যে কারণে তালেবানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না চীন-পাকিস্তান

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আফগানিস্তানে তালেবানের অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেলেও তাদের এখনো কোনো দেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। 

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তালেবানের সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। অন্যদিকে, তালেবানকে যে দেশটির সবচেয়ে সমর্থনপুষ্ট বলে মনে করা হয়, নতুন কাবুল সরকার নিয়ে সেই পাকিস্তানের ভূমিকাও অস্পষ্ট। তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে ইসলামাবাদ এখনো চুপ।

তালেবানের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দিনক্ষণের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি চীনও। চীন তালেবানের কাবুল দখলের খোলাখুলি তাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল। তালেবান সরকার গঠনের পরদিনই অর্থাৎ বুধবার তারা তালেবান সরকারকে স্বাগতও জানিয়েছিল।

যেভাবে তালেবান সরকার গঠন করেছে বা সেই সরকার এখন পর্যন্ত যেভাবে আচরণ করছে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র কোনো কথা চীন বলেনি। অনেক পর্যবেক্ষক একে তালেবানের প্রতি পরোক্ষ স্বীকৃতি হিসাবে দেখলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দিনক্ষণের কোন ইঙ্গিত চীন দেয়নি।

আর যে সৌদি আরব বাকি বিশ্বের তোয়াক্কা না করে ১৯৯৬ সালে তালেবানকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, এবার তারা তালেবানের কাবুল দখলের পর একটি কথাও বলেনি। কাতারের সাথে তালেবানের দহরম মহরম হয়তো সৌদিদের পছন্দ নয়।

পাকিস্তানের ‘ধীরে চলো নীতি’
১৯৯৬ সালে তালেবান কাবুল দখলের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান ওই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। আবার পাকিস্তানই দেন-দরবার করে তালেবানের জন্য সৌদি আরব এবং ইউএই-র স্বীকৃতি আদায় করেছিল। কিন্তু এবার তালেবানের কাবুল দখলের এক মাস পরও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে ইসলামাবাদ এখনও চুপ। 

‘পাকিস্তান তাড়াহুড়ো করতে চাইছে না। তারা এবার একা কিছু করতে চায় না। অন্য আরও দশ-পাঁচ জনের সাথে মিলে সিদ্ধান্ত নিতে চায়,’ বিবিসিকে বলেন ইসলামাবাদে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আসকারি রিজভী।‘প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোর সাথে, বিশেষ করে চীনের সাথে সমন্বয় করে এবার এগুতে চাইছে পাকিস্তান। আফগান এবং তালেবানের প্রশ্নে কমপক্ষে আঞ্চলিক একটি ঐক্য চাইছে পাকিস্তান,’ যোগ করেন তিনি।

সম্ভবত সে কারণেই পাকিস্তানের উদ্যোগে গত বুধবার চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি বৈঠক করেছেন।

দুদিন পর শনিবার আবারও পাকিস্তানের উদ্যোগেই এসব দেশের গোয়েন্দা প্রধানরা একটি বৈঠক করেন বলে পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন খবর দিয়েছে। আমেরিকার সাথেও গোপনে পাকিস্তান কথা বলছে বলে দ্য ডনের খবরে বলা হয়েছে।

বুধবার যখন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে কথা বলছেন, সেদিনই সিআইএ-র প্রধান উইলিয়াম বার্নস ইসলামাবাদে ছিলেন। বার্নস আফগান পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার রশীদ বাজওয়া এবং আইএসআই প্রধান লে. জেনারেল ফায়েজ হামিদের সাথে বৈঠক করেন।

তালেবানকে গত ২০ বছর ধরে পাকিস্তানই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে শক্তিধর করেছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে, যদিও পাকিস্তান তা সবসময় অস্বীকার করে। সে কারণেও আগ বাড়িয়ে এককভাবে তালেবানকে স্বীকৃতি দিতে পাকিস্তান চাইছে না বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

তবে রিজভী বলেন, তালেবানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে ‘ধীরে চলো নীতি’ নিলেও পাকিস্তান আফগানিস্তানকে সাহায্য দিয়ে চলেছে। ‘আফগানিস্তানের প্রায় সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পাকিস্তানের ভেতর দিয়েই যাচ্ছে। সীমান্ত খোলা। প্লেন ভরে ত্রাণ গেছে,’ জানান তিনি।

তাছাড়া, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে আটক রাখা আফগানিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অবমুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। কোন শর্ত ছাড়াই আফগানিস্তানে মানবিক সাহায্য দেওয়ার কথা বলেছেন।

চীনারা ইতিহাসকে গুরুত্ব দেয়, তাই তাড়াহুড়ো করবে না
তালেবান সরকার গঠনের পর একমাত্র যে দেশটি খোলাখুলি অভিনন্দন জানিয়েছে, সেটি চীন। গত সপ্তাহে চীন আফগানিস্তানের জন্য তিন কোটি মার্কিন ডলারের জরুরী খাদ্য এবং ওষুধ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আফগানিস্তানে বিনিয়োগ নিয়ে দোহায় তালেবান প্রতিনিধিদের সাথে গত সপ্তাহে চীনাদের কথা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অনেক বিশেষজ্ঞ তাই বলছেন যে তালেবান সরকারের প্রতি পাকিস্তান, চীন বা কাতারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অনেকটাই এখন অপ্রাসঙ্গিক, কারণ সম্পর্ক শুরু হয়ে গেছে।

তবে কুয়ালালামপুরে চীনা রাজনীতির বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী মনে করেন যে তালেবানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে চীন ধৈর্য ধরবে এবং জাতিসংঘের আওতায় একটি ঐক্যমত্যের সৃষ্টির চেষ্টা তারা হয়তো করতে পারে।

‘আমেরিকার পরাজয়ে চীন হয়তো খুশি, কিন্তু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ভিন্ন একটি বিষয়,’ বলেন ড. আলী।

ড. আলী আরো বলেন, ‘একটি যুদ্ধের মাধ্যমে তালেবান ক্ষমতা হয়তো নিয়েছে, কিন্তু তাদের সরকার কি পুরো আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? তাদের জনসমর্থনের মাত্রা তো এখনও নিশ্চিত নয়। আফগানিস্তানের ইতিহাস চীনের জানা এবং চীনারা ইতিহাসকে গুরুত্ব দেয়। তারা তাড়াহুড়ো করবে না’।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //