চাচা-ভাতিজার ভোজ : গরিবের তৈল সংকট

প্রায় তিন মাস আগে বরিশালে এক অভিনব ভোজন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের একজন টুনু শরীফ জানান, ভোজন প্রতিযোগিতায় দুটি দল অংশ নেয়। একটি ‘চাচা গ্রুপ’, অপরটি ‘ভাতিজা গ্রুপ’। চাচা দলের সদস্যদের বয়স ছিল ৫৫ থেকে ৬০ বছর। আর ভাতিজা দলের সদস্যদের বয়স ছিল সর্বোচ্চ ২৫ বছর। প্রত্যেক দলে ২০ জন করে সদস্য ছিল। টুনু শরীফ নিজে ছিলেন চাচা দলের অধিনায়ক।

ভাতিজা দলের অধিনায়ক সাইফুল ইসলাম জানান, প্রতিটি দলের জন্য ৪০ কেজি খিচুরি-গরুর মাংস রান্না করা হয়। রাত ১০টার পর শুরু হয় খাওয়ার প্রতিযোগিতা। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তারা (ভাতিজা) ৩৮ কেজি খিচুরি ও গরুর মাংস খেতে সক্ষম হন। প্রতিদ্বন্দ্বী চাচারা খেয়েছেন ৩২ কেজি খিচুরি-মাংস। ৬ কেজির বেশি খেয়ে ভোজন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছেন ভাতিজারা। খাওয়া শেষে ছিল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে অতিথিরা চাচা-ভাতিজাদের হাতে ট্রফি তুলে দেন। 

চাচা দলের অধিনায়ক টুনু শরীফ বলেন, করোনার এই সময়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষদের আনন্দ দেওয়া ছিল আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আমরা তাতে সফল হয়েছি। হারা-জেতা কোনো বিষয় না। আমাদের আয়োজনে এলাকার সর্বস্তরের মানুষ আনন্দ করেছেন। খবরটি পড়ে ভাবার কোনো কারণ নেই যে, মানুষের আয় এমন বেড়ে গেছে যে, প্রতিযোগিতা করে খাওয়ার আয়োজন করার মতো সচ্ছলতা অর্জন করেছে দেশের অনেক মানুষ। আসলে এটি প্রকৃত চিত্র নয়।

যদিও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছেন, দেশের বর্তমান মাথাপিছু আয় ২৫৯১ ডলার। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান মাথাপিছু আয় ২৫৯১ ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি। 

সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে একনেক সভা পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরে চূড়ান্ত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৪১৬ বিলিয়ন ডলার।

দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়েনি এবং তা আগের মতো ২০ দশমিক ৫ শতাংশেই রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। 

তিনি আরো বলেন, ‘যদিও অনেক বেসরকারি সংস্থা, তাদের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, মনে করে যে দারিদ্র্যের হার বেশি, আমরা সেই বিতর্কে জড়াব না।’

দারিদ্র্যের হার নিয়ে সরকারও একটি হিসাব করছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তারা সঠিক সময়ে গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানাবেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের আকার এখন ৪১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিবিএস কর্তৃক গৃহীত নতুন ভিত্তি বছরের জন্য জিডিপির আকার প্রসারিত হয়েছে।

আগের ভিত্তি বছর ২০০৫-০৬ থেকে ২০১৫-১৬ এ ভিত্তি বছর পরিবর্তনের কারণে, অর্থনীতিতে অনেক নতুন ধরনের ব্যবসা ও পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা জিডিপির আকারকে প্রসারিত করেছে। 

তিনি আরো বলেন, যেহেতু জিডিপির আকার প্রসারিত হয়েছে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সাথে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে, যা এখন ২৫৯১ ডলারে উন্নীত হয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে করোনার প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার (আপার পোভার্টি রেট) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। দেশব্যাপী খানা পর্যায়ের জরিপের ভিত্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। নিজেদের অর্থায়নে এই জরিপ পরিচালনা করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম।

বিবিএসের খানা জরিপ অনুসারে, ২০১৬ সালে দেশের গ্রামাঞ্চলের সার্বিক দারিদ্র্য ছিল ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১৮ সালের জিইডি-সানেম জরিপ অনুসারে যা ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ; কিন্তু করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ আর করোনার সময়ে ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব শীর্ষক এক ভাচুর্য়াল অনুষ্ঠানে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। দারিদ্র্য যে বহুমুখী ধারণা, যেমন- শিক্ষা ও চিকিৎসায়ও এর প্রভাব দেখা যায়, এই প্রথম এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলল।

জরিপের আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, ২০২০ সালে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে রেমিট্যান্সের ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হলেও, ব্যক্তি পর্যায়ে তা বরং কমে গেছে। কারণ হিসেবে বলা হয়, অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসী আয় এসেছে। এতে বিনিময় হার কমে গেছে। ৮২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ পরিবার বলেছে, দেশের বাইরে থেকে আসা প্রবাসী আয় কমেছে। একই ক্ষেত্রে আগের মতো আছে বলেছে ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ পরিবার। ফলে প্রবাসী আয়ের প্রভাব সমাজে অতটা অনুভূত হয়নি, যতটা বলা হয়েছে, সে তুলনায়।

জরিপের ফলাফল তুলে ধরে সানেমের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, জরিপ পরিচালনার খরচ আছে। তবে তহবিল পাওয়া না গেলেও সানেম নিজস্ব অর্থায়নে জরিপটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। তার ভাষ্য মতে, ‘এটা না হলে আমরা একটি পরিপ্রেক্ষিত হারিয়ে ফেলতাম।’ সেই তাড়না থেকেই এই জরিপ পরিচালনা করা। দারিদ্র্য, অসমতা ও কর্মসংস্থান- এই তিনটি ক্ষেত্রে কোভিডের প্রভাব নিরূপণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, করোনার প্রভাবে দারিদ্র্যের কারণে মানুষ খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছেন, ঋণ নিয়েছেন, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনেছেন। আবার জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ পরিবার বলেছে, তারা খাপ খাওয়ানোর পথই খুঁজে পায়নি।

আর এই দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে অসমতায়। ভোগের ক্ষেত্রে যা দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৩৩। অথচ ২০১৮ সালে সানেম ও জিইডির আরেক জরিপে দেখা গিয়েছিল, এর মান শূন্য দশমিক ৩১। ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুসারে, এটি ছিল শূন্য দশমিক ৩২।

দারিদ্র্যের আরেকটি ফল হলো, শিক্ষাগ্রহণ ব্যাহত হওয়া। জরিপে দেখা গেছে, ২০১৮ ও ২০২০ সালের মধ্যে মাথাপিছু গড় শিক্ষা ব্যয় কমেছে। অতি দরিদ্র পরিবারের জন্য এই হার হ্রাস সবচেয়ে বেশি- ৫৮ শতাংশ। পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষায় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও কম ছিল।

জরিপের ফলাফল নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয় সাধারণত ভোগ দিয়ে; কিন্তু দারিদ্র্য যে বহুমুখী ধারণা, যেমন- শিক্ষা ও চিকিৎসায়ও এর প্রভাব দেখা যায়, সানেমের জরিপ এই প্রথম এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিচ্ছে। শিক্ষা, দারিদ্র্য বেড়েছে, শিক্ষায় ব্যয় কমেছে, বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থায় বেশির ভাগই অংশ নিতে পারছে না- এমনকি বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা আগের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনায় কতটা কম কার্যকর, সেটিও জানতে পারলে আরো ভালো হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কোভিডের প্রভাবে খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় কমে গেছে, কোন খাতে কতটুকু কমেছে, সেই অনুপাত জানা প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এম এম আকাশ। দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে মূল ধারায় আনতে শিক্ষা খাত যত দ্রুত সম্ভব চালু করতে হবে, স্বাস্থ্য খাতে ভর্তুকি দিতে হবে, কর্মসংস্থানের পরিবর্তনগুলো স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হবে বলে তিনি মত দেন।

সম্প্রতি ভোজ্যতেল  সংকটকে খাদ্যঝুড়ির এক গুরুত্বপূর্ণ আইটেম হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতাসহ সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় অবিশ্বাস্যভাবে দাম বেড়েছে এই পণ্যটির; কিন্তু এই একটি পণ্যের দাম বৃদ্ধি সহ্য করতে পারছেন না অনেক মানুষ। অর্থাৎ মাথাপিছু আয় যতই বাড়ুক না কেন তা বণ্টনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। উন্নয়ন বেশিসংখ্যক মানুষকে যদি স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে প্রকৃত উন্নয়ন অভিধাভুক্ত করা সঙ্গত নয়।

অর্থাৎ সমাজে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমা টপকাতে পারেননি এখনো। ফলে চাচা-ভাতিজারা যখন আনন্দ করার জন্য ভোজন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন, তখন কম আয়ের মানুষ একটু সাশ্রয়ী দামে ভোজ্যতেল পাবার আশায় টিসিবির ট্রাকের পেছনে তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই চিত্র দেশের মানুষের আর্থিক উন্নয়নের ছবি বহন করে না। কম আয়ের লোকের হাতে তাই অধিক অর্থ পৌঁছানোর পথ খোঁজা এখন জরুরি  হয়ে পড়েছে।


লেখক: কথাসাহিত্যিক

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //