কোটি টাকায় হকির সুদিন কি ফিরবে?

কোটি টাকা অনুদানে হকি ফিরবে বলে অনেকেই মনে করছেন। ফাইল ছবি

কোটি টাকা অনুদানে হকি ফিরবে বলে অনেকেই মনে করছেন। ফাইল ছবি

বাংলাদেশে হকি যেন সৎ মায়ের সন্তান। কারণ নিজেদের ভেতর নানা দ্বন্দ্ব আর কলমে পড়েই বেশিরভাগ সময় পার করতে হয়। কর্মকর্তার সঙ্গে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত রেষারেষিই বেশিরভাগ সময়ে আলোচনায় উঠে আসে। এক পক্ষ দায়িত্বে থাকলে তাকে কীভাবে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা যায় সে চেষ্টায় মত্ত থাকে প্রতিপক্ষ গ্রুপ। 

আর এসব কারণেই তিন বছর হতে চলল মাঠে গড়ায়নি প্রিমিয়ার ডিভিশন হকি লিগ। মোহামেডান-মেরিনার ম্যাচে মারামারির ঘটনায় দুই ক্লাবের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ৭ জুনের এই ঘটনার পর সেই সময়কার কমিটি আর লিগ মাঠে গড়াতে পারেনি। এরপর ওই বছরের ৩০ অক্টোবর মোহামেডানকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে ফেডারেশন।

এই অবস্থায় প্রায় দুই বছর আগে ফেডারেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অর্থ লগ্নির এই নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন একেএম মোমিনুল হক সাঈদ। অনেকটা আনকোড়া হিসেবে উষা ক্রীড়া চক্র আর মেরিনার ইয়াংসের কর্মকর্তাদের ওপর ভর করে আরামবাগের এই কাউন্সিলর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নির্বাচনের কয়েক মাস পর ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত হওয়ার কারণে বিদেশ পাড়ি জমান। টানা তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকার কারণে সাঈদের সম্পাদক পদ বাতিল হয়ে যায়।

অথচ তিনি নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে প্রিমিয়ার লিগকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন; কিন্তু এর কিছুই হয়নি। উল্টো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আসে করোনাভাইরাস। কর্মকর্তারা লিগ আয়োজন করতে না পারার আরও একটি কারণ দাঁড় করানোর সুযোগ পেয়ে যান। এদিকে হকি খেলোয়াড়রা কি অবস্থায় আছে সেটি যেন দেখার কেউ ছিলেন না। অনেকে পেশা বদল করে চলে যান অন্য জায়গায়। যারাই এখন খেলছেন তাদের বড় একটা অংশ বিভিন্ন বাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। যদি বলা হয়, বাহিনীগুলোতে বেঁচে আছে হকি তাহলে এতটুকু ভুল বলা হবে না। 

এই অবস্থায় লিগ আয়োজনের পাশাপাশি নানা সংকট কাটাকে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সভাপতি ও বিমানবাহিনী প্রধান চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। ক্রীড়াবান্ধব হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাশ না করে ১ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। মাঠে হকি খেলাকে ফেরাতে ফেডারেশন বারবার চেষ্টা করলে ক্লাবগুলো দাবি করে, লিগে খেলার জন্য কিছু আর্থিক অনুদান দিতে হবে। এরপর ক্লাবগুলোকে আর্থিক অনুদান দিতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চান ফেডারেশন সভাপতি। এবার ঈদুল ফিতরের আগেই ওই টাকা হকি ফেডারেশনের হাতে এসে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুদান পেয়ে হকি ফেডারেশন ডাবল আনন্দে আনন্দিত হয়। এখন মূল লক্ষ্য মাঠে হকি ফেরানো। 

ফেডারেশন সভাপতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরলে ১২টি প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। তবে পুরো ১ কোটি টাকা ক্লাবগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হবে কিনা একটা বড় অংশ দেওয়া হবে, সেটি ঠিক হয়নি। এখন দ্রুত লিগ শুরু করাই ফেডারেশনের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইউসুফ। এমনিতেই ক্লাবগুলো নানা অজুহাতে লিগ খেলতে তালবাহানা করে। আর্থিক সংকেট কথা বলে তারা বারবারই পিছিয়ে যায়। ফেডারেশনও কঠিন কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না। ক্লাব খেলতে চাইলে তবেই খেলা মাঠে গড়াতে পারে ফেডারেশন। এটাই ঘরোয়া হকির নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। হকি ফেডারেশনের ভেতরে একটা পক্ষ লিগ আয়োজনে তেমন একটা আগ্রহী নয় বলে মাঝেমধ্যেই খবর বের হয়। ফলে ঘরোয়া হকি যে তিমিরে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে, চেষ্টা করেও জেগে উঠতে পারছে না। 

এদিকে ঘরোয়া হকি বোতলবন্দি হলেও ফেডারেশন চোখ রাখছিল ঢাকায় অনুষ্ঠেয় দুটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ওপর। একটি অনূর্ধ্ব-২১ জুনিয়র এশিয়া কাপ, অন্যটি এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। দুটি টুর্নামেন্টই গত বছর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু করোনা কারণে দুটি টুর্নামেন্ট বেশ কয়েবার পিছিয়েছে। জুনিয়র এশিয়া কাপ সর্বশেষ ১ থেকে ১০ জুলাই হওয়ার কথা থাকলেও করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি না মেলায় অনির্দিষ্টকাল তা স্থগিত হয়ে গেছে। ঘরোয়া হকির পাশাপাশি এই অর্থের কিছু অংশ আন্তর্জাতিক দুটি আসরেও কাজে লাগাতে চাইছে ফেডারেশন। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ থেকে ৯ অক্টোবর। হকি ফেডারেশন আশাবাদী দুটি টুর্নামেন্টই এ বছর ঢাকায় আয়োজন করা সম্ভব হবে। দুটি টুর্নামেন্টেরই স্বত্ব কেনা রয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। 

হকিতে আলাদা স্টেডিয়াম আর জনপ্রিয়তা থাকার পরও এখন ভুলতে বসা খেলাগুলোর একটি হয়ে গেছে। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু নবম বাংলাদেশ গেমসে খেলাটি টার্ফে গড়ালেও আশার সঞ্চার হওয়ার মতো কিছু পাওয়া যায়নি। তিন বছর হতে চলল দেখা নেই প্রিমিয়ার ডিভিশন হকি লিগের। প্রথম বিভাগ আর দ্বিতীয় বিভাগ লিগের কি অবস্থা হতে পারে সেটি সহজেই অনুমেয়। এই সময়ে যারা বিভিন্ন বাহিনীতে চাকরি করছেন তারাই কেবল খেলাটি নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন। 

সরকার থেকে প্রাপ্ত কোটি টাকা অনুদানে হয়তো কর্মকর্তাদের মুখে হাসি ফুটেছে; কিন্তু খেলোয়াড়রা কি রুটি-রুজির লিগ নিয়ে কোনো আশার আলো দেখতে পাবেন। কোটি টাকা অনুদানে হকি ফিরবে বলে অনেকেই মনে করছেন। তবে সবকিছু দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে সময়ের। কারণ হকিতে মাঠে যেমন আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মনপূত না হলে মানতে চান না খেলোয়াড়রা, ঠিক তেমনি টেবিলের লড়াইয়ে ছাড় দিতে নারাজ এক পক্ষ আরেক পক্ষকে। 

সব সংকট কাটিয়ে হকি টার্ফে গড়ালেই দীর্ঘদিন পর হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে রাসেল মাহমুদ জিমি, আশরাফুল ইসলাম, মঈনুল ইসলাম কৌশিক, পুস্কর ক্ষিসা মিমোরা। খেলোয়াড়দের বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন সবার আগে। কারণ খেলোয়াড়রা না বাঁচলে হকি তো বাঁচবে না।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh