Logo
×

Follow Us

অন্যান্য

কৃষকের আত্মহনন : দায় কার?

Icon

গৌরাঙ্গ নন্দী

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫, ১০:৪৯

কৃষকের আত্মহনন : দায় কার?

রাজশাহীর পবা উপজেলার আত্মহননকারী কৃষক মিনারুলের স্বজনদের আহাজারি

ক্ষুধা ও ঋণের জ্বালায় রাজশাহীর পবা উপজেলার বামুনশিকড় এলাকায় একই পরিবারের চারজন আত্মহত্যা করেছে। পুলিশ ১৫ আগস্ট সকালে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত ব্যক্তিরা হলো মিনারুল ইসলাম (৩৫), স্ত্রী মনিরা বেগম (২৮), তাদের ছেলে মাহিন (১৩) ও শিশুকন্যা মিথিলা (২)। মরদেহের পাশে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে, যাতে ঋণ এবং খিদের জ্বালা, খাবার জোগাড় করতে না পারার কথা বলা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয়দের সূত্রে পত্রিকার খবরে বলা হয়, মিনারুল কৃষিকাজ করতেন। অনেক টাকা ঋণগ্রস্ত ছিলেন। কৃষিকাজেও সুবিধা করতে পারছিলেন না, ফলে আয় তেমন ছিল না। ঋণ ও খিদের জ্বালা সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সবাই আত্মহত্যা করলেন। যে চিরকুটটি মৃতদেহের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তা মিনারুলের লেখা বলে পুলিশের ধারণা। 

আগেও এ রকম আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। তবে কেউই এমন করে সুনির্দিষ্টভাবে অভাব, খাদ্যাভাবের কথা উল্লেখ করে চিরকুট লিখে রেখে যায়নি। আগের আত্মহত্যাগুলো নিয়ে আমরা নানা ধরনের ব্যাখ্যা দিতাম। আত্মহত্যার দায় তাদের ওপরই চাপিয়ে দিতাম। আর খাদ্যাভাবে, ঋণের দায়ে মানুষ আত্মহত্যা করেছে, তা স্বীকার করতে চাইতাম না। কিন্তু এবারে আত্মহত্যাকারী সুনির্দিষ্টভাবে তাদের আত্মহত্যার কারণ উল্লেখ করে চিরকুট লিখে গেছেন। আমরা নিশ্চয়ই এবারে এই নির্মম সত্যিটা অস্বীকার করব না যে এখনো মানুষ খাবার জোগাড় করতে না পেরে আত্মহত্যা করছে। 

স্বাভাবিকভাবে এসব আত্মহত্যার ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা নথিভুক্ত হয়। দু-এক দিন এসব নিয়ে কথাবার্তা হয়। তারপর সব থেমে যায়। আবারও একটি আত্মহত্যার ঘটনা খবর হলে আমরা সচকিত হই। কিছুদিন আগেও রাজশাহীতে দেনার দায়ে এবং উৎপাদিত পণ্য-পেঁয়াজের যথাযথ মূল্য না পেয়ে কৃষক মীর রুহুল আমিন (৭০) ট্রেনের তলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। তার আগে মেহেরপুরে কৃষক সাইফুল শেখ (৫৫) উৎপাদিত পেঁয়াজের যথাযথ মূল্য না পেয়ে এবং দেনা পরিশোধের দুশ্চিন্তায় ক্ষেতেই বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। এক বছর আগে রাজশাহীতেই ক্ষেতে পানি দিতে না পেরেও এক কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। কৃষক সাইফুলের দেনাদার (এনজিওর কাছ থেকে ঋণ, সার ও কীটনাশকের দোকানে দেনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানে ধারে পণ্য কেনা বাবদ দেনা) ছাড়া অন্য কোনো শত্রু বা বিরোধ আছে, এমন কথা কেউই বলেননি। পবার কৃষক মিনারুলের পরিবারের সব সদস্যের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করলেও সম্ভবত একই বিষয় উঠে আসবে। 

বিস্ময়কর হচ্ছে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এই উৎপাদকরা সব উপকরণ কেনেন উচ্চমূল্যে, উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করেন কম দামে; আবার নিজেরা যখন প্রয়োজনে কিনতে যান অথবা আমজনতা যখন বাজারে যায় তখন সবকিছুতেই দেখে অগ্নিমূল্য। এখন বাজারে কোনো সবজি ১০০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। যে পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয়েছিল বিঘাপ্রতি এক লাখ থেকে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা, সেটাই কৃষক বিক্রি করেছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। অথচ এখন বাজারে পেঁয়াজের সংকট দেখা দিয়েছে। পেঁয়াজ আমদানি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।  

আর একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, ঘটনার দায় আমরা নিতে চাই না, পাশ কাটানোর চেষ্টা করি। ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করি। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের মানসিক রোগী হিসেবে তকমা দেওয়ার চেষ্টা থাকে। কেউ কেউ কৃষক সাইফুল শেখকেও মানসিক রোগী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তার মেয়ের উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছিল। তার মেয়ে বলেছিলেন, পেঁয়াজের দাম না পাওয়ায় তার বাবা কিছুদিন মানসিক চাপে ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, মানসিক চাপে না থাকলে কেউ কি আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে? ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিতে পারে? তেমনিভাবে কতটা বিপর্যস্ত হলে এই পরিবারের চার সদস্যকে একসঙ্গে আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত হয়েছে! সম্ভবত সবাই মিলেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন, কেউ কাউকে এই পৃথিবী থেকে আর দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করার ঝুঁকি নিতে চায়নি। অথবা মা-মেয়েকে পরিবারের পুরুষ সদস্যটি কোনোভাবে আগেভাগে হত্যা নিশ্চিত করেছেন; তারপর ছেলে এবং নিজের হত্যাটি নিশ্চিত করেছেন। এসব আমরা ভাবতে পারি! কিন্তু নির্মম সত্যি হচ্ছে; চারটি মানব-সন্তান খাবার জোগাড় করতে না পেরে, ঋণের দায়ে মারা গেল!

এই চারটি প্রাণ হত্যার দায় কি কর্তৃপক্ষ তথা সমাজ তথা সরকার নেবে না? নিদেনপক্ষে, এই ব্যর্থতার দায় কি স্বীকার করবে না? যদি না করে, তবে বলাই যায়, কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনাটি বরাবরের মতো সরকার খাটো বা ছোট করে দেখছে।

অথচ এই কৃষকই আমাদের সমাজকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য আমাদের মুখে খাবার জুগিয়ে চলেছে। এটি একেবারেই কাঠামোগত সমস্যা, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সমস্যা। আমরা সব মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করতে পারিনি-এমন কোনো বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি, যাতে কৃষক তার উৎপাদিত মূল্যের লাভজনক মূল্য পেতে পারেন। আমরা আর কবে এই দিকটির প্রতি নজর দেব?  

আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছি, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, মোট সম্পদ বেড়েছে। ধনী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। অথচ আমরা প্রান্তিক মানুষের, উৎপাদনকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি। এ কারণে অবিলম্বে কতকগুলো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- 

এক. কৃষক যাতে উৎপাদিত ফসলের লাভজনক মূল্য পেতে পারে, সেই বিষয়ে নীতি প্রণয়ন করা। 

দুই. কাঁচামাল বা শস্য সংরক্ষণের জন্য সংরক্ষণাগার বা হিমাগারের ব্যবস্থা করা। 

তিন. যেকোনো কৃষি পণ্য ক্ষেত থেকে ওঠার সময় একেবারেই মূল্য কমে যায়, কিন্তু ফড়িয়া হয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে গেলে মূল্য তিন থেকে চারগুণ বা তার বেশি বেড়ে যায়। এই ব্যবস্থা রোধের জন্য মূল্য কমিশন গঠন ও তা কার্যকর করা। 

চার. একদিকে উৎপাদনকারী কৃষক তার উৎপাদনমূল্য পান না; অন্যদিকে মুনাফা লোটে ফড়িয়া, পাইকার, আড়তদার। এই ব্যবস্থা রোধের জন্য কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সরাসরি কেনার ব্যবস্থা করা। 

পাঁচ. পণ্য উৎপাদনের পূর্বাভাস, বাজারজাতকরণের ধরন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কিত সব তথ্য উৎপাদনকারীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ফেয়ার দিয়া ১১/৮/ই, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট (লেভেল-৮), বক্স কালভার্ট রোড, পান্থপথ, ঢাকা ১২০৫