মিডিয়া সেন্সরশিপে ইমরান ও তার দল

অদ্ভুত এক মিডিয়া সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার দলের বিরুদ্ধে। গত বছরের জুন মাসের আগে যেখানে পাকিস্তানের মূলধারার প্রায় সব মিডিয়া সরব ছিল ইমরানের খবরে; সেখানে জুনের পর থেকে কদাচিৎ ইমরানের নাম উচ্চারিত হতে দেখা যায়। এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন। এ সময়েও ইমরান ও তার দলকে আলোচনা ও প্রচারের বাইরে রাখতে সব ক্ষমতা ব্যবহার করছে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য দল। কয়েক মাস আগের কথা, রাতে লাইভ টিভি শো চলাকালে এক পাকিস্তানি উপস্থাপক ইমরানের নাম উচ্চারণ করেন, এর পরপরই থেমে যান। দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ চেয়ারম্যান’। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যে ইমরানকে নিয়ে প্রতিবেদন করা থেকে বিরত রয়েছে। এখন পিটিআইয়ের কভারেজের ওপর বিধিনিষেধও বিস্তৃত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সাংবাদিকদের মোবাইলে এক প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা মেসেজ পাঠিয়েছেন, সেখানে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংবাদভিত্তিক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানান, “মূলত তিনি আমাদের চ্যানেলে নির্বাচন বিষয়ে প্রচারিত কিছু অনুষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমরা যেন আগামীতে তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) পতাকা না দেখাই বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র নিয়ে কিছু উল্লেখ না করি। তিনি নির্দেশ দেন, এ ধরনের প্রার্থীদের পিটিআই সমর্থিত না বলে ‘স্বতন্ত্র’ বলতে হবে এবং তারা কোন দলের সমর্থন পাচ্ছেন, তা উল্লেখ করা যাবে না।” ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে ইমরান ও তার রাজনৈতিক দলের সংবাদ প্রকাশ করার বিষয়ে ‘সেন্সর’ করতে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পিটিআই পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। তবে গত বছরের আগস্ট থেকে কারাগারে বন্দি আছেন ইমরান। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগ রয়েছে। যদিও ইমরান সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন ইমরান। এরপর থেকে ইমরানের দলের বিরুদ্ধে চলছে দমন-পীড়ন। হাজারো পিটিআই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কয়েকশ নেতা দল ছাড়তে বাধ্য হন। অভিযোগ আছে, সামরিক বাহিনীর চাপে অনেকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে ইমরান ও তার দলের বেশ কয়েকজন নেতার মনোনয়নপত্র নাকচ করে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন। এমনকি পিটিআইয়ের নির্বাচনী প্রতীক ক্রিকেট ব্যাট বাতিল করে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করা হলেও আদালত নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে বহাল রেখেছেন। ইমরানও অভিযোগ করেছেন যে গণমাধ্যমেও সেন্সরশিপ বসানো হচ্ছে। আগে তাকে বিরোধীরা বাছাইকৃত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তকমা দিত। কিন্তু এবারের নির্বাচনে যে বাছাই হতে চলেছে, তা ‘সব বাছাইয়ের মা’। সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কয়েকটি মিডিয়া। সব ধরনের ভিজুয়াল, গ্রাফিক্স, আলোচনা-সূচি থেকে পিটিআইয়ের নাম বাদ দেওয়া হবে এবং পিটিআই প্রার্থীদের শুধু ‘স্বতন্ত্র’ বলে অভিহিত করা হবে। পিটিআইয়ের সব রেফারেন্স মুছে ফেলা হবে। কোন প্রার্থী দলটির প্রতিনিধিত্ব করছে এর কোনো চিহ্ন থাকবে না।

সাত শীর্ষ সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে আল জাজিরা জানিয়েছে, অনেক সাংবাদিকই নিজেদের সুরক্ষার কথা ভেবে মুখ খুলছেন না। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, তাদের বলা হয়েছেপিটিআইয়ের দলীয় পতাকা এবং তাদের নাম প্রদর্শন করা যাবে না। এমনকি দলের নামও উচ্চারণ করা যাবে না। তবে পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তথ্যমন্ত্রী মুরতাজা সোলাঙ্গি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। শুধু সাংবাদিকই নয়, সেন্সরশিপের অভিযোগ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরাও। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, পাকিস্তান সরকার মিডিয়া ও মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। নির্বাচনে কারচুপি এবং ভিন্নমত দমন করতেই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। 

পাকিস্তানে সামরিক প্রতিষ্ঠান থেকে আসা নির্দেশনার মডেল দীর্ঘদিনের। এর আগে অন্য দলগুলো ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। এবার পিটিআইয়ের ওপর চাপ পড়ছে। এমনকি ইমরান যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখনো রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়া ওয়াচডগ সাংবাদিকদের হয়রানি, ভয় ও হুমকি দেখানোর নিন্দা জানিয়ে প্রতিবেদন করেছিল।

এখন ইমরানের পাশাপাশি মিডিয়াকর্মীদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অনেক সাংবাদিককে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই তাদেরকে মাসের পর মাস বন্দি রাখা হয়েছে। অনেককে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। 

পাকিস্তানের অন্যতম বড় মিডিয়া জিও নিউজে কাজ করা প্রবীণ সাংবাদিক আজাজ সৈয়দ বলেন, ‘মিডিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করা এবং সেন্সরশিপ জারি করার বিষয়টি কয়েক দশক ধরে চলে আসছে। পাকিস্তানি সাংবাদিকতার বাস্তবতা এবং কৌশলগুলো এখন পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। তাদের ওপর মিডিয়া মালিকদের এবং প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের কর্মকর্তা দিয়ে ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।’ 

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //