সুচির ক্ষমতা পোক্ত: নেই শান্তির বারতা

গত ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে গতবারের চেয়েও বড় ও নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)। 

সেনা সমর্থিত সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) প্রতি জনগণের সমর্থন নেই। আর অন্য কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দল শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে না দাঁড়াতে পারায় এনএলডির সমর্থন আরো বেড়েছে। তবে সুচি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আরো বিতর্কিত হয়েছেন। 

সমালোচকরা বলছেন, তিনি মিয়ানমারের সব জনগণের নেতা হয়ে উঠতে পারেননি- শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীই নয়, কোনো সংখ্যালঘু জাতিসত্তাকেই সুচি আপন করে নিতে পারেননি। এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত প্রায় ১৫ লাখ মানুষের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তারপরও ভোটকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সুচি ও তার দল এনএলডিকে ভোট দিয়েছেন।

মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, দেশটিতে মোট তিন কোটি ৮০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৪৪০ আসনে ভোটগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে এনএলডি পেয়েছে ৩১৫ আসন। উচ্চকক্ষে ২২৪ আসনে ভোটগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে এনএলডি পেয়েছে ১৬১ আসন।

রোহিঙ্গা ইস্যুও সুচির পক্ষে

২০১৭ সালের আগস্টে বিদ্রোহী দমনের নামে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্মূলীকরণ চালায় দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ এটিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করলেও বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার। ওই গণহত্যায় ১০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা। 

এই জাতিগত নির্মূলীকরণের পরও তা নিয়ে কোনো মন্তব্য না করায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমর্থন হারান নোবেল বিজয়ী সুচি। তিনি আন্তর্জাতিক সমর্থনের তোয়াক্কা না করে আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই দেন। সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞকে ‘যৌক্তিক’ প্রমাণ করতে তিনি আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে (আরসা) সন্ত্রাসী সংগঠন বলে ঘোষণা দেন। সেইসাথে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগকেও নাকচ করেন। তার এ অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মহল তাকে ‘সেনাবাহিনীর পুতুল’ বলেও উল্লেখ করেছে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে এমন অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে সুচির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলেও, দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বামার জাতিসত্তার মানুষজনের মধ্যে তার ও ক্ষমতাসীন এনএলডি সরকারের প্রতি সমর্থন আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সমর্থন চোখে পড়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার জন্য মিয়ানমার ত্যাগ করা ও ফিরে আসার সময়ে বিমানবন্দরসহ রাস্তাজুড়ে বিশাল সমাবেশে। 

উল্লেখ্য, বামার, শান, রাখাইন, বা কাচিন জাতিসত্তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তবে জাতিগত ভিন্নতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে ভয়াবহ সেনা আগ্রাসনের মুখে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতিসত্তা স্বাধীনতার ডাক দিয়েছে। সরকারি হিসাবে, দেশটিতে রয়েছে ১৩৪টি জাতিসত্তা। এর মধ্যে অ-বামাররা মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ। তার মানে, বামারদের উগ্র-জাতীয়তাবাদী অবস্থান সুচির ক্ষমতা পোক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয়।

সেনা শাসনের ভয়

মিয়ানমারের নির্বাচনী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা খুবই ভঙ্গুর। সেখানে এখনো সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্র  কাঠামোয় সামরিক বাহিনীর বিশেষ সংরক্ষিত অবস্থান রয়েছে। এ কারণে বেসামরিক সরকারকে সব সময়ই সামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে হয়। রোহিঙ্গা প্রশ্নে এনএলডি সরকার ও সামরিক প্রশাসনের অবস্থান একই ধরনের হলেও, দেশটির গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্নে সুস্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। 

তবে সুচি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেনা প্রশাসনের সঙ্গে আপসের পথেই হেঁটেছেন। কারণ সাংবিধানিক পথে এগোতে হলে সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া দেশটির রাজনৈতিক সংস্কার প্রায় অসম্ভব। সংবিধানের বর্তমান কাঠামোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সবাই অর্থাৎ পার্লামেন্টের ৭৫ শতাংশ সদস্য চাইলেও গণতন্ত্রের স্বার্থে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়, যদি না সেনাবাহিনীর অনির্বাচিত এমপিরা তাতে সম্মতি দেন। সেনাবাহিনী পার্লামেন্টে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ আসন নিয়ন্ত্রণে রাখছে। সেইসাথে প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের হাতেই থাকছে। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার দাবি করলেও মিয়ানমারে কার্যত সেনা শাসন নিরঙ্কুশভাবেই চলছে। শুধু সুচির শরীরে সামরিক উর্দিটুকু নেই। এমন সাংবিধানিক সামরিক-বেসামরিক হাইব্রিড কাঠামোয় শান্তিপূর্ণ উপায়ে পুরো ক্ষমতা যে বেসামরিক প্রশাসনের কাছে যেতে পারে না, তা জনগণেরও অজানা নয়। তবে তারা স্বৈরতান্ত্রিক সেনা শাসনের স্মৃতি এখনো জনগণের মনে সমুজ্জ্বল, আর দেশটির সেনা শাসনের থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া খুব সহজ-সরলও নয়। তাই তারা এর বাইরে একমাত্র বিকল্প হিসেবে এনএলডিকেই বেছে নিচ্ছেন। 

উল্লেখ্য, মিয়ানমারে কয়েক ডজন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য নিপীড়নের শিকার হওয়া এনএলডির প্রতি গণতন্ত্রমনা মানুষের সহানুভূতি রয়েছে। 

ভোটাররা মনে করেছেন, দেশটির দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটে বেসামরিক প্রশাসনের প্রতি জনসমর্থন না থাকলে, আবারও সেনা শাসন ফিরে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন সম্পর্কে দেয়া সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। গত ২ নভেম্বর এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি নির্বাচন কমিশন ও এনএলডির বিরুদ্ধে নির্বাচনী ব্যবস্থায় দলীয়করণের অভিযোগ তুলে বলেছেন, এ নির্বাচনের ফল হয়তো তিনি গ্রহণ করবেন না। সেনা শাসনের ভয়ও সুচি ও তার দলের প্রতি জনসমর্থন বাড়িয়েছে। সেইসাথে কমেছে সেনা-সমর্থিত ইউএসডিপির সমর্থন। 

কভিড-১৯ মহামারি এনএলডির শাপে বর

করোনাভাইরাস মহামারি যেন এনএলডির জন্য শাপে বর হয়ে এসেছে। সম্প্রতি দেশটিতে মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। কঠোর স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োগ করা হয়েছে। যে কারণে হটস্পটগুলোতে নির্বাচনি প্রচারণা চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তবে এনএলডির কর্মী-সমর্থকরা প্রচারণা চালিয়েছেন প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে। সেইসাথে ছিল পত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রচারণা। এক্ষেত্রে সুচির ফেসবুক পেইজ থেকে দেয়া পোস্টও প্রচারণায় কার্যকর ভ‚মিকা রেখেছে। 

সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ভোটাধিকার হরণ

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার নেই। তবে এর বাইরে নিবন্ধিত প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে ১৫ লাখই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি এবার। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো নয়- এই দাবিতে রাখাইন, শান, কায়িন, মন, চিন ও কাচিন রাজ্যের বেশ কয়েকটি আসনে এবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। 

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২২টি আসনে নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। সেখানে শিগগিরই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের খবর সমসাময়িক ও বহুল প্রচারিত বলে এর মধ্য দিয়েই মিয়ানমার রাষ্ট্রের গণবিরোধী, অমানবিক রূপ বেশি দেখা যায়। অথচ অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসত্তার প্রতিও মিয়ানমার রাষ্ট্র ও সেখানকার সেনাবাহিনীর আগ্রাসন কোনো অংশে কম ছিল না। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে মিয়ানমার বাহিনীর সামরিক অভিযানের ক্ষেত্র প্রশস্ত হয় কেন্দ্র থেকে সীমান্ত এলাকার পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা অঞ্চলগুলোতে। সেখানে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ যখন কেন্দ্রের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানান, তখন মিয়ানমার বাহিনী চালাতে শুরু করে ভয়ংকর আগ্রাসন। এখানে কোনোকালেই মানবাধিকারের প্রশ্ন আমলে নেয়া হয়নি।

উচ্ছেদ অভিযান যেন একটি নিয়মিত ঘটনা! ২০১১ সাল থেকে দেশটির উত্তরাঞ্চলে জাতিগত সংঘর্ষ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ২০১৫ সালে শান রাজ্যের কোকাং অঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টারের সাহায্যে সেনা সদস্যদের অভিযানে পাঠানো হয়। এসব হামলায় কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাবে, বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা অন্তত দুই লাখ ৪১ হাজার।

এখন অন্তত ১৮টি সংগঠন দেশটির বিভিন্ন স্থানে জাতিগত স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রামে চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ১০টির সাথে সেনাবাহিনীর যুদ্ধবিরতি চলছে ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে। অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠনের সাথে সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ চলছে প্রায় নিয়মিতই। আর এসব সংঘর্ষ দেখিয়ে সেনা প্রশাসন কথিত জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নামে জাতিগত নির্মূলীকরণকে ন্যায্যতা দিচ্ছে। স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ ও রাষ্ট্রীয় নীতি সংস্কারের দলবদ্ধ দাবিকে তারা ‘অপরাধ’ হিসেবে দেখাচ্ছে। 

স্বাধীনতার পর প্রায় সাত দশক ধরে চলে আসা এ সেনা সংস্কৃতিকে পরিবর্তনের জন্য যে রাজনৈতিক সংস্কার ও উদ্যোগ দরকার ছিল, তা বাস্তবায়নে শতভাগ ব্যর্থ হয়েছেন সুচি। আপসের পতাকা উড়িয়ে তিনি কার্যত জনগণের শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে মাটিচাপা দিয়েছেন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh