শবেবরাতের বার্তা ও শিক্ষা

চান্দ্র মাসের ভিত্তিতে পরিগণিত হিজরি বছরের অষ্টম মাস শাবান। এ মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে শবেবরাত বলা হয়। হাদিস শরীফে এটি লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বা মধ্য শাবানের রজনি নামে আখ্যায়িত।

হযরত আলী রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন অর্ধ শাবানের রাত উপস্থিত হবে তখন তোমরা সেই রাতে সজাগ থেকে ইবাদত-বন্দেগি করবে এবং দিনের বেলায় রোজা রাখবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ উক্ত রাতে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং ঘোষণা করতে থাকেন, কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। রিজিক প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দান করব। কোনো বিপন্ন আছে কি? আমি তার বিপদ দূর করে দেব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত তিনি ঘোষণা করতে থাকেন’ (ইবনে মাজা শরীফ)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বাণী অনুযায়ী এ রাতে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। এ জন্য এটি লাইলাতুল বারাআত বা মুক্তির রজনি নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে।

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযিআল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, ‘এক রাতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে বিছানায় পেলাম না। (খুঁজতে বের হয়ে) হঠাৎ (দেখলাম) তিনি বাকী কবরস্তানে। তিনি (আমাকে) বললেন, তুমি কি আশঙ্কা কর যে, আল্লাহ ও তার রাসূল তোমার ওপর অবিচার করবেন? আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আমি ধারণা করেছিলাম, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন। তখন তিনি বললেন, (তা নয়, বরং) নিশ্চয়ই আল্লাহ শাবানের মধ্যভাগের রাতে পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন তারপর তিনি কালব গোত্রের মেষের পশমের চেয়ে বেশিসংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে দেন”। (তিরমিজী শরীফ)

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযিআল্লাহু তায়ালা আনহা থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে আয়েশা তুমি কি জান, এই রাতে কী সংঘটিত হয়? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এ রাতে কী সংঘটিত হয়? আল্লাহর রাসূল তখন বললেন, এ রাতে আগামী এক বছরে কতজন সন্তান জম্মগ্রহণ করবে এবং কতজন লোক মারা যাবে, তা লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাতে বান্দার (এক বছরের) কাজসমূহ আল্লাহর নিকট পেশ করা হয় এবং এ রাতে বান্দার (এক বছরের) রিজিকের ফায়সালা হয়। (বায়হাকী শরীফ)

হযরত আবু মুসা আশয়ারী রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাবানের অর্ধাংশের রাতে নেমে আসেন এবং শুধু মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাজা শরীফ)

অতএব, এ রাত আল্লাহ তায়ালার মহান দরবারে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ সময়। আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের এক দুর্লভ সুযোগ এনে দেয় লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান। প্রতিটি কল্যাণকামী মানুষের কর্তব্য এ সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা এবং মহান আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন হয়ে রাত অতিবাহিত করা। তাৎপর্যপূর্ণ এই রাতে বিশেষ বরকত হাসিলের জন্য নফল নামাজ আদায়, কুরআন তেলাওয়াত, ইস্তেগফার, তাসবিহ-তাহলিল ও দুয়ায় মশগুল থাকা উচিত ।

লাইলাতুল বারাআত রমজান মাসের আগমনি বার্তা ঘোষণার রাত। মাত্র দুই সপ্তাহ পরে এসে যায় রমজান। এ জন্য মুমিন বান্দারা শবে বরাতের আগমনে নতুন উদ্দীপনা অনুভব করেন এবং পবিত্র মাসে আরো বেশি ইবাদতে মশগুল হওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। 

এ রাতের নফল আমলসমূহ বিশুদ্ধ মত অনুসারে একাকী করণীয়। এশার ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে অবশ্যই মসজিদে আদায় করতে হবে। তবে নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার প্রমাণ হাদিস শরীফে নেই। আর সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবা তাবেঈনের যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না। তবে এমনিই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যায়, তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবেন, একে অন্যের আমলের ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবেন না।

কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে- শপথ স্পষ্ট গ্রন্থের। নিশ্চয়ই আমরা তা অবতীর্ণ করেছি কল্যাণময় রজনীতে। (সূরা দুখান; ২-৫)

এখানে উল্লিখিত মুবারক বা কল্যাণময় রজনী বলতে বেশির ভাগ মুফাসসিরের মতে রমজানের কদরের রাত উদ্দেশ্য। সুতরাং এ রাতের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া সাধারণভাবে প্রত্যেক চান্দ্র মাসের মধ্যভাগের তিন দিন বা ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখার বিশেষ ফযিলত বর্ণিত হয়েছে হাদিস শরীফে। আর প্রতিদিন শেষ রাতের ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য ও অনুগ্রহ লাভের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে কুরআন মজিদ ও হাদিসে। তাই শবে বরাতের ইবাদত ও দুয়ার মাহাত্ম্য সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই।

বরকতময় এ রজনীতে তওবা-ইস্তেগফার ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে নিমগ্ন থাকাই মুমিনের কর্তব্য। অথচ কিছুসংখ্যক লোক এ রাতে এমন কিছু কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে, যেগুলো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যেমন : পটকাবাজি, তারাবাজি, আতশবাজি, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, পোলাও-বিরিয়ানি ও হালুয়া-রুটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া ইত্যাদি। এগুলো নিছক কুসংস্কার বৈ কিছু নয়। বরং আল্লাহ তায়ালা যখন পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশে এসে বান্দাদের ডাকতে থাকেন, তখন তার ডাকে সাড়া না দিয়ে এসব ভোজনে লিপ্ত থাকা আল্লাহর সেই আহ্বানের প্রতি অবজ্ঞার প্রকাশ, তেমনি এতে ইবাদতেও বিঘ ঘটে।

মুক্তির বারতা নিয়ে আগত পবিত্র বারাআত রজনীতে প্রতিটি মুসলমানের উচিত এ রাতের যাবতীয় ফজিলত অর্জনের জন্য প্রয়াসী হওয়া। এ জন্য পূর্বদিনেই নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুমিয়ে নেয়া প্রয়োজন, যাতে রাতের বেলা ঘুম আমাদের কাহিল করতে না পারে। আরো উচিত নফল নামাজের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দুই রাকাত করে যত রাকাত সম্ভব হয় নামাজ পড়তে থাকা, কুরআনুল কারীম তেলওয়াত করা, গভীর ধ্যানে বেশি বেশি দরুদ পড়া, ইস্তেগফার পড়া, দুয়া করা ও তাসবিহ তাহলিল পাঠ করা। আর সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই নিজের জন্য, নিজের পিতা-মাতা, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী ও সব মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করা, তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।


Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //