এক নজরে হায়দার আকবর খান রনো

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা হায়দার আকবর খান রনো। গতকাল শুক্রবার (১০ মে) রাত ২টা ৫ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে বরাসুলা গ্রামে হলেও তার জন্ম ১৯৪২ সালের ৩১ আগস্ট, কলকাতার বৈঠকখানা রোডে নানার বাড়িতে। 

হায়দার আকবর খান রনোর নানা ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ সৈয়দ নওশের আলী। পিতা হাতেম আলী খান ছিলেন একজন প্রকৌশলী। ১৯৬৮ সালে হাতেম আলী খান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সড়ক ও জনপথ বিভাগের চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। মা কানিজ ফাতেমা মহসিনা ছিলেন গৃহিনী। রনোর ছোট ভাই হায়দার আনোয়ার খান জুনোও একজন বামপন্থি রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। হায়দার আকবর খান রনোর একমাত্র কন্যা ড. রানা সুলতানা সপরিবারে কানাডায় বসবাস করেন। 

হায়দার আকবর খান রনো যশোর জিলা স্কুল, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও ঢাকার সেন্টগ্রেগরী স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৫৮ সালে সেন্টগ্রেগরী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ম্যাট্রিকের মেধাতালিকায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে তিনি ১২তম স্থান লাভ করেছিলেন। রনো ১৯৬০ সালে ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। ১৯৬০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু কোর্স সম্পন্ন করতে পারেননি, তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে ডিগ্রি পাসকোর্সের সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। হায়দার আকবর খান রনো কারাগারে অবস্থানকালে আইনশাস্ত্রে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টের সনদও লাভ করেছিলেন। কিন্তু ওকালতি পেশা তিনি গ্রহণ করেননি। রনো ছোটবেলাতেই বাংলা ও বিদেশি ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্য পাঠ করেছিলেন। কিশোর বয়সেই বাবার কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, নজরুল, শেক্সপিয়ারের বিভিন্ন কাব্য শুনে শুনে তার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। আবৃত্তির পাশাপাশি তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিতর্ক ও সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বহু পুরস্কার জিতেছেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভালো বক্তা হিসাবে পরিচিতিও লাভ করেছিলেন। তাকে বলা হতো অনলবর্ষী বক্তা।

১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার ছাত্র থাকাকালে তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে তার সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সেসময়কার প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে ডা. আহমদ জামানকে সভাপতি, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদকে সাধারণ সম্পাদক ও হায়দার আকবর খান রনোকে যুগ্ম সম্পাদক করে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ১৯৬২ সালে রনো দুইবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ৬২-এর মার্চ মাসে তাকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে রাখা হয়েছিল। পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। যেখানে ছাব্বিশ সেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তিনি একত্রে ছিলেন।

পরের বছর ১৯৬৩ সালে হায়দার আকবর খান রনো ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ছাত্র আন্দোলনের কারণে ১৯৬৪ সালে তার নামে হুলিয়া বের হয়। তিনি আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু দুই মাস পর ধরা পড়েন। তাকে গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয়ে দুই দিন ও দুই রাত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাখা হয়েছিল। এ সময় তাকে ঘুমাতেও দেয়া হয়নি। মাথার উপর রাখা হয়েছিল অতিরিক্ত পাওয়ারের বৈদ্যুতিক বাতি। ১৯৬৫ সালে তার জেলে থাকাকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঐতিহাসিক বিভক্তি ঘটলে, তিনি জেল থেকে বেরিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপকে সমর্থন জানান। ১৯৬৫ সালে তিনি রেল ধর্মঘটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং আবার কিছুদিনের জন্য কারারুদ্ধ হন। ১৯৬৫ সালের আগে এদেশে মার্কসবাদী বইপত্র নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৬৬ সালে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট পার্টির মস্কো-পিকিং ঐতিহাসিক বিভক্তির প্রভাবে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হলে তিনি চীনপন্থি অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ওই বছরই তিনি কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে টঙ্গী শ্রমিক এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। দুজনে মিলে টঙ্গী অঞ্চলে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে আলোচিত অধ্যায়। সে সময় হায়দার আকবর খান রনো ঢাকার বাসা ছেড়ে টঙ্গীর শ্রমিক বস্তিতে বসবাস করতে শুরু করেন। সপ্তাহে এক-আধবার ঢাকায় আসতেন রাজনৈতিক কারণে। শ্রমিক আন্দোলন করার ফলে বহুদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে তাকে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। শ্রমিক আন্দোলন ও পাশাপাশি জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনে সংগঠকের ভূমিকা দুটোই চালিয়ে গেছেন। 

১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টঙ্গী থেকেই শুরু হলো ঐতিহাসিক ঘেরাও আন্দোলন। এই আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। পরে ঘেরাও আন্দোলন অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। সংগঠন গড়ে তুলতে ও নেতৃত্ব দিতে রনোকে তখন টঙ্গীর বাইরে অন্যান্য শ্রমিক অঞ্চলেও যেতে হয়েছে। ১৯৭০ সালে তিনি তৎকালীন প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সুযোগ তার হয়েছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭৩ সালে তার অন্যান্য রাজননৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে গঠন করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী) এ দল গঠন করার পূর্বে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের কিছুকাল আগে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’ নামের একটি দল গঠন করেছিলেন তারা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নরসিংদীর শিবপুরে হেডকোয়াটার স্থাপন করে সারা দেশে তারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী)-এর নাম ১৯৭৯ সালে পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পাটি’। প্রথম থেকেই তিনি পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন। ১৯৭৯-৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৯ সালে রাশেদ খান মেননের সঙ্গে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিরোধ তৈরি হলে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির একাংশ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হন। দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে ২০২২ সালে সরে আসনে তিনি। মৃত্যুর আগপর্যন্ত এই দলের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। রাজনীতি ছাড়া অন্য কোনো পেশা তার ছিল না। তিনি ছিলেন সার্বক্ষনিক রাজনীতিবিদ। তবে লেখক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বহুল পঠিত ও পাঠক প্রিয় গ্রন্থ। 

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //