ফিলিস্তিনে গণহত্যা: জায়নবাদী সেটলার কলোনিয়ালিজমের পূর্ণ রূপ

গত বছর ৭ অক্টোবর গাজার হামাস গ্রুপ কর্তৃক ইসরায়েলের ওপর সন্ত্রাসী হামলার জবাব হিসেবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর প্রকাশ্যে চালিয়ে দিয়েছে তার গণহত্যার মেশিন। ইসরায়েলি গণহত্যার শুরু অবশ্য ৭৬ বছর আগে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের অধিবাসীদের হত্যা ও উচ্ছেদ করার মধ্য দিয়ে।

গত সাত মাসে ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনে এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করছে ৩৬ হাজারেরও বেশি মানুষ, যাদের অর্ধেক শিশু আর আহত হয়েছে প্রায় ১ লাখ। বোমার আঘাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো পড়ে আছে অনেকে। এই ৭ মাসে ফিলিস্তিনে অনেক শিশুর জন্ম ও মৃত্যু হয়েছে যাদের পৃথিবীতে আসার অভিজ্ঞতা কেবল বোমার আতঙ্ক, ক্ষুধা ও মৃত্যু। 

গাজা, রাফা ও পশ্চিম তীরে যে ইসরায়েলি গণহত্যা চলছে তা হিটলারের নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ইহুদিদের ওপর নির্যাতনকেও হার মানানোর পথে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টেলিভিশন ও ইন্টারনেট ছিল না, ছিল না জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, মানবাধিকার সংস্থা ইত্যাদি। এখন এসবের উপস্থিতিতে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যা করছে তা হিটলারের পক্ষে সম্ভব হতো কিনা অনিশ্চিত। 

ইহুদিরা বেশিরভাগ সময় সারা ইউরোপে নির্যাতিত ও অপদস্থ হয়ে পালিয়ে ফিরেছে। সেদিনের সেই অসহায় দিনগুলোতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ছিল ইহুদিদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। হলোকস্ট ইউরোপের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেই কলঙ্ককে ঢাকতে তারা ফিলিস্তিনকে টুকরো করে তার অধিবাসীদেরকে উচ্ছেদ করে ইহুদিদের জন্য একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নেয়; যা শুরুই হয় ফিলিস্তিনি হত্যার নীলনকশা দিয়ে আর  ১৯৪৮ সাল থেকে চলছে।

নূর মাসালহা ফিলিস্তিন ইতিহাসের চার হাজার বছর নিয়ে লেখা বইতে লিখেছেন, “জায়নবাদী দখলদারি ঔপনিবেশিকতার শিকড় ইউরোপিয়ান উপনিবেশবাদের গভীরে নিহিত। ... ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে যখন সব ইহুদিকে জড়ো করে ফিলিস্তিনে দখলদার-উপনিবেশ স্থাপনের লক্ষ্য ঠিক হলো, ফিলিস্তিনে যে মানুষ বাস করে তা বেমালুম ভুলে গেল তারা। ১৮৯৭ সালে রাজনৈতিক জায়নবাদের যাত্রা শুরুর সময় প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেসে গৃহীত বাসেল কর্মসূচিতে ফিলিস্তিনের মাটিতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের কোনো উল্লেখই করা হয় না। জায়নবাদী মিশনের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয় : ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে একটি আইনি ও জনস্বীকৃত বসতি প্রতিষ্ঠা।”

ইহুদি বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ইলান পাপের কথায়, “১৮৮০-র দশকে কেন্দ্রীয় ও পূর্ব ইউরোপে জাতীয় পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন হিসেবে জায়নবাদের উৎপত্তি হয় ঐসব এলাকায় প্রচলিত সমাজে ইহুদিদের একাত্ম হয়ে যাওয়ার অথবা ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার লক্ষ্যে। (যদিও আমরা জানি, প্রচলিত সমাজের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্মতাও নাজি জার্মানি কর্তৃক তাদের নির্মূলীকরণ ঠেকানোর রক্ষাকবচ হয়নি।) বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বেশিরভাগ জায়নবাদী নেতা জাতিগত পুনরুজ্জীবনকে যুক্ত করেছেন ফিলিস্তিনের ঔপনিবেশিকরণের সঙ্গে।” 

ফিলিস্তিন দখলের সেই ঘৃণ্য জায়নবাদী পুনরুজ্জীবনের পূর্ণ রূপই আজকের এই গণহত্যা। পৃথিবীর ইতিহাসে গণহত্যার যেসব কলাকৌশল, নেতানিয়াহু ও তার সাগরেদরা এর সবগুলোর সফল প্রয়োগ ঘটাচ্ছে ফিলিস্তিনে। সঠিকভাবে বললে, কৌশলগুলোকে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার আরও ‘উন্নত ও অব্যর্থ’ করেছে। আর গণহত্যাকারী নেতানিয়াহুর সরকার অস্ত্র ও অর্থদাতা হিসেবে পেয়ে গেছে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকা আর মদদদাতা হিসেবে আছে আরেক বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটিশ সরকার। 

গণহত্যাকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কৌশলের মধ্যে থাকে উন্নততর অস্ত্র দিয়ে নির্বিচার হত্যা, উচ্ছেদ ও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা, পালানোর পথ বন্ধ করে হত্যা, খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব সৃষ্টি, টার্গেট জনগোষ্ঠী ও অধিবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব সৃষ্টি, তাদেরকে পশুতুল্য মনে করা, তাদের গ্রন্থাগার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, গণহত্যাকারী সৈনিকদের মনে হত্যাকর্মে পাশবিক আনন্দ সৃষ্টি, সংগঠিত মিথ্যাচার, গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার লক্ষ্যে টার্গেট জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কোনো একটা কাল্পনিক ও মিথ্যা অভিযোগ তৈরি ইত্যাদি। গত ৭ মাসের ঘটনা থেকে এটাই প্রমাণিত ভবিষ্যতের যে কোনো গণহত্যাকারী রাষ্ট্র বা শক্তির জন্য বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রশিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারবে। 

যে হলোকস্টের লজ্জা থেকে বাঁচার জন্য ইউরোপ-আমেরিকা যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি রাষ্ট্র উপহার দিল তা প্রচলিত ইউরোপিয়ান দখলদারি ঔপনিবেশিকরণেরই একটি আধুনিক রূপ। দাক্ষিণ অফ্রিকায় এ প্রকল্পের পতনের পর এর নতুন প্রয়োগ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে ফিলিস্তিনের নিরীহ জনগণের ওপর। দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষের মুক্তিসংগ্রাম ও ফিলিস্তিনের জনগণের মুক্তিসংগ্রাম তাই অনেকটা এক সূত্রে গাঁথা। ‘গ্লোবাল প্যালেস্টাইন’ বইয়ের লেখক জন কলিন্সের কথায়, ফিলিস্তিন কেবল একটি স্থানীয় রাজনৈতিক সমস্যা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক বিষয়। যেখানেই অবিচার, বর্ণবাদ, বৈষম্য, উগ্র ধর্মান্ধতা, বিমানবিকীকরণ, গণতন্ত্রের খোলসে নির্মূলীকরণ-সেখানেই ফিলিস্তিন ও স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। আমেরিকা ও ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে তাই তরুণশক্তি ফুঁসে উঠেছে ইসরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে। নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে ফিলিস্তিনের মুক্তির দাবিতে যাতে অনন্য সাহস ও নৈতিকতা নিয়ে অংশগ্রহণ করেছে অসংখ্য ইহুদি তরুণ-তরুণীও। ইসরায়েলি গণহত্যা প্রকল্পের শেষ পরিণতি তাই পরাজয় এ কথা নিশ্চিত বলা যায়।

লেখক : সম্পাদক, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //