ম্যারাডোনার মৃত্যু ও জীবনের গল্প

 ডিয়েগো ম্যারাডোনা

ডিয়েগো ম্যারাডোনা

কিছু কিছু মৃত্যু এমনই। সত্য জানার পরও বিশ্বাস হতে চায় না। ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনার মৃত্যু ঠিক তেমনই। ‘জন্মিলে মরিতে হয়’-চিরন্তন এই সত্যের পথে হেঁটে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ওপারে চলে গেছেন গত ২৫ নভেম্বর। পরদিনই তাকে সমাহিত করা হয়েছে। পৃথিবীকে ছেঁয়ে ফেলা তার মৃত্যু শোকেও ভাটা পড়েছে। অথচ এখনো মনে হয় ম্যারাডোনা বেঁচে আছেন। মনে হয় এই বুঝি কোনো বিতর্কিত কাণ্ড করে সংবাদ শিরোনাম হবেন!

কিন্তু চরম বাস্তবতা এটিই, ম্যারাডোনা আর নেই। এই দুনিয়ার কোনো চোখ কখনোই আর তাকে দেখবে না। আর কখনোই ম্যারাডোনা বিতর্কিত কাণ্ড করে সংবাদ শিরোনাম হবেন না। হ্যাঁ, আর্জেন্টিনার মহানায়ক সংবাদ শিরোনাম হবেন, বর্তমানে হচ্ছেন, ভবিষ্যতেও ততদিন হবেন, যতদিন এই দুনিয়ায় ফুটবল নামক খেলাটি থাকবে। তবে খবর হবেন কীর্তিময় অতীতের জন্য। নতুন কোনো ঘটনা ঘটিয়ে কখনোই নয়।

মাত্র ৬০ বছর বয়সেই ম্যারাডোনার চলে যাওয়াটা এক দিক থেকে আকস্মিক। আবার আকস্মিক নয় মোটেই। মদ আর মাদকের নেশায় নিজেই নিজেকে শেষের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। অতিমাত্রায় মাদকাসক্তির কারণে তার শরীরে বাসা বেঁধেছিল নানা জটিল রোগ। যে রোগ থেকে বাঁচতে সর্বদাই ভাড়া করা ব্যক্তিগত চিকিৎসক সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হয়েছে। প্রায়ই ছুটতে হয়েছে হাসপাতালে। তারপরও খেয়ালি ম্যারাডোনার চৈতন্য ফেরেনি। মদ-মাদককে জীবন থেকে ছুটি দেননি। ফল, শেষ পর্যন্ত নিজেই চিরকালের জন্য ছুটি নিয়ে নিলেন।

গত অক্টোবরে হঠাৎই তার মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ ঘটে। দ্রুতই তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। সেখানে সফল অস্ত্রোপচারের পর বাড়িও ফিরেছিলেন; কিন্তু কদিন পরই আবার তার ঠাঁই হয় ব্যক্তিগত চিকিৎসকের ক্লিনিকে। ২৫ নভেম্বর সেই ক্লিনিকেই জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটি ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়েন আজীবনের জন্য। তবে শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও ফুটবল মাঠের কীর্তির জন্য আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

দেশ আর্জেন্টিনাকে প্রায় একক নৈপুণ্যে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জেতানো, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক দুটি গোল, ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলির হয়ে তার অবিশ্বাস্য সাফল্য-সেসব কি কেউ কখনো ভুলতে পারবে! ভুলতে চাইলেও বারবার মনে করিয়ে দেবে ইতিহাস। ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তির দেহ অবসান ঘটে বটে, কিন্তু কখনো মৃত্যু হয় না।

২০-২৫ জনে শেষকৃত্য

সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। আর্জেন্টাইনদের কাছে মহানায়ক। ডিয়েগো ম্যারাডোনার শেষকৃত্যে অংশ নেবে লাখ লাখ মানুষ, এটিই ছিল প্রত্যাশিত; কিন্তু বাস্তবে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির শেষকৃত্যানুষ্ঠানে অংশ নেয় মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন। ম্যারাডোনার খুব কাছের কয়েকজন আত্মীয় এবং বন্ধুরা মিলেই সেরেছেন শেষকৃত্যানুষ্ঠান।

এমন নয় যে, আর্জেন্টাইনরা তাদের মহানায়কের শেষকৃত্যে অংশ নিতে অনিহা দেখিয়েছে। বরং শেষকৃত্যানুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আশায় সমাধিস্থলের কাছে জড়ো হয়েছিল লাখো জনতা। সবাই শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে মহানায়ককে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উদগ্রীব ছিল; কিন্তু নিষেধাজ্ঞার অদৃশ্য বেড়ি পরিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে ছুটে আসা ভক্তদের দূরে রেখে চুপিসারে সেরে ফেলা হয় ৮৬ বিশ্বকাপের কিংবদন্তির শেষকৃত্য। এমনকি ম্যারাডোনার সাবেক বান্ধবী রোসিও অলিভাকেও শেষ দেখা দেখতে দেওয়া হয়নি। অলিভাকে অবশ্য দেখতে যেতে দেননি ম্যারাডোনার সাবেক স্ত্রী ক্লদিয়া ভিয়াফান। অলিভার দাবি অন্তত সেটিই।

কেন ভক্ত-সমর্থকদের শেষকৃত্যানুষ্ঠান থেকে দূরে রাখা? কেনই বা হৃদয় দিয়ে ভালোবাসা ভক্ত-সমর্থকদের চোখের শেষ দেখাটা দেখতে দেওয়া হয়নি? বাতাসে ভেসে বেড়ানো এসব কোনো প্রশ্নেরই উত্তর মেলেনি। হয়তো কোনদিন মিলবেও না।

শায়িত হয়েছেন মা-বাবার পাশে

এক এক করে জন্ম নেয় ৪টি মেয়ে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা চিতোরো ও দালমা সালভাদোরা ফ্রাঙ্কো দম্পতি তাই একটি পুত্র সন্তানের জন্য ব্যাকুল ছিল। তাদের সেই ব্যাকুলতা দূর করে পৃথিবীতে আসেন ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। ৪ মেয়ের পর ছেলে বলে ম্যারাডোনা খুব আদরের ছিলেন মা-বাবার কাছে। খুব আদরের ছিলেন বোনদের কাছেও। ম্যারাডোনাও মা-বাবা, বোনদের খুব ভালোবাসতেন। দুনিয়ার এত বড় ফুটবলার হলেও মা-বাবা, বোনদের কখনো এতটুকু অবহেলা করেননি। মা দালমাকে ম্যারাডোনা কতটা ভালো বাসতেন, ছোট্ট একটি তথ্যেই সেটি স্পষ্ট। ম্যারোডোনা নিজের বড় মেয়ের নাম রাখেন মায়ের নামে মিলিয়ে- দালমা ম্যারাডোনা।

তো মা-বাবার প্রতি ম্যারাডোনার এই অকৃত্রিম ভালোবাসার বন্ধন মরণের পর অটুট। মৃত্যুর পর ম্যারাডোনা সমাহিত হয়েছেন মা-বাবার পাশে। ম্যারাডোনার জন্ম রাজধানী বুয়েনস এইরেসের নিকটবর্তী উপশহর ভিল্লা ফিওরিতো’র বস্তি এলাকায়। সেখানেই স্থানীয় সমাধিস্থলে ঠিক মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার।

ছেলে হাসপাতালে শুয়ে শুনেছেন বাবার মৃত্যুর খবর

দিয়েগো সিনাগ্রা সত্যিই বড় দুর্ভাগা। জন্মদাতা বাবার কাছ থেকে ছেলের স্বীকৃতি পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ৩০ বছর। জীবনের প্রথম ৩০ বছরে একটি বারের জন্যও বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারেননি। পাননি আদর-স্নেহ। মৃত্যুর আগেও বাবার সঙ্গে কথা বলা হয়নি। এমনকি বাবার মৃত্যুর সংবাদটিও পাননি সময় মতো। শুনেছেন অনেক দেরিতে। সেটিও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে! ততক্ষণে সারা দুনিয়া জেনে গেছে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা।

বলা হচ্ছে ম্যারাডোনার সবচেয়ে বড় সন্তানের কথা। সিনাগ্রা ম্যারাডোনার বড় সন্তান। নেপলসে থাকার সময় ক্রিস্তিয়ানা সিনাগ্রার সঙ্গে বিবাহবর্হিভূত সম্পর্ক হয় ম্যারাডোনার। সেই সম্পর্কের ফসল হিসেবেই দুনিয়ার মুখ দেখেন দিয়েগো সিনাগ্রা; কিন্তু ম্যারাডোনা তাকে ছেলে হিসেবে স্বীকার করেননি। বাবার কাছ থেকে ছেলের স্বীকৃতি আদায় করতে সিনাগ্রার মা আদালতের দ্বারস্থ পর্যন্ত হয়েছেন। আদালত সিনাগ্রাকে ম্যারাডোনার ছেলে বলে রায় দেওয়ার পরও ম্যারাডোনা মেনে নেননি। অবশেষে ২০১৬ সালে সিনাগ্রাকে নিজের ছেলে বলে স্বীকার করেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।

৩০টি বছর বাবার আদর-স্নেহ, ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত সিনাগ্রা শেষ সময়েও বঞ্চিত। বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনেছেন হাসপাতালের বেডে শুয়ে, সেটিও টেলিভিশনের পর্দায়। কাছের কারও কাছ থেকে নয়। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে। অথচ ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর প্রথমেই জানানো হয়েছিল তার পরিবারকে। তিন মেয়ে জিয়ান্নিনা, দালমা ও ইয়ানাকে সঙ্গে সঙ্গেই জানানো হয়। জানানো হয় অন্যদেরও; কিন্তু হাসপাতালে শুয়ে করোনার সঙ্গে জীবন-যুদ্ধরত সিনাগ্রাকে কেউ খবরটি দেয়নি। হাসপাতালে ঝোলানো টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা সংবাদ উপস্থাপিকার মুখে প্রথম শোনেন বাবার মৃত্যুর খবর। হায়রে ভাগ্য!

অনাকাক্ষিত ঘটনা

দুনিয়ার এত বড় তারকা। এত বড় মানুষ। ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবরে অতি-আবেগি ভক্ত-সমর্থকেরা স্রোতের মতো ভেসে এসে অনাকাক্ষিত কাণ্ড করে বসবে, এটিই স্বাভাবিক। আবেগ কি আর বাধ মানে! মানে না বলেই ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর কিছু অনাকাক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। শেষকৃত্যে অংশ নিতে আসা ভক্ত-সমর্থকদের সঙ্গে যেমন সংঘর্ষ হয়েছে পুলিশের। পুলিশের লাঠির বাড়িতে অনেকেরই রক্ত ঝরেছে। হয়েছে টানা-হেঁচড়া, ধাক্কাধাক্কি, ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুড়ি। অতি-আবেগ দেখাতে গিয়ে কেউ কেউ পুলিশের হাতে পাকড়াও হন। পরে অবশ্য ছাড়াও পেয়েছেন তারা।

যদিও সংঘর্ষের দায়টা এক অর্থে পুলিশের কাঁধেই বর্তায়। ভক্তরা প্রিয় তারকার শেষকৃত্যে অংশ নিতে চাইবে, এটিই স্বাভাবিক; কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়েই পুলিশের সঙ্গে লেগে যায় ভক্ত-সমর্থকদের। শেষকৃত্যে অংশ নিতে সমাধিস্থলের কাছে লাখো মানুষ ভিড় জমালেও তাদের একজনকেও ভেতরে যেতে দেওয়া হয়নি। অংশ নিতে দেওয়া হয়নি শেষকৃত্যে; কিন্তু পুলিশের বাধা মানতে রাজি ছিলেন না আবেগি ভক্তরা। তারা জোর করেই ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে ঝামেলা বেঁধে যায় পুলিশের সঙ্গে।

সবচেয়ে বিচিত্র ঘটনার জন্ম দিয়েছেন দিয়েগো মোলিনা নামের এক নারী। ম্যারাডোনার মরদেহের সঙ্গে ছবি তুলে চাকরিই হারিয়েছেন তিনি! এই নারী প্রেসিডেন্টের বাসভবনে মরদেহ সৎকারসংক্রান্ত কাজের জন্য নিয়োজিত। পেশাগত দায়িত্বের কারণেই কারও সঙ্গে তার ছবি তোলা মানা! কিন্তু ম্যারাডোনার মতো এত বড় তারকাকে হাতের নাগালে পেয়ে মোলিনা নিজের আবেগকে আর ধরে রাখতে পারেননি। ম্যারাডোনার মরদেহ প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালাসে নেওয়া হলে মোলিনা সুযোগ পেয়েই প্রিয় তারকার মরদেহের কফিন জড়িয়ে একটি ছবি তুলে ফেলেন! ফল, আইনভঙ্গের দায়ে চাকরিটি হারাতে হয়েছে তাকে। হয়েছেন ছাঁটাই। আরেক দর্শক হাঙ্গামা করে জরিমানাও গুনেছেন। সেই দর্শকের নাম কি এবং কত টাকা জরিমানা গুনেছেন, সেসব অবশ্য জানা যায়নি।

চিকিৎসকদের দিকে অভিযোগের তীর

৬০ বছরের জীবনে ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনার বিরুদ্ধে কত শত অভিযোগই যে উঠেছে! শক্তিবর্ধক মাদক সেবন করে ফুটবল মাঠে নামার অভিযোগ উঠেছে। বিদেশ সফরে গিয়ে আকণ্ঠ মদ গিলে মাতাল হয়ে মাতলামি করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে নারী কেলেঙ্কারিরও। আরও কত বিতর্কিত কর্মকা-ের জন্য যে অভিযুক্ত হয়েছেন। নিয়তির কী খেলা, অভিযোগ যার জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে ছিল, সেই ম্যারাডোনার মৃত্যুর পরও অভিযোগ পর্ব শেষ হয়ে যায়নি। বরং তাঁর মৃত্যুর পরও অভিযোগ উঠেছে।

তবে মৃত্যুর পর ওঠা অভিযোগটি ম্যারাডোনার বিরুদ্ধে নয়। মরে যাওয়া মানুষের বিরুদ্ধে আর কে অভিযোগের তীর ছুড়বে! ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর অভিযোগ উঠেছে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের দিকে! অভিযোগটা ওঠে আবার তার মৃত্যুর পরের দিন, মরদেহ সমাহিত করার আগেই। সেটিও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন কাসা রোসাদায়, শত শত মানুষের সামনে। শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আগে ম্যারাডোনার মরদেহ কফিনে মুড়িয়ে নেওয়া হয় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের বাসভবনে। যেখানে তাকে দেশের সর্বোচ্চ মরনোত্তর সম্মানে ভূষিত করা হয়। সেখানেই ম্যারাডোনার আইনজীবী মাতিয়াস মোরলা চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলেন।

তিনি অভিযোগ করেন, মৃত্যুর আগে ১২ ঘণ্টা কোনো চিকিৎসক ম্যারাডোনার কাছে যাননি। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স আনতেও নাকি আধ ঘণ্টা দেরি হয়! ম্যারাডোনার মতো একজনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স আনতে আধঘণ্টা দেরি, অভিযোগটি গুরুতরই। শুধু তাই নয়, অ্যাম্বুলেন্সটি যে ম্যারাডোনার জন্য, সেটিও নাকি জানাননি চিকিৎসক। যার অর্থ ম্যারাডোনার চিকিৎসায় অবহেলা ছিল!

মোরলার এসব অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে তদন্তে। ম্যারাডোনার চিকিৎসাসেবায় সত্যিই যে অবহেলা হয়েছে, সেটি স্পষ্ট হয়েছে নার্স দাহিয়ানার কথায়। এই নার্স নিজের প্রথম বিবৃতিতে বলেছিলেন, তিনি ম্যারাডোনাকে সর্বশেষ জীবিত দেখেছিলেন মৃত্যুর দিন সকাল সাড়ে ৯টায়। তিনি নাকি রুমে ঢুকে ম্যারাডোনাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন; কিন্তু দ্বিতীয় বিবৃতিতে দাহিয়ানা বলেন অন্য কথা। এবার তিনি বলেন, আসলে তিনি দুপুরে ম্যারাডোনার ওষুধ খাওয়ানোর সময়ই রুমে ঢুকেছিলেন। তাকে নাকি প্রথম দফায় মিথ্যে বলার জন্য বাধ্য করা হয়েছিল! তবে কে তাকে চাপ প্রয়োগ করে মিথ্যে বলতে বাধ্য করেছিল, তার নাম এখনো গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি।

নার্স দাহিয়ানার দ্বিতীয় বিবৃতিতেই স্পষ্ট, জীবনের শেষ মুহূর্তে ম্যারাডোনার চিকিৎসায় গাফিলতি হয়েছে! চিকিৎসক-নার্সরা নিজেদের দায়িত্বটা ঠিকঠাক পালন করেননি। এমনকি ম্যারাডোনা কখন শেষ নিঃশ্বাস ছেড়েছেন, সেটিও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউ। মানে মৃত্যুর সময় কেউ ম্যারাডোনার পাশে ছিলেন না। শুধু দাহিয়ানার বিবৃতি নয়, তদন্তে ম্যারাডোনার দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিত অন্যদের কথা-বার্তাতেও বিচ্যুতি ধরা পড়েছে। একেক সময় নাকি তারা একেক কথা বলছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক কিছুই উঠে আসবে বলে মনে হচ্ছে; কিন্তু সেসবে কি আর দুনিয়ার ওপারে ঘুমিয়ে থাকা ম্যারাডোনার কোনো উপকার হবে?

অপূর্ণ এক অদ্ভূত ইচ্ছা

জন্ম নিয়েছিলেন এক দরিদ্র পরিবারে। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত অমিয় প্রতিভা আর আশীর্বাদে দরিদ্র কুটির থেকে হয়েছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। ফুটবল সাফল্যের চূড়ায় যেমন উঠেছিলেন, তেমনি দু-হাতে টাকাও কামিয়েছেন। জীবনের সব সখ পূরণ করতে গিয়ে দু’হাতে খরচও করেছেন; কিন্তু দু’হাতে টাকা উড়িয়েও কি জীবনের সব ইচ্ছে পূরণ করতে পেরেছেন ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা? উত্তর সোজা, না। অন্তত একটি ইচ্ছে পূরণ হয়নি আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির। ম্যারাডোনার অপূর্ণ সেই ইচ্ছেটি বড় অদ্ভূত, বিচিত্র। মৃত্যুর পর তার মরদেহটি যেন ভক্তদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়, এটিই ইচ্ছে ছিল ম্যারাডোনার।

মজার ব্যাপার হলো, মারাডোনার এই অদ্ভূত ইচ্ছেটি প্রকাশ পায় তার মৃত্যুর পর। তবে ইচ্ছেটি নিজেই প্রকাশ করেছিলেন ম্যারাডোনা। মৃত্যুর কিছুদিন আগে খুব কাছের কিছু বন্ধুপ্রতীম প্রিয় মানুষের কাছে নিজের অদ্ভূত ইচ্ছেটির কথা ব্যক্তও করেছিলেন ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের নায়কের এই ইচ্ছের কথাটি প্রকাশ পেয়েছে তার মৃত্যুর দুইদিন পর! সারা দুনিয়াকে তা জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় ক্রীড়া দৈনিক টিওয়াইসি স্পোর্টসের সংবাদকর্মী মার্টিন আলভারো। যিনি ম্যারাডোনার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মিশেছেন অন্তরঙ্গভাবে।

টিওয়াইসি স্পোর্টসকেই তিনি বলেন, ‘প্রথমে তার মূর্তি বানানোর কথা উঠেছিল; কিন্তু তিনি (ম্যারাডোনা) মানা করে বলেন, না, আমি চাই ওরা আমাকে সংরক্ষণ করুক।’ পরে মার্টিন আলভারো লন্ডনভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকেও জানান তথ্যটি। বলেন, ‘ম্যারাডোনা আমাদের মাঝে চিরকাল থাকতে চেয়েছিলেন।’ মার্টিন আলভারো যখন ম্যারাডোনার এই ইচ্ছের কথা প্রকাশ করেন, তার আগের দিনই ফুটবল জাদুকরের মরদেহ সমাহিত হয়ে গেছে। সুতরাং ম্যারাডোনার অদ্ভূত ইচ্ছেটি অপূর্ণই থেকে গেছে।

আর্জেন্টিনার ইতিহাসে শুধু দুজন কিংবদন্তির মরদেহ সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। দেশটির তিনবারের প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরন ও তার স্ত্রী ইভা পেরন। যিনি আর্জেন্টাইনদের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে খ্যাত। এই দুজনের সঙ্গী হতে চেয়েছিলেন ম্যারাডোনাও; কিন্তু সবার সব ইচ্ছেই যে পূরণ হয় না।

ম্যারাডোনা স্মরণে

ছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। কারও কারও মতে, সর্বকালের সেরা দু’জনের একজন। সেই ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাকে চির স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্বজুড়ে নানা কিছু হবে, এটি অনুমিতই। হচ্ছেও। ২৫ নভেম্বর বিকেলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ম্যারাডোনা। এরপর থেকেই শুরু হয় ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধা জানানোর পর্ব। সেই পর্ব চলছে এখনো। চলবে ভবিষ্যতেও। মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিশ্বের সাবেক-বর্তমান ফুটবলারসহ ভক্ত-সমর্থকরা ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধা জানাতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ছেয়ে যায় ম্যারাডোনার প্রতি শ্রদ্ধা বার্তায়।

পেলে, জিনেদিন জিদান, রোনাল্ডো নাজারিও, রিভালদো, রবার্তো বেজিও, আন্দ্রেয়া পিরলো, গ্যারি লিনেকার, কাফু থেকে শুরু করে হালের লিওনেল মেসি, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোসহ কে শ্রদ্ধা জানাননি কিংবদন্তি ম্যারাডোনাকে। ফুটবলারদের পাশাপাশি বিশ্ব বরেণ্য রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ীরাও প্রয়াত ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে ম্যারাডোনার অগণিত ভক্ত-সমর্থকদের কথা না-ই বা বললাম। সময়ের ব্যবধানে সেই শ্রদ্ধা বার্তার বানে ভাটা পড়েছে। তবে এখন শুরু হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানোর পর্ব। এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হচ্ছে ম্যারাডোনার নামে।

তবে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানানোর প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে নাপোলিই। ইতালির এই ক্লাবটিকে বাইরের দুনিয়া সেভাবে চিনতই না। ম্যারাডোনাই পায়ের মায়াবি ছন্দে অখ্যাত নাপোলিকে করেছিলেন বিখ্যাত। ইতালির ফুটবল ঐতিহ্যের ধারক জুভেন্টাস, এসি মিলানের মতো ক্লাবকে টেক্কা দিয়ে নাপোলিকে লিগ এবং উয়েফা কাপসহ আরও অনেক শিরোপা জেতান ম্যারাডোনা। বিনিময়ে জিতে নেন নেপলসবাসীর হৃদয়। 

১৯৮৪ থেকে ১৯৯১-এই ৭টি বছর নাপোলিতে খেলেছেন ম্যারাডোনা। এই সময়ে শুধু জাদুকরী ফুটবল শৈলী দিয়ে নয়, নিজের খেয়ালি আচরণের মাধ্যমেও নেপলসবাসীর মনের মণিকোটায় জায়গা করে নেন কিংবদন্তি ম্যারাডোনা। আসলে নেপলস শহরটিকেই বিখ্যাত করে তোলেন ম্যারাডোনা। 

বিনিময়ে নেপলসবাসীও দিয়েছে অনেক। ম্যারাডোনা ক্লাব ছাড়ার পর থেকেই ম্যারাডোনার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিটি চিরদিনের জন্য তুলে রেখেছে নাপোলি। ১০ নম্বর জার্সি পরে নাপোলিতে কেউ খেলে না। কাউকে দেওয়া হয় না। ম্যারাডোনাকে নিজেদের একজন করে নিতে নাগরিকত্বও দিয়েছিল ইতালি। মৃত্যুর দিন নাপোলি নিজেদের এস্তাদিও সান পাওলো স্টেডিয়ামটি সারা রাত আলো প্রজ্জলিত করে রাখে। 

যাতে আকাশ থেকে নাপোলিকে দেখতে পারেন ম্যারাডোনা! কিংবদন্তি ম্যারাডোনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে নাপোলি এবার নিয়েছে আরও বড় পদক্ষেপ। নিজেদের এস্তাদিও সান পাওলো স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে রাখতে যাচ্ছে ‘এস্তাদিও ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা স্টেডিয়াম।’ ম্যারাডোনার মৃত্যুর দিনই নাপোলি ভক্তরা ম্যারাডোনার নামে স্টেডিয়ামের নামকরণের দাবি জানায়। পরে নেপলসের সিটি কাউন্সিলে প্রস্তাবটি পাস হয়ে যায়। খুব শিগগিরই এস্তাদিও সান পাওলো স্টেডিয়াম হয়ে যাবে ‘এস্তাদিও ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা স্টেডিয়াম।’

ভারতের কলকাতার বারাসাতের আদিত্য স্পোর্টস স্কুলের ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নামকরণও হয়েছে ম্যারাডোনার নামে। তিন বছর আগে এই স্কুলের ১০০ ছাত্রের সঙ্গে ক্রীড়া কর্মশালা করেছিলেন ম্যারাডোনা। পরে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং বিসিসিআইর বর্তমান প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলিকে সঙ্গে নিয়ে একটি প্রদর্শনী ম্যাচও খেলেছিলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। পাকিস্তানের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট পিএফএফ ন্যাশনাল চ্যালেঞ্জ কাপ এবার ম্যারাডোনার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।

আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট কোপা দে লা লিগা প্রফেসিওনালে-এর নাম পরিবর্তন করে এবার ‘কোপা ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা কাপ’ নামকরণের ঘোষণা দিয়েছে। শুধু কী তাই? আর্জেন্টিনার সরকার গ্রহণ করেছে আরও বড় পদক্ষেপ। আর্জেন্টিনার টাকায় থাকবে ম্যারাডোনার ছবি। তবে সব ধরনের নোটে নয়। বড় মানুষ হিসেবে দেশের বড় বড় নোটগুলোতেই শুধু থাকবেন ম্যারাডোনা। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এক হাজার আর্জেন্টাইন ডলার ও এর বেশি মূল্যমানের নোটগুলোতে থাকবে ম্যারাডোনার ছবি। নোটগুলোর এক পৃষ্ঠে থাকবে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে ম্যারাডোনার ছবি। অন্য পিঠে থাকবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা সেই গোলটির। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের দ্বিতীয় যে গোলটি করেছিলেন ম্যারাডোনা। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেছে ২০২১ সালেই পাওয়া যাবে ম্যারাডোনার ছবিসহ আর্জেন্টাইন টাকা! সবে তো শুরু। ভবিষ্যতে আরও কত প্রতিষ্ঠান, স্থাপনার যে ম্যারাডোনার নামে নামকরণ হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে।

মেসি যা করেছেন

ম্যারাডোনাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দুনিয়াজুড়ে কত ভক্ত-সমর্থকই তো কত অদ্ভূত, বিচিত্র, বিতর্কিত কাণ্ডকারখানা করে চলেছেন। সেখানে তিনি তো ছিলেন লিওনেল মেসির সরাসরি ‘গুরু’। একই সঙ্গে স্বদেশিও। শৈশবেরও অনুপ্রেরণাও। তো সাবেক সেই গুরুর বিহেদী আত্মার শান্তি কামনায় মেসি বিশেষ কিছু করবেন না, তা কি হয়!

আবেগের বসে, ভালোবাসার টানে বিশ্বসেরা মেসিও সাবেক ‘গুরু’র স্মরণে এক কাণ্ড ঘটিয়েছেন। গত ২৯ নভেম্বর প্রকাশ্যে ঘটানো মেসির সেই কাণ্ড সারা দুনিয়া দেখেছে। সেদিন স্প্যানিশ লা লিগায় ওসাসুনার বিপক্ষে ম্যাচ ছিল মেসির বার্সেলোনার। ম্যাচে দলকে ৪-০ গোলে জেতাতে শেষ গোলটা করেন মেসি। ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধা জানানোর এই তো সময়। 

তো গোলটাও ছিল দেখার মতো। ওসাসুনার বক্সের বাইরে বলটা পেয়েছিলেন মেসি। বল পেয়ে নিজের অমিয় ছন্দে এক এক করে ওসাসুনার গণ্ডাখানেক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে শট। মেসির সেই কোণা ঘেঁষা শট ঠেকানোর সাধ্য ওসাসুনার গোলরক্ষকের ছিল না। 

ব্যস, গোল করেই দৌড় শুরু করেন মেসি। দৌড়ের মধ্যেই আবেগ-উচ্ছ্বাসে, পূর্ব পরিকল্পনা মতো গায়ে চাপানো বার্সেলোনার জার্সিটি খুলে ফেলেন মেসি। খেলা চলাকালে মাঠে জার্সি খুলে ফেলাটা অপরাধ, পেতে হয় ন্যূনতম হলুদকার্ড শাস্তি। শাস্তির কথাটা জানা থাকার পরও মেসি তা করেন। ম্যারাডোনার মতো সাবেক এক গুরুকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রশ্নে হলুদকার্ড শাস্তি, এ আর এমন কি! মেসিও তাই আনন্দের সঙ্গেই শাস্তিযোগ্য অপরাধটি করে বসেন।

বিস্ময়কর হলো, বার্সেলোনার জার্সিটি খুলে ফেলার পর বেরিয়ে এল আরও একটি জার্সি। যেটি মেসির গায়ের সঙ্গে একদম লেগে আছে। তাতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ‘নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ’। আর্জেন্টিনার একটি ফুটবল ক্লাবের নাম। জার্সিটির পেছনে বড় করে লেখা ‘১০’। 

বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার আগে শৈশবে আর্জেন্টিনার এই ক্লাবটিতে খেলেছেন ছোট্ট মেসি। তবে তিনি সেখানে ১০ নম্বর জার্সি পরে খেলেননি। তাহলে? ওই ১০ নম্বর ম্যারাডোনার। ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় এই নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে কিছুদিন খেলেছেন ম্যারাডোনাও। এবং যথারীতি নিওয়েলস ওল্ড বয়েজেও ১০ নম্বর জার্সি পরেই খেলেছেন ম্যারাডোনা। ক্লাবটির হয়ে ম্যারাডোনার অভিষেক ম্যাচটি সরাসরি মাঠে বসেই দেখেছিলেন ছোট্ট মেসি! সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষের বেশ কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে দর্শনীয় একটি গোলও করেছিলেন ম্যারাডোনা। যা দেখে ছোট্ট মেসিও মুগ্ধ হয়েছিলেন!

তাই মাঠ থেকে পূর্ণ শ্রদ্ধা জানাতে ম্যারাডোনার পরিহিত নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের ১০ নম্বর জার্সিটিই বেছে নেন মেসি। এবং সেদিন পরিকল্পনা করেই নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের জার্সিটি নিচে পরেছিলেন মেসি। উদ্দেশ্য ছিল একটিই- গোল পেলেই ম্যারাডোনাকে স্মরণে ‘নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে’র জার্সিটি দুনিয়াকে দেখাতে হবে। ভাগ্যগুণে সেদিন গোল পেয়েও যান মেসি এবং পরিকল্পনা মতো ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধাও জানান। 

কিন্তু এক ক্লাবের ম্যাচে অন্য ক্লাবের জার্সি পরা তো অনেক বড় অপরাধ। জার্সি খুলে ফেলাটা যে অপরাধ, মেসি নিশ্চিভাবেই জানতেন; কিন্তু নিচে অন্য আরেকটি ক্লাবের জার্সি পরাটা যে আরও বড় অপরাধ সেটি জানতেন কিনা জানা যায়নি। আর জানলেও আবেগের বসে হয়তো তার সেই অপরাধের কথা মনেই ছিল না। তবে মেসির মনে না থাকলেও শাস্তি থেকে তিনি রেহাই পাবেন বলে মনে হয় না। লা লিগা কর্তৃপক্ষ এই অপরাধে তাকে অর্থ জরিমানার শাস্তি দেবে বলেই শোনা যাচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত সেই শাস্তি ঘোষিত হয়নি।

অবাক ব্যাপার হলো, ওসাসুনার বিপক্ষে মেসির গোলটিও ঠিক নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে ম্যারাডোনার অভিষেক গোলটির মতোই। চাইলে দুটি গোলের ভিডিও জোগাড় করে মিলিয়ে দেখতে পারেন! মিলটি কী অদৃশ্য দেবতা ইচ্ছা করেই ঘটিয়ে দিয়েছেন! এক প্রয়াত ‘গুরু’কে এক শিষ্যের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা জানানোর ব্যাপার বলে কথা।

তেভেজ যা করেছেন

লিওনেল মেসি সাবেক গুরুকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েছেন তারই জার্সি পরে। কার্লোস তেভেজই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন! মেসির মতো তিনিও তো ম্যারাডোনার অতি প্রিয় এক শিষ্য। বরং তেভেজের প্রতি ম্যারাডোনার ভালোবাসা, সান্নিধ্যের স্নেহধন্য আশীর্বাদের পরশ আরও অনেক আগে থেকে। হৃদয়ের সেই আবেগ-ভালোবাসার টানে তেভেজও প্রায় মেসির মতো করেই প্রয়াত গুরু এবং শৈশবের নায়ককে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। গত ১ ডিসেম্বর কোপা লিবার্তাদোরেস কাপে ম্যারাডোনার জার্সি পরেই ম্যারাডোনাকে দিয়েছেন শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মেসির মতোই গোল করার পর বোকা জুনিয়র্সের বর্তমান জাসির্টি খুলে ফেলেন তেভেজ; কিন্তু নিচে বেরিয়ে এল আরও একটি জার্সি। সেটিও বোকা জুনিয়র্সের জার্সিই। তবে ১০ নম্বর লেখা সেই জার্সিটি ৩৯ বছরের পুরনো। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। ১ ডিসেম্বর কোপা লিবার্তাদোরেস কাপে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ইন্টারন্যাসিওনালের বিপক্ষে গোলের পর তেভেজ যে জার্সি দেখিয়ে প্রয়াত ম্যারাডোনাকে অর্ঘমাল্য দিয়েছেন, সেই জার্সিটি স্বয়ং ম্যারাডোনাই তাকে দিয়েছিলেন। যে জার্সির জন্য ম্যারাডোনাকে জ্বালিয়েও মেরেছিলেন ছোট্ট তেভেজ। 

সেটি সেই ১৯৮১ সালের ঘটনা। ম্যারাডোনা তখন আর্জেন্টাইন ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের হয়ে খেলতেন। তো ওই মৌসুমে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী রিভার প্লেটের বিপক্ষে বোকার ৩-০ গোলের জয়ে দর্শনীয় এক গোল করেছিলেন ম্যারাডোনা। তারও ৩ বছর পর জন্ম নেওয়া তেভেজ পরবর্তীতে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, বিরক্ত করে ম্যারাডোনার কাছ থেকে সেই জার্সিটি চেয়ে নিয়েছিলেন। শৈশবের নায়কের কাছ থেকে পাওয়া সেই অমূল্য উপহার যত্ন করে এখনো নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন তেভেজ। 

ম্যারাডোনার মৃত্যুর ৫ দিন পর তাকে হৃদয়ের অর্ঘমাল্য দিতে তেভেজ যত্নে রাখা পুরোনো সেই জার্সিটি বের করে বোকায় নিজের বর্তমান জার্সির নিচে পরে নেন। উদ্দেশ্য ছিল গোল করেই জার্সিটি দেখিয়ে মাটির নিচে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে যাওয়া ম্যারাডোনাকে অর্ঘ দেবেন। সৃষ্টিকর্তা তার মনের ইচ্ছা সেদিন পূরণও করেছেন। ম্যাচের একমাত্র গোলটি সেদিন করেন তেভেজই। আর গোল করেই পরিকল্পনা মতো বোকার বর্তমান জার্সি খুলে ৩৯ বছরের পুরনো জার্সিটি দুনিয়াকে দেখান। মানে ম্যারাডোনার জার্সি পরেই ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েছেন।

বুড়ো তেভেজ কাজটি কতটা আবেগের সঙ্গে করেছেন, সেটি ম্যাচ শেষে ফুটে উঠে তার কণ্ঠেও, ‘এটি ডিয়েগোর প্রতি আমার ছোট্ট শ্রদ্ধাঞ্জলি। ১৯৮১ সালের এই জার্সিটি তিনিই আমাকে দিয়েছিলেন। তাকে এই সুখ উপহার দিতে পেরে আমি আনন্দিত। নিশ্চিতভাবেই তিনি ওপর থেকে এটি দেখছেন।’ তেভেজ নাকি সেদিন আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি গোল পেতে যাচ্ছেন, ‘আমি জানতাম, আমি একটি গোল করতে যাচ্ছি। কারণ, এটি পরলে আমাকে ভালো খেলতেই হবে। আশা করি, আমরা তাকে কোপা লিবার্তাদোরেস কাপটি উপহার দিতে পারব।’ তার ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের চাওয়াও তাই। ম্যারাডোনা যে বোকারও ঘরের ছেলে।

ম্যারাডোনার আরও একটি জার্সি তেভেজের কাছে আছে। সেটিও এই বোকারই। ১৯৯৫ সালে ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় বোকায় ফেরার পর যে জার্সিটি পরে খেলেছেন ম্যারাডোনা; কিন্তু অর্ঘ জানাতে তেভেজ দুটির মধ্যে ১৯৮১ সালের জার্সিটিই বেছে নেন। কেন? উত্তর দিয়েছেন তেভেজই, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ১৯৮১ সালের জার্সিটিই পরব। কারণ, আমি যখন এটি পরি, আমার শরীরের ভেতর কি যেন ঘটে। আমি তা ব্যাখ্যা করতে পারব না। এই জার্সি, এই গল্প, সবকিছুই অন্যরকম।’

মজার ব্যাপার হলো, জার্সি খোলার অপরাধে তেভেজকেও হলুদকার্ড দেখিয়েছেন রেফারি। তবে রেফারি শাস্তিটি তেভেজকে বলেই দিয়েছেন। তেভেজই বলেছেন, ‘আমি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই এটি করেছি। এরপর রেফারি বললেন, এটি আমাকে করতেই হবে। তিনি তার কাজ করেছেন এবং সেটি সঠিকই ছিল। আমি নিশ্চিত ডিয়েগো ওপর থেকে সব দেখেছেন এবং হেসেছেন।’

বাবাকে সম্মান জানিয়ে মেয়েকে কাঁদিয়েছে বোকা

একবার নয়, দুই মেয়াদে বোকা জুনিয়র্সে খেলেছেন ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। দু’বারে অবশ্য মাত্র ৩টি মৌসুম খেলেছেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সফল এই ক্লাবটির হয়ে। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই বোকা জুনিয়র্সের সঙ্গে ভালোবাসার চিরন্তন এক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনার জীবদ্দশাতেই সেই 

অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছে বোকা। নিজেদের লা বোমবোনেরা স্টেডিয়ামে যেমন ম্যারাডোনার জন্য আলাদা একটি ভিআইপি বক্সই করেছিল। তার নামও রেখেছে ‘ম্যারাডোনা ভিআইপি বক্স।’ খেলা ছাড়ার পর নিজ নামের এই ভিআইপি বক্সে বসে বোকার কত ম্যাচ যে দেখেছেন ম্যারাডোনা! কখনো কখনো মেয়েদেরকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। 

সেই বোকা মৃত্যুর পর ম্যারাডোনার সম্মানে কিছু করবে না তা কি করে হয়! প্রয়াত ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বোকা বিশেষ কিছু করেছেও। যা করেছে, তা দেখে ম্যারাডোনার মেয়ে দালমা চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। কেঁদেছেন অঝোরে। ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর ৪ দিন পর মানে ২৯ নভেম্বর প্রথম ম্যাচ খেলতে নামে বোকা জুনিয়র্স। তার আগেও একটি ম্যাচ ছিল বোকার। তবে ম্যারাডোনার সম্মানে কোপা লিবার্তাদোরেসের সেই ম্যাচটি পিছিয়ে দেয় বোকা। ২৯ নভেম্বর আর্জেন্টিনার ঘরোয়া কাপ টুর্নামেন্ট কোপা দে লা লিগা প্রফেসিওনালে ম্যারাডোনারই আরেক সাবেক ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের বিপক্ষে প্রথম মাঠে নামে ম্যারাডোনা-উত্তর বোকা। তো নিজেদের মাঠের এই ম্যাচটিতে আমন্ত্রণ জানানো হয় দালমাকে। অতিথি দালমা ম্যারাডোনা ভিআইপি বক্সে বসেই ম্যাচটা দেখেন। ভিআইপি বক্সটি ঠিকই ছিল। হয়তো ম্যারাডোনার অনেক স্মৃতিও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুধু নেই ম্যারাডোনা। তো বাবাকে উৎস্বর্গ করা ম্যাচটি বাবার স্মৃতিবিজড়িত, বাবার নামে নামাঙ্কিত ভিআইপি বক্সে দেখে চোখের জল ঝরাতে বাধ্য হয়েছেন দালমা।

ম্যারাডোনার স্মরণে সেদিন কি করেনি বোকা! ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে বোকার খেলোয়াড়-কোচ-কর্মকর্তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন, ম্যারাডোনা বক্সে আর না আসতে পারেন, তাদের হৃদয়ে ম্যারাডোনার উপস্থিতি চিরন্তন। ম্যাচে বোকার সব খেলোয়াড়ই মাঠে নামে ‘ম্যারাডোনা’ লেখা জার্সি পরে! ম্যাচটা ২-০ গোলে জেতে বোকা। ম্যাচ শেষে জয়টাও প্রয়াত ম্যারাডোনাকে উৎস্বর্গ করে বোকা। তার আগে দুটি গোলের পরই ম্যারাডোনাকে সম্মান করেছে বিশেষ ভঙ্গিতে। বোকা প্রথম গোলটি করে ১২ মিনিটে।

গোলের পর গোলদাতা কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার কারদোনাসহ সবাই দৌড়ে গিয়ে জড়ো হন ম্যারাডোনা ভিআইপি বক্সের সামনে। এরপর ম্যারাডোনার খেলোয়াড়ী জীবনের একটি জার্সি এনে তা মাঠে বিছিয়ে দেন গোলদাতা কারদোনা। এরপর সবাই মিলে দালমার দিকে তাকিয়ে হাততালি দিতে থাকেন! সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তি বাবার সম্মানে এমন কিছু দেখে মেয়ে ঠিক থাকতে পারেন! অঝোরে কেঁদে ফেলেন দালমা। 

দ্বিতীয় গোলটিও এভাবেই উদযাপন করে বোকা। ম্যাচ শেষেও বোকার সব খেলোয়াড় মিলে দালমার সামনে গিয়ে করতালি দেন। এবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন দালমা। পরে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বুকে হাত রেখে দালমা দুটি শব্দ উচ্চারণ করেন, ‘গ্রাসিয়াস, মুচাস গ্রাসিয়াস।’ বাংলায়, ‘ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ।’

ম্যারাডোনার জন্ম

আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির জন্ম ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর। রাজধানী বুয়েনস এইরেসের নিকটবর্তী ছোট্ট শহর ভিল্লা ফিওরিতোর বস্তি এলাকার এক দরিদ্র পরিবারে। তারা মোট ৮ ভাই-বোন। ৫ বোন, তিন ভাই। ৮ ভাই-বোনের মধ্যে ম্যারাডোনা ছিলেন পঞ্চম। ৫ বোনের ৪ জনই ম্যারাডোনার চেয়ে বড়। তার দুই ভাই হলেন হুগো ও রাউল। তারা দু’জনেই ছিলেন পেশাদার ফুটবলার।

তো ভিল্লা ফিওরিতোর বস্তি এলাকাতেই তার বেড়ে ওঠা, ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়ির শুরু। এমন অনুর্বর এলাকার এক দরিদ্র পরিবারের ছেলের পক্ষে এত বড় খেলোয়াড় হওয়াটা সহজ ব্যাপার ছিল না। অমিয় প্রতিভা আর মনের ঐকান্তিক ইচ্ছার জোরে ম্যারাডোনা ঠিকই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে। যে সাফল্য যাত্রার প্রথম ধাপটি তিনি পেরোন আর্জেন্টাইন ক্লাব আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সে। ফুটবল শেখার স্বপ্ন নিয়ে মাত্র ১০ বছর বয়সে যোগ দেন এই ক্লাবটিতে। এরপর কেবলই তরতর করে উপর থেকে উপরে উঠে শিখরে পৌঁছে যাওয়া।

প্রথম খবর ক্যারাডোনা নামে

৬০ বছরের জীবনে কত দেশের কত পত্রিকায় কত লক্ষ বার সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই। জানেন কি, ডিয়েগো ম্যারাডোনা কিন্তু পত্রিকায় পাতায় প্রথম ছাপা হন ‘ক্যারাডোনা’ নামে। সত্যিই তাই। ম্যারাডোনা প্রথম খবর হয়েছিলেন ক্যারাডোনা নামে। সেটি অবশ্য ভুলবশত। ওই সাংবাদিক ভুল করে তার নাম ‘ক্যারাডোনা’ শুনেছিলেন।

ঘটনাটি ম্যারাডোনার ১১ বছর বয়সের। ছোট্ট ম্যারাডোনা তখন খেলতেন আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের বয়সভিত্তিক দল ‘লস সেবোলিতাস’-এ। ম্যাচ খেলার সুযোগ তেমন মিলত না; কিন্তু ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভা কি আটকে রাখা যায়! ম্যারাডোনার প্রতিভাকেও আটকে রাখা যায়নি। যতটুকু সুযোগ পেতেন, ততটুকুতেই দর্শকদের মোহবিষ্ট করে রাখতেন। আর্জেন্টিনোসের একটি রীতি ছিল, প্রথম বিভাগের ম্যাচের বিরতিতে ‘লস সেবোলিতাসের খুদে ফুটবলারদের মাঠে নামিয়ে দিত।

একদিন এ রকমই ম্যাচ বিরতিতে নেমে বল নিয়ে অবিশ্বাস্য কারিকুরি দেখাতে শুরু করেন খুদে ম্যারাডোনা। তা দেখে দর্শকেরা এতোটাই মুগ্ধ হন যে, ঘটে গেল এক বিপত্তি। বিরতি শেষ। খেলা আবার শুরু করতে হবে; কিন্তু খুদে ম্যারাডোনার জাদু দেখে দুই দলের সমর্থকেরা মিলে গ্যালারিতে গোলমাল বাঁধিয়ে দিল। দর্শকেরা আসল ম্যাচের চেয়ে খুদে ফুটবলারদের কারিকুরি দেখতেই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলেন! মূল ম্যাচ তারা শুরু করতে দিলেন না! 

ব্যস, খুদে ম্যারাডোনাকে নিয়ে পড়ে গেল হইচই কাণ্ড। সেদিন অন্য আরও সব ক্রীড়া সাংবাদিকের সঙ্গে মাঠে এসেছিলেন দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকা ক্লারিনের প্রতিবেদকও। তিনি স্বচক্ষে খুদে ম্যারাডোনার কারিকুরি দেখেন এবং ম্যাচ শেষে একটি প্রতিবেদনও লেখেন। খুদে ফুটবলারদের নিয়ে লেখা সেই প্রতিবেদন ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ক্লারিনে ছাপা হয়। প্রতিবেদনে ওই প্রতিবেদক লেখেন, ‘ও বাঁ পায়ের ফুটবলার। তবে ডান পা’টাও ব্যবহার করতে জানে। আর্জেন্টিনোস জুনিয়র ও ইন্দিপেনদিয়েন্তের মধ্যকার ম্যাচ বিরতিতে বল নিয়ন্ত্রণ ও ড্রিবলিংয়ের বিরল দক্ষতা দেখিয়ে দর্শকদের উষ্ণ করতালিতে স্লান হলো ১০ বছরের ডিয়েগো ক্যারাডোনার। ওর পরনের জার্সিটি ছিল বড়। শার্টের প্রান্ত এত বড় ছিল যে, ও নিচে ঠিকমতো দেখতেই পারছিল না।’

ব্যস, ভুল করে নাম ‘ক্যারাডোনা’ ছাপা হলেও ক্লারিনের ওই প্রতিবেদনের পর থেকে প্রায় নিয়মিতই খবর হতে থাকেন খুদে ম্যারাডোনা। দেশজুড়ে লাভ করেন পরিচিতি। পরের গল্পটি তো সারা দুনিয়ারই জানা। 

হতে চেয়েছিলেন ডিফেন্ডার

ডিয়েগো ম্যারাডোনা। নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জাদুকরী এক ফরোয়ার্ডের প্রতিচ্ছবি। যিনি সব সময় নিজের মায়াবী ড্রিবলিং আর গতি দিয়ে তটস্থ করে রাখতেন প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের। আর্জেন্টিনা জাতীয় দল, ক্লাব বোকা জুনিয়র, নাপোলি, বার্সেলোনা, সেভিয়া, আর্জেন্টিনোস জুনিয়র, নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ-ক্যারিয়ার জুড়ে যেখানেই খেলেছেন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবেই মাতিয়েছেন; কিন্তু জেনে অবাক হবেন, ফরোয়ার্ড বা আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নন, ছোটবেলায় ম্যারাডোনার স্বপ্ন ছিল ডিফেন্ডার হওয়ার। একজন নিখাঁদ ডিফেন্ডার হতে চেয়েছিলেন তিনি।

অন্য কেউ নন, স্বয়ং ম্যারাডোনাই জানিয়েছেন এই তথ্য। নিজের আত্মজীবনী ‘এল ডিয়েগো’তে ম্যারাডোনা নিজেই লিখেছেন, ক্যারিয়ারের শুরুতে ডিফেন্ডার হতে চেয়েছিলেন তিনি। ডিফেন্ডার হিসেবে খেলতেই পছন্দ করতেন বেশি, ‘আমি খেলতে চেয়েছি; কিন্তু জানতাম না কোথায় খেলব। তবে আমি ডিফেন্ডার হিসেবে খেলতেই বেশি পছন্দ করতাম। একজন ডিফেন্ডারই হতে চেয়েছিলাম আমি।’

ম্যারাডোনার ছোট বেলার এই চাওয়া পূরণ হয়নি। ডিফেন্ডার হতে চেয়ে হয়েছিলেন ফরোয়ার্ড। কিভাবে নিজের এই পছন্দ বদল, সেটি জানাননি। তবে যেভাবেই হোক, পছন্দটা বদল করে ভালোই করেছিলেন। কারণ, ডিফেন্ডার হলে ম্যারাডোনা নিজেকে এতটা উচ্চতায় তুলতে পারতেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় থাকেই।

খেলোয়াড় জীবন

ম্যারাডোনার ফুটবলের হাতেখড়ি আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সে। সেটি আগেই জানা। ১৯৭৬ সালে এই ক্লাবটির হয়েই পেশাদার ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে অভিষেক হয় ম্যারাডোনার। ৫ বছর এই ক্লাবেই খেলে ১৯৮১ সালে যোগ দেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সফল ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে। সেখানে এক মৌসুম কাটিয়ে ১৯৮২ সালে পাড়ি জমান ইউরোপে, নাম লেখান বার্সেলোনায়। বার্সায় দুই মৌসুম খেলে ১৯৮৪ সালে যোগ দেন নাপোলিতে। ইতালির এই ক্লাবটিতেই ম্যারাডোনার ম্যারাডোনা হয়ে ওঠা। লাভ করেন বিশ্ব তারকার খেতাব।

এই নাপোলিতে থাকতেই অংশ নেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। প্রায় একক নৈপুণ্যে দেশ আর্জেন্টিনাকে উপহার দেন দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি। মেক্সিকোর যে বিশ্বকাপটিকে বলা হয় ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ। তার আগে জাতীয় দলের হয়ে তার অভিষেক ১৯৭৭ সালে; কিন্তু ১৯৭৮ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি ম্যারাডোনা। তবে ১৯৮২ বিশ্বকাপে খেলেছেন। খেলেছেন ১৯৯০ এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও। সব মিলে ৪টি বিশ্বকাপে খেলেছেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ দিয়েই ইতি পড়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। তবে ক্লাব ফুটবল খেলেছেন ১৯৯৭ পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালে বোকা জুনিয়র্সের হয়ে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন। 

ক্লাব ক্যারিয়ার

অভিষেক : ১৯৭৬ সাল, 

অবসর : ১৯৯৭ সাল

জাতীয় দল অভিষেক : ১৯৭৭ সালে

অবসর : ১৯৯৪ সালে

ক্লাব ও দেশের হয়ে অর্জন

সব মিলে ক্লাব ক্যারিয়ারে শিরোপা জিতেছেন ৯টি। বোকা জুনিয়র্সের হয়ে ১টি, বার্সেলোনার হয়ে ৩টি ও নাপোলির হয়ে ৫টি। দেশের হয়ে একবার জিতেছেন যুব বিশ্বকাপের শিরোপা (১৯৭৯ সালে), জাতীয় দলের হয়ে একবার জিতেছেন মূল বিশ্বকাপ (১৯৮৬ সালে) এবং একবার হয়েছেন রানার্সআপ (১৯৯০ সালে)। এ ছাড়া ১৯৯৩ সালে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়েছেন আরতেমিও ফ্রাঞ্চি ট্রফি।

ব্যক্তিগত পুরস্কার

দলীয় সাফল্যের সুবাদে ক্যারিয়ারে ব্যক্তিগত পুরস্কারও পেয়েছেন অনেক। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন সোনার বল। একই বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে পেয়েছিলেন রুপার জুতাও। আর্জেন্টিনার ফুটবল লেখকদের রায়ে বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার পেয়েছেন ৪ বার। দু’বার জিতেছেন দক্ষিণ আমেরিকার অফিসিয়াল অ্যাওয়ার্ড।

এত সব কীর্তির মধ্যেই ম্যারাডোনা বেঁচে থাকবেন

চিরকাল। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //