রোজার শেষে খুশির ঈদ

আসছে খুশির ঈদুল ফিতর। সিয়াম সাধনার মাস সফলভাবে সম্পন্ন করার এবং শেষ প্রান্তে উপনীত হওয়া একটি শুভ আলামত। তাই এ দিনগুলো যেন আল্লাহ তায়ালার অপার রহমত ও অনুগ্রহের অধিকারী হওয়ার এবং পাপরাশি থেকে পাক-সাফ হয়ে ঈদের আনন্দ ভোগের সুসংবাদ ঘোষণা হতে থাকে রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে।

মাহে রমজানে যেসব সদভ্যাস গড়ে উঠেছে, যেসব নেক কাজ পালন করা হয়েছে, বিশেষভাবে নফল ইবাদতের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, রমজানের পরও সেগুলো অব্যাহত রাখতে পারা বড়ই সৌভাগ্যের বিষয়। তাকওয়া, তাওয়াক্কুল ও খোদাপ্রেমের দীক্ষা রমজানের বহুল আলোচিত বিষয় হলেও, এগুলোর সম্পর্ক শুধু এ মাসের সাথে নয়, সারাজীবন এসব মহৎ গুণ চর্চা করা সৌভাগ্যের চাবিকাঠি ।

রমজানের শেষভাগের প্রতিটি ক্ষণই স্মরণ করিয়ে দেয় বহুগুণ ছওয়াব লাভের সুযোগ চলে যাচ্ছে বলে। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অবারিত ধারায় সিক্ত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ যারা হাতছাড়া করেন, তাদের জন্য দুঃখ করা ছাড়া কী থাকতে পারে? এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস উল্লেখযোগ্য। হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন মহানবী (সা.) মিম্বারে ওঠার সময়ে প্রথম সিঁড়িতে পা রেখে বললেন ‘আমীন’, দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রেখে আবার বললেন ‘আমীন’। তৃতীয় সিঁড়িতেও পা রেখে বললেন ‘আমীন’। এভাবে তিনবার ‘আমীন’ বলার তাৎপর্য জিজ্ঞেস করলেন উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম।

জবাবে হজরত নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, আমি যখন মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন জিবরাইল এসে আমাকে জানালেন, যে ব্যক্তি আপনার নাম শুনেও দরুদ পাঠ করে না, তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। আমি বললাম, আমীন। তিনি আবার বললেন, যে ব্যক্তি মাতা-পিতা উভয়কে কিংবা একজনকে বৃদ্ধবয়সে পেয়েও, তাদের খেদমতের বদৌলতে জান্নাতের উপযুক্ত হতে পারল না, তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। আমি বললাম, আমীন। তারপর জিবরাইল বললেন, যে ব্যক্তি রমজান পেল; কিন্তু রমজান বিদায় হয়ে গেল এই অবস্থায় যে, সে ক্ষমা লাভ করতে পারল না, তার প্রতিও আল্লাহর অভিশাপ। আমি বললাম, আমীন।

এ হাদিস থেকে অনুমান করা যায়, রমজানের সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা নিতান্ত হতভাগা হওয়ার আলামত। অন্যদিকে যারা অবারিত রহমতের মাসটিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হন, তাদের নিয়ে গর্ব করেন স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, রমজানের শেষে মুমিন বান্দারা যখন তাকবির পাঠ করতে করতে ঈদগাহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন, আল্লাহ তায়ালা তখন ফেরেশতাদের বলেন, যে বান্দা তার কর্তব্য সম্পন্ন করে, তার প্রতিদান কী হওয়া উচিত? ফেরেশতারা বলেন, তার প্রতিদান পূর্ণ মাত্রায় দেওয়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার বান্দারা তাদের ওপর আরোপিত কর্তব্য পালন করে এখন আমার মহিমা ঘোষণা করতে করতে বের হয়েছে। আমি আমার মর্যাদা ও প্রতিপত্তির শপথ করে বলছি, তাদের দোআ অবশ্যই কবুল করব। তারপর আল্লাহ ঘোষণা করেন, তোমরা ফিরে যাও। আমি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিলাম এবং তোমাদের পাপরাশিকে ছওয়াবে পরিণত করলাম (বায়হাকী শরিফ)।

মাহে রমজানের পর আসে মুসলিম মিল্লাতের বার্ষিক প্রধান দুটি আনন্দ উৎসবের একটি ঈদুল ফিতর। ঈদ অর্থ আনন্দ। আর ফিতর বলতে রোজার সমাপ্তি কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া উদ্দেশ্য। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনায় লিপ্ত থাকার পর তাতে সমাপ্তি ঘটানো এবং দিনের বেলায় পানাহারের স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে যাওয়া উপলক্ষে আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থা দিয়েছে শরিয়ত। এটা শুধু অনুমতি নয়, বরং অনেকটা বাধ্যতামূলক নির্দেশ। কেননা শাওয়ালের প্রথম দিনে রোজা রাখাই নিষিদ্ধ। দুই ঈদের দিনে পানাহার করা এবং আল্লাহর নিয়ামতের স্বাদ গ্রহণ করা অবশ্য পালন করার তাৎপর্য অনেক। হাদিসের গ্রন্থগুলোয় বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) হিজরত করে মদিনায় এসে দেখলেন-সেখানকার বাসিন্দারা বছরের দুটি দিন আনন্দ উৎসবে কাটায়।

যদিও এর আগে সেখানকার অনেকে মুসলমান হয়েছিল; কিন্তু প্রথাটি চালু ছিল। যেহেতু এতে পৌত্তলিকতার ছাপ ছিল। এ জন্য তাতে মুসলমানদের যোগ দেওয়ার বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় আল্লাহর নবী (সা.) তাদেরকে জানালেন, আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের আরো উন্নত ও উত্তম দুটি উপলক্ষ দান করেছেন আনন্দ উৎসবের জন্য। একটি রমজান মাসের শেষে শাওয়ালের প্রথম তারিখে। আরেকটি জিলহজ মাসের দশম তারিখে বা হজের পরের দিন।

অতএব, ঈদের দিনটি আমাদের জন্য আনন্দের দিন। মনের সব কালিমা দূর করে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে, মান-অভিমান বিসর্জন দিয়ে সবার দেহ-মন এক হওয়ার আনন্দ হলো ঈদের আনন্দ। নিজের মনের হিংসা, ঘৃণা, লোভ, অহংকার, অহমিকা, আত্মম্ভরিতা, আত্মশ্লাঘা, রাগ, ক্রোধ, বিদ্বেষসহ যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার আনন্দ। সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির আনন্দ। মাহে রমজান উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য সম্প্রীতি ও সমবেদনার অমিয় শিক্ষা নিয়ে উপস্থিত হয়। রমজানের শেষে ঈদ উৎসবে যেন স্বচ্ছল পরিবারের সঙ্গে অভাবী পরিবারের সদস্যরাও অংশ নিতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে বলা হয়েছে বিশেষভাবে। ঈদের আগে সদাকাতুল ফিতর আদায়ের বিধান আনন্দ উৎসবে সবাইকে শরিক করে নেওয়ার অনুপম ব্যবস্থা। এ জন্য ঈদের নামাজে রওয়ানা হওয়ার আগেই সদাকাতুল ফিতর আদায় করা কর্তব্য।

ঈদের দিনে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, মিসওয়াক করা, মহল্লার (এলাকার) মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়া, গোসল করা, সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, আতর ব্যবহার করা, নামাজের আগে সদাকাতুল ফিতর আদায় করা, ঈদুল ফিতর নামাজের আগে কিছু মিষ্টান্ন খাওয়া, তিন, পাঁচ বা বেজোড়সংখ্যক খেজুর বা খুরমা খাওয়া, সকাল সকাল ঈদের নামাজ পড়ার জন্য যাওয়া, ঈদের নামাজ ঈদগাহে গিয়ে পড়া সম্ভব না হলে মহল্লার মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়া, আস্তে আস্তে নিম্নলিখিত দোয়া পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাওয়া- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ’।

ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া, এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা, শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে খুশি প্রকাশ করা প্রভৃতি ঈদের সুন্নত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাঁর সুসংবাদের অধিকারী করুন। প্রকৃত খুশি ও উভয় জগতের কল্যাণ আমাদের নসিব করুন। সবাইকে ঈদ মোবারক।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //