বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ প্রশ্ন

বৈশ্বিক মহামারির ভেতর আমাদের দুটি মুখঢাকা বিশ্ব পরিবেশ দিবস পাড়ি দিতে হয়েছে। করোনা মহামারির ভেতর দেশদুনিয়া লকডাউনের ফলে প্রচলিত দূষণ ও পরিবেশগত সংকট কিছুটা কমতে দেখা যায়। বিশেষ করে দুনিয়াব্যাপী মানুষ প্রাণ-প্রকৃতির গুরুত্ব অনুধাবনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের তৎপরতা দেখিয়েছিল।

কিন্তু এ সময়টাতেও প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের সংকট তৈরি হয়েছে, বহু বন্যপ্রাণ হারিয়ে গেছে। বছর দুই পর মহামারি সংক্রমণহ্রাসের এই লগ্নে আরেকটি পরিবেশ দিবসের ময়দানে দুনিয়া হাজির। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘একটাই পৃথিবী’। এমন প্রতিপাদ্য কেন যেন মনে হয় আগেও বেজেছে কোথাও। ২০১০ সালকে আন্তর্জার্তিক প্রাণবৈচিত্র্য বর্ষ ঘোষণা করা হয়েছিল। সে বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বহু প্রাণের বৈচিত্র্য, এক পৃথিবী, এক আগামী’।

এমনকি ১৯৯২ সালে রিওডিজেনেরিওতে বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলনেও একমাত্র বসবাসযোগ্য পৃথিবী গ্রহকে বাঁচাতে দুনিয়া শপথ করেছিল। এই এক পৃথিবীর কথা নানা সময়ে নানা দিবসে বৈশ্বিকভাবে উচ্চারিত হলেও, এমনকি করোনাকালে পৃথিবী সুরক্ষার গুরুত্ব সামগ্রিকভাবে উপলব্ধ হলেও এখনো আমরা পৃথিবীর পরিবেশ সুরক্ষায় নিজেদের দায়িত্বশীল আচরণ ও তৎপরতা সক্রিয় করিনি। করোনা মহামারি ছড়িয়ে যাওয়ার শুরুতে একটি লেখার কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি। 

‘...দুনিয়া জুড়েই কমছে প্রাণ-প্রজাতির বৈচিত্র্য। নয়াউদারবাদী করপোরেট বাজারনির্ভর উন্নয়ন প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের সহাবস্থানকে বারবার অস্বীকার করছে। দশ হাজার বছর আগে হাজার উদ্ভিদ প্রজাতি থেকে মানুষের খাদ্যের জোগান আসত, আজ মাত্র চারটি শস্যফসল মানুষের খাদ্যবাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ঐসময়ে দুনিয়ায় মানুষ ছিল এক ভাগ আর বন্যপ্রাণ ছিল ৯৯ ভাগ। আজ মানুষ হয়েছে ৩২ ভাগ, গবাদি প্রাণিসম্পদ ৬৭ ভাগ আর বন্যপ্রাণ মাত্র এক ভাগ। দুনিয়াজুড়ে নির্দয়ভাবে উধাও হচ্ছে বন্যপ্রাণের জাত ও পরিসংখ্যান। মানুষ আজ মাছ, পাখি, বাদুড়, বাঘ, হাতি কি মৌমাছি সবাইকে উচ্ছেদ করে নিজের বসতি গড়ছে। প্রকৃতিতে এক মানুষ ছাড়া আর সব প্রাণপ্রজাতির বিচরণস্থল ও নিজেদের আপন বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়েছে। প্রতিবেশবিমুখ এই উন্নয়ন বাহাদুরিই একের পর এক নানা অসুখ ও মহামারি ডেকে আনছে। যার প্রভাব জীবনযাপন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি কি বৃহৎ সামাজিক প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে। এক একটা বিপদের মুহূর্তে শুধুমাত্র কিছুটা সময়ের জন্য আমরা ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া হচ্ছি, কিন্তু বিপদ কিছুটা কমলেই আবার ভুলে যাচ্ছি। নিজেরাই এক একজন প্রবল পরিবেশ-হন্তারক হয়ে উঠছি।’ 

আজ আমরা কেউ কি অস্বীকার করতে পারব, প্রাণ-পরিবেশের জন্য আমরা বিপজ্জনক নই? পরিবেশ সুরক্ষা প্রশ্নে আমাদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে প্রথমত সচেতন হওয়া জরুরি। আমরা কতজন প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার পর খালি প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতল, টিস্যু পেপার কিংবা কলার খোসা সঠিক স্থানে ফেলি? বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যকর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের পৃথিবীর সবুজ স্বপ্ন মজবুত হবে না। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পরিবেশবান্ধব বর্জ্যব্যবস্থাপনা বিষয়ে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে সক্রিয় হওয়া জরুরি। 

আমরা যখনই বলি সভ্যতা, বিশেষ করে নগরসভ্যতা, তখন এর চাকচিক্য আর স্থাপনা বা বিলাসবহুল জীবনই শুধু নয় এর সাথে চলে আসে বর্জ্য বা আবর্জনার প্রসঙ্গ। দেখা গেছে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ জীবন থেকে কোনো এলাকা যখনই নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে পরিবর্তিত হয়েছে তখনই বর্জ্য এক তীব্র সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। কারণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে নগর ও শিল্প এলাকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক মৌলিক বিবেচনা হিসেবে নেওয়া হয়নি।

আজ তাই দেশের রাজধানীসহ বড় মেট্রোপলিটন, সিটি কর্পোরেশন, বিভাগ, জেলা এমনকি উপজেলা সদরগুলোও আজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভীষণ দুর্বিপাকে আছে। সকল বর্জ্য আবর্জনা শহরে ঢোকার রাস্তার আশপাশে ফেলা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে এখনো দেশে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। এর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সকল শ্রেণি-পেশার নগরবাসীকেই। বিশেষ করে নগরের নিম্ন আয়ের মানুষজন এবং বিশেষত যারা বস্তি এলাকায় বসবাস করছেন তাদের অধিকাংশের আবাসস্থল এ রকম বর্জ্য ডাম্পিং এলাকায় এবং এরাই বর্জ্য বিষয়ক সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়। মোট বর্জ্যরে একটা বড় অংশ হচ্ছে কঠিন বর্জ্য। পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে যে বর্জ্য সম্পদে পরিণত হতে পারে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নগরবাসীকে যুক্ত করলে গড়ে উঠতে পারে সঠিক পরিকল্পিত পরিবেশবান্ধব স্বাস্থ্যকর বর্জ্যব্যবস্থাপনা। সে ক্ষেত্রে নগরের নিম্ন আয়ের বস্তিবাসীদের নিয়ে সমাজভিত্তিক পরিবেশবান্ধব কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। 

সারা পৃথিবীতেই কঠিন বর্জ্য এবং এর ব্যবস্থাপনা নানামুখী সংকট তৈরি করে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পৃথিবীতে প্রতিদিন নগরে প্রায় ২.০২ বিলিয়ন টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয় এবং জনপ্রতি ০.৭৪ কেজি কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। যদি এভাবে কঠিন বর্জ্যরে পরিমাণ বাড়তে থাকে তবে ২০৫০ সালের ভেতর পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রায় ৩.৪০ বিলিয়ন টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হতে পারে যার ব্যবস্থাপনা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। 

নয়াউদারবাদী ব্যবস্থার লাগামহীন মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্য এবং নগরভিত্তিক ভোগবিলাসিতা প্রতিনিয়ত কঠিন বর্জ্য তৈরি করছে এবং সকলের সুস্থভাবে বেঁচে  থাকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষ করে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বস্তিবাসী গরিব মানুষদের। এখনো আমরা ঘরের ভেতর বর্জ্যকে আলাদাভাবে ভাগ করতে অভ্যস্ত হইনি, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাছে নিজ দায়িত্বে বর্জ্য সঠিকভাবে বুঝিয়ে দিতে সচেতন হইনি, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা না ফেলার অভ্যাস এখনো আমাদের সংস্কৃতি হিসেবে গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে পলিথিন, রাসায়নিক, বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ দ্রব্য এবং এসবের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার নিত্যনতুন কঠিন বর্জ্যরে ভাগাড় বড় করছে এবং সংকট বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে পলিথিন বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার শুরু হয়। পলিথিন গলে না, মেশে না, পচে না। ৫০০ থেকে হাজার বছরে এটি আবারো প্রকৃতিতে রূপান্তর হয়। ২০০২ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী ঢাকা শহরে প্রতিদিন একটি পরিবার গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করত। পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে দৈনিক ৪৫ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হতো, ২০০০ সালে ৯৩ লাখ। ২১ জুন ২০১৫, ব্যবসায়ীদের এক সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে দৈনিক এক কোটি ২২ লাখ পলিথিন ব্যবহৃত হচ্ছে।

দুনিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন পলিথিন সামগ্রী তৈরি হয়। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬ (ক) (সংশোধিত ২০০২) ধারা অনুযায়ী ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা শহরে এবং একই সালের ১ মার্চ বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বিস্কুট, চানাচুরসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, সিমেন্ট, সারসহ ১৪টি পণ্যের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০০২) এর ১৫(১) অনুচ্ছেদের ৪ (ক) ধারায় পলিথিন উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণের জন্য অপরাধীদের সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা ৬ মাসের কারাদণ্ডের বিধান আছে। আইন অনুযায়ী ১০০ মাইক্রোনের কম পুরুত্বের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। 

প্লাস্টিকসহ সুষ্ঠু সমাজভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নগরের নিম্ন আয়ের মানুষদের যুক্ত করা দরকার। সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কর্মসংস্থানেও তাদের যুক্ত করা জরুরি। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১ এবং ‘চিকিৎসা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা ২০০৮-এর বিধানাবলি অনুসরণে সমাজভিত্তিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে জোরদার করা সম্ভব। আর এই পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই আমাদের এক স্বাস্থ্যকর পরিবেশবান্ধব সবুজ আগামী উপহার দিতে পারে। সবাই মিলে এক পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কেবলমাত্র প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণ করলেই হবে না, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।


পাভেল পার্থ
গবেষক ও লেখক

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //