‘আমি’ ও ‘আমার’ বলতে নেই

‘আমি’ বলতে কিছু নেই: সৃষ্টিজগতের জন্য আমিত্ব বলতে কিছু নেই। পৃথিবীতে তারা ক্ষণিকের অতিথিমাত্র। চোখ বন্ধ করলে ‘আমিত্ব’র অস্তিত্ব শেষ। মহান আল্লাহ তার আমি ও আমিত্বের প্রকাশ ঘটানোর জন্য মানুষসহ সব মাখলুকাতকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হওয়ার কারণে তার মধ্যেও এই আমি ও আমিত্বের প্রকাশ ঘটানোর অদম্য ইচ্ছা বা কামনা বিদ্যমান দেখা যায়। অথচ যে ক্ষেত্রে আমি ও আমিত্বের দ্বারা অহংকার ও গর্ব প্রকাশ পায়, সে ক্ষেত্রে আমি ও আমিত্বের ব্যবহার অবৈধ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যার অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণও অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৫৯)
মানুষ আল্লাহর মাখলুক ও গোলাম। আল্লাহর ইবাদতের জন্যই তাদের সৃষ্টি করা হয়। সুতরাং মানুষের অহংকার করার কোনো অধিকার নেই। মহান আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের জন্য মানুষ শুকরিয়া করতে পারে, যা তাদের নিয়ামতকে আরো বৃদ্ধি করে দেবে; কিন্তু আল্লাহর প্রদত্ত নিয়ামত পেয়ে অহংকার করলে সেই নিয়ামত যেমন হাতছাড়া হয়ে যাবে, তেমনি মহান আল্লাহর রহমত থেকেও বঞ্চিত হতে হবে।
মানুষকে মহান আল্লাহ দুনিয়ায় পাঠান এক ফোঁটা নাপাক শুক্রাণু থেকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘শুক্রবিন্দু থেকে তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আবাসা, আয়াত : ১৯)
অর্থাৎ যার জন্ম এমন ঘৃণিত পানি থেকে, তার জন্য অহংকার শোভা পায় না। এটা জানার পরও যাদের মাঝে অহংকার আসে, তাদের মতো বোকা আর কেউ হতে পারে না। আমিত্বের কারণে ফেরাউন, কারুন, শাদ্দাদের মতো প্রভাবশালীরাও ধ্বংস হয়েছে। শয়তানকে হতে হয়েছে চির অভিশপ্ত।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি বলেন, আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম, তখন কী তোমাকে নিবৃত্ত করল যে তুমি সিজদা করলে না? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কাদামাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন, তাহলে তুমি এখান থেকে নেমে যাও, এখানে থেকে অহংকার করবে, এটা হতে পারে না। সুতরাং তুমি বের হয়ে যাও, নিশ্চয় তুমি অধমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১২-১৩)
উপরোক্ত আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা অহমিকা, মর্যাদার ভিত্তিহীন দাবি এবং কোনো জন্মগত স্বতঃসিদ্ধ অধিকার ছাড়াই নিজেকে অযথা শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন মনে করা মানুষকে বড়, শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাশীল করতে পারে না। বরং এর ফলে মানুষ মিথ্যুক, লাঞ্ছিত ও অপমানিতই হয়। এর জন্য দায়ী সে নিজেই।
‘আমার’ বলে কিছু নেই: দুনিয়ায় ‘আমার’ বলে কোনো কিছু নেই। দুনিয়ায় যা কিছু আমার মনে হয়, সবই মরীচিকা। নিঃশ্বাস ত্যাগ করা মাত্রই সেই মরীচিকা কেটে যায়। পবিত্র কোরআনে দুনিয়ার জীবনকে শুধুই ধোঁকার সামগ্রী বলা হয়েছে। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজনকে বলা হয়েছে পরীক্ষাস্বরূপ। এগুলোর মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রেখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো এক পরীক্ষা। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহাপুরস্কার।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৮)
কিয়ামতের বিভীষিকাময় মুহূর্তে এরা কেউ সঙ্গী হবে না। কেউ কারো কোনো উপকার করতে পারবে না। সেদিন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন একে অন্যকে ভুলে যাবে। সেদিন মানুষ আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াবে একাকী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর কিয়ামতের দিন তাদের সবাই তার (আল্লাহর) কাছে আসবে একাকী। (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ৯৫)
অতএব, আমাদের অহংকার করার কোনো যোগ্যতাই নেই, আমরা নিছক আল্লাহর গোলাম। আল্লাহর রহমত ছাড়া আমাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। আমাদের উচিত অহংকার ত্যাগ করা, দম্ভের ‘আমি’ ও ‘আমিত্ব’কে মহান আল্লাহর জন্য বিলীন করে দেওয়া, আল্লাহকে ভয় করা, তার কাছেই আত্মসমর্পণ করা। তবে মহান আল্লাহ আমাদের জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি দেবেন। তার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। দুনিয়া ও আখিরাতে করবেন সম্মানিত। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh