, সেটা জেনেও কংগ্রেস কেন গো রক্ষার কথা বলছে? বিরোধটা কি তবে তারা জিইয়ে রাখতে চায়?

নিজেই গান্ধী স্বীকার করেছেন, ‘গোমাতার নামে যে সব দাঙ্গা সংঘটিত হয়ে গেছে, তার সবগুলোতেই উদ্যমের অহেতুক অপব্যবহার করা হয়েছে। এর দ্বারা একটিও গরু রক্ষা পায়নি, বরং উল্টো বহু মুসলমানের দেহে আঘাত পড়েছে এবং তার ফলে আরও গো-হত্যা সংঘটিত হয়েছে।’ (২৬) গান্ধী এসব জেনেও তাহলে বারবার গো-রক্ষার দাবি তুলছেন কেন? তিনি বলছেন কেন হিন্দুত্ব মানেই গো-রক্ষা? নকশাল আন্দোলনের নেতা সন্তোষ রাণা স্পষ্টই লিখেছেন, সত্যিকার অর্থে আঠারশো আশির দশকে আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতী সমগ্র উত্তর-ভারত জুড়ে গো-রক্ষা সমিতি গড়ে তোলেন। এই সমিতিগুলো গো-রক্ষার পক্ষে জনমত গঠন করার জন্য প্রচারপত্র বিলি করে এবং দরখাস্তে গো-রক্ষার পক্ষে হাজার হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। সেই দরখাস্তগুলোতে ব্রিটিশ সরকারের কাছে গো-হত্যা বন্ধের আইন তৈরি করার দাবি জানানো হয়। মুসলমানরা তীব্রভাবে এর প্রতিবাদ করে। আঠারশো তিরানব্বই সালে বোম্বাই, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বাংলা ও উত্তর ভারতের অন্যান্য স্থানে গো-হত্যার প্রশ্নকে সামনে রেখে দাঙ্গা হয়।(২৭) 

ভারতের ক্ষমতাবানরা দু-ধরনের রাজনীতি করে গরু নিয়ে। নিজেরাই তারা একদিকে গরু খেতে ব্রিটিশদের উৎসাহ জোগায় আর ভিন্ন দিকে মুসলমানদের গরু হত্যা করতে নিষেধ করে। যখন আঠারশো তিরানব্বই সালে গো-রক্ষা সমিতি গো-হত্যা বন্ধের দাবি তোলে, বিস্মিতভাবে সে বছরের ডিসেম্বর মাসে রানী ভিক্টোরিয়া ভাইসরয় ল্যান্সডাউনকে লেখা এক চিঠিতে স্পষ্টই জানান, ‘হিন্দুরাই আমাদের জন্য মুসলমানদের চাইতে বেশি গরু মারে।’ (২৮) রানী ভিক্টোরিয়ার চিঠি থেকে বোঝাই যায় হিন্দুদের দ্বারা গরুর মাংসের চালান তখনো যেত ব্রিটেনে। ক্ষমতাবান হিন্দুরা একদিকে মুনাফার স্বার্থে গো-হত্যা করে বিদেশে তার মাংস চালান দিচ্ছে আবার ভিন্ন দিকে মুসলমানদেরকে গো-হত্যায় বাধা দিচ্ছে। কী রকম ভয়াবহ দ্বিচারিতা! স্বাধীনতার আগে থেকেই হিন্দুত্ববাদীরা গো-হত্যা বন্ধের নামে মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটিয়েছে এবং গো-হত্যাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য দাঙ্গা সংঘটিত করেছে। মনে হবে দাঙ্গাটা হিন্দুদের দিক থেকে মুসলমানের বিরুদ্ধে; কিন্তু প্রকৃত ঘটনা তা নয়। 

ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর যেমন অত্যাচার চলে, ঠিক একইভাবে অত্যাচার চলে নিম্নবর্গের হিন্দুদের ওপর। দুপক্ষের ওপর যাঁরা অত্যাচারটা করেন তাঁরা হলেন আরো সংখ্যালঘু ‘বর্ণহিন্দু’ সম্প্রদায়-তাঁরাই মূলত ভারতের শাসকগোষ্ঠী। বর্ণহিন্দুরা একই সঙ্গে অত্যাচার চালান নিম্নবর্গের হিন্দু আর মুসলমানদের ওপরে। পাশাপাশি নিম্নবর্গের হিন্দুদের আবার ব্যবহার করতে চান মুসলমানদের বিরুদ্ধে। সেই জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নানারকম প্রচার চালান। কাশ্মীরে দীর্ঘদিন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে সম্প্রীতি ছিল, সেটা নষ্ট করার জন্য শাসকরা বহু রকম দাবার চাল চেলেছিলেন। সেই খেলা এখনো বন্ধ হয়নি। নানান রকম গল্প বানিয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুদেরও তাঁরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। নিম্নবর্গের এই হিন্দুদের বড় একটা অংশ গরুর মাংস খান। খুব ঠাণ্ডা মাথায় সকলকে মনে রাখতে হবে, ভারতের লড়াইটা আসলে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে নয়-লড়াইটা শাসক আর শাসিতের মধ্যে। শাসিতদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান উভয়েই আছে। ভারতের বর্ণহিন্দুদের একটা প্রগতিশীল অংশ রয়েছেন এই শাসিতদের সঙ্গেই; কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর প্রচারে বিপথগামী হচ্ছে নি¤œবর্গের হিন্দুরা, এমনকি মুসলমানরা। ফলে বাবরি মসজিদ ভাঙলে বা রামমন্দির গড়লে কী লাভ তাদের যারা জানে না, তারা বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির গড়তে চাইছে। রাষ্ট্র এদের বিপথগামী করে শেষপর্যন্ত বাবরি মসজিদের জমি দখল করেছে আইনী প্রক্রিয়ায়। সাধারণ মানুষকে বিপথগামী করেছে সেখানে গান্ধীর মতো মানুষরাই। 

বাবরি মসজিদ নিয়ে শেষপর্যন্ত যে রায় ঘোষিত হয়েছে তার মধ্যে কুটনীতি আছে, কিন্তু ন্যায় নেই। ভারতের প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়া বা আইনও মানা হয়নি রায় ঘোষণায়। ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানরা এ রায় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু মানুষ এই রায়কে সমর্থন করেননি। রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক বিচারপতি অশোককুমার গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, কিছু মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তিতে রায়টা দেয়া হয়েছে, প্রমাণপত্রের ভিত্তিতে নয়। তিনি বলেছেন, ‘রাম শুধু মহাকাব্যে রয়েছেন। সেই সূত্রে অনেক মানুষের মনে একটা বিশ্বাসও রয়েছে; কিন্তু সেই বিশ্বাসের বলে একটা মসজিদের জমি মন্দিরের নামে হয়ে যেতে পারে না।’ কিন্তু মুসলমানরা যে এ রায় মেনে নিয়েছেন, দাঙ্গা বা রক্তপাতের পথে যাননি তার জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ জানানো দরকার। কারণ তাঁরা ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন এবং একটা মসজিদ রক্ষার জন্য অযথা রক্তপাত ঘটবার পথ পরিহার করেছেন।(২৯) ভারতের মুসলমানদের দিক থেকে এই পথ অবলম্বন সর্বক্ষেত্রে মানবজীবনে একটা উদাহরণ হতে পারে রক্তপাত এড়াবার জন্য।

ভারতে যে ঘটনা ঘটলো ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শক্তির দ্বারা, আধুনিক যুগে এসে একটা মসজিদকে মন্দির বানিয়ে ফেলা এর দায়ভার আরো বহুজনের সঙ্গে ভারতের জাতির পিতা গান্ধীকে নিতে হবে। সকল রকম আবেগ বাদ দিয়ে ভারতের ইতিহাসের ওপর যদি তীক্ষ্ণ আলো ফেলা যায়, তাহলে এই সত্যিটি প্রমাণিত হবে যে গান্ধী বিরাট দায় রয়েছে এই ঘটনায়। ভারতে জাতীয় কংগ্রেস যখন জন্ম নেয়, যদিও তা ছিল ইংরেজ ঘেঁষা আর নরমপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত, কিন্তু কংগ্রেস তখন পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক কোনো দল ছিল না। উনিশশো বিশ সালে জিন্নাহকে হটিয়ে দিয়ে গান্ধী যখন কংগ্রেস দখল করলেন, তখন থেকেই সেখানে সাম্প্রদায়িক চিন্তা দানা বাঁধতে থাকে। কংগ্রেসের প্রধান ব্যক্তিত্ব গান্ধী বললেন, ধর্ম বাদ দিয়ে রাজনীতি হতে পারে না। তিনি ধর্ম টেনে আনলেন কংগ্রেসের রাজনীতিতে।(৩০) কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রক গান্ধী বললেন, তিনি “রামরাজত্ব” প্রতিষ্ঠা করতে চান আর চান গো-রক্ষণ বা গোমাতাকে রক্ষা করতে। কংগ্রেসের প্রধান নেতা যখন ভারতে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান আর গো-রক্ষার কথা বলেন-তখন কি তা আর অসাম্প্রদায়িক দল থাকতে পারে?

সাধারণভাবে মনে হবে কংগ্রেস ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক দল কিন্তু তার কার্যক্রম কি তা প্রমাণ করে? কংগ্রেস নিজেও বলেছে, তারা অসাম্প্রদায়িক দল। ভারতে যেখানে বহু মুসলমানরা বসবাস করছে সেখানে একটি অসাম্প্রদায়িক দল কী করে সেখানে ‘রামরাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার কথা বলে? রামরাজত্বই তো এখন প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে বিজেপি আর অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠাতারা। বর্তমানে যা ঘটলো সেইরকম বিশ্বাসের বীজ বপন করেছিলেন গান্ধী উনিশশো বিশ সালেই। তিনি খিলাফতের মতো একটি ধর্মীয় আন্দোলনকে সমর্থন করলেন এই শর্তে যে, ‘মুসলমানরা ভারতে আর গো-হত্যা করবে না’। জিন্নাহ তখন গান্ধীর এই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি পছন্দ করেননি বলেই কংগ্রেস ছাড়তে বাধ্য হলেন। গান্ধীর অনুসারী বিপুল জনতার ধর্মীয় উন্মাদনার কারণে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে চলে যান। গান্ধী সেদিন একইভাবে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিলেন হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে। জিন্নাহ বললেন, এর পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা। ঠিক তাই হলো, কয়েক বছর যেতে না যেতেই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হলো। হিন্দু-মুসলমানের সেই বিভেদ আর দূর হলো না। গান্ধী কিন্তু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত রামরাজত্বের ধারণা ছাড়লেন না। মতিলাল, জওহরলাল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, সুভাষচন্দ্র প্রমুখ কংগ্রেসের নেতারা কেউই কংগ্রেসের সভায় গান্ধীকে এসব কথা বলতে বাধা দেননি।

যখন সাঁইত্রিশ সালে কংগ্রেস বিভিন্ন প্রদেশের ক্ষমতায় বসল, তখন কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলোতে সেখানকার মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিজেপি আর হিন্দুত্ববাদীদের বর্তমান স্লোগানটা কী? ‘হিন্দি, হিন্দু আর হিন্দুস্থান’। স্বাধীন ভারতে কংগ্রেসের শাসনেই হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়েছিল। ভারতের ছয়-সাতটি প্রদেশ ছাড়া আর বাকি প্রদেশগুলোতে গো-মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেল। বর্তমান যুগে একটি রাষ্ট্রে গরুকে দেবতা মনে করে বিরাটসংখ্যক নাগরিকদের গো-মাংস খাওয়া থেকে বঞ্চিত করা কি আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞা হতে পারে? বহু মানুষের খাদ্য বাছাইয়ের অধিকার কেড়ে নিয়ে কি সেখানে গণতন্ত্র থাকতে পারে? রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ধর্মের প্রভাবের কারণে আর কেন্দ্রের হাতে সাংবিধানিক সকল ক্ষমতা থাকায় গণতন্ত্র সেখানে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। হিন্দুত্বকে ভারতের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই সংবিধানে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে রাখা হয়েছে। যখন তখন রাজ্যগুলোর সরকারকে সে সংবিধানের বলে বাতিল করে দেয়া যায়।

ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙা হচ্ছে, গরুর মাংস খাওয়ার জন্য মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে-তারা মানে এ নয় যে ভারতের সব মানুষই সাম্প্রদায়িক। বিহারীলাল সরকার, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, নিখিলনাথ, কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ সিরাজ-উদ-দৌলা সম্পর্কে ইংরেজদের মিথ্যাপ্রচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেন উনিশ শতকেই; কিন্তু তারপরেও বহু ইতিহাসবিদ লিখলেন মনগড়া ইতিহাস ভারতভাগ আর ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নিয়ে। মুসলমানরা সবসময় তাতে খলনায়ক-মুসলমানদের লড়াই, তাদের আত্মত্যাগ বা প্রাণ দেয়া আর বীরত্বের কথা সেখানে পাওয়া যাবে না। কংগ্রেস মনোভাবাপন্ন বা হিন্দুত্বের প্রচারকদের বিচারে গান্ধী দেশনায়ক আর জিন্নাহ আর মুসলমানরা ভারত ভাগের কারিগর। বহুকাল ধরে তা চলতে চলতে মানুষের মনে তাই বিশ্বাসের মতো গেঁথে গেল; কিন্তু ভারতের হিন্দু পরিবারে জন্মেছেন তেমন ব্যক্তিরাই লিখলেন আবার বিপরীত কথা। প্রগতিশীল এসব মানুষরা কংগ্রেসের বা হিন্দুমহাসভার প্রচারের দ্বারা প্রভাবিত হননি, বরং কলম ধরেছেন সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ভারতের মুসলিম শাসকদের নিয়ে সবচেয়ে নিরপেক্ষ গবেষণামূলক ইতিহাস গ্রন্থ লিখেছেন হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া মানুষরা। বিভিন্ন দাঙ্গা, মুসলিমদের ওপর অত্যাচারের কথা প্রকাশ পেল তাদের রচনায়। হিন্দুত্ববাদীদের লেখার বিরুদ্ধে কলম ধরলেন নামকরা সব ইতিহাসবিদরা, রমিলা থাপার, হরবংশ মুখিয়া, সতীশচন্দ্র, এরকম বহু মানুষ।

যখন একদল মানুষ বাবরি মসজিদ ভাঙার কথা বলছেন আর একদল হিন্দু পরিবার তার বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছেন। ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেছেন ভারতের এরকম বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাবরি মসজিদ ভাঙার নিন্দা করেছেন। বাবরি মসজিদের জায়গায় যে এতদিন রামমন্দির গঠন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি আগের সরকারগুলো, তার কারণ এ-ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সচেতন হিন্দুরাই সচেষ্ট ছিলেন। গরুর মাংস খাওয়ার জন্য যারা মুসলমানদের হত্যা করেছে তারা যেমন হিন্দু, ঠিক তেমনি এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে যারা পথে নেমেছেন, আন্দোলন করেছেন-তাদের বেশির ভাগই হিন্দু। ভারতের সকল রাজনীতিকরা সাম্প্রদায়িক যেমন নন, কট্টর অনেক সাধারণ হিন্দুরাও তেমনি সবাই সাম্প্রদায়িক নন; কিন্তু নানারকম প্রচারের মধ্য দিয়ে মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তোলার এক দুর্বার চেষ্টা চলছে শাসক মহলের কাছ থেকে, ভারতের কেন্দ্র থেকে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অনেক গবেষক, অনেক ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক হিন্দুত্বের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন কিন্তু এইসব গবেষক ইতিহাসবিদদের কণ্ঠস্বর স্বভাবতই কেন্দ্রের ক্ষমতাসীনদের মতো ততবেশি জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। 

ভারতবর্ষে মানুষের শিক্ষার হার কম। ফলে হরবংশ মুখিয়া, রমিলা থাপার, সুপ্রকাশ রায়, সতীশচন্দ্র, সুকোমল সেন, সুনীতি কুমার ঘোষ, বিমলানন্দ শাসমল, অমলেন্দু দে প্রমুখের ইতিহাস তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না, কিন্তু মন্দির আর পুরোহিতরা অনেক দ্রুত পৌঁছে যায়। প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকরা পৌঁছে যান অনেক দ্রুত তাদের বশংবদ গণমাধ্যমের সাহায্যে। যদি ভারতবর্ষের বিরাটসংখ্যক মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার আলো পেতেন, যদি প্রগতিশীল ইতিহাসবিদ, সাংবাদিকদের লেখনী তাদের কাছে পৌঁছে যাবার সুযোগ থাকত-তাহলে এমনটা হতে পারতো না। বাবরি মসজিদের রায়ের বিরুদ্ধে সকল সাধারণ মানুষরা ফেটে পড়তেন। যখন সাধারণ মানুষের কাছে প্রগতিশীল বাণী পৌঁছে যাবার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তখন কালাকানুন জারি করে তার কণ্ঠ রোধ করা হয়। সর্বত্রই সস্তা জাতিভেদ আর ধর্মের কথায় মানুষকে উন্মাদনায় ভাসিয়ে দেয়া যায়, হিটলারের নাৎসী বিদ্বেষ জার্মানির জনগণকে যেভাবে আকৃষ্ট করেছিল। হিন্দু মহাসভা বা সেইসব প্রতিষ্ঠান যে মানুষকে উন্মাদনায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে তার প্রধান কারণ, ইংরেজদের আগমনের ভিতর দিয়ে ভারতের মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারেনি, বিজ্ঞানের ব্যবহারিক জীবনের সঙ্গে মাত্র তাদের পরিচয় ঘটেছিল। পাশ্চাত্য যখন চার্চের বন্ধন থেকে মানুষকে মুক্ত করছিল, ভারত তখন মন্দিরের বিশ্বাসের সঙ্গে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আরো তীব্রভাবে বেঁধেছে। ধর্মের প্রভাব পূর্বের চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ধর্মের আধ্যাত্মিকতা, কুসংস্কার আর স্বার্থপরতার বাণী তার কণ্ঠে প্রবেশ করাতে সাহায্য করেছে। বৃহত্তর ভারতবর্ষের অংশ হিসাবে যা ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানেও চলমান।

সকলকে স্মরণ রাখতে হবে ভারতের রাজনীতিতে গো-হত্যা বা গো-রক্ষা খুব ছোটখাটো ঘটনা নয়। ভারত ভাগের পেছনে রয়েছে গো-হত্যা বন্ধ, হিন্দির প্রভাব আর হিন্দুত্বের ধারণা। ব্রিটিশ শাসনেই এই হিন্দুত্ববাদ ডানা মেলেছিল। ব্রিটিশরা তাতে প্রাথমিক ইন্ধন যুগিয়েছিল এটাও সত্যি। সারাবিশ্বে প্রাচীন যুগে রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মের প্রভাব সর্বত্রই ছিল। ভারতে সেটা লক্ষ্য করা গেল প্রথম ব্রাহ্মণ্যদের রাষ্ট্র পরিচালনায়। রাষ্ট্র পরিচালনার পুরোটাই ছিল ধর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পরের নানা ঘটনা তার দ্বারাই পরিচালিত হয়েছে; কিন্তু আধুনিক ভারতে তা হবার কথা ছিল না। ভারতবর্ষের দুর্ভাগ্য এই যে, বাংলা তথা ভারতবর্ষের যেসব ব্যক্তিত্বরা সমাজজীবনে বিপুল প্রভাব ফেলেছেন, তাদের মধ্যে ধর্মহীনতার কথা প্রচার করতে পেরেছেন খুব কম লোক। স্বামী বিবেকানন্দর মতো বিরাট মাপের মানুষ হিন্দুত্বকে এতো বড় করে তুলেছিলেন, যার প্রভাব পড়েছে সমাজজীবনে। পাশ্চাত্য যখন মানবতাবাদ প্রচার করছে ঈশ্বর বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথসহ সকলেই তখন বেদ, উপনিষদ বা হিন্দুত্বের মহিমা প্রচারে ব্যস্ত। 

ভারতবর্ষের সকল বড় মাপের মানুষরাই আসলে একটা ধর্মের পক্ষে দাঁড়ালেন। ফলে ভারত আধুনিক রাষ্ট্র না হয়ে হলো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। ভারতের মনীষীদের দ্বারা প্রচীন ভারতের ঋষি এবং বেদবাদী ধর্মকে বড় করার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতকেই শক্ত করেছে। রবীন্দ্রনাথ মুসলমানদের পক্ষে বহুবার সরাসরি কলম ধরেছেন।(৩১) কিন্তু ব্যক্তিজীবনে উপনিষদ বা বেদ বা প্রাচীন ঋষিদের প্রতি তাঁর দুর্বলতা ভারতবর্ষে “হিন্দুত্বের ভিত্তিকে” শক্ত করেছে। হিন্দুত্বের ভিত্তি যতই শক্ত হয়েছে, ভারতের মুসলিম শাসক আর মুঘলদের বিরুদ্ধাচারণ হয়েছে ততবেশি। যদিও এর পথিকৃৎ ছিল ইংরেজ শাসকরা। মুসলিম শাসক আর মুঘলদের বিরুদ্ধাচারণ শেষ পর্যন্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চলে গেছে। না হলে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন আসবে কেন, যার ভয়াবহ পরিণাম দেখা গেল বাবরি মসজিদের ঘটনায়। রাষ্ট্র দ্বারা ভারতের মুসলমানদের ওপর প্রভুত্ব সৃষ্টি হলো হিন্দুদের। বাবরি মসজিদের রায় প্রমাণ করলো, রাষ্ট্রীয়ভাবে বা ভারতের বিচার ব্যবস্থায় সংখ্যালঘু মুসলমানরা হিন্দুদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে কি এরপর ধর্ম নিরপেক্ষ বলা চলে? 

সরকারিভাবে ভারত বহুদিন ধরেই হিন্দুরাষ্ট্রের আচরণ করলেও, ভারতের জনগণ সবাই সাম্প্রদায়িক নন। মুসলমানদের ওপর নির্যাতন তাঁরা পছন্দ করেন না। ভারতের জনগণের উদারতা রাষ্ট্র হিসেবে ভারত গ্রহণ করতে পারেনি। ভারতের বহু মানুষ বাবরি মসজিদের রায়ে লজ্জিত এবং প্রতিবাদী। সরকার কিন্তু জনগণের এইসব উদার মনোভাব দমনে খড়গহস্ত। জনগণের ওপরে রাষ্ট্র তার আধিপত্য এভাবেই চাপিয়ে দেয় বণিকদের বা মুনাফার স্বার্থে। ভারতে উনিশ শতকে বহু উচ্চমাপের মানুষ জন্মেছিলেন। যারা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, কিন্তু ধর্মের প্রশ্নে কট্টর ছিলেন। হিন্দুত্বের জয়গান ভারতের বিভিন্ন মনীষীদের কণ্ঠে এতোটাই তীব্র ছিল যে, তা ভারতের বৃহত্তর সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক হতে সুযোগ দেননি। এই জয়গান কখনো বেদের শ্রেষ্ঠত্বে, কখনো হিন্দুত্বের গরিমায় আবার কখনো বা মুসলমান বিদ্বেষে পরিণত হয়েছে। বৃহত্তর মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখবার দায় রবীন্দ্রনাথ নিজেও এড়াতে পারবেন না। কারণ তিনি নিজেও দীর্ঘসময় বিজ্ঞানমনস্কতার চেয়ে উপনিষদকে বড় করে দেখেছেন অনেক ক্ষেত্রেই। বিপুল পরিচিত বিবেকানন্দ আর রবীন্দ্রনাথ হিন্দুত্বের জয়গান গেয়েছেন নিজেরা সাম্প্রদায়িক না হলেও। হিন্দুত্ব সম্পর্কে তাদের প্রচার সাধারণ মানুষকে অন্ধ করে রেখেছিল। সত্যি বলতে উনিশ আর বিশ শতকে হিন্দুত্ব এক বিশাল শক্তিরূপে আবির্ভূত হয় ভারতবর্ষে, যাকে চাইলেই অগ্রাহ্য করা যাচ্ছিল না।

সন্দেহ নেই ভারতবর্ষে ইংরেজরাই প্রথম সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল। সেটাকে ষোল কলায় পূর্ণ করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘আনন্দমঠ’ লিখে। তিনি আনন্দমঠে সরাসরি মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের লড়তে বললেন আর মুসলমানদের যে নিশ্চিহ্ন করতে হবে তা বলে দিলেন।(৩২) বঙ্কিম যা বলেছিলেন উনিশ শতকে, ঠিক বিশ শতকে সেটাই বললেন হিন্দু মহাসভার সাভারকার। বলতে দ্বিধা নেই, ভারতবর্ষে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে ঘিরেই প্রবলভাবে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার জন্ম। যারা বঙ্কিমের মতো সরাসরি মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে চাননি, সেই বিবেকানন্দরা কিন্তু হিন্দুত্বের গরিমা আর হিন্দুত্ববাদের প্রচার করেছেন। বিবেকানন্দ আর বঙ্কিমের আদর্শকে সামনে রেখেই ভারতে সেখানে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাদেশিকতার শুরু। ১৮৬৭ সালে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্যারীমোহন সরকার, রথীন্দ্রমোহন ঠাকুর প্রমুখের সহযোগিতায় ‘হিন্দুমেলা’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের পরিমণ্ডল বিস্তৃত করা হয়, মুসলমানরা সেখানে জায়গা পেল না। কারণ নামই ছিলো “হিন্দুমেলা”।(৩৩) হিন্দুত্বের ধারণা ভারতে আজকের নয়। বাংলার বিজ্ঞানমনস্ক কয়েকজন মানুষের মধ্যে বাংলার দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর মধুসূদন দত্ত। ভিন্ন দিকে প্রভাব প্রতিপত্তিতে তাদের সমান না হলে বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার পরিচয় দিয়েছিলেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়; কিন্তু সমাজজীবনে তাঁর প্রভাব সেরকম ছিল না। 

বিশ শতকে বিশের দশক থেকে গো-হত্যা নিষেধের ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন গান্ধী, গান্ধী ছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে সন্ন্যাসী সমতুল্য; কিন্তু নিজের প্রচারের বলি হলেন গান্ধী নিজেই শেষজীবনে। স্মরণ করা যেতে পারে, ভারত স্বাধীন হবার মাসখানেক আগে, উনিশশো সাতচল্লিশ সালের পঁচিশে জুলাই গান্ধীকে তাঁর প্রার্থনাসভায় আলোচনার জন্য বেছে নিতে হয়েছিল এমন একটি বিষয়- যা তাঁর মনে হয়েছিল, দেশ স্বাধীন হবার আগেই চূড়ান্তভাবে সমাধান হওয়া দরকার। বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ থেকে অনেক নেতা দাবি তুলেছিলেন দেশে গো-হত্যা বন্ধ করতে হবে। ভারতের বিভিন্ন লোকের গো-হত্যার বিরুদ্ধে আইন আনার দাবি করে পাঠানো হাজার হাজার চিঠির কথা উল্লেখ করেন রাজেন্দ্রবাবু তখন গান্ধীর কাছে। গান্ধী বিন্দুমাত্র ধোঁয়াশা না রেখেই বলেছিলেন, ‘ভারতে গো-হত্যা বন্ধ করার জন্য কোনো আইন আনা যায় না’। কী কারণে সে আইন আনা যায় না, তিনি সেটা ব্যাখ্যা করে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলেন, ‘আমার ধর্ম বাকি ভারতবাসীর ধর্ম হয় কী করে?’ তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, গো-হত্যা বন্ধ করার আইন, ‘বাকি অ হিন্দু ভারতবাসীর ওপর বলপ্রয়োগ’। গান্ধী সেদিন যথেষ্ট দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন, ভারতে “গো-হত্যা” বন্ধের আইন না করার জন্য।

গান্ধীর সেদিনের ভূমিকার জন্য তাঁকে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে; কিন্তু উনিশশো সাতচল্লিশ সালে জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি যেভাবে গো-হত্যা বন্ধের দাবিকে যুক্তি দিয়ে বাতিল করতে চেয়েছিলেন, প্রথম জীবনে বা কদিন আগেও তা পারেননি। কংগ্রেসের রাজনীতিতে ততদিনে তা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। গান্ধী যখন তা আইন করতে নিষেধ করছেন, তখন তাঁর খেয়াল করা দরকার ছিল তিনিই সাধারণ মানুষকে গো-রক্ষার ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে উস্কে দিয়েছেন। সেজন্যই তারা আজ সেটাই আইন হিসেবে দেখতে চায়। রাজনীতিবিদরা অনেক সময় বুঝতেই চান না, নিজেরা এমন সব কাজ করেন জনপ্রিয় হবার লক্ষ্যে, পরে নিজেই আর তার গতি রোধ করতে পারেন না। স্মরণ রাখতে হবে উনিশশো চল্লিশ সালে জাতীয় কংগ্রেস গো-হত্যা বন্ধ করার বিষয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে। এই কমিটি গো-হত্যা পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষে মত দেয়; কিন্তু তারপরেও, গো-হত্যা নিষেধকে আইন না করার ব্যাপারে গান্ধীর সেদিনের ভূমিকা বিরাট এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ভারতের সংবিধান প্রণেতারা কিন্তু গান্ধীর এ রায় মেনে নেননি। 

গরুর সুস্বাস্থ্য বা তাকে রক্ষা করার বিষয়টাকে ভারত ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশ তার স্বাধীনতা আন্দোলনের স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেনি বা স্বাধীনতার পর তার সংবিধানে এতো গুরুত্ব দেয়নি। ভারতের সংবিধান তৈরি করার সময় পঞ্চাশ হাজারের ওপরে কংগ্রেসকর্মী ও গো-সেবকদের স্বাক্ষরসহ গো-বধ বেআইনী ঘোষণা করার বিষয়টা সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে বা মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি ওঠে। সমর্থন করেন অনেকেই। সংবিধানের মূল প্রণেতা বা সংবিধান সভার সভাপতি ভীমরাও আম্বেদকর বিষয়টাকে তখনকার পরিস্থিতিতে সুন্দরভাবে সামাল দেন। গো-হত্যা বন্ধের বিষয়টা নিয়ে কংগ্রেস দল এবং উচ্চ সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দুদের এক অংশের মানুষের চাপ থাকা সত্ত্বেও আম্বেদকরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ বিষয়টা ‘মৌলিক অধিকারের’ পরিবর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই সারা ভারতে এখনো এটা বাধ্যতামূলক করা যায়নি। যদিও হিমাচল প্রদেশের হাইকোর্ট কয়েক বছর আগে এক রায়ে সারা ভারতেই গো-হত্যা নিষিদ্ধ করার কথা বলেছে।(৩৪) 

স্বাধীনতার পর সংবিধানের ৪৮নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষি ও পশুপালন সংগঠিত করার চেষ্টা করবে, বিশেষত প্রজাতি সমূহকে রক্ষা করা ও উন্নত করার চেষ্টা করবে এবং গাই ও বাছুর হত্যা করা বা অন্যান্য দুগ্ধবতী ও ভারবাহী গবাদি পশু হত্যা করার জন্য ব্যবস্থা নেবে।’ (৩৫) দীপক নাগ বলেন, ‘ভারতের সংবিধানে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করার পেছনে যাই যুক্তি দেখানো হোক না কেন আসলে ধর্মীয় কারণেই যে এটা যুক্ত করা হয়েছে-তা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। গো-হত্যা নিষিদ্ধ করার পেছনে সাধারণত দুটো যুক্তি দেখানো হয়: প্রথমত, হিন্দুরা গরুকে গোমাতা হিসেবে পূজো করে। গরুর প্রতি তাদের একটা ধর্মীয় আবেগ আছে। দ্বিতীয়ত, কৃষি ও অর্থনেতিক কারণে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা উচিত।(৩৬) 

ভারতে স্বাধীনতা লাভের পর গরু নিয়ে মাতামাতি কিছুদিন বন্ধ ছিল। উনিশশো ছিষট্টি সালে জয়প্রকাশ নারায়ণ আবার বিষয়টা সামনে নিয়ে আসেন। তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে এক চিঠি লেখেন। সেই বছরের সাতই নভেম্বর উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা গো-হত্যা বন্ধ করার জন্য সংসদ অভিমুখে যাত্রা করে এবং উত্তেজিত জনতা সংসদ আক্রমণ করে। শান্তিপূর্ণভাবে মারমুখী জনতাকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে পুলিশ লাঠি চালাতে বাধ্য হয়। সে সময়ে আট জনের মৃত্যু ঘটে। হিন্দুত্ববাদীদের হাত থেকে সরকারকে রক্ষা করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হন। ছিষট্টি সালের পর থেকে আরম্ভ হয় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা। সরকারি কাগজপত্রে দেখা যায়, ১৯৬৭ সাল থেকে উনিশশো তিরাশি পর্যন্ত সতেরো বছরে ভারতে দাঙ্গার সংখ্যা পাঁচ হাজার চারশো একান্নটা।(৩৭) যার বেশির ভাগ ছিল গো-হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। 

ছিষট্টি সালের পর আবার গান্ধীর শিষ্য বিনোবাভাবে বামফ্রন্ট পরিচালিত পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় গো-হত্যা বন্ধ করার জন্য উনিশশো উনাশি সালে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসেন। প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাইয়ের আশ্বাসে তিনি পরে অনশন তুলে নেন।(৩৮) বিনোবাভাবে অনশনের পর সে বছরেই ভারতে গো-হত্যা বন্ধের জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল উপস্থাপন করা হয়; কিন্তু ষষ্ঠ লোকসভা বাতিল হয়ে গেলে সে প্রস্তাব আর গৃহীত হয়নি। বিনোবা ভাবে পরের বছর আবার গো-হত্যা বন্ধের জন্য আন্দোলন শুরু করেন কিন্তু তা তেমনভাবে দানা বাঁধেনি। পরে উনিশশো নব্বই, উনিশশো একানব্বই, উনিশশো চুরানব্বই, উনিশশো ছিয়ানব্বই, দুই হাজার এবং দুই হাজার দুই সালে গো-হত্যা বন্ধের জন্য সংসদে প্রস্তাব আনা হয়। নানা কারণে কখোনই তা গৃহীত হয়নি। সকলেই তখন আবার নির্বাচনে মুসলমানদের ভোট হারাতে চায়নি এবং এমনকি বিরাট সংখ্যক হিন্দুদের ভোট। কারণ ভারতে বিরাটসংখ্যক হিন্দু জনগোষ্ঠী গরুর মাংস খেয়ে থাকেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও দুই হাজার পাঁচ সালের ছাব্বিশে অক্টোবর ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এক রায়ে বিভিন্ন রাজ্যে প্রচলিত গো-হত্যা বন্ধ করার বিষয়টাকে সমর্থন করা হয়েছে। কোনো কোনো রাজ্য সরকার হাটে হাটে গরু বিক্রি করা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে।(৩৯) 

ভিন্ন চিত্রটি কী দেখা যাক। দুই হাজার বারো সালে গৃহপালিত পশুর সংখ্যা গণনা করা হয়েছিল, তাতে গরুর সংখ্যা ছিল প্রায় বিশ কোটি আর প্রাপ্তবয়স্ক গাইয়ের সংখ্যা ছিল সাত কোটি সাতষট্টি লক্ষ। মোষের সংখ্যা ছিল দশ কোটি সাতাশি লক্ষ, যার মধ্যে বয়স্ক স্ত্রী মোষের সংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি ছিষট্টি লক্ষ। ভারতে প্রতিবছর মোট গরুর দশ শতাংশ আর মোষের চৌদ্দ শতাংশ মাংসের জন্য কাটা হয় যাতে চল্লিশ লক্ষ টন মাংস পাওয়া যায়। তার মধ্যে একুশ লক্ষ টন দেশের ভিতরে খাওয়া হয় আর উনিশ লক্ষ টন রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি হয় ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনস, সৌদি আরব, কুয়েত ও মিশরে। দুই হাজার তেরো সালে এই রপ্তানির মেট আর্থিক মূল্য ছিল দুই হাজার সাতশো কোটি টাকা। ভারত থেকে যে মাংস রপ্তানি করা হয় তাতে মোষের মাংসের ছাপ মারা হয়, কারণ গরুর মাংস রপ্তানি বে-আইনি।(৪০) 

দীপক নাগ জানাচ্ছেন, গরুর মাংস যারা বাইরে পাঠায় তাদের প্রায় সবাই হিন্দু। গরুর মাংস প্রস্তুতকারী দেশ হিসেবে ভারত পৃথিবীতে পঞ্চম আর এই মাংস খাদ্য হিসেবে ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে পৃথিবীতে সপ্তম স্থানের অধিকারী। গরুর মাংস রপ্তানিকারী দেশ হিসেবে ভারত প্রথম।(৪১) ভারত নামক একই রাষ্ট্রে গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে সেখানে এক এক রাজ্যের আইন এক এক রকম। প্রথমত দিল্লি, গুজরাট, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যে গো-হত্যা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত: কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, অরুণাচল, মিজোরাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, সিকিম প্রভৃতি রাজ্যে গো-হত্যা বা গো-মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। উনিশশো উনচল্লিশ সালে মণিপুরের মহারাজা গো-হত্যা বন্ধ করার আইন জারি করলেও সেখানে ব্যাপকহারে গো-মাংস খাওয়ার রীতি আছে।(৪২) 

ভারতের রাজনীতিতে গো-হত্যা নিয়ে কী ধরনের রাজনীতি চলে তার একটি চিত্র দেয়া গেল। ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় দুটো বিষয় খুবই আলোচিত; জাতপাতের প্রশ্ন আর গো-হত্যা। জাতপাত তো এক মহাসমস্যা, কখনো কখনো গরুর চেয়ে অন্ত্যজদের মর্যাদা কম। ভারতের রাজনীতিতে জাতপাতের প্রশ্ন এতোই ভয়াবহ যে, ভারতের সংবিধান প্রণেতা আম্বেদকর ছিলেন নীচুবংশ জাত। তিনি শিক্ষিত আর প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়েও ভারতে জাতের পরিচয়ে এতোই নিগৃহীত হতেন যে, তিনি মৃত্যুর আগে তার ৩ লক্ষ (তিন) অনুসারীকে নিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সংবিধান সভায় বলেছিলেন, হিন্দুরা যে মানবিকতাকেই অস্বীকার করেছে, ব্যাপারটা শুধু তা নয়। তারা নিচুজাতের মানুষকে উঁচুজাতের মানুষের সমান স্তরে ওঠার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেছে। হিন্দুদের একটা জাতি আক্রান্ত হলে সাধারণত অন্য জাতির মানুষ নিরাসক্ত থাকতেই ভালবাসে। নানা জাতিতে ভাগ থাকার কারণে হিন্দুরা কখনোই ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হতে পারেনি। তাই নানা জাতে বিভক্ত হয়ে থাকা হিন্দুরা বারবার আক্রমণের মুখে পড়েছে আর সেসব যুদ্ধে কখনো বিজয়ী হতে পারেনি। 

বাবা সাহেব আম্বেদকর বলেন, ‘হিন্দু সমাজের চতুবর্ণের ধারণা আজ চার হাজার জাতির জন্ম দিয়েছে। তিনি ভারতের দুরাবস্থার কথা উল্লেখ করেন। হিন্দু সমাজের অবহেলার দরুণ অনেক আদিবাসী মানুষ আজও ‘অপরাধী উপজাতি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছেন। এদের এই অবস্থার জন্য হিন্দুরা লজ্জা বোধ করেন না। বাইরে থেকে এসে খ্রিস্টান মিশনারীগুলো ভারতের আদিবাসীদের অনেক সাহায্য করেছে। হিন্দুরা যে একাজ করতে পারতো না, তা নয়; কিন্তু জাতপাতের ধারণা থেকেই এসেছে ছোঁয়াছুয়ির ধারণা। এক হিন্দু আর এক হিন্দুকে অস্পৃশ্য মনে করে। হিন্দু ধর্ম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া যায়; কিন্তু অন্য ধর্ম থেকে হিন্দুধর্মে আসার কোনো সুযোগ নেই। হিন্দু মা-বাবার ঘরে না জন্মালে কেউ হিন্দু হয় না।’ সত্যি বলতে সে-কারণেই অন্য ধর্মের লোকরা হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়নি, হিন্দুধর্মের এটা কোনো উদারতা নয় বরং অচলায়তন। ফলে ভারতের নির্যাতিত হিন্দুরা বর্ণবাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেছে। মুসলমান শাসনে তারা মুসলমান হয়েছে, খ্রিস্টান শাসনে তারা খ্রিস্টান হয়েছে। 

ভীমরাও আম্বেদকরও মৃত্যুর দু’বছর আগে নিজ ধর্ম ছেড়ে তাঁর তিন লাখ অনুসারীকে নিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। কারণ কী ছিল? আম্বেদকর স্বাধীনতার পর ভারতের প্রথম নেহরু সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তিনি সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন সংবিধান রচনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে; কিন্তু তারপরেও ভারতের সমাজে তিনি অন্ত্যজ বলে মানুষের পূর্ণ মর্যাদা লাভ করতে পারেননি। তিনি শিশু বয়স থেকেই অন্ত্যজ হিসেবে নানা অপমানের ভিতর দিয়েই বহুদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে এসেছিলেন আর দেখতে পাচ্ছিলেন হিন্দুত্বের ভয়াবহ রূপ। তিনি লিখে রেখে গেছেন, ‘জাতপাত হলো ব্রাহ্মণ্যবাদের দেহধারী মূর্তিমান শয়তান। ব্রাহ্মণ্যবাদ এমন এক বিষয় যা হিন্দুদের শেষ করে দিয়েছে। হিন্দুত্বকে আপনারা রক্ষা করতে পারবেন যদি ব্রাহ্মণ্যবাদকে ধ্বংস করতে পারেন।’ (৪৩) সংবিধান প্রণয়নের পর সভাপতি হিসেবে তিনি তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় বলেছিলেন, ভারতীয় সমাজ বিষয়ে প্রথমেই একটি কথা স্বীকার করে নেওয়া উচিত: দুটি ধারণা এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তার একটি হলো ‘সাম্য’। সামাজিক স্তরে, ভারতে এমন একটি সমাজ বর্তমান যার ভিত্তি বহুস্তরীয় অসাম্য, বহু মানুষের অবনমনের বিনিময়ে যেখানে মুষ্টিমেয় মানুষের উন্নতি সাধিত হয়।’ (৪৪) 

ব্রাহ্মণ্য সমাজের শত দোষত্রুটি আলোচনার পরেও একথা সত্যি, ভারতে প্রতিবাদ থেমে নেই। ব্রাহ্মণরাও সে প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন। বিরাট ভারতে বর্ণবাদ টিকে থাকার কারণে ধর্মের প্রভাব রাজনীতিতে খুব বেশি। কারণ অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের জন্যই সুবিধাভোগীদের এই বর্ণবাদ টিকিয়ে রাখা দরকার। ভীমরাও সংবিধান সম্পর্কিত বক্তৃতায় একথাও বলেছিলেন, ‘কিছু মানুষের হাতে প্রচুর সম্পদ, অধিকাংশ মানুষ ডুবে রয়েছে অবর্ণনীয় দারিদ্রে।’ (৪৫) ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদ, গো-রক্ষা আর জাতপাত কী চায়? চায় যাদের হাতে প্রচুর সম্পদ আছে তা যেন অন্যদের হাতে না চলে যায়। কংগ্রেসের শুরু থেকে রাজনীতি ছিল তাই, হিন্দুত্ববাদীদেরও লক্ষ্য ঠিক একই। ধর্ম দিয়ে মানুষকে অনেক বেশি অন্ধ করে রাখা যায়, ভারত এখনো তা পারছে। ধর্ম ভারতে প্রবল এক শক্তি, বহু সাম্যবাদী বামফ্রন্ট নেতাদের বাড়িতে গেলেও দেখা যাবে পূজাপার্বণ ঠিকঠিক চলছে। হিন্দুধর্ম সম্পর্কে ভীমরাওয়ের ক্রোধ আর ঘৃণা তাই তাঁকে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেছিল। 

ভারতের বৌদ্ধধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল ভীমরাও মনে করতেন, বুদ্ধ চেয়েছিলেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি উৎখাত করতে। কারণ ভীমরাও নিজের লেখা ‘বুদ্ধ অথবা কার্লমার্কস’ রচনায় বুদ্ধের বাণী হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন, ‘সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা একশ্রেণিকে ক্ষমতা দেয় এবং অন্যকে দুঃখ। সমাজের মঙ্গল করার জন্যে দুঃখের কারণ দূর করে দুঃখের অবসান জরুরি।’ বুদ্ধের বাণী হিসেবে তিনি আরও লিখেছেন, ‘স্বাধীন সমাজে ধর্ম আবশ্যক। সব ধর্মই আবার গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মের সম্পর্ক জীবনতথ্যের সঙ্গে; ঈশ্বর বা আত্মা বা স্বর্গ বা মর্ত সম্পর্কীয় কল্পনার সঙ্গে নয়। ঈশ্বরকে ধর্মের কেন্দ্র করা অবৈধ।’ তিনি দিল্লিতে ১৯৫৩ সালে ভারত-জাপান সাংস্কৃতিক সংস্থার এক সভায় অভিমত প্রকাশ করেন যে, বর্তমান অথবা ভবিষ্যত প্রজন্মকে অবশ্যই গৌতম বুদ্ধ অথবা কার্ল মার্কস-এই দুই মতবাদের যে কোনো একটিকে গ্রহণ করতে হবে। নিজে তিনি শেষ পর্যন্ত বুদ্ধের ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, নিজেকে হিন্দুত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত করার জন্য।

ভীমরাও আম্বেদকরের মতো ভারতের অসংখ্য মানুষ নানারকম ধর্মীয়বন্ধন থেকে মুক্তি পাবার জন্য লড়াই করে চলেছে। ভারতের দিকে তাকালে ধর্মের যে প্রভাব রাজনীতিতে লক্ষ্য করা যায়, ভিতর থেকে সেটা একই সঙ্গে ক্ষয়িষ্ণু হতে আরম্ভ করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের কট্টর ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে কোটি কোটি মানুষের ভিন্ন কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। রাষ্ট্রের সকল দমন নিপীড়নের বিপরীতে বহু মানুষের সজাগ দৃষ্টি ধর্মীয়-বন্ধনের বিপরীতেই হাঁটছে। ভারতের সাহিত্যে, নাটকে, চলচ্চিত্রে, সাংবাদিকতায়, ইতিহাস রচনায় এবং আরো নানান কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় গোঁড়ামির বাইরে এক নতুন সত্য প্রতিদিনই আত্মপ্রকাশ করছে। কয়েক হাজার বছরের ধর্মীয় রাহুর গ্রাসের বিরুদ্ধে তারা শক্ত হয়ে দাঁড়াতে সময় নিচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যত তাদেরই পক্ষে। নতুন এক ভারত জন্ম নেবে, রাষ্ট্রে ধর্মীয় প্রভাবের বাইরে গিয়ে মানবতার জয়গান গাইবে- তার প্রতিক্ষায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছে সারাবিশ্ব।  

তথ্যসূত্র:

১. সন্তোষ রাণা, ‘গো-রক্ষা না গ্রামীণ অর্থব্যবস্থার সর্বনাশ’, গো-মাংস ও ভারত, কলকাতা: স্ন্যাপ প্রকাশনা ২০১৭, পৃ. ৩০

২. ঐ, পৃ. ৩১

৩. কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর সম্পাদিত, বি আর আম্বেদকর নির্বাচিত রচনা সংকলন কলকাতা : ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, ২০১৮, পৃ. ১৮ 

৪. ঐ, পৃ. ৮৫ 

৫. ঐ, পৃ. ৯১ 

৬. ঐ, পৃ. ৯২ 

৭. ঐ, পৃ. ৯৫-৯৬ 

৮. ঐ, ২০১৮, পৃ. ৯৯

৯. দীপক নাগ, ভারতীয় রাজনীতিতে গরু ও জাতপাত, কলকাতা : বিবলিয়া ২০১৬, পৃ. ১২ 

১০. ঐ 

১১. দ্রষ্টব্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,‘বিসর্জন’, রবীন্দ্র রচনাবলি প্রথম খণ্ড, কলকাতা:

বিশ্বভারতী ১৩৯৩, পৃ. ৫৩৭-৫৯৮ 

১২. রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ‘প্রাচীন ভারতে গো-মাংস’, সন্তোষ রাণা অনূদিত, গোমাংস ও ভারত, কলকাতা: স্ন্যাপ প্রকাশনা ২০১৭, পৃ. ৩

১৩. ঐ, ৩-৪ 

১৪. ঐ, পৃ. ১০-১১ 

১৫. ঐ, পৃ. ১৬ 

১৬. দীপক নাগ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৮ 

১৭. রাজেন্দ্রলাল মিত্র, পূর্বোক্ত, পৃ. ১২-১৩ 

১৮. ঐ, পৃ. ৬ 

১৯. দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, প্রথম খণ্ড, কলকাতা : দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯৩, পৃ. ১৩৭ 

২০. রাজেন্দ্রলাল মিত্র, পূর্বোক্ত, পৃ. ৯ 

২১. দীনেশচন্দ্র সেন, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৬৫ 

২২. প্রত্নতত্ত্ব হিসেবে পাওয়া অশোকের চতুর্দশ গিরিলিপি 

২৩. রাজেন্দ্রলাল মিত্র, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৭ 

২৪. মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, আমার ধ্যানের ভারত, শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত, কলকাতা : বঙ্গীয় সর্বোদয় সাহিত্য ও সমাজকল্যাণ সমিতি, ২০১৪, পৃ. ৫৬ 

২৫. ঐ, পৃ. ৫৬ 

২৬. ঐ, পৃ. ৫৬ 

২৭. সন্তোষ রাণা, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৮ 

২৮. দীপক নাগ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১০ 

২৯. ভারতের তৎকালে প্রকাশিত বহু পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

৩০. মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৫ 

৩১. দ্রষ্টব্য, রবীন্দ্রনাথের কালান্তর নামের প্রবন্ধ আর ঘরে বাইরে উপন্যাস। 

৩২. বঙ্কিচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘আনন্দমঠ’, বঙ্কিম রচনাবলী উপন্যাস সমগ্র, কলকাতা : তুলিকলম ১৯৮৬, পৃ. ৭০৪

৩৩. দ্রষ্টব্য, অমর দত্ত, উনিশ শতকের শেষার্ধে বাঙলাদেশে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, কলকাতা : প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স ২০০৭, বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য, পৃ. ১০-১৩ 

৩৪. দীপক নাগ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৫ 

৩৫. সন্তোষ রাণা, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৮ 

৩৬. দীপক নাগ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৬ 

৩৭. সুকান্ত পাল, ভারতে সাম্প্রদায়িকতা উদ্ভব ও বিকাশ, কলকাতা : ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৯৮, পৃ. ৬৪-৬৫; আরো দ্রষ্টব্য, শৈলেশকুমাার বন্দ্যোপাধ্যায়, দাঙ্গার ইতিহাস, ঢাকা : জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ২০১৫, পৃ, ৮১-৮২ 

৩৮. দীপক নাগ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩ 

৩৯. ঐ, পৃ.১৩ 

৪০. সন্তোষ রাণা, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৭ 

৪১. দীপক নাগ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৯-১০ 

৪২. ঐ, পৃ.১৪

৪৩. কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর সম্পাদিত, পূর্বোক্ত, ২০১৮, পৃ. ১০৩ 

৪৪. ঐ, পৃ. ১২৮ 

৪৫. ঐ, পৃ. ১২৮ 


লেখক : গবেষক ও শিক্ষক, গণ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //