পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন: মমতাই ক্ষমতায়, বলছে জরিপ

ভাঙা পায় নিয়েও নির্বাচনি প্রচার চালান মমতা

ভাঙা পায় নিয়েও নির্বাচনি প্রচার চালান মমতা

আগামী ২৭ মার্চ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে। এবারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ২৯৪ আসনে ভোট হতে চলেছে আট দফায়। 

এক মাস ধরে চলবে ভোটগ্রহণ। শুধু তা-ই নয়, কোনো কোনো জেলায় একাধিক দফায় ভোটগ্রহণ হবে। সবচেয়ে বেশি ভাঙা হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাকে। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় অর্থাৎ ১, ৬ ও ১০ এপ্রিল হবে এই জেলার ভোটগ্রহণ। অষ্টম দফায় ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ শেষ হবে। ফল ঘোষণা হবে ২৩ মে।

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র তিনটি আসন। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। এখন তারাই তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি জনমত প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পরও ১০০টির মতো আসন পাবে বিজেপি। ৩০ থেকে ৪০টির মতো আসন পেতে পারে বাম-কংগ্রেস জোট। 

অর্থাৎ, নির্বাচনে আবারো জয়ী হতে যাচ্ছে মমতা ব্যানার্জির টিএমসি। এবিপি-আনন্দ ও সি-ভোটারের তিন দফা জনমত জরিপের গত ১৯ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রথম দফায় বলা হয়, টিএমসি পেতে পারে ১৫৪ থেকে ১৬২টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ৯৮ থেকে ১০৬টি আসন। আর বাম-কংগ্রেস জোট পেতে পারে ২৬ থেকে ৩৪টি আসন। 

২৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দ্বিতীয় দফার জরিপে বলা হয়, টিএমসি পেতে পারে ১৪৮ থেকে ১৬৪টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ৯২ থেকে ১০৮টি আসন আর বাম-কংগ্রেস জোট পেতে পারে ৩১ থেকে ৩৯টি আসন। 

গত ১৬ মার্চ তৃতীয় দফার জনমত জরিপের ফলাফল বলছে, নির্বাচনে টিএমসি পেতে পারে ১৫০ থেকে ১৬৬টি আসন। আর বিজেপি পেতে পারে ৯৮ থেকে ১১৪টি আসন। বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট পেতে পারে ২৩ থেকে ৩১টি আসন। আর অন্যরা পেতে পারে পাঁচটি আসন। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে রাজ্যের ১৯ হাজার ৩১৪ জন ভোটার নিজেদের মতামত দেন। 

জরিপে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতাকে পছন্দ করেছেন ৫২ শতাংশ ভোটার। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষকে পছন্দ করেছেন ২৭ শতাংশ, বিজেপির নেতা মুকুল রায়কে ৭ শতাংশ, কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী ও সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীকে ২ শতাংশ ভোটার পছন্দ করেছেন।

তবে ভোটে জনমত জরিপই শেষ কথা নয়। যেকোনো সময় এ মঞ্চ পাল্টে যেতেও পারে। ২০১৯ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনের সময়কালে বিজেপির অবস্থা খুব ভালো ছিল না; কিন্তু ভোটের আগমুহূর্তে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভারতীয় সেনাদের ওপর বোমা হামলা সব হিসাব পাল্টে দেয়। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিজেপি। 

উল্লেখ্য ভারত রাষ্ট্রের ইতিহাসে এবারই প্রথম একটি সাম্প্রদায়িক দল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে এতটা মরিয়া হয়ে নেমেছে। তাদের তুরুপের তাস- নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব আইন। রাজ্যে ক্ষমতাসীন টিএমসির ভিন্নমত দমনে অতিষ্ঠ বিরোধীদের একাংশকে পদ্মশিবিরে টানতে পেরেছে বিজেপি। আবার টিএমসি থেকেও কেউ কেউ বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন।

অন্য রাজ্যে ফল যা-ই হোক না কেন; বিজেপির প্রধান লক্ষ্য যে পশ্চিমবঙ্গ, তা নিশ্চিত করেই বলে দেয়া যায়। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে। ২০১১ সালে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সর্বত্র আলোড়ন তুলেছিল। ২০১৬ সালে পরবর্তী নির্বাচনেও দলটির বিজয় সহজ হয়েছিল। তবে ২০২১ সালে এসে দলটি বিভিন্ন দিক থেকে কোণঠাসা। 

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপি অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিজেপির উত্থান মমতাকে প্রথমবারের মতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের এ নির্বাচন খোদ নরেন্দ্র মোদির জন্যও এক চ্যালেঞ্জ। মোদির জনপ্রিয়তা এখন আর আগের মতো নেই। ভারতে কৃষক আন্দোলন, বেকারত্বের রেকর্ড, অর্থনীতির দুরবস্থা, অসহিষ্ণুতা মোদির জনপ্রিয়তায় কিছুটা হলেও ধস নামিয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিজয়ী হতে না পারলেও মোদি সরকারকে তা বেকায়দায় ফেলবে না। তবে জয়ী হলে তা নিশ্চিতভাবেই প্রণোদনার কাজ করবে। 

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রশ্নে মোদি সরকারের জন্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস) ও সিএএর (সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) আলোকে পশ্চিমবঙ্গের এ নির্বাচন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষমতায় এসেই পশ্চিমবঙ্গে সিএএ কার্যকর- নির্বাচনী ইশতেহারে বিজেপির এই ঘোষণা এখন বিতর্কের ভরকেন্দ্র। 

শুধু এটিই নয়, এনআরসি নিয়ে বিজেপির প্রচারণাও প্রশ্নের মুখে। কারণ, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এনআরসি দেশজুড়ে চালু হওয়া নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাহলে অমিত শাহের ঘোষণা কীসের ভিত্তিতে? ইশতেহারেই বা এই প্রতিশ্রুতি গেরুয়া শিবির দিল কীভাবে?

এদিকে, সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের পর তিস্তা চুক্তি হবে। যার মানে দাঁড়ায়, নির্বাচনে জিততে পারলে বিজেপি সরকার ওই চুক্তি করতে পারে। এ প্রসঙ্গে মমতার একটি মন্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘তিস্তা উত্তরবঙ্গের অংশ। আগে নিজে খাব, তারপর তা দেবো। আগে আমার ঘরে রাখতে হবে। তারপর দেয়ার কথা উঠছে।’ গত ৭ মার্চ শিলিগুড়িতে মহামিছিল করে তিনি এ মন্তব্যটি করেন। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে তার অবস্থান আরো স্পষ্ট হলো। 

সব মিলিয়ে এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচনে সীমিত থাকছে না। এর প্রভাব ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে যে বাংলাদেশেও এসে পড়বে তা বলাই বাহুল্য।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh